স্থাপত্যের অবয়বে বাংলা ভাষা

একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলা ভাষাই নয়, বিশ্বের সব ভাষাভাষীর জন্য সম্মানজনক ও গৌরবের একটি দিন। ‘মা’-কে ‘মা’ বলতে পারার মধ্যে নিহিত নিগুঢ় আনন্দটি এই দিনেই বারবার টের পাওয়া যায়। ভাষা তাই মানুষের টিকে থাকার, মানুষের অস্তিত্বের অবলম্বন। সভ্যতা মানেই পরিচ্ছন্ন যোগাযোগ আর সে যোগাযোগের মূল হাতিয়ার ভাষা। বাংলা ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশ ও বিশ্ব স্থাপত্যের সম্পর্ক জানব এই রচনায়।

হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

– মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বাংলার স্থাপত্য

বাংলাদেশের স্থাপত্যের ইতিহাসে কালক্রমে চলে আসে কতক অধ্যায়। পাল-বৌদ্ধ স্থাপত্য, টেরাকোটা মন্দির স্থাপত্য, মুঘল স্থাপত্য, সাধারণ বাংলো ধরনের স্থাপত্য, আধুনিক বাংলো স্থাপত্য প্রভৃতি। এখানে বলাই বাহুল্য, ‘বাংলো’ স্থাপত্যের সূচনা বাংলা এই ভূখন্ডেই। বাংলা, বাঙালি শব্দের অপভ্রংশ হিসেবেই ‘বাংলো’ শব্দের জন্ম। এই বাংলো ধরনের বাড়িগুলো প্রথাগতভাবেই আকারে ছিল ছোট; একতলাবিশিষ্ট। গ্রামীণ নিরিবিলি পরিবেশে প্রশস্ত উঠান আর ছাউনি সহযোগে বারান্দাযুক্ত ছিমছাম এই বাড়ির ধারণাকে আরও উদ্ভাবনী প্রচেষ্টায় নির্মাণ করতে দেখা গেছে তৎকালীন ব্রিটিশদের। গ্রীষ্মকালীন প্রাদেশিক প্রশাসনের জন্য পরিবেশবান্ধব এই বাংলোবাড়ি ব্রিটিশরাই বাবুমহলে জনপ্রিয় করে তোলে। এই বাংলো ধরনের বাড়িগুলো এখনো কিন্তু বাঙালিদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কাঠ, বাঁশ ও খড় ছিল এসব বাড়ি নির্মাণের মূল উপাদান, যা গরমকালে ঘরকে রাখে শীতল আর শীতে ঘরকে রাখে উষ্ণ। আধুনিক বাংলার স্থাপত্যে দেখা যায় প্রযুক্তি আর পশ্চিমা বলয়ের দাপট। যদিও এরই মধ্য দিয়ে বাংলার স্থাপনা ও নির্মাণশৈলী নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তার শিকড়কে খুঁজছে।

বাংলো, বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা এই তিন জিনিসকে এক করে দেখতে গেলে সুযোগ রয়েছে দুটো দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। প্রথমত, স্থাপত্যের ভাষায় বাংলাদেশের প্রকাশ এবং দ্বিতীয়ত, স্থাপত্যের অবয়বে বাংলা ভাষার প্রকাশ। প্রথম এই প্রক্রিয়ায় আমরা সচরাচর ভবন সম্পর্কে নিজেদের যে উপলব্ধি, চিন্তাভাবনা ধারণ করি, তাকে কেন্দ্র করে ডিজাইনের শুরুটা করে থাকি। কিন্তু দ্বিতীয় যে চিন্তা অর্থাৎ, বাংলা ভাষাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা স্থাপত্যের অবয়বে, সেটি বাংলার আধুনিক স্থাপনায় প্রায় বিরল।

স্থাপত্যশিক্ষায় বাংলা

স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষাঙ্গনে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাগ্রহণের মূল ভাষা হওয়ায় সেখানে ইংরেজি ভাষা আধিপত্য বিস্তার করলেও কিছু কিছু প্রকল্প, যা বাংলাদেশের ইতিহাস; যেমন, ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বা শহীদ বুদ্ধিজীবী জাদুঘর ইত্যাদি প্রকল্পে শিক্ষকেরা ভীষণভাবে বাংলা ভাষার প্রাধান্যকে ওখানে প্রশ্রয় দেন। কারণ, বাংলা ভাষাকে প্রধান হিসেবে উৎসাহ না দিলে প্রকল্পটি পারবে না তার নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করতে। আবার অনেক সময় বাংলা ভাষাকে পরিপুষ্ট করেছেন এমন কবি বা গীতিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত যেমন, শিলাইদহে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাদুঘর ও সাইট সংরক্ষণ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত জাদুঘর বা শচীন দেব বর্মন জাদুঘর নিয়ে শিক্ষার্থীরা কাজ করার সময়েও বাংলা ভাষাকেই মুখ্য ধরে কাজ করতে পারে।

শিক্ষাঙ্গনে বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে স্থপতি আদর ইউসুফ মনে করেন, ‘আমরা স্থাপত্যবিদ্যায় ক্লাসে বাংলায় শুনি, যদিও শিক্ষক সেই সময় বোর্ডে কিছু লিখতে হলে ইংরেজিতে লেখেন, তেমনি করে আমাদের জুরিতে (পরীক্ষা) বা অন্যত্র কথা বলার সময় আমরা বাংলাতেই বলি, কেবল লেখার সময় ইংরেজিতে লিখি। এর ফলে একটা দ্ব›দ্ব তৈরি হয়। আমাদের উচিত বাংলা স্থাপত্যের ইতিহাসটা জেনে এরপরে পশ্চিমা স্থাপত্যের ইতিহাস জানা। কারণ, পশ্চিমা ইতিহাস জেনে একবার চোখ খুলে গেলে বাংলার স্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া কঠিন, যেহেতু বাংলায় স্থাপত্যসংক্রান্ত তেমন কোনো বইপত্রও নেই। বেডরুম, কিচেন, টয়লেট, ফয়ার এমন অনেক ইংরেজি শব্দ কিন্তু স্থায়ীভাবে বাংলা শব্দের সমান হয়ে গেছে। বাংলায় চর্চা যেহেতু করা হয় না, তাই বাংলা এখন দুর্বোধ্য মনে হয়। এই সমস্যা পেশাগত চর্চাতেও থেকে যায়। স্থপতি তাঁর কনসেপ্ট মুখে বর্ণনা করছেন বাংলায় কিন্তু লিখছেন সেই ইংরেজিতেই। ফলে এই দ্বা›িদ্বকতার সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।’

পেশাগত স্থাপত্যচর্চায় বাংলা

শিক্ষাকাল শেষেই প্রকট হয়ে ওঠে বাংলা ভাষার প্রয়োগ। ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথোপকথনে, নির্মাণকর্মী, সহকর্মী- সবার সঙ্গে তখন একাডেমিক ইংরেজি শব্দ আর আগের মতো ব্যবহার করা হয় না। কারণ, সেই শব্দগুলো এখন যোগাযোগে অকার্যকর। স্থাপত্যের ডিজাইনে তখন প্রায়ই ব্যবহার করতে দেখা যায় বাংলা শব্দ। নির্মাণকর্মীদের কাছ থেকেও স্থপতির ঝুলিতে যুক্ত হয় ইংরেজি ও বাংলার নানা অপভ্রংশ। স্থাপত্যে বাংলা ভাষার প্রভাব নিয়ে স্থপতি নুরুর. আর. খান মনে করেন, ‘আমাদের সমস্যা হলো, আমাদের স্থাপত্যশিক্ষা বইভিত্তিক নয়। বই না পড়েই যেহেতু আমরা স্থপতি হয়ে যাচ্ছি, ফলে বোঝা যাচ্ছে যে স্থাপত্যবিদ্যাকে আমরা গেøারিফাইড ভকেশনাল ট্রেনিং-এ পরিণত করেছি। এতে ‘স্থাপত্য’ কী এবং ‘স্থপতি’ কে?-এই মূল চিন্তার জায়গাটা থেকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই দূরে সরে গেছে। আজকে যে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও টিএসসি নিয়ে আমাদের এত কথা বলতে হচ্ছে, তার মূল কারণ হলো গত ২০ বছর ধরে ‘স্থপতি’ এবং ‘স্থাপত্য’ ব্যাপারটিকে আমরা হালকা করে ফেলেছি।’

স্থাপত্যের পেশাগত দর্শন নিয়ে স্থপতি রবিউল হুসেইনকে আমরা ভীষণভাবে স্মরণ করছি। কারণ, ওনাদের ওই সময়টা পর্যন্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কবি, রাজনীতিবিদ, পলিসিমেকার, স্থপতি-এদের সবারই একসঙ্গে ওঠাবসা ছিল। সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ও কথা বলতে পারা অর্থাৎ স্থপতিরা যে সুশীল সমাজের একটি বিশেষ অংশ, এই ভাবধারাটি তাঁরা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, শামসুল ওয়ারেস, রবিউল হুসেইন, বশিরুল হকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সেই জায়গাটি অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সমসাময়িক স্থপতিরা সেই ভাব ধারণ করতে পারছে না। প্রথাগত পেশাদারত্ব সমাজকে কিছু দিতে পারেনি বলেই সমাজ আজ তাঁদের কথা শুনতেও আগ্রহী নয়। সমাজের জন্য করতে হলে মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। যেমন, স্থপতি মাজহারুল ইসলামের কাছে স্থাপত্য ছিল দেশ গড়ার একটি আন্দোলন। স্থাপত্য আলাদা কিছু ছিল না। স্থপতি রবিউল হুসেইনের সঙ্গে দেশি-বিদেশি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের ছিল ওঠাবসা, যেখানে তাঁর মতামতকে ভীষণ গুরুত্ব দেওয়া হতো।

স্থপতিদের এখনো নানা রাষ্ট্রীয় নগর পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণে তাঁদের চিন্তা রাখতে ও ডিজাইনমতো নির্মাণ সম্পন্ন করতে যুদ্ধ করতে হয়। যখন পেশা সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে, অর্থাৎ সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি-এই সবকিছুর সঙ্গে যখন একজন জড়িয়ে পড়েন, তখনই তিনি প্রকৃত স্থাপত্যচর্চায় ভূমিকা রাখতে পারেন। ভাষাও এর ভেতরেই পড়ে। আমাদের সব কর্মকান্ডের সঙ্গেই ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাঙালির ভাষার যে চেতনা, তা তো অবশ্যই স্থাপত্যে পড়া উচিত। আমরা যখন বলি ধূসর রং, তখন একভাবে আকাশটা ভেবে আঁকব। ঠিক তেমনি নীল রং বললে আরেকরকম হবে। বাঙালি সত্তার সঙ্গে বাংলা ভাষার গান ও সাহিত্যের যে সম্পর্ক, তা কি স্থাপত্যে আসে না? নিশ্চয় আসে। যদিও বর্তমানে যারা স্থাপত্যচর্চা করছেন, তাদের মধ্যে সেই জ্ঞান কতটা আছে, সেটি জোরগলায় দাবি করতে পারব না। ব্যক্তিমানুষের চিন্তাভাবনা-চেতনার সঙ্গে যেহেতু স্থাপত্যচর্চার সম্পর্ক নেই, তাই সামগ্রিক চেতনায় বাংলা ভাষার প্রভাব বাংলার স্থাপত্যে অবশ্যই দৃশ্যমান হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি’।

বাস্তুশাস্ত্র ও বাংলা ভাষা 

বাস্তু শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বস্তু’ থেকে। এর অর্থ ভূ, এর আরেক অর্থ হলো সমগ্র সৃষ্টি। অর্থাৎ, সব নশ্বর ও অবিনশ্বরের আবাসস্থলই বাস্তুর অন্তর্গত। বাস্তু, শিল্প ও চিত্রকলা এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয় বাস্তুশাস্ত্রকে। ভারতীয় উপমহাদেশে সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই স্থাপত্য নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতিমাতার উপাদানের মধ্যে অন্যান্য বস্তুও মানুষের সমান গুরুত্ব পেয়েছে এই শাস্ত্রে। বাস্তুশাস্ত্র হলো সেই পাঠপ্রক্রিয়া, যেখানে একটি জায়গাকে সাজানো এবং নির্মাণের জন্য এর মাটি, পানি, বায়ু, অগ্নিকে সবকিছুর যথাযথ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এক সজ্জাপদ্ধতি নির্ণিত হয়, যা ওই স্থানের প্রাণিকুলের জন্য শ্রেয়। এই স্থানে এনার্জি হয় সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর।

