সড়কে বাইসাইকেল লেনের প্রত্যাশায়

কর্মব্যস্ত রাজধানীতে মানুষের নিত্য ছুটে চলা। সারাক্ষণ যানজট, তবুও গণপরিবহনের জন্য হাহাকার। গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। কোনোমতে বাসে উঠতে পারলেও দাঁড়িয়ে বা ঝুলে যাওয়াই যেন পরম নিয়তি। ধাক্কাধাক্কি, ঠাসাঠাসি আর গরমে একবারে নাজেহাল অবস্থা বাসযাত্রীদের। সঙ্গে বাড়তি ভাড়া তো আছেই। এভাবেই প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা; অর্থ আর স্বাভাবিক জীবনধারা। পরিস্থিতি যখন এমন, তখন তরুণেরা যাতায়াত বিড়ম্বনায় মুক্তির উপায় হিসেবে সঙ্গী করেছে বাইসাইকেল তথা দ্বিচক্রযানকে। আর তাই সাইক্লিংয়ে তাদের ব্যাপক উৎসাহ। বিনোদনের এই জনপ্রিয় বাহনটিই হয়ে উঠেছে যানজট সমস্যার সমাধান। কিছু সাইক্লিং সংগঠনও বাইসাইকেল ব্যবহারে মানুষকে আগ্রহী করতে চালিয়ে যাচ্ছে নানা কর্মকাণ্ড ও প্রচার-প্রচারণা। আর এ চেষ্টায় সংগত কারণেই বাড়ছে সাইক্লিস্টের সংখ্যা। কিন্তু ঢাকার সড়কগুলো একেবারেই বাইসাইকেলবান্ধব নয়। যান্ত্রিক যানের সঙ্গে চলার ঝুঁকির পাশাপাশি ভাঙা রাস্তা, গর্ত, উন্মুক্ত ম্যানহোল যেন সাইক্লিস্টদের জন্য মরণফাঁদ। এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করেও রাজধানীতে যেভাবে বাইসাইকেল বাড়ছে তাতে আশঙ্কা, সড়কে দেখা দিতে পারে নতুন বিশৃঙ্খলা। তাই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আগেই নিরাপদ সাইক্লিংয়ের জন্য পৃথক বাইসাইকেল লেন এখন সময়ের দাবি।

যে কারণে বাইসাইকেল

রাজধানীর নাগরিকদের তুলনায় সড়ক যেমন সীমিত, তেমনি গণপরিবহনও। পরিকল্পনাহীনভাবে সড়ক উন্নয়নের ফলে লেনভিত্তিক যানব্যবস্থা এ নগরে চালু হয়নি। তাই যানবাহন যতই বেড়েছে, ঠিক ততই বেড়েছে বিশৃঙ্খলা। তা ছাড়া বড় নগরে যে ধরনের আদর্শ যাতায়াত অবকাঠামো প্রয়োজন, সেটাও নেই এ নগরে। কম দূরত্বে হাঁটা, মধ্যম দূরত্বে বাইসাইকেল এবং দূরের পথে গণপরিবহন। কিন্তু তিন মাধ্যমের কোনোটিরই অবকাঠামো এবং উপযুক্ত পরিবেশ নেই। ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডিজের (ডিআইটিএস) গবেষণামতে, ঢাকায় ৬০ শতাংশ যাতায়াত হয় হেঁটে। ৭৬ শতাংশ যাতায়াত পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে, যার অর্ধেক আবার দুই কিলোমিটারের বেশি নয়। ফুটপাত নানাভাবে দখলে থাকার কারণে নেই হাঁটার সুষ্ঠু পরিবেশ, সাইকেলের জন্য নেই পৃথক কোনো লেন এবং বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (BRT) ন্যূনতম সুবিধা। রাজধানীতে বাইসাইকেল চালানোর উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে ক্রমেই কমছে যানটির ব্যবহার। অথচ এ দেশের প্রায় সর্বত্রই আগে যাতায়াতে ব্যাপক হারে বাইসাইকেল ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ষাটের দশকে ঢাকায় বাইসাইকেল তথা অযান্ত্রিক যানবাহন (রিকশা, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি) চালানোর জন্য ছিল পৃথক লেন। অথচ যান্ত্রিক যানের দৌরাত্ম্যে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়েছে এসব লেন। তা ছাড়া বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ইত্যাদি ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই লেনে বাইসাইকেল চালাতে অনেকেই নিরাপদ বোধ করেন না। ফলে ইচ্ছে থাকলেও বাইসাইকেল ব্যবহারে আগ্রহী নন অনেকেই। তা ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বাইসাইকেল রাখার স্ট্যান্ডও নেই খুব একটা। ফলে চুরির ভয় ও ঝামেলা মনে করে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন কেউ কেউ। ফলে বাইসাইকেল ব্যবহার বাড়িয়ে ঢাকার ভয়াবহ যানজট, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করাও সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীবাসীর মূর্তিমান এক আতঙ্ক যানজট। উড়ালসড়ক, বাইপাস সড়ক, মেট্রোরেল ইত্যাদি বড় বড় নানা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে। অথচ প্রধান সড়কগুলোতে এক চিলতে জায়গা মিলছে না সাইকেলের জন্য পৃথক লেন নির্মাণে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, উড়ালসড়ক সাময়িক যানজট নিরসন করলেও ভবিষ্যতে তা সংকট বাড়াবে। সাধারণ মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেরা যেভাবে বাইসাইকেল ব্যবহারে আগ্রহী, তাতে নিয়মনীতি না থাকলেও বাইসাইকেল উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে সড়ক ও যানব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো উচিত। সাইকেলের আলাদা লেন করতে সড়কে পর্যাপ্ত পরিসর নেই এমন অজুহাত সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার। তাদের দাবি, সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করলে অন্যান্য যান চলাচলের স্থান সংকুচিত হয়ে পড়বে। তাদের এ দাবি যুক্তিসংগত হলেও পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ, সাইকেলের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই চাপ কমবে যান্ত্রিক যানের ওপর এবং যা সরাসরি ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ একটি বাইসাইকেল চলাচল ও পার্কিংয়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম জায়গার প্রয়োজন হয়। হিসাবমতে, একটি গাড়ির জায়গা দিয়ে চলাচলে তিন থেকে পাঁচ এবং পার্কিংয়ে সাত থেকে দশটি বাইসাইকেল রাখা সম্ভব। সে হিসাবে যদি একটি লেনে প্রতি ঘণ্টায় দুই হাজার গাড়ি চলে, সাইকেলের বেলায় তা হবে প্রায় ১০ হাজার। ইউরোপিয়ান এনার্জি এজেন্সির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপের ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ির প্রতিদিনের গড় ভ্রমণ তিন কিলোমিটারের কম এবং ৫০ শতাংশ ভ্রমণ পাঁচ কিলোমিটারের কম। এর প্রতিটি ভ্রমণই বাইসাইকেলে করতে প্রয়োজন মাত্র ১৫ মিনিট।

সমাধানে যখন বাইক শেয়ারিং

পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা উন্নত বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এ জন্য তারা গাড়ি কমাতে এবং সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ। নগর যাতায়াতব্যবস্থা গতিশীল ও যানজট সহনীয় রাখতেও তাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সে দৌড়ে এগিয়ে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, চীন, জাপান, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রভৃতি দেশ। দেশগুলোতে বাইসাইকেল চালানোর আমন্ত্রণমূলক নানা পদক্ষেপ চোখে পড়ার মতো। পৃথক বাইক লেন, নিরাপদ বাইসাইকেলস্ট্যান্ড, বাইক শেয়ারিং, বিনা মূল্যে বাইসাইকেল চালানো সুবিধাসহ নানা প্রণোদনা। এমনকি ট্রাফিক সিগন্যালে বাইসাইকেলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাইসাইকেল ব্যবহারে অনেকটাই এগিয়ে ডেনমার্ক। বর্তমানে দেশটির রাজধানী কোপেনহেগেনে মোট যানবাহনের ৫০ শতাংশ বাইসাইকেল। নেদারল্যান্ডের রাজধানীর আমস্টারডামের জনসংখ্যা প্রায় সাত লাখ। সাইকেলের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। মানুষের চেয়ে বাইসাইকেল বেশি হওয়ায় পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট জায়গা থাকলেও অধিকাংশ সময় সেগুলো থাকে পূর্ণ। বাধ্য হয়ে অনেকে রাস্তার পাশে বাইসাইকেল রাখে। শহরটিতে বাইসাইকেল এত মাত্রায় বাড়ায় কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে বানাতে হয়েছে বাইসাইকেল খোঁয়াড় (ফিয়েটস ডিপো)। ২০১২ সালে খোঁয়াড়ে জমা হয়েছিল ৬৫ হাজার বাইসাইকেল। অবশ্য নির্দিষ্ট জরিমানা দিয়ে ফিরে পাওয়া যায় জমাকৃত বাইসাইকেল। আমস্টারডাম রেলস্টেশনের বাইরে বাইসাইকেল রাখার জন্য তিনতলা একটি পার্কিং রয়েছে, যেখানে আড়াই হাজারের বেশি বাইসাইকেল বিনা খরচায় রাখা যায়। এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন শহরে রয়েছে ফ্রি বাইসাইকেল সার্ভিস। যেখান থেকে মানুষ বাইসাইকেল নিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে তা আবার ফেরত দিয়ে থাকে। বাইসাইকেলবান্ধব অবকাঠামো একটি দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ হতে পারে স্পেনের সেভিলি শহর (Seville)। ২০০৬ সালে শহরটিতে গড়ে প্রতিদিন ছয় হাজার বাইসাইকেল ট্রিপ হতো, শুধু লেন নির্মাণ করায় ২০০৯ সালে নাটকীয়েভাবে বেড়ে তা পৌঁছায় ৫০ হাজারে।

ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে সাইকেলের বিস্তার ঘটছে ব্যাপক হারে। জনপ্রিয় হচ্ছে বাইক শেয়ারিং। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে স্বল্প দূরত্বের ভ্রমণে সবার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সাইকেলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় যে কেউ ঘরে বসেই বাইসাইকেল রিজার্ভ করতে পারে। ১৯৬৫ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টার্ডামে প্রথম ৫০টি সাদা রঙের বাইসাইকেল ছাড়া হয়। যেগুলো কোনো মূল্য পরিশোধ না করে চালিয়ে শহরের মানুষ যাতায়াত করতে পারত। পরবর্তী সময়ে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে কয়েন জমা দিয়ে এই প্রোগ্রামের প্রচলন শুরু হয়। এখনো তা চলছে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে। বর্তমানে এ প্রোগ্রামে আধুনিক নানা প্রযুক্তি সংযুক্ত হচ্ছে; যেন সহজেই যে কেউ এ সুবিধা নিতে পারে। নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ যখন বাইক শেয়ারিং চালুর ঘোষণা দেয়, মাত্র ৩০ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ হাজার লোক এই প্রোগ্রামে নিবন্ধন করে। ২০১৩ সালের শুরুতে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ২২টি আধুনিক বাইক শেয়ারিং প্রোগ্রাম চালু ছিল, যা এখন বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাইক শেয়ারিং নেটওয়ার্ক চীনের।

বাইসাইকেলের যত সুবিধা

বাইসাইকেল সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব যান। হেঁটে এবং বাইসাইকেলে চলাচলে যান্ত্রিক যানবাহনের ওপর নির্ভরশীলতা কমে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করতে হয় না বলে পরিবেশ থাকে দূষণমুক্ত। বিশ্বব্যাপী সাইকেলের প্রসার ঘটলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধ করা সম্ভব হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ৪০ শতাংশ এবং অন্যান্য দূষণের ৭০ শতাংশ আসে যান্ত্রিক যান থেকে। সাইকেলের ব্যবহার বাড়ালে ক্ষতিকর এই গ্যাস নির্গমন ঠেকানো যাবে। প্রতিবছর আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয় যান্ত্রিক যানের জন্য। ফলে ব্যয় হয় প্রচুর অর্থের। বাইসাইকেল ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহী করতে পারলে অনেকাংশে এই ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। তা ছাড়া যান্ত্রিক যানের বিরক্তিকর শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ন শব্দদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শব্দদূষণ কমিয়ে শহরকে শান্ত রাখতে বাইসাইকেল হতে পারে অনন্য বাহন। 

রাজধানীতে বাইসাইকেল এখন লাইফস্টাইলের অনুষঙ্গ; বিনোদনের অনন্য মাধ্যম। বিভিন্ন উৎসবের মাধ্যমে বাইসাইকেল চালানো পরিণত হচ্ছে সামাজিক আন্দোলনে। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং অন্যান্য ছুটির দিনে বাইসাইকেল আনন্দে মাতে সাইক্লিস্টরা। প্রায় সারা বছরই চলে নানা আয়োজন। দেশে ও দেশের বাইরে বাইসাইকেলভ্রমণের আয়োজন, দিনব্যাপী সাইক্লিং, সারা দেশ বাইসাইকেলে ভ্রমণ, প্রতিযোগিতা আয়োজনসহ বিভিন্ন শোভাযাত্রা ও সভা-সেমিনার এখন সংগঠনগুলোর নিত্যকাজ। লেখালেখি, ব্লগিং, ফেসবুক ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষকে সাইক্লিংয়ের উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত করছে সংগঠনগুলো। এ ছাড়া বাইসাইকেল ব্যবহারকারীদের নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করতে হেলমেট পরিধান, গতি নিয়ন্ত্রণ, রাস্তার বামে চলা, ট্রাফিক আইন মানা ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন করছে। সংগঠনগুলোর দাবি, বিনোদন ও যাতায়াতের পাশাপাশি বাইসাইকেল হতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সহজেই বাইসাইকেল ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া বাজারজাতকরণ কোম্পানি, এনজিও কর্মীসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাইসাইকেলের ব্যবহার বাড়িয়ে সম্ভব অর্থনৈতিভাবে লাভবান হওয়া।

সাইক্লিং একটি উৎকৃষ্ট ব্যায়াম। নিয়মিত বাইসাইকেল চালালে শরীর সুস্থ ও নিরোগ থাকে। বাইসাইকেল চালানোর সময় শরীর ঘামে, নিঃশেষ হয় অতিরিক্ত ক্যালরি এবং এর সঙ্গে বেরিয়ে আসে দূষিত পদার্থ। এতে শরীর ও ত্বক থাকে সুস্থ। মুক্ত বাতাসে সাইক্লিং করলে শ্বাস-প্রশ^াসের হার বেড়ে যায়। ফলে ফুসফুসে বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহে শ্বাসনালির রোগ প্রতিরোধ ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া এ সময় রক্তে নিঃসরিত হয় আনন্দদায়ক হরমোন এন্ডোরফিন, যা মনকে প্রশান্তি দান করে মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখে। নিয়মিত সাইক্লিং করলে পেশি সুগঠিত হয়, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ও রক্তচাপ কমায় হৃদরোগের আশঙ্কা কমে। বাইসাইকেল চালালে রোগ প্রতিরোধী কিছু কোষও তৈরি হয় শরীরে। ফলে সাধারণভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, যা বার্ধক্য প্রতিরোধে সাহায্য করে। শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠায় এটি দারুণ কার্যকরী। সর্বোপরি সুস্থ জাতি গঠনে বাইসাইকেল রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

পরিকল্পিত ও নিরাপদ বাইসাইকেল লেন

এত সম্ভাবনা কোনো কাজেই আসবে না, যদি না বাইসাইকেল চালানোর উপযুক্ত পরিবেশ না থাকে। আদর্শ ও বিজ্ঞানসম্মত নিরাপদ লেনই বাড়াতে পারে বাইসাইকেলের ব্যাপক ব্যবহার। কিন্তু ঢাকার সড়কের ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনায় লেন নির্মাণ সহজ নয়। উন্নত বিশ্বে লেনভিত্তিক যান চলাচলব্যবস্থা থাকায় সেখানে সবুজ রঙের লেন মার্ক, সাইকেলের প্রতীকী চিহ্ন দিয়েই সড়কের একপাশে বাইসাইকেল লেন করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে যান্ত্রিক যানও সবুজ সীমানায় ঢুকে পড়ত। তবে কঠোর আইন প্রয়োগের ফলে সমস্যাটি দূর হয়েছে। এ ছাড়া জংশন ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে জেব্রা ক্রসিংয়ের মতো বাইসাইকেল ক্রসিং লেন করা হয়েছে। ফলে বাইসাইকেল লেন অনেকটাই নিরাপদ। কিন্তু যেহেতু ঢাকার সড়ক যানজটপূর্ণ এবং আইন মানার প্রবণতা কম সে ক্ষেত্রে এখানে লেন নির্মাণ এবং তা শুধু বাইসাইকেল চলাচলে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না সেটা রীতিমতো এক চ্যালেঞ্জ। মোটরসাইকেল, রিকশা এমনকি পথচারীও চাইবে এই লেন ব্যবহার করতে। লেনটি শুধু বিশেষ কোনো রঙে সীমানা চিহ্নিত হলে যান্ত্রিক যানও ঢুকবে এমনকি পার্কিয়েও দখল হতে পারে। এ জন্য ঢাকার বাইসাইকেল লেন হওয়া প্রয়োজন সম্পূর্ণ আলাদা এবং সীমানাঘেরা। এর বাঁক, সড়ক চিহ্ন ও জংশন ব্যবস্থাপনা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তবে বাইসাইকেল লেনকে অবশ্যই নিরুপদ্রব রাখতে আগেই কিছু পরিকল্পনা নিতে হবে। ম্যানহোল, ড্রেন, খোঁড়াখুঁড়ি ইত্যাদির কবলে যেন না পড়ে এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ডিজাইন করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী লেনের জন্য রিজিট বা কংক্রিট পেভমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।

একটি নগরের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। বাইসাইকেল নিঃসন্দেহে নগরের বিরক্তিকর যানজট নিরসন, দূষণ ও পরিবেশরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ জন্য সরকারি পর্যায়ে লেন নির্মাণ, সাইকেলের ওপর কর কমানো, বাইসাইকেল উৎপাদন কারখানা প্রসারসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শুধু রাজধানীতেই নয়, সারা বাংলাদেশেই বাইসাইকেলবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত বাইসাইকেল রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুসারে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার আয় এসেছে এ খাত থেকে। বাংলাদেশে উৎপাদিত বাইসাইকেল বিশ্বজয় করতে পারলে কেন পারবে না ঢাকাকে জয় করতে। সুন্দর একটি অবকাঠামো পেলেই ঢাকাও হয়ে উঠতে পারে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের মতো বাইসাইকেলের শহর।

বিশেষজ্ঞমত

রাজধানীতে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাইসাইকেল। গরিবের যান বলে তরুণ প্রজন্ম বাইসাইকেলকে দূরে ঠেলে দেয়নি বরং যাতায়াতের কেতাদুরস্ত এক মাধ্যম করে নিয়েছে। এতে সে নিজে যেমন যানযটের তীব্র যাতনা থেকে মুক্তি পাচ্ছে, তেমনি নগরকেও দিচ্ছে কিছুটা স্বস্তি। রাজধানী হিসেবে ঢাকা খুব বড় শহর না হলেও যানবাহনের রয়েছে বিপুল চাহিদা। পর্যাপ্ত ও কার্যকর গণপরিবহন না থাকায় নাগরিক বিড়ম্বনার অন্ত নেই। অথচ ঢাকার লম্বালম্বি দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার এবং আড়াআড়ি দূরত্ব মাত্র ছয় কিলোমিটার। এখানে ৪৫ শতাংশেরও বেশি ট্রিপ হয় মাত্র তিন কিলোমিটারের মধ্যে। হেঁটে বা সাইকেলে সহজেই এ দূরত্ব অতিক্রম করা গেলেও উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় মানুষ যানবাহনে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। বাইসাইকেল উন্নত বিশ্বে যাতায়াতের জনপ্রিয় বাহন হলেও এ দেশে বিশেষ করে ঢাকায় পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও নিরাপত্তার অভাবে সাইকেলের বহুল ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। তবে আশার কথা, তরুণ প্রজন্ম বাইসাইকেলকে করেছে তাদের যাতায়াতের সঙ্গী। জীবাশ্ব জ্বালানিবিহীন এমন যান নগরের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য রক্ষায় খুবই প্রয়োজন।

ঢাকার জন্য বাইসাইকেল একটি আদর্শ বাহন। বিভিন্ন স্টাডির মাধ্যমে বিষয়টি গবেষকেরা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছেন। যেমন, ১৯৯৪ সালের ঢাকায় প্রথম কম্প্রিহেনসিভ স্টাডিণ্ড ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডিতে (ডিআইটিএস) বারবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল ছোট ছোট ট্রিপগুলোর জন্য বাইসাইকেলকে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন¦য় করা হোক। পাশাপাশি বাইক লেনগুলো রিকশার সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড করে জোনভিত্তিক একটি সেগ্রিগ্রেটেড লেন করার পরামর্শও ছিল। কিন্তু যা হয়, স্বল্প বাজেটের প্রকল্প বলে সরকার ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো আন্তরিক হয়নি। কারণ, তাদের আগ্রহে যত বড় প্রকল্পে যেগুলোতে প্রচুর অর্থের লেনদেন হয় এবং নির্মাণ সম্পন্ন হলে দেখভালের দরকার পড়ে না। তাই পরামর্শগুচ্ছমালায় মহাখালী ফ্লাইওভার, কয়েকটি টার্মিনাল, ফুটপাতের কিছু উন্নয়ন কাজ ছাড়া বাইসাইকেল লেনের মতো কম বাজেটের অথচ কার্যকর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৯৭ সালে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট স্টাডি (ডিইউটিবি) ফেইজ-১, ২-তেও ফুটপাত ও জংশনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেখানে জোনভিত্তিক বাইকওয়ে বা বাইসাইকেল লেন বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর অনীহার কারণে বিনিয়োগ হয়নি। এরপর ২০০০ ও ২০০৪ সালে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানেও (এসটিপি) পথচারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে ফুটপাত এবং বাইকওয়েকেও ইন্টিগ্রেটেড করার কথা বলা হয়েছে। তবে সেটা যেহেতু কৌশলগত একটি পরিকল্পনাপত্র বিস্তারিত নয় কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর ব্যাপক বা বিস্তারিত করার দায়িত্ব কেউ নেয়নি। এভাবেই অবহেলিত থেকেছে বিশেষজ্ঞ পরামর্শগুলো।

বাইসাইকেলভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা দেশের যাতায়াত সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ সড়ক। সে ক্ষেত্রে বাইসাইকেল লেন নির্মাণ অত্যন্ত প্রয়োজন। লেন না থাকায় এলোমেলো যান চলাচলব্যবস্থার কারণে বাইসাইকেল চালানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বাইসাইকেল সড়কের বামে চলে আবার গণপরিবহনগুলোও বাম ঘেঁষে চলে; যাত্রী ওঠানামা করায়। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে সব সময়। ঢাকাতেই একসময় কিছু স্থানে অযান্ত্রিক যানের জন্য আলাদা লেন (এনএমভি) ছিল। সেগুলোকে অবিবেচকের মতো যান্ত্রিক গাড়ির সুবিধা দেওয়ার জন্য মূল সড়কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন, নিউমার্কেটের সামনে এনএমভি লেনে পার্কিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য রিকশা লেনও ব্যবহারের উপযোগী থাকেনি। পার্কিং, ময়লার ডাস্টবিন, দোকান ইত্যাদির মাধ্যমে দখল হয়ে গেছে। ঢাকা সেনানিবাসে এখনো অযান্ত্রিক যানের একটি লেন আছে। লেনটি দখল হয়নি এবং নিয়ম মেনে যানবাহন চলছে। কারণ, সেখানে আইনের প্রয়োগ আছে।

অপরিকল্পিত সড়ক ও নগর উন্নয়নের ফলে ঢাকার সড়কে আলাদা লেন নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন। এর প্রধান কারণ, লেনের এই বিষয়টি কখনো পরিকল্পনাতেই ছিল না। সড়কসমূহ সমান্তরাল নয়। কোথাও চওড়া, কোথায় সরু। তাই যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, তা পূর্ণ মাত্রায় এ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ খণ্ডিত-বিখণ্ডিতভাবে লেন নির্মাণ করা গেলেও ধারাবাহিক বাইসাইকেল লেন (ঈড়হঃরহঁবং ইরশব ডধু) স্থাপন খুবই কঠিন। বাইসাইকেল লেন ন্যূনতম দেড় মিটার জায়গা নিয়ে করতে হয়। সড়কে ধারাবাহিক এতটা জায়গা বের করা খুবই দুরূহ। যেহেতু সরলপথে বা সড়ক যেহেতু সম্প্রসারণ করে লেন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এ জন্য পরিকল্পনা করে যেখানেই খোলা জায়গা মিলবে অর্থাৎ সড়ক, ফুটপাত, গলিপথ, পার্ক, মাঠ ইত্যাদি তাই যতটা সম্ভব কাজে লাগাতে হবে। বিষয়টাতে খটকা লাগলেও উন্নত বিশ্বে সড়কে স্থান সংকুলান না হলে এভাবেই লেন নির্মাণ করা হয়। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট স্টাডিতেও (ডিইউটিবি-জোন ১০) এমনটাই বলা হয়েছিল। ফুটপাতের চওড়া অংশ, পার্কের ভেতর দিয়ে গতি নিয়ন্ত্রিত আঁকাবাঁকা পথ (Sinusoidal Bike Way) তৈরি করে (যেন পার্কের দর্শনার্থীদের সমস্যা না হয়) এমনকি অলিগলিও ব্যবহার করার সুপারিশ ছিল। কিন্তু সড়কের দুই পাশে যদি বাইক লেন করা হয়, তাহলে রিকশা চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হবে বলে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ পরিকল্পনামতে, রিকশা কখনোই প্রধান সড়কের বাহন নয়।

লেনের মতো নিরাপদ অবকাঠামো ছাড়াই যেভাবে সাইকেলের সংখ্যা বাড়ছে, তা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বাইসাইকেল লেন করতে জোনভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সে জন্য প্রথমেই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। সবটা উদ্ধার করা না গেলেও যেটুকু সম্ভব তা দিয়ে সড়কের বাঁ পাশে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি লেন তৈরি করতে হবে। বুয়েটের গবেষণা বলছে, কোথাও কোথাও ৩০ শতাংশেরও বেশি দখল হয়ে আছে। যদি এয়ারপোর্ট সড়কে কথা বিবেচনা করা হয়, সেখানে কাজটি করা বেশ সহজ। আগে থেকেই সড়কের দুই পাশে রয়েছে সার্ভিসওয়ে। তবে তা কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন। এই সড়কে যদি সংযুক্ত করা যায়, তাহলে সহজেই লেন নির্মাণ সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন সমীক্ষার। ১৯৯৪ সালে অনেক ভালোভাবে করা যেত। ২০১৫ সালে এসেও কিছুটা সুযোগ আছে, এরপর আর সম্ভব হবে না। করা যাবে না জোনভিত্তিক আলাদা আলাদাভাবে। তখন গুরুত্ব বিবেচনায় মডেল লেন করতে হবে। বাইক পথ করতে গেলে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

একটি অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হয় না, তা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। হয়তো নির্মাণ সম্পন্ন পর্যন্ত সংস্থাগুলো দায়িত্ব নেবে কিন্তু ব্যবহারের উপযোগী রাখার দায়িত্ব কেউ নেবে না। লেনের জায়গা যেন কোনোভাবেই বেদখল না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। লেনগুলো যেন খোঁড়াখুঁড়ির কবলে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ইউটিলিটি সার্ভিসগুলো সড়কের নিচে নিতে হবে। বর্ষার সময় ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সবাই যেন আইন মেনে লেন ব্যবহার করে, সে জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে, চালাতে হবে প্রচার।

ঢাকায় গাড়ির চাপ প্রচুর। এই চাপ শাসন মানতে চায় না। তারাও চাইবে লেনে ঢুকতে। উন্নত দেশেও না মানার প্রবণতা দেখা গেছে। তারা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা দিয়ে এই অসংগতি নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রচুর ক্যাম্পেইনিং, প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে লেন মানতে সচেতন করা হচ্ছে। লেনের জন্য আলাদা সীমানাপ্রাচীর প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা মোটরসাইকেল। এখন যদি বাইকের জন্য আলাদা লেন করাও হয়, সেখানে মোটরবাইক ঢুকবে, যা বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করবে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামÑ এসব দেশের মোট যানবাহনের ৭০-৮০ শতাংশ মোটরসাইকেল। একে তারা অভিশাপ বলছে। কারণ, মোটরসাইকেলচালকেরা আইন মানে না। তদুপরি, মোটরসাইকেল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের সড়কের বাম দিক থেকে অতিক্রম করার ঝোঁক বেশি থাকে। এটা যেমন তাদের জন্য হুমকি, তেমনি বাইকের যাত্রীর জন্যও। ওসব দেশ মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমাতে সচেতনতা চালাচ্ছে আর আমরা সে পথেই হাঁটছি। থামানোর কোনো উদ্যোগ নেই।

প্রতিটি নগরের সমস্যার বৈশিষ্ট্য প্রায় এক ও অভিন্ন। ঢাকার বাইরে বড় শহরগুলোতেও একই সমস্যা দানা বাঁধছে। ভুল পরিকল্পনা, অবহেলা, ভুল চাপ, অত্যাচারে আমরা শহরকে নষ্ট করছি। আরও ভুল করলে এ শহর পরিত্যক্ত শহরে পরিণত হবে। তাই এখনই এখানে লেনভিত্তিক সড়ক বাস্তবায়ন করা উচিত। যে ভুলগুলো আমরা অতীতে করেছি, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেদিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যেখানে নতুন শহর গড়ে উঠছে যেমন- পূর্বাচল প্রকল্প, উত্তরা তৃতীয় ফেইজের মতো জায়গায়। এগুলোকে যদি সঠিক পরিকল্পনা না করে গড়ে তোলা হয়, তবে আবারও ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে। মনে রাখতে হবে নগরেরও স্বাস্থ্য আছে। সেটা ভালো রাখা আমাদের কর্তব্য। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দূষণ ও যানজটমুক্ত রাখার মাধ্যমেই এ কাজ করা সম্ভব। সাইকেলের মতো জ্বালানিবিহীন পরিবেশবান্ধব বাহনের ব্যবহার বাড়াতে যা যা করা প্রয়োজন, সরকারকে তা-ই করতে হবে। মানুষের রোগ যখন চিকিৎসার বাইরে পৌঁছাবে, তখন টাকা দিয়েও আর বাঁচানো যাবে না। তেমনি কোনো শহর যদি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, তাহলে আর কোনোভাবেই তাকে ব্যবহারের উপযোগী রাখা যাবে না। তাই পরিকল্পনাকারী ও সরকারকে আন্তরিক হতে হবে এ ব্যাপারে। নবনির্বাচিত মেয়ররা এই দায়িত্ব নিতে পারেন। যেহেতু তাঁদের একজন বাইসাইকেল চালিয়ে দেখিয়েছেন, তিনিও বাইসাইকেল ব্যবহারের পক্ষে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মাহফুজ ফারুক

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top