Image

পর্যটনপ্রিয় কাচ সেতু-কাহন

চীনের হুনান প্রদেশের ঝানজ্বিয়াজি (Zhangjiajie) পার্কটি সুউচ্চ পর্বত আর সবুজ গালিচায় মোড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য আধার। এ নন্দন কাননটিকে স্বর্গ বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। নিগূঢ় সৌন্দর্য আস্বাদনে এখানে বছরজুড়েই ভিড় করে দেশি-বিদেশি পর্যটক। স্থানটির আকর্ষণ ও পর্যটনপ্রিয়তা বাড়াতে প্রদেশটির কর্তৃপক্ষ ঘটিয়েছে অবিশ্বাস্য কাণ্ড। নির্মাণ করেছে চমকপ্রদ এক কাচ সেতু। তবে যেনতেন সেতু নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ও লম্বা কাচের সেতু। কর্তৃপক্ষের ভাবনার ফসল কিন্তু বৃথা যায়নি; সাড়া পড়েছে অভাবনীয়। সেতুটি উদ্বোধনের পর ঝাঁকে ঝাঁকে উৎসাহী মানুষ এখানে এসে ভিড় করছে এক নজর এটিকে দেখতে। বিশ্ব মিডিয়াও প্রচার করছে এই সেতুর নির্মাণকৌশল এবং তা ঘিরে দর্শনার্থীদের যত কাণ্ডকীর্তি। ব্যতিক্রমী এ সেতুটি বিশ্বের বাঘা-বাঘা স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ারের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

কাচ নির্মিত অভিনব এ সেতুটি স্থাপত্যের চমক জাগানো শৈল্পিক উপস্থাপনা। সেতুটির নকশা করেছেন ইসরায়েলের স্থপতি হাইম ডুটন। সেতুটি দুটো বিশাল পাহাড়কে সংযুক্ত করেছে। এর পাটাতন ৬ মিটার চওড়া ৯৯টি স্বচ্ছ প্যানেল কাচে নির্মিত। সেতুটি লম্বায় ৪৩০ মিটার এবং মাটি থেকে ৩০০ মিটার ওপরে অবস্থিত। নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার, টাকার অঙ্কে যা ২৭ কোটি ২০ লাখেরও বেশি। চীনে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের কাচের সেতু ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তাদের এমন সেতু নির্মাণের রোগে পেয়েছে বললে ভুল হবে না। এর আগে কর্তৃপক্ষ তিয়ানমেন ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কে একটি ২০০ মিটার দীর্ঘ কাচ রাস্তা নির্মাণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ তাইওয়ানের নানতাউ- এ ১৭৯ মিটার উঁচু একটি সেতু নির্মিত হয়েছে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে টিকে থাকে কি না তা যাচাই-বাচাই শেষে উদ্বোধন করা হয় এ বছরের আগস্টে। উদ্বোধনকালেই যতটা চমক ও নাটকীয় ঘটনা ঘটানো যায়, তার কোনোটাই করতে বাকি রাখেনি কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অনেকেই হয়তো সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন, সে জন্য তারা এনেছিল বিশাল এক হাতুড়ি। দশাসই একজন মানুষ সে হাতুড়ি দিয়ে গায়ের জোরে কাচের পাটাতনে একের পর এক আঘাত করে নিশ্চিত করেছেন কাচের শক্তিমাত্রা। এতেই ক্ষ্যান্ত হয়নি তারা। পায়ে চলা সেতুতে একটি গাড়িও চালিয়ে নির্বিঘ্নে পার করিয়েছে। প্রকৌশলীদের দাবি, সেতুটি একসঙ্গে ৮০০ জনের ভার বহনে সক্ষম।

