ব্য-ব্যবহার, ব-বক্তা, সা-সামর্থ্য। এই তিনেই ব্যবসা। অর্থাৎ ব্যবসা শব্দটিকে বর্ণে ভাগ করে বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যায় এর প্রকৃত মর্মার্থ। এই তিনটি বিশেষ গুণ ও যোগ্যতা যদি কারও থাকে তবে সে একজন প্রকৃত ব্যবসায়ী যে হবে তা হলফ করেই বলা যায়। ভালো ব্যবহার ক্রেতা আকর্ষণের সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। কোনো পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাকে যদি যুক্তিসহকারে বোঝানো যায়, তাহলে ওই ক্রেতা আগ্রহী হয় পণ্যটি কিনতে। তবে এর জন্য চাই বোঝানোর সক্ষমতা ও গুণগত মানসম্মত পণ্য। এ পর্যায়ে এসে দরকার হয় সুষ্ঠু ব্যবসা পরিচালনার চাবিকাঠি তথা পর্যাপ্ত মূলধন বা আর্থিক সামর্থ্য। এভাবেই ব্যবসাও যেমন পায় পূর্ণতা তেমনি এর পেছনের মানুষটিও হয়ে ওঠে একজন সফল ব্যবসায়ী। এর বাস্তব প্রমাণ শ্রীপুর, মাগুরার খামারপাড়া বাজারের মেসার্স হামজা ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী হাজি মো. আমির হামজা মোল্লা। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা শেখ মো. আবু খালেদের সহায়তায় সফল এ ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপচারিতায় ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার জানাব তাঁরই সাফল্যগাথা।
ব্যবসায়ী আমির হামজার জন্ম ১৯৬৯ সালের ৫ অক্টোবর মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার বরিশাট গ্রামে। পিতা মরহুম মো. আকবর হোসেন মোল্লা ও মা মোছা. রিজিয়া বেগম। বাবা ছিলেন একজন কৃষিপণ্যের (ধান, চাল, পাট) মজুদ কারবারি। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে আমির হামজাই সবার বড়। ১৯৮৮ সালে খামারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর বাবার ব্যবসায় যোগ দেন। অলস ব্যবসা; নেই কোনো প্রাণচাঞ্চল্য তাই ব্যবসাটি তাঁর ভালো লাগেনি। কোনো রকম বছর দুয়েক কাটানোর পর বাবার কাছে চান নিজেই ব্যবসা করার সুযোগ, যে ব্যবসায় থাকবে প্রচুর ক্রেতা সমাগম। বাবার কাছ থেকে সম্মতি নিয়ে মাত্র ৮৭ হাজার টাকায় শুরু করেন নিজের পছন্দের নতুন ব্যবসা। প্রথমে সার; দুই বছর পর সিমেন্ট। এরপর ব্যবসায় একে একে যুক্ত হয় কীটনাশক, তেলসহ অন্যান্য নির্মাণপণ্য। ২০০৬ সালে ফ্লাই অ্যাশবিহীন আকিজ সিমেন্ট যোগ হয় তাঁর বিক্রির তালিকায়। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই এলাকায় তিনি হয়ে ওঠেন একজন সফল ও স্বনামধন্য ব্যবসায়ী।
সুদীর্ঘ সময় ধরে সুনামের সঙ্গেই ব্যবসা করছেন আমির হামজা। এ সুনাম একদিনে অর্জিত হয়নি। বছরের পর বছর পরিশ্রমের পর এসেছে এ সাফল্য ও স্বীকৃতি। গুণগতমানসম্মত পণ্য বিক্রির ব্যাপারে বরাবরই থেকেছেন অটল। অধিক মুনাফার চেয়ে অধিক পণ্য বিক্রিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন সব সময়। ফলে মানুষ নির্দ্বিধায় আস্থা সহকারেই পণ্য কিনেছে তাঁর কাছে। স্থানীয় পরিচিতি কাজটিকে সহজ করেছে। ক্রেতারা যে শুধু পণ্যই কেনেন তা