শিরোনাম দেখে কি ভাবছেন, মনের ওপর আবার ঘরের কী প্রভাব? আছে, আলবত আছে। আপনি নিশ্চয় বিশ্বাস করেন সবাই চায় নিজস্ব একটি জগৎ। সেই জগতের অন্যতম অনুষঙ্গ ঘর। যেমন পরিবারের ছোট সদস্যটি চায় ছোট্ট কিন্তু রংচঙা ঘর। বাড়ির কর্তা চান খোলামেলা বারান্দা, যেখানে এক কাপ চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ পড়তে মন্দ লাগবে না। গৃহিণীর ইচ্ছে বাড়িতে থাক এক চিলতে বাগান, যেখানটা ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকবে সারাক্ষণ। বাড়ির গৃহকর্মীটি চাইবে রৌদ্রোজ্জ্বল ছাদ, যেখানে কাপড়গুলোকে দ্রুত শুকোবে। গ্রামের বাড়ির মাটির ঘর, টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দ নিশ্চয় এখনো গেঁথে আছে আপনার মনের মণিকোঠায়। মনের সুখে অনেকে আবার বাসা বাঁধে গাছেও! এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ঘরের সঙ্গে মনের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
তবুও যদি আপনি ঘর-মনের সম্পর্ক পুরোপুরি বুঝতে না পারেন তাহলে একটা গল্প বলি শুনুন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার নরওয়াকের মেট্রোপলিটন হাসপাতাল এক শ বছরেরও বেশি পুরোনো। স্থাপনাটিকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যেন অধিকসংখ্যক রোগীকে স্থান দেওয়া যায়। হাসপাতালে তৈরি করা হলো বিশাল বিশাল সব ওয়ার্ড। একেকটিতে ৫০ থেকে ১০০টি করে শয্যা। প্রতিটি শয্যার সঙ্গে ছোট লকার। দেয়ালে সেই একঘেয়ে ধূসর রং। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য নেই আলাদা কোনো কক্ষ। এরই মধ্যে করতে হতো যাবতীয় কাজ। একসময় দেখা গেল হাসপাতালের রোগীদের সুস্থতার অনুপাত তুলনামূলক অনেক কম। এমনকি ডাক্তার, নার্স ও অন্য কর্মীরাও ভুগছে কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায়। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, উচ্চ স্বরে কথা বলা, খিটখিটে মেজাজ হাসপাতালে এমনই পরিবেশ নিত্যদিনের। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। সমস্যা সমাধানে ডাকা হলো মনোবিজ্ঞানী, স্থপতি ও অন্য বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা খুব সহজেই সমস্যাটির সমাধান বের করলেন। সমাধানটিও মজার!
হাসপাতালের বাইরেটা ছিমছাম কিন্তু ভেতরটা কেমন যেন বদ্ধ। প্রথমেই পুরো হাসপাতালের ইন্টেরিয়র বদলে ফেলা হলো। ওয়ার্ডগুলোকে চার-ছয় শয্যার ছোট কেবিনে রূপান্তর করা হলো। জানালা করা হলো আরও বড়, যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়া যায়। লকারগুলোতে তালার ব্যবস্থাসহ ডাক্তার, নার্স ও অন্য কর্মীদের জন্য আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা হলো। ফলও পাওয়া গেল দ্রুত। রোগীদের মধ্যে জায়গা নিয়ে ঝগড়া কমল, নিজস্ব লকার থাকায় জিনিস গুছিয়ে রাখতে সুবিধা হলো, ঘরে জানালা দিয়ে আসা বাইরের আলো-বাতাস অসুস্থ ব্যক্তিদের দিল দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশ্বাস। আর স্টাফদেরও আলাদা অফিস হওয়ায় কাজকর্মেও বেশ সুবিধে হলো। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ঘরের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে এর গঠন কীভাবে মানব মনকে প্রভাবিত করে!