বাস্তুশাস্ত্র সম্পূর্ণরূপেই আছে বাংলা ভাষার দখলে। এখানে একটিও ইংরেজি শব্দের দেখা পাওয়া যায় না বরং সংস্কৃত শব্দের প্রভাবই বেশি। সংস্কৃত থেকে সরলীকরণ করে বাস্তুশাস্ত্রের অনেক বই এখন বাজারে পাওয়া যায়, যেগুলো সরল বাংলায় লেখা। কিছু কিছু ইংরেজি শব্দও সেগুলোতে ঢুকে পড়ছে। বাস্তুশাস্ত্রের কতগুলো ভাগপ্রক্রিয়ার নাম যদি আমরা দেখি যেমন, অণু-পরমাণু পরীক্ষা, ভূমি ও জল পরীক্ষা, গৃহদ্বারব্যবস্থা, শয়নবিধি, বৃক্ষ পরীক্ষা, গৃহরম্ভকাল ইত্যাদি। খাঁটি বাংলা ভাষা ব্যতিরেকে এই শাস্ত্র পাঠ একেবারেই অসম্ভব।

বাস্তুর আবির্ভাব সম্পর্কেও বাস্তু দেবতা, নিত্যবাস্তু, চরবাস্তু-এমন নানা বিষয় আছে, যা কেবল ভারতীয় উপমহাদেশের সনাতন বাঙালি সমাজের গল্প ও চিন্তা। এটি বাঙালির ঐতিহ্য। বাস্তুশাত্র এখনো খুবই সীমিত পরিসরে ভারতে চর্চিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম স্থপতি মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য দপ্তরের নাম ছিল ‘বাস্তুকলাবিদ’। বাংলাদেশের প্রথম স্থপতি তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল ক্ষেত্রের নামে বাস্তুকে ঠিকই গণ্য করে গেছেন। যদিও ভারতীয় উপমহাদেশের অতি প্রাচীন এই শাস্ত্রকে এখন নাকচ করা হয় এ জন্য যে সেই সময়ের জলবায়ু আর এই সময়ের জলবায়ুর মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ফারাক। তাই নির্মাণশাস্ত্রের এই জ্ঞান বর্তমান সময়ে কাজে লাগার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ, যেটা আমাদের দুর্ভাগ্য। তবে বাস্তুর বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই।

বাংলার শিলালিপি

যখন মানুষ ভাষার বর্ণ বা শব্দ তৈরি করতে শেখেনি, তখন চিত্রকলা দিয়ে দৈনন্দিন কাজের নানা মুহূর্তের কাল্পনিক চিত্র আদিম গুহায় এঁকে সেখান থেকে চিহ্নগুলো নির্ধারণ করত। এর ফলে পরবর্তী সময়ে সেই একইভাবে বা কাছাকাছি মুহূর্তগুলো বোঝানোর জন্য এই চিহ্নগুলো বারবার ব্যবহার করতে করতে নিজেদের ভাষার জন্ম দিয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে ভাষার উন্নতি সাধন ও পরিবর্তিত রূপ যখন আরও সংগঠিত ও পুষ্ট হলো, তখন নানা হরফে শোভিত হতে দেখা গিয়েছে গুহার অভ্যন্তরীণ দেয়াল। শুরু হলো শিলালিপির যুগ।

বাংলাদেশে মধ্য ও ঔপনিবেশিক যুগ এই দুই সময়ে শিলালিপির অনেক দৃষ্টান্ত দেখা মেলে। সুলতানি আমলে ধর্মীয় স্থাপনা যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, সমাধি প্রভৃতির গায়ে শিলালিপির অস্তিত্ব মেলে। প্রধানত আরবি ও ফারসি ভাষায় মুসলিম ক্যালিগ্রাফি বা হস্তলিখন শিল্পানুসারে লেখা হয়েছিল এসব শিলালিপি। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপিয়ানদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিরও পরিবর্তন আসে। ইংরেজি ও গ্রিক ভাষাতে তখন গির্জা, সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভে দেখা গিয়েছিল শিলালিপি। এই সময়েই জমিদারবাড়িগুলোতে বাংলায় কিছু শিলালিপির খোঁজও মেলে।

স্থাপনার অবয়বে নামকরণে বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষার সরব প্রকাশ দেখা যায় বাড়ির নামকরণের মধ্যে। দীর্ঘদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর মানুষ তার সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে বানায় বহু আকাক্সিক্ষত মাথা গোঁজার ঠাঁইটি। ফলে বাড়ির নামকরণে মধ্যবিত্ত বাঙালির কবিমন টের পাওয়া যায়। আসলে বাঙালিমাত্রই কবি বলে যে জনপ্রিয় ধারণাটি আছে, সেটিই সত্য প্রমাণিত হয়।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কবি এনায়েত কবীর মনে করেন, ‘বাঙালি নাম নিয়ে চলে। নাম আমাদের জন্য বিরাট এক ব্যাপার। নামের যে সৌন্দর্য, সেটি দিয়ে আমরা আমাদের সৌন্দর্যকে প্রকাশের চেষ্টা করি। আমাদের বাসাবাড়িও যেহেতু দৃশ্যমান এক কীর্তি, তাই নাম দিয়ে এই সৌন্দর্য প্রকাশের বাসনা দেখা যায়। বাসা তৈরির যে সক্ষমতা হয়েছে, সেখান থেকে ‘নীড়’ নামকরণ হয়েছে। অর্থাৎ, পাখির বাসার সমান একটা বাসা করেছে কিন্তু সেটি নিজের এবং সেটি পথচলতি মানুষেরা দেখছে, এটিই তার প্রাপ্তি। অদ্ভুত নাম চোখে পড়েছিল একটি বাসার, ‘সৃজনি’। এই নাম কিন্তু বাড়িতে বসবাসরত মানুষের পরিচয়ও বহন করে। সেক্ষেত্রে সৃজনির অর্থ তৈরি হয় যে এই বাড়ির সবাই সৃষ্টিশীল মানুষ, অন্তত তারা সেভাবে নিজেদের জানান দিতে চান। বাংলা ভাষার শব্দের একটা অসামান্য গুণ হলো তা আমাদের চিন্তাজগতে ছবির জন্ম দেয়। সেই ছবির নান্দনিকতা বোধকে বাঙালি তীব্রভাবে ধারণ করতে চায় তার নিজের গৃহে। দৃশ্যমান বাড়ি, বাড়ির বাগান, বাড়ির পুকুর- সবকিছুর মধ্যেই নন্দনপ্রেমী বাঙালি নামকরণে বাংলার কাব্যিকতার ও বৈরাগ্যের আশ্রয় নেয় বরাবরই। এমনকি বাড়ির নাম আশ্রয়, এটিরও চিত্র ভাসে ‘মাতৃক্রোড়’। আমাদের পাড়া বা গ্রামের এই নামও কিন্তু ভীষণ অর্থবোধক।’

স্থাপনায় ব্যবহৃত কিছু শব্দমালা

অনিকেত- অর্থাৎ, নিকেত নাই যার বা বাড়ি নাই যার। লক্ষ করুন, তিনি নিজ বাড়িরই নাম দিচ্ছেন অনিকেত। কেননা বাড়ি থাকার পরও বাঙালির বৈরাগ্যভাব কিন্তু থেকেই যায় বা বলা ভালো প্রকট হয়।

বৈভ্রাজ- অর্থাৎ, শোভমান বা দীপ্তিশীল। নিজ আবাসের কাছে এটাই তো আমাদের সুন্দর একটি কামনা, যেন বাড়ির সবাই মিলে তাদের কর্ম দিয়ে নামের মতোই সমাজে শোভা ছড়াতে পারে।

এপারের বাড়ি- নিজের বাড়ি করার সঙ্গে সঙ্গেই জাগতিক বস্তুবাদে কোথাও একটা ভাটা পড়ে হয়তো। নিজের বাড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে তাই শেষমেশ যখন তার প্রাপ্তিই ঘটে, তখনই কোথাও নশ্বর এ জীবনের ধারণাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই নিজের বাড়ি হলেও প্রাণটা তার পরপারের বাড়ির জন্যও থাকতে চায় উন্মুক্ত।

স্নেহনীড়- স্নেহযুক্ত স্বপ্নের আবাসের চিন্তা। স্নেহে কাতর বাঙালি পাখির বাসার মতো ছোট্ট একটি বাসাতেও সেই স্নেহই খুঁজে ফেরে। অন্যের বাড়িতে থেকে থেকে এত দিনে সে নিজ বাড়িতে নিশ্চিন্তে এবং নির্ভাবনায় স্নেহের ঠাঁই পেয়েছে।

ধুমকেতু- সহসা মহাজাগতিক বস্তু, যার বিশেষ এক চমক রয়েছে। যাকে সব সময় পাওয়া যায় না। নিজের বাড়ির প্রতিও আধ্যাত্মিক এই চেতনা কাজ করে বাঙালির মননে।

হেঁয়ালি- এই নামের মধ্যেও সেই আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে নশ্বরতা প্রসঙ্গে।

প্যারাডাইজ, ম্যানসন- ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষার নামও দেখা যায় আমাদের আজকালকার বাসাবাড়িতে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অনেকেই বাড়ির নামকরণে ইংরেজি শব্দের প্রয়োগের মাধ্যমে কোথাও নিজের আধিপত্য বিরাজের একটা সেকেলে চর্চা করে থাকেন, যা প্রায়ই দেখা যায়।

স্থাপত্যের নামকরণ ও রবীন্দ্রনাথ  

বাংলা ভাষা নিয়ে লিখতে গেলে সেখানে এমন কোনো মুহূর্ত থাকা দায়, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম আসবে না। বিস্ময়কর হলেও সত্য, স্থাপত্যেও রয়েছে রবিঠাকুরের বিচরণ। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের বাড়িগুলোর নামকরণ করা হয়েছে সেই স্থাপনার গুণবিচারে। এমনই কতগুলো নাম যদি আমরা দেখি-

দেহলি- সংস্কৃত শব্দ ‘দেহ’ থেকে দেহালি নামটি এসেছে। অর্থ যা দেহের আশ্রয় দেয়। মাটি ও গোবর দিয়ে তৈরি একতলা ও ছাউনি বাড়ি। দেহালি একই সঙ্গে মাটি আর আকাশ ছুঁইয়ে থাকার তাড়না জোগায়।

কোণার্কা- সংস্কৃত থেকে আগত শব্দ কোণার্কা। অর্থ কৌণিকভাবে আসা আলো। একতলা লম্বাটে এই বাড়ি। পূর্ব দিক থেকে বাড়ির ছাদ ছাড়িয়েও কিছু উঁচু ছাদ দিয়ে একটি বারান্দা ঢুকে গিয়েছে ঘরের ভেতরে একেবারে কেন্দ্রে। এখান দিয়েই ঘরে প্রবেশ করে সূর্যের কৌণিক আলো।   

উদয়ন- উদয়ন বা ভোর। উদয়ন শান্তিনিকেতনের একমাত্র বিশালাকার ভবন। রবীন্দ্রনাথের পুত্রের প্রয়াসে বানানো এ বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ কমই থেকেছেন। সত্যি বলতে তাঁর কিছুটা অভিমানই ছিল যে কেন তাঁর আশ্রমে এই বিশাল বাড়িটি বানানো হলো।

শ্যামলী- সংস্কৃত শব্দ থেকে আসা শব্দ শ্যামলী। কালচে ধরনের মাটি দিয়ে বানানো এই বাড়ি। অনেকটা গুহার মতো আবদ্ধ। অজন্তা গুহা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন। মাটির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাওয়ার রবীন্দ্রনাথের বাসনা প্রