Image

জীবনের জন্য স্কুল

আকাশ আমায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাই রে,
কর্মী হবার মন্ত্র আমি
বায়ুর কাছে পাই রে।


সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়
আপন তেজে জ্বলতে,
চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে,
মধুর কথা বলতে।


বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,
সবার আমি ছাত্র,
নানানভাবে নতুন জিনিস
শিখছি দিবারাত্র।

কবি সুনির্মল বসু ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতায় প্রকৃতির সবকিছুকেই তাঁর শিক্ষক আখ্যয়িত করেছেন। আকাশ শেখায় উদারতা; বায়ু শেখায় কর্মস্পৃহা; পাহাড় শেখায় মহানুভবতা; আর খোলা মাঠ শেখায় বড় মনের মানুষ হতে। সূর্য, চাঁদ, ঝরনা, পাখি কেউ আসলে বাদ যায় না দীক্ষাদানে। সবাই আমাদের শিক্ষক। কবির ভাবনার এই জগৎই যদি আমাদের মহাবিদ্যালয় হয়, তবে শ্রেণিকক্ষগুলো কেন চার দেয়ালে বন্দী থাকবে? জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র হতে হবে উন্মুক্ত। তেমনই ভাবনা থেকেই স্থপতি জন ও সিনথিয়া হার্ডি নির্মাণ করেছেন এক স্বপ্নের স্কুল। নাম দিয়েছেন গ্রিন স্কুল, ‘জীবনের জন্য স্কুল’ (Green School, ‘School for Life’)’). এটা শুধুই একটি বিদ্যালয় নয়, স্বপ্নঘেরা এক শৈল্পিক ভুবনও।

গ্রিন স্কুল একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্বজনীন বিদ্যালয়। ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ বালিদ্বীপের শিবাং কাজা (Sibang Kaja) গ্রামের প্রকৃতিঘেরা এক সবুজ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির নির্মাণকাজ শুরু ২০০৫ সালে এবং শেষ হয় ২০০৭ সালে। প্রায় ৮ হেক্টর জায়গা নিয়ে অবস্থিত এই বিদ্যালয়কে ঘিরে রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টি, বন ও ধানখেত। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিদ্যালয় ভবন ছাড়াও রয়েছে খেলার মাঠ, পুকুর, বাগান, অডিটরিয়াম, জিমনেশিয়াম, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র, অতিথি ভবন আর হাঁটাপথ। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো খোলামেলা। নেই কোনো দেয়াল; নেই লাগোয়া ছাদ।

গ্রিন স্কুল

স্থপতি জন (John) ও সিনথিয়া হার্ডি (Cynthia Hardy) গ্রিন স্কুল নির্মাণে ব্যবহার করেছেন সম্পূর্ণ স্থানীয় উপাদান, যার প্রায় ৯৯ শতাংশই প্রাকৃতিক। প্রধান কাঠামোগত উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বাঁশ। শক্তিশালী নির্মাণ উপকরণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার বাঁশ বেশ প্রসিদ্ধ। সব কাঠামোর ছাদে বা চালায় তাঁরা ব্যবহার করেছেন অ্যালাঙ্গলাঙ্গ থার্চ (Alangalang thatch) নামক একধরনের স্থানীয় ঘাস। ইট ও মাটির ব্যবহারও লক্ষণীয়। এ ছাড়া আগ্নেয়গিরির পাথর, রেমড আর্থও ব্যবহৃত হয়েছে এটিতে। বিদ্যালয়ের ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে একটি গাছও কাটেননি তাঁরা বরং সেগুলোকে রেখেই ডিজাইন করেছেন। কিছু গাছ তো চাল ফুঁড়ে আকাশে উঠে গেছে। কোথাও কোথাও এগুলোকে আবার খুঁটি বা অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এলাকাটি যেহেতু পাহাড় ও টিলাঘেরা, যাতায়াতের সুবিধার্থে ঝিরিপথের ওপরে নির্মাণ করা হয়েছে বাঁশের সেতু। সেতুর ওপরে অ্যালাঙ্গ ঘাস দিয়ে চমৎকারভাবে ছাউনি দেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাইক্রো-হাইড্রো শক্তি, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ো-ডিজেল এবং প্রাকৃতিক শক্তির মতো কতিপয় নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস এখানে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রতিটি স্থাপনা স্থানীয় ঐতিহ্যকে বজায় রেখে চালাঘর আকৃতিতে করা। মোটা একগুচ্ছ বাঁশ স্থাপনার কলাম হিসেবে বেশ শক্ত-পোক্তভাবে ধরে রেখেছে খড়ের চালাকে। কয়েক স্তরের চালার ফাঁক গলে ঠিকরে পড়ে আলো। প্রাকৃতিক আলোর সহজ প্রবেশে দরকার হয় না কোনো বৈদ্যুতিক বাতির। উঁচু ও খোলামেলা ছাদ সহজেই সতেজ বাতাস বাইরের মতো ভেতরকেও রাখে শীতল। তবে বাঁশ-খড়ের বিশেষ চালা (rig) ভারী বৃষ্টি ও দমকা বাতাস থেকে খুব ভালোভাবেই রক্ষা করে। প্রতিটি ভবনই দ্বিতল। ওপরে ওঠার সিঁড়িও বাঁশের তৈরি। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার চেয়ার-টেবিল এমনকি তাঁদের শোবার খাটও বাঁশের। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঁশের মজবুত বুনন শৈল্পিকতা ছাড়িয়ে অনন্য রূপে অলংকৃত হয়েছে।

বিদ্যালয়টির শৈল্পিক নির্মাণ কৌশল প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা নয় বরং বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি করে। আত্মিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিসরটি শেখায় প্রকৃতি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। শেখায় সবুজ আন্দোলনের উদ্যমী নায়ক হতে! ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত মানসিকতা গড়ার লক্ষ্যে স্থপতিদ্বয় তাঁদের স্থাপত্যকর্মকে এমন শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা দেখলেই মনকে নাড়া দেবে। তাঁরা পরিসরকে এমনই পরিবেশবান্ধব করে উপস্থাপন করেছেন, যাকে ২০১২ সালে বিশ্বের সবুজতম স্কুলের অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল। নান্দনিক এ স্থাপনা এবং খুদে শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বের গণমাধ্যম কত যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার হিসাব নেই। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনও সম্প্রতি এসেছিলেন এই বিদ্যালয় পরিদর্শনে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এবং বাচ্চাদের শেখার পদ্ধতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে দারুণভাবে।

গ্রিন স্কুল

গ্রিন স্কুলের এই মহান শিক্ষা অর্জনে জড়ো হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খুদে শিক্ষার্থীরা। ৫৫টিরও বেশি দেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী। ওরা এসেছে প্রকৃতির নিবিড় তত্ত্বাবধানে নিজেদের প্রকৃতির সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর বিশুদ্ধতা থেকে নির্যাস নিয়ে তারাও হবে পরিশুদ্ধ। এমনভাবে তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে যেন তারা আজীবন তা ধারণ করতে পারে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ব্যাপারে খুবই সচেতন। তাঁরা শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই দেয় না, বরং তাদের হাতেকলমে শেখায়। অনেকটা কাজের মাধ্যমে শেখা। যেন কাজ করো, শেখো! যেমন- হস্তশিল্প, কৃষি, প্রকৌশল, ফ্যাশন ডিজাইনের মতো কর্মমুখী যত শিক্ষা।

গ্রিন স্কুলের খুদে শিক্ষার্থীদের দেখে যে কেউ হকচকিয়ে যাবে এটা হলফ করে বলা যায়। বাচ্চারা কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, কেউ আবার কাস্তে হাতে ফসলের আগাছা পরিষ্কার করছে, অনেকে আবার বাঁশ দিয়ে খেলনা বানাচ্ছে; ছবি আঁকছে; মাটির টেরাকোটা বানাচ্ছে; পাপেট বা পুতুল তৈরি করছে; খেলাধুলা; শরীর চর্চাÑ কোনো কিছুই বাদ পড়ছে না। নিয়মিত পড়ালেখা ছাড়াও দলগতভাবে তারা যা করে তা দেখে মনে হবে বিদ্যালয়টি একটি মানুষ গড়ার কারখানা। সবাই মিলে গান গাচ্ছে, বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, ক্যাম্প করছে, মার্শাল আর্ট শিখছে আরও কত কী! এরাই আবার সকালে ধ্যান করলে সন্ধ্যায় মাতে নাটকে, গল্প বলায় বা পাপেট শোতে। এভাবেই হাসি-আনন্দে বেড়ে উঠছে সবুজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা এখানে শারীরিক ও মানসিকভাবে এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে যে ভবিষ্যতে যেকোনো দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একেকজন হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী; দার্শনিক; শিল্পী কিংবা নেতা।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৯তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৫

Related Posts

ভবন নয় যেনো বাসযোগ্য ল্যান্ডস্কেপ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটন ও কুইন্সের মাঝখানে ইস্ট রিভারের বুকে অবস্থিত  রুসভেল্ট আইল্যান্ড । ঘন নগরায়ণ, উঁচু ভবন ও ব্যস্ত…

২৫ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে টুইন টাওয়ারের স্মৃতি

নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের আকাশরেখায় আজ যে সুউচ্চ ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো শুধু আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন নয়। এগুলো একটি…

ByBySarwar Alam Sep 14, 2026

আলোচনায় আসছে ‘আর্ক ডি ট্রাম্প’

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির স্থাপত্য-ভূদৃশ্যে যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি বিশালাকার বিজয়-তোরণ—যার নামই হলো ‘ ওয়াশিংটন ডিসির বিজয় তোরণ’।…

মাটির নিচে আরেক পৃথিবী

গ্রিসের সিফনস দ্বীপের উপকূলীয় পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ‘পৃথিবীর ভেতের’ (Within the Earth) যেন কোনো নতুন ভবন নয়। এটি…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

রান্নাঘরে খেলাচ্ছলে টুইস্ট নিয়ে এসেছে ডিজাইনবুম শপের নতুন কিউরেটেড সংগ্রহ
বাগানের ভেতর রঙিন খিলানে বিস্তৃত হলো এক ইরানি বাড়ি: গেলারেহ হাউস
বেঙ্গাজির নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা আঁকছে ZHA
ফেসবুক পোস্ট থেকে ফিরে এলো ফুটুরো হাউস
ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ও কার্বন নি:সরণ
আসন্ন RIBA ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্টে রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি
হারানো মসজিদ
নির্মাণসামগ্রী আবিষ্কার করবে রোবট
canopy