আমাদের এখানে সরকারি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো এখনো অনেকটাই উনিশ শতকের ক্যালিফোর্নিয়ার নরওয়াকের মেট্রোপলিটন হাসপাতালের মতোই। অবশ্য যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগই অপ্রতুল, সেখানে রোগীর অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উপেক্ষিত থেকে যাবে এতে আর আশ্চর্য হওয়ার কি! কিন্তু বেসরকারি খাতের ব্যয়বহুল আধুনিক হাসপাতালগুলোও কি গুরুত্ববহ এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন? সম্প্রতি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশ নিয়ে মানসিকভাবে তুষ্ট রোগীদের সুস্থতার হার অন্যদের থেকে বেশি। যদিও উভয় ক্ষেত্রে একই ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
অবকাঠামোগত পরিবেশের প্রতি মানুষ কেমন আচরণ করে তা দেখার জন্য আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকেই। প্রথম দিকে বিভিন্ন গবেষকদল হাসপাতালের অবকাঠামোগত নকশা, বিশেষত রোগীদের মানসিক সুযোগ-সুবিধা কীভাবে তাদের আচরণ ও সুস্থতাকে প্রভাবিত করছে, কেবল সেটিরই পর্যালোচনা করত। পরবর্তী সময়ে ১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে এটি পরিবেশগত মনস্তত্ত্ব নামে আলাদা একটি বিষয় হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে। পরিবেশগত মনস্তত্ত্ববিদেরা দেখতে পান যে সৌন্দর্য সম্পর্কে বহুল প্রচলিত উক্তি beauty lies in the eyes of the beholder আসলে সত্য নয়। সত্য হচ্ছে সৌন্দর্য যে উপভোগ করে তার চোখে নয়, বরং তার মনেই প্রোথিত থাকে (beauty is not in the eyes of the beholder, but rather built into their minds) যা মন আর তার পারিপার্শ্বিকতায় বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত।
মানুষ প্রকৃতিরই অংশ বলে তার ওপর পারিপার্শ্বিক সবকিছুরই প্রভাব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রকৃতির অন্য প্রাণীর মতো মানুষ খোলা প্রকৃতিতে বাস করল না কেন? মানুষের কেন ঘরের প্রয়োজন হলো? এর সহজ উত্তর, মানুষ নিরাপদ আশ্রয় চায়। ঘরের সঙ্গে মানুষের দুটো অনুভূতি সরাসরি জড়িত। আশ্রয় আর নিরাপত্তা। মানুষ নিজের ঘরকে যতখানি নিরাপদ মনে করে, এমনটি আর কোথাও নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপত্তার বাইরেও মানুষের মনের ওপর ঘরের প্রভাব আরও বিস্তৃত। এমনকি ঘরের বাহ্যিক গঠনও মানুষের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ১৯৫০-এর দশকে পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী ডক্টর জোনাস সক (Dr. Jonas Salk) পোলিওর প্রতিকার নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর কাজের জায়গাটি ছিল রাশিয়ার পিটাসবুর্গের ভূগর্ভস্থ অন্ধকার এক ল্যাবরেটরি। কাজের অগ্রগতি ছিল ভীষণ ধীর। হতাশ ডক্টর জোনাস তাঁর মাথাকে পরিষ্কার করার জন্যই বেড়াতে বের হলেন। ইতালির অসিসিতে অবস্থিত ১৩ শতকের এক ধর্মীয় পীঠস্থানে তিনি ছিলেন কিছুদিন। সেখানকার উঁচু কলাম, বিচ্ছিন্ন শান্ত পরিবেশে তিনি হঠাৎই যেন নিজের মধ্যে এক জ্যোতি অনুভব করলেন, যাকে তিনি বলছেন পোলিও টিকা আবিষ্কারের জন্য অনন্য এক প্রেরণা। সেই থেকে মানুষের ওপর স্থাপত্যের প্রভাবকে তিনি এতটাই বিশ্বাস করতেন যে পরে জগদ্বিখ্যাত স্থপতি লুই কানকে সঙ্গে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার লা জল্লাতে তৈরি করেন সক ইনস্টিটিউট (Salk Institute, La Jolla, California), যার স্থাপত্য এখানকার গবেষকদের সৃজনশীলতাকে ত্বরান্বিত করে তুলতে পারে।
ঘরের আলো-বাতাস, খোলামেলা জায়গা মনকে প্রফুল্ল রাখে। যে বাড়িতে জায়গা বেশি, প্রাইভেসি বেশি, সে বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যকার সম্পর্কও ভালো। এমনকি এরা বাইরের মানুষের সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নে ভালো করেন। এগুলো এখন প্রায় সবারই জানা। ঘরের উচ্চতার সঙ্গেও যে মানুষের মনমানসিকতা পাল্টে যায় তা কি জানেন? ধরুন ঢাকা শহরের সবচেয়ে উঁচুতলার বাসাটায় আপনি থাকেন অথবা আপনার অফিসরুমটি আপনার পরিচিত ব্যক্তিদের থেকে উঁচুতে প্রায় আকাশছোঁয়া এক রুমে। এ ক্ষেত্রে আপনি কি নিজেকে একটু সুপিরিয়র ভাববেন না? মনে হয় না, চাইলেই আপনি আকাশে রঙের খেলা দেখতে পাচ্ছেন? অথবা সারা দিন কর্মব্যস্ত দিনশেষে বাড়ির ঝুলবারান্দাটায় বসে এক কাপ চা পানের মজাই আলাদা? মজার ব্যাপার হচ্ছে উঁচু ভবনে বাস করা মানুষের চিন্তাভাবনা, লিঙ্গ, বয়স এমনকি দেশভেদেও ভিন্ন হয়। মেয়েরা যেখানে উঁচু ভবনের বাসাকে খোলামেলা আর আরামদায়ক ভাবে; পুরুষেরা আবার এর ঠিক বিপরীত মনে করে। ঢাকার মতো শহরে যেখানে উঁচু ভবনের মালিককে কিছুটা সমীহের চোখে দেখা হয়, যুক্তরাজ্যের মতো জায়গায় সেটি আবার অনাভিজাত্যেরই পরিচায়ক। আবার হংকংয়ের মতো শহরে সেটি প্রয়োজনীয়, কেননা সেখানে জায়গার বড্ড অভাব।
শুধু ভবন নয়, ঘরের সিলিংয়ের উচ্চতাও মানুষের চিন্তাধারার ওপর প্রভাব ফেলে। মনোবিদ জোয়ান মেয়ারস লেভি (Joan Meyers-Levy) পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন, যাঁরা কম উচ্চতার সিলিংয়ের ঘরে বাস করেন, তাঁরা সাধারণত ‘সীমিত’, ‘নির্দিষ্ট’ এ ধরনের শর্তযুক্ত সমস্যা সমাধানে অনেক দ্রুত সাড়া দেন। অন্যদিকে, যাঁদের ঘরের সিলিং তুলনামূলক উঁচু, তাঁরা ‘অসীম’, ‘উন্মুক্ত’ ইত্যাদি শর্তযুক্ত সমস্যার সমাধানে বেশি পারদর্শিতা দেখান। আবার ঘরের দেয়ালের রঙের প্রভাবও মানুষের ওপর একেবারে কম নয়। ২০০৯ সালে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ (Science) প্রকাশিত এক জার্নালে দেখা যায়, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একদল মনোবিদ ৬০০ জনের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান মানুষের মস্তিষ্ক ভিন্ন ভিন্ন রঙের প্রতি ভিন্নভাবে উদ্দীপ্ত হয়। এই গবেষণায় লাল, নীল এবং নিরপেক্ষ রং ব্যবহার করা হয়। দেখা যায়, যাঁদের লাল রঙের ঘরে রাখা হয়েছিল, তারা বানান ভুল ধরা, সংখ্যা মনে রাখার মতো বিষয়ে যেখানে বেশি মনোযোগ এবং নির্ভুলতার প্রয়োজন, সেখানে বেশি ভালো করেছে। অপর দিকে নীল রঙের ঘরের লোকগুলো এ ধরনের পরীক্ষায় খারাপ করলেও যে ক্ষেত্রে কল্পনা বা সৃজনশীলতা প্রয়োজন সে ক্ষেত্রে বেশি ভালো করেছে। যেমন ব্লক দিয়ে নকশা তৈরি, সাধারণ জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করে বাচ্চাদের মজার খেলনা তৈরি ইত্যাদি। বিজ্ঞানীদের মতে, এর কারণ হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই মানুষ লাল রংকে বিপজ্জনক হিসেবে ধরে নেয়। তাই যেখানে লাল রং দেখে মস্তিষ্ক নিজে থেকেই সতর্ক হয়ে ওঠে, সাবধানী হয়। ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটে নীল রঙের প্রতি। নীল রং আকাশ আর সমুদ্রকে মনে করিয়ে দেয়। নীলাকাশ, বিশাল সমুদ্র, বালুময় সমুদ্রতটের ভাবনায় মন হয় নির্ভার, মস্তিষ্কের যে অংশ কল্পনা করে তা হয় উদ্দীপ্ত।
এ তো গেল রং আর উচ্চতা। ঘরের ভেতরে আলোর ব্যবস্থাটা কেমন তারও কিন্তু অনেকখানি প্রভাব পড়ে মানুষের মনে, চিন্তায় আর আচরণে। আপনার ঘরে দিনের আলোর উৎসটি হয় যদি প্রাকৃতিক, তাহলে তার স্বাস্থ্যগত দিকটিও ফেলনা নয়। বরং সেটি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার একটি বড় নিয়ামক। দিনের স্বাভাবিক আলোর উপকারিতা আপাত সংখ্যা দিয়ে পরিমাপযোগ্য নয় বলেই হয়তো আমরা একে উপেক্ষা করি বেশি। দিনের স্বাভাবিক আলো মানুষের মনোভাব, নৈতিকতা উন্নতিকরণ এবং শারীরিক দুর্বলতা ও চোখের ওপর চাপ কমাতে দারুণ কার্যকরী। চোখের কার্যক্ষমতা দিনের স্বাভাবিক আলোয় সবচেয়ে বেশি থাকে। ঘরে ব্যবহৃত বিভিন্ন বৈদ্যুতিক বাতি বিশেষত হলুদ আলোয় চোখের ওপর চাপ পড়ে সবচেয়ে বেশি। দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা বজায় রাখতে তাই প্রাকৃতিক আলোর বিকল্প নেই। আর তাই ঘরের নকশা প্রণয়নের সময় দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার যেন নিশ্চিত করা যায়, সেটির প্রতি লক্ষ রাখাটা বুদ্ধির পরিচায়ক।
এবার দেখা যাক, ঘর তৈরির উপাদানেরও কি কোনো প্রভাব আছে মানুষের মনে? অ্যালটো বিশ্ববিদ্যালয়ের (Aalto University) অধ্যাপক ম্যাটি ক্যারি (Professor Matti Kairi)-এর মতে, ইউরোপে দেখা গেছে কাঠের তৈরি বাড়ি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি বলছেন, ‘কাঠ সব সময়ই শান্ত, সুন্দর আর আভিজাত্যের প্রতীক। এটিই Care work-এর সর্বোৎকৃষ্ট উপাদান। Care work বলতে ওই সব স্বতঃপ্রণোদিত যত্নশীল ও সাবধানতামূলক কাজকে বোঝায়, যা অন্য কারও কাজ করে দেওয়ার সময় করা হয়। বিশ্বজুড়েই গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মনের ওপর কাঠ বা বনজ সম্পদের প্রভাব বিস্ময়কর। নিজস্ব রং, বিচিত্র স্থাপত্যশৈলীর কারুকার্য, শান্ত পরিবেশ কাঠকে ঘর তৈরির উপাদান হিসেবে দিয়েছে অনন্যতা, যা সহজেই মানুষের মন ও শরীরকে প্রভাবিত করে। এ ছাড়া কাঠই সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণ। এমনকি ভূকম্পনপ্রবণ এলাকাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য কাঠের তৈরি বাড়ি হতে পারে সহজ ও সুন্দর সমাধান।
বসবাসের জন্য যে ঘর, তার পরিবেশ কেমন হলে আপনার মনোদৈহিক সুস্থতা নিশ্চিত হয়, সেটা তো জানলেন কিন্তু দিনের বেশির ভাগ সময়টি যেখানে কাটান, সেই অফিস বা কর্মস্থলের পরিবেশ কেমন হবে? কর্মস্থলের জন্যও আসলে একই কথা প্রযোজ্য। আপনি যদি একদল সুস্থ, কর্মচঞ্চল, সৃষ্টিশীল কর্মী চান, যাঁরা প্রতিনিয়ত আপনার প্রতিষ্ঠানকে একটি লাভজনক সত্তায় পরিণত করবেন, তো তাঁদের জন্য আগে তেমন পরিবেশ নিশ্চিত করুন। খেয়াল রাখুন কর্মস্থলে যেন প্রচুর প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবস্থা থাকে। সেটি সম্ভব না হলে চোখের জন্য সহনশীল ও আরামদায়ক সাদা আলো ব্যবহার করুন। দেয়ালে ধূসর ও একঘেয়ে রঙের পরিবর্তে উজ্জ্বল রং ব্যবহার করুন, তবে লালের মতো অতি সংবেদনশীল রং এড়িয়ে চলা উত্তম। সিলিং আর কলাম এমনভাবে ব্যবহার করুন যেন সেটি উন্মুক্ত আর খোলামেলা পরিবেশের স্বাদ দেয়। আর যাঁদের কর্মস্থল ভূগর্ভস্থ ভবনে, সে ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যেন সেখানে কর্মরত কেউ নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করেন। যেহেতু মানুষের মনোদৈহিক অবস্থা তার কাজের দক্ষতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, তাই কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ মানসিক প্রশান্তিমূলক হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
ইদানীং আমাদের দেশে বিশেষত রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে ছোট সংকীর্ণ বাসাবাড়িতে গড়ে উঠছে, তাতে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বৈকি! শিশুদের স্বাভাবিক মনোদৈহিক বিকাশের জন্য যেমন পারিপার্শ্বিকতা দরকার, তেমনটি আমরা দিতে পারছি কি? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন দমবদ্ধ পরিবেশ গাণিতিকসহ অন্যান্য সৃজনশীল বুদ্ধি বিকাশের অন্তরায়। একটি ভবনের অবকাঠামোগত নকশা, আলো-বাতাসের পর্যাপ্ততা, দেয়ালের রং থেকে শুরু করে আসবাবপত্রের বিন্যাস এককথায় অন্দরসজ্জা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ সবই এর বাসিন্দাদের মানসিক বিকাশ ও শারীরিক সুস্থতাকে ত্বরান্বিত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একধরনের অবকাঠামো। যেকোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাথমিক শিক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজের অনেক গুরত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যা একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিক বিকাশ লাভের সূতিকাগার, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রকৌশল সম্পর্কে আমরা আসলে কতটুকু সচেতন? আমাদের দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা ও অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রমের অভাবে এর ভয়াবহতা জনমানসের সামনে সেভাবে ফুটে উঠছে না। এখন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি একটি সম্ভাবনাময় শিশুর অভিভাবক হিসেবে আপনার ভাবার সময় এসেছে বৈকি!
বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যার দেশে অনেক জায়গা নিয়ে খোলামেলা পরিবেশে প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়ায় একটি বাড়ি হয়তো বিলাসিতাই। তাই, আপনার বাড়িটি সুউচ্চ বিল্ডিংয়ের একটি ছোট ফ্ল্যাট হোক আর শান বাঁধানো পুকুরসহ বাগানবাড়িই হোক, বাড়ি তৈরির আগে আপনার স্থপতির সঙ্গে আলোচনা করে নিন। যেন আপনার বাড়িটি সত্যিকার অর্থেই নিরাপদ আর শান্তির নীড় হয়ে ওঠে, যেখানে ফিরলেই আপনি পাবেন নিরাপদ আশ্রয় আর সৃষ্টিশীল প্রশান্ত মন। শুধু বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য অবকাঠামোগত নির্মাণের ক্ষেত্রেও মানুষের মন ও দেহের ওপর এর যে প্রভাব, তা মাথায় রাখাটা কিন্তু ভীষণ জরুরি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৫