নয় বরং এ বিষয়ে পরামর্শও চান তাঁদের কাছে। এরই মধ্যে ব্যবসার পরিসর যেমন বি¯ৃÍত হয়েছে তেমনি বেড়েছে মূলধন। খামারপাড়া বাজারে এখন তাঁর একটি শোরুম ও সাতটি গোডাউন। নতুন নিজস্ব বাড়িও করেছেন। ২০১২ সালে আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে মাগুরা জেলার চতুর্থ সর্বোচ্চ বিক্রেতা ছিলেন। এ ছাড়া শ্রীখোল ইউনিয়নের বিসিআইসির সম্মানিত সারের ডিলার। তা ছাড়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য বিক্রির স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির তরফ থেকে পেয়েছেন টিভি, মোটরসাইকেল, মোবাইল, ডিনারসেট, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী ও সম্মাননা। একটি সিমেন্ট কোম্পানির তরফ থেকে ঘুরে এসেছেন কক্সবাজার।
নির্মাণ পণ্যের ব্যবসাকে আদর্শ ব্যবসা হিসেবে মনে করেন এ ব্যবসায়ী। কেননা এ ব্যবসায় ক্রেতা সমাগম বেশ। সহজে পাওয়া ক্রেতাকে চিরদিনের অটুট বন্ধনে বেঁধে রাখা খুবই কঠিন কাজ; আবার সহজও। মনে রাখতে হবে ব্যবসা একদিনের নয়; সারাজীবনের। তাই ক্রেতাদের প্রতি থাকতে হবে মমত্ববোধ ও আন্তরিকতা। ধীরে ধীরে এগিয়ে নিতে হবে ব্যবসাকে। তবে সবকিছুর পরও সততাই যে ব্যবসার সবচেয়ে বড় মূলধন, এমনটিই মনে করেন সফল এ ব্যবসায়ী। একজন সৎ ব্যবসায়ীকে কমবেশি সবাই পছন্দ করে। এ বিষয়গুলো ব্যবসায় কেউ ধারণ করতে পারলে যশ, খ্যাতি ও মুনাফা এমনিতেই আসবে বলে তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস।
ব্যবসায়ী আমির হামজা বিয়ে করেন ১৯৯১ সালে। স্ত্রী মোছা. রুবিয়া বেগম। সুখী এ দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় মেয়ে মোছা. রোকসানা পারভিন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। ছেলে মো. মেহেদী হাসান পড়ছে সপ্তম শ্রেণীতে। ব্যবসা পরিচালনায় ছোট ভাই মো. আসাদুজ্জামান দারুণ সহযোগিতা করেন। দোকানের অদূরেই তাঁর বাসা। সব সময় ভাইয়ের ছেলেমেয়ে ও পরিবারের খোঁজখবর নেন। এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে এলাকায় রয়েছে আমির হামজার সক্রিয়তা। তিনি প্রথম শ্রেণীর একজন ঠিকাদার। খামারপাড়া বাজার দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি। এ ছাড়া স্থানীয় মসজিদ কমিটির অন্যতম সদস্য। নিয়মিত নামাজ পড়েন, জাকাত দেন, হজও করেছেন। মসজিদ, এতিমখানা ও মাদ্রাসায় সাধ্যমতো সহায়তা করেন। সময় পেলে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান। তাঁর প্রিয় খাবার গোশত-রুটি।
ব্যবসা চলমান প্রক্রিয়া হলেও সব ব্যবসায় নির্দিষ্ট একটি সময়ে পণ্য তুলনামূলক বেশি বিক্রি হয়। নির্মাণপণ্যের সেই সময়টা এখনই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা; হরতাল, অবরোধ চলমান এ ব্যবসায় ঘটাচ্ছে ছন্দপতন। অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো তাঁরও কামনা এ সমস্যার আশু সমাধান।
মাহফুজ ফারুক
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৬ তম সংখ্যা, ফেবু্রুয়ারি ২০১৪