একসময় ছোট কলকাতা নামেই ছিল কোটচাঁদপুরের খ্যাতি। চিত্রা নদী, কপোতাক্ষ নদ ও কয়েকটি সুবিশাল বাঁওড়বেষ্টিত এ জনপদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলের অসংখ্য নান্দনিক স্থাপনা ও নীল বিদ্রোহের দুঃসহ স্মৃতিচিহ্ন এখনো বয়ে চলেছে জেলা শহরটি। বাংলাদেশের অন্যতম পুরাকীর্তিসমৃৃদ্ধ এ জনপদটি ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম উপজেলা। এ জনপদের একজন সফল ও তরুণ নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. হুমায়ুন কবির হিরু। হাইস্কুল রোড, কোটচাঁদপুরের ‘মেসার্স শরিফুল ইসলাম অ্যান্ড সন্স’-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব এ ব্যবসায়ীর সাফল্য-রহস্য। সহসঙ্গী আকিজ সিমেন্টের আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. মোহন রায়হান ও বিপণন পরিদর্শক মো. রায়হানুজ্জামান।
ব্যবসায়ী মো. হুমায়ুন কবির হিরু ১৯৮৯ সালের ২৩ নভেম্বর ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম আলহাজ শরিফুল ইসলাম কবির ও মা মোছা. জোহরা পারভীন। ২ ভাই ১ বোনের সংসার। বড় বোন শামিমা আক্তার টুম্পা বিবাহিত, ছোট ভাই এহসানুল কবির নাফিস যশোর সরকারি পলিটেশনিক-এ উচ্চমাধ্যমিক ১ম বর্ষে পড়ছে। ব্যবসায়ী হিরু বর্তমানে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির কোটচাঁদপুর টেরিটরির এক্সক্লুসিভ ডিলার। তাঁর নির্মাণপণ্য সম্ভারে রয়েছে সিমেন্ট, রড, অ্যাঙ্গেল, পাতি ও শিট। পাশাপাশি ট্রান্সপোর্ট তথা গাড়ির ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত তিনি।
ব্যবসায়ী হিরুর বাবা ছিলেন অত্র এলাকার প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী। হিরু যখন নবম শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর বাবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে (স্ট্রোক) মারা যান। একমাত্র অভিভাবক হারিয়ে পরিবারটি পড়ে অথৈ সাগরে! পরিবারের বড় সন্তান নিরুপায় কিশোর হিরুকেই পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে হয়। অথচ ব্যবসা সম্পর্কে সামান্যই জ্ঞান ছিল তাঁর। সংকট মুহূর্তে দোকানের ম্যানেজার ও কর্মচারীরা তাঁকে ব্যবসা এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেন; ব্যবসা শেখান। তা ছাড়া ছোটকাল থেকেই মাঝেমধ্যে বাবার ব্যবসায় সময় দিতেন বিধায় ব্যবসাসম্পর্কিত কিছুটা ধারণাও ছিল। ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবশেষে সক্ষম হন ব্যবসা অনেকটাই নিজ আয়ত্বে আনতে। এরপর বিয়ে করেন। ঘর আলো করে আসে প্রথম সন্তান।
ব্যবসা-সংসার-সব মিলিয়ে মধুর ব্যস্ত সময় পার করছিলেন তরুণ এ ব্যবসায়ী। সুখের সংসার হঠাৎ ছেয়ে যায় কালবৈশাখীর কালো মেঘে। স্ত্রী সোমাইয়া আক্তার ঋতু আক্রান্ত হন মরণব্যাধি ক্যানসারে। তাঁর সুচিকিৎসায় একদিকে যেমন সময় দিতে হয়, অন্যদিকে ব্যয় হয় প্রচুর অর্থও। অথচ শত চেষ্টার পরও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। শোকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসতে পারেন না। ক্রমেই পুঁজিশূন্য হয়ে পড়ে সাজানো ব্যবসাটি। তাঁর মা যতটুকু সময় পেতেন ব্যবসার দেখভাল করতেন। ব্যবসার অবস্থা যখন একেবারেই শোচনীয় তখন হিরু শোক ভুলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন, অন্তত ছোট্ট মেয়ে ও সংসারের কথা ভেবে। পরিবার থেকে তাঁকে আবারও বিয়ে দেওয়া হয়। নতুন সহধর্মিণী আফসানা মিমি পরম মমতায় সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। স্ত্রীর এমন মহৎ হৃদয়ের পরিচয়ে আশ^স্ত হয়ে তিনি পূর্ণ মনোযোগ দেন ব্যবসায়। পরে তিনি জনক হন আরও একটি কন্যাসন্তানের। বড় মেয়ে মরিয়ম কোটচাঁদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে ফাতেমা, বয়স দেড় বছর।
ব্যবসায়ী মো. হুমায়ুন কবির হিরু স্বল্পকালীন ব্যবসায়ী-জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও দিনশেষে একজন সফল ব্যবসায়ী। এতটা মানসিক চাপ সহ্য করে সফলতা অর্জন মোটেও সহজসাধ্য নয়। নানা সমস্যা অতিক্রম করে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার পাথেয় হয়েছে তাঁর বাবার ব্যবসায়িক সুনাম। এ ছাড়া নিজস্ব কৌশল, সততা ও পরিশ্রমও করেছে সহায়তা। ছোট ভাইও ব্যবসায় বাড়িয়েছে সাহায্যের হাত। দুই ম্যানেজার আব্দুর রশিদ ও মাহবুবুল হক রেখেছেন অসামান্য অবদান। অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক সাফল্যে তিনি আকিজ সিমেন্টের পক্ষ থেকে পেয়েছেন এয়ারকন্ডিশন, ওয়াশিং মেশিন, স্মার্ট টিভি, নগদ টাকাসহ নানা উপহার। এ ছাড়া প্রতিবছর কোম্পানির দেওয়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করায় পেয়েছেন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অফার।
নির্মাণপণ্য ব্যবসায় সাফল্য পেতে প্রচুর ধৈর্য ধরতে হবে; থাকতে হবে সততা। রাখতে হবে সব ধরনের গুণগতমানের পণ্য। তবেই ব্যবসায় সফল হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন সফল তরুণ এ ব্যবসায়ী।
একনজরে
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম: মেসার্স শরিফুল ইসলাম অ্যান্ড সন্স
অবস্থান: হাইস্কুল রোড, কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ
ব্যবসা শুরু: ২০০১ সালে
নির্মাণপণ্য: সিমেন্ট, রড, অ্যাঙ্গেল, পাতি ও শিট
সাফল্যসূত্র
সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার পাথেয় হয়েছে তাঁর বাবার ব্যবসায়িক সুনাম। মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি নিজস্ব কৌশল, সততা ও পরিশ্রমও করেছে সহায়তা। ছোট ভাইও ব্যবসায় বাড়িয়েছে সাহায্যের হাত। এমন প্রেরণাদায়ী সাফল্যে অসামান্য অবদান রয়েছে দুই ম্যানেজার আব্দুর রশিদ ও মাহবুবুল হকের।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০২১