উইকিপিডিয়া

উদ্বোধনের পর থেকেই সেতুতে আয়োজিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রদর্শনী, যোগ ব্যায়ামসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান। স্বচ্ছ কাচের ওপর সেলফি ওঠানোর হিড়িক পড়ে গেছে। এক নবদম্পতি তো রীতিমতো হুলস্থুল ফেলে দিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের বিবাহ অনুষ্ঠান উদ্যাপন করতে বেছে নিয়েছেন সেতুটিকে। সেতুর স্প্যানের সঙ্গে রশি বেঁধে একটি ঝুলন্ত বিছানায় হয় মধুর শয্যা। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের ওপর এমন বাতাসে শূন্য বিছানায় শুয়ে থাকা অনেকের কাছে দারুণ রোমাঞ্চকর মনে হলেও বেশির ভাগই বলছে নিছক পাগলামি। তবে তা সেতুর আকর্ষণ বাড়াতে কর্তৃপক্ষের সাজানো নাটকও হতে পারে। নাটক হোক আর যা-ই হোক, এত উঁচু থেকে শূন্যে ঝোলা কি যা তা কথা! এ দম্পতির থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও পাঁচ জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা ওই সেতুর ওপরেই তাঁদের প্রতিজ্ঞা বিনিময় করেছেন। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে সেতুটি থেকে নিচে দুঃসাহসী বানজি জাম্প এবং একটি জিপ লাইন ধরে ঘোড়ার রেস।

উইকিপিডিয়া

কাচ সেতুটি সবার হৃদয় জয় করলেও এর নির্মাণ ছিল প্রকৌশলীদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। এমন পার্বত্য এলাকায় নির্মাণ উপকরণ পরিবহন যেমন খুবই বিড়ম্বনার, তেমনি সেখানে যন্ত্রপাতি স্থাপন করে সেতু নির্মাণ আরও কঠিন। তা ছাড়া প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা সহ্য করে তার টেকসই রূপ দেওয়া ছিল আরও কঠিন। তবে তাঁদের দাবি, ঝোড়ো বাতাস এবং ভূমিকম্পেও যেন সেতুটির ক্ষতি না হয় সেভাবেই তাঁরা ডিজাইন ও নির্মাণকাজ করেছেন। তবে কোনো কারণে যদি ভেঙে পড়ে তাহলে কী হবে? এ আশঙ্কার জবাবে তাঁদের দাবি, তিন স্তরে স্বচ্ছ কাচ দিয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর নিচে স্টিল কাঠামোর বুনন এতটাই ঘন, কেউ সরাসরি নিচে পড়বে না। সাধারণত কাচ পিচ্ছিল, যা বৃষ্টি কিংবা শিশির পড়ে ভিজে আরও পিচ্ছিল হয়। তবে তাঁরা এমন ধরনের কাচ ব্যবহার করেছেন, যা অনেক বেশি গ্রিপযুক্ত। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কম। তবে যাঁদের উচ্চতাজনিত ভীতি রয়েছে, তাঁদের প্রতি পরামর্শ সেতুতে না ওঠার। সার্বিক নিরাপত্তার জন্য কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৮ হাজার দর্শনার্থীকে সেতুতে ওঠার অনুমতি দিয়েছে।

সেতুটি উদ্বোধন হলেও সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে এ বছরের ২০ সেপ্টেম্বর। নিজের স্নায়ু পরীক্ষা এবং রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি পেতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন সেতুটিতে। তবে কাচ সেতুতে ওঠার আগে বুক ভরে লম্বা একটি শ্বাস নিতে ভুলবেন না, কিন্তু!

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৭তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬।

Related Posts

নুহাশ পল্লী: হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সবুজ রাজ্য

নুহাশ পল্লী বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র এবং কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর স্বপ্নে গড়ে ওঠা একটি অনন্য সবুজ…

পরিবেশবান্ধব এআই ডেটা সেন্টার ‘রিও এআই সিটি’

আন্তর্জাতিক আর্কিটেকচার স্টুডিও হাইফেন ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্ব রাজ্য রিও ডি জেনেইরোতে বিশ্বের প্রথম ডাটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।…

জীবন্ত স্থাপত্যের ধারণা: IGArchitects-এর নকশাকর্মের আলোকে বিশ্লেষণ

সমকালীন জাপানি স্থাপত্যচর্চায় IGArchitects একটি স্বতন্ত্র নাম। যারা স্থাপত্যকে সময়, আলো, বায়ু এবং মানব অভিজ্ঞতার সঙ্গে ক্রমাগত পরিবর্তিত…

২০২৬ সালে বিশ্বের আলোচিত সেরা ৫ স্থাপত্য

পুরস্কার এমনই এক শক্তিশালী মাধ্যম যে মাধ্যমে কৃতিত্ব ও কীর্তিমানদের পুনরুজ্জীবিত করা যায়। জাগানো যায় উন্মাদনা। স্থাপত্যে পুরস্কারের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *