সৈয়দা জেরিনা হোসেন দেশের একজন খ্যাতনামা স্থপতি। এছাড়াও তিনি শিক্ষকতা, পরিবেশ আন্দোলন, নারী আন্দোলন ইত্যাদি নানান কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। জন্ম সিলেটে। আওয়ার লেডি অব ফাতিমা ক্যামব্রিজ স্কুল, কুমিল্লা থেকে প্রাইমারি, সিলেট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এআইটি) থাইল্যান্ড থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের একজন সক্রিয় সদস্য। ১৯৭৫ সালে স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষাদানের মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু করেন। এরপর পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। সেখানে রয়েছে তার ব্যক্তিগত কনসালটেন্সি ফার্ম। এছাড়াও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন, সিভিক অর্গানাইজেশান, ফোরাম ফর প্লানড চিটাগংসহ নানান সংগঠনের কাজের সাথে যুক্ত।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চট্রগ্রাম শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে পরিদর্শক অধ্যাপকের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন।
চট্রগ্রাম নগরীর পরিবেশ ক্রমেই বিপর্যয়ের সম্মুখন হচ্ছে এর প্রধান কারণগুলো কি কি?
শুধু চট্টগ্রামই নয় বাংলাদেশের সকল জনপদেই পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। যে নগর যত দ্রæত বাড়ছে সেখানেই বেশি মাত্রায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। তার মূল কারণ জনসংখ্যার চাপের ফলে নগর বর্ধণ ও বিনিয়োগে কোনো নীতি ও লক্ষের অভাব এবং নগর পরিকল্পনা ও পরিচালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম বা প্রতিষ্ঠান না থাকা।
যেমন চট্টগ্রামের নগরায়নের দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (PDK), এখানে কোনো নগর পরিকল্পনাবিদ নেই বহুদিন যাবত। পরিকল্পনা বিভাগও অকার্যকর বললেই চলে।
জনসেবামূলক কার্যকলাপ পরিচালনা করতে হয় সিটি করপোরেশনকে। তাদের পরিকল্পনা করার এখতিয়ার যৎসামান্য। তাই স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদের আনুষ্ঠানিক পদ ও কার্যকলাপ নেই বললেই চলে। তার উপর, চউক ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক (অপ্রাতিষ্ঠানিকও) কোনো সমন্বয় নেই।
রাজধানীর মত চট্টগ্রামের জনসংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলেছে, ফলে আবাসন একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে করণীয় কি?
আবাসনের মতো একটি বিরাট সমস্যা সমাধান করতে হলে সুদুরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি কর্ম পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি মূলনীতি হতে হবে। এর মধ্যে অবশ্যই বিকেন্দ্রীকরণ থাকতে হবে। জনসংখ্যা কোথায় বাড়বে সেই হিসেবে বিভিন্ন আয়ের জনগণের চাহিদা নির্ণয় করতে হবে। সরকারকে ভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য ভিন্ন রকম চিন্তা করতে হবে এবং প্রতিটি শ্রেণী কি পরিমাণ সুযোগ সুবিধা বা জায়গায় বিস্তার করতে পারবে তার নিরীক্ষা প্রয়োজন। যেমন উচ্চ আয়ের ৩০ শতাংশ এর মত জনগণের চাহিদা বাজার ব্যবস্থা পূরণ করতে পারা উচিত। নিচের ১০ শতাংশ জনগণের জন্য হয়তো শেল্টার বা ঘুমানোর জায়গার ব্যবস্থা শুরু করা যেতে পারে। মাঝের ৬০ শতাংশ মানুষের জন্য যে কোনো নগরে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে পারে যাতে ৫, ১০, ১৫ বছরে ক্রমান্বয়ে আবাসনের ব্যবস্থা সরকার করবে।
পাহাড় কাটলে পরিবেশের কি ধরনের ক্ষতি হয়? যেহেতু পাহাড়কাটা আইনত অপরাধ, এটা বন্ধে বার বার রুল জারি হলেও কেন তা বন্ধ হচ্ছে না?
নির্বিচারে পাহাড় কাটলে উক্ত এলাকার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। এছাড়াও মাটিতে ধস নামে, পাহাড়ের উপরিভাগের আচ্ছাদন সরে যাওয়ায় বৃষ্টির সাথে পলি নিচে নেমে পানির স্বাভাবিক চলাচলের রাস্তা, নালা, নর্দমা ভর্তি করে, তাই পাহাড় সংলগ্ন নিচু ভূমি এমনকি নগরীর নিচু এলাকায় পাহাড়ি ঢল নেমে ওইসব এলাকাকে প্লাবিত করে। এমন ঘটনা সহসা হয় বলে মৃত্যৃসহ জনজীবনের অনেক ঝুঁকি ও ক্ষতি হয়। পাহাড় ধসে এর পাদদেশে বসবাসরত অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।
পাহাড়ি জমিকে যে কোনোভাবে ভাগ করে বিক্রি করা যায়। তাই একজন ক্রেতা পাহাড়ের যে কোনো স্থানে যেনতেনভাবে জমি কেনে। এমন খÐ জমি কিনলে, তাকে ব্যবহার উপযোগী করতে হলে কর্তন করতে হয়। আবার জমি ব্যবসায়ীরা এমনভাবে পাহাড়ি জমি ক্রয় করে যেন তাকে সমতল ভূমির কায়দায় প্লট ও রাস্তার বিভাজন করে বিক্রি করে। পাহাড়ি জমি ব্যবহার করা হলে তার catchneat ও contoun বিবেচনা করে আইনগতভাবে এমন পদক্ষেপ বন্ধ না করা হলে কেবল পাহাড় কাটা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে করতে হবে। আইন করে পাহাড় কাটা রোধ করা কঠিন।
বর্তমানে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে যে ধরনের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে দুর্যোগ মোকাবেলায় তা কতটুকু সক্ষম? যদি না হয় তাহলে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছু বলুন?
দুর্যোগ বলতে যদি ভূমিকম্পের কথা চিন্তা করা হয় তবে এটি একটি প্রকৌশলগত বিষয়। যথাযথ ডিজাইন ও তদারকি করা হলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অবশ্যই কম থাকবে। এমন বিষয় প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন।
বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে কাঁচ দিয়ে ঢাকা বিল্ডিং এবং জলবায়ুর কোনোরকমের বিবেচনা না করে যেভাবে বিল্ডিং করা হচ্ছে তাতে যেমন বিদ্যুৎ সমস্যা কোনো দিনও মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া এমন বিল্ডিং ব্যবহারের খরচ বহুমাত্রায় বেড়ে যাবে। এসব বিল্ডিং পরিবেশ এবং সামাজিক সমতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত। কিভাবে এ শহরকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যায়?
চট্টগ্রাম নগরের সম্ভাবনা বিশাল। এর হাজার বছরের ইতিহাস আছে। তবে অবহেলা ও অসচেতনতায় বহু নিদর্শন হারিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম নগরের আছে, পাহাড় ও নিচু ভূমির অপূর্ব সুন্দর মিশ্রণ, আছে শতবর্ষ ঊর্ধ্ব দীঘি, জলাশয় ও রেলওয়ের অপূর্ব সুন্দর এলাকা।
সুষ্ঠু দূরদর্শন, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা নগরকে পর্যটকবান্ধব করতে পারি। পরিতাপের বিষয়, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ও আইনগত কাঠামোর অভাবে আমরা তা করতে পারছি না। তাই মূল কথা বার বার বলতে হয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি ও তার আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তা করা সম্ভব।
আপনি একজন পরিবেশ আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে চট্রগ্রামের পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কর্মকাÐ সম্পর্কে কিছু বলুন?
বাপা চট্টগ্রাম পরিবেশ আন্দোলনকে আরো বেগবান ও জোরালো করার জন্য নিজেকে আরো শক্তিশালী করার প্রয়াস চালাচ্ছে। এরই মধ্যে নগরায়নের কিছু অসঙ্গিতপূর্ণ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। যেমন ঐতিহাসিক লালদীঘিকে বিনষ্ট করে সুইমিংপুল করার উদ্যোগ, প্রবর্তক পাহাড়ের সড়ক জংশনে বিশালাকার বিপণি বিতান নির্মাণ ইত্যাদি। এই মাসে বাপার চট্টগ্রাম শাখার ৭টি কমিটি তাদের স্ব স্ব বিষয়ের ওপর সমস্যা ও ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা কি কি হতে পারে তা সুপারিশ পেশ করবে একটি গোলটেবিল বৈঠকে। সেখান থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।
আপনি একাধারে একজন স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে চট্টগ্রামের পরিবেশ রক্ষার্থে কি কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পরে?
বিক্ষিপ্ত ও একসাথে কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এ চট্টগ্রামের পরিবেশ কখনোই রক্ষা করা যাবে না। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সরকার সুস্থ, টেকসই ও ধারাবাহিক নগরায়নের কর্মপন্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। জনগণকে এই প্রচেষ্টায় সামিল করতে হবে।
নগর পরিকল্পনা, পরিচালন ও ব্যবস্থাপনায় একটি যথার্থ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে এবং পরীক্ষিত ও প্রাতিষ্ঠিত নানা কারিগরি ব্যবস্থা এবং উপায় কার্যকর করে জনগণের সঙ্গে সংলাপ সুযোগ নির্দেশনা দিয়ে দক্ষ পেশাজীবীর মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নগরায়ন ঘটাতে হবে যা এখন নিতান্তই অনুপস্থিত।
- প্রকাশকাল: বন্ধন ২৬ তম সংখ্যা, জুন ২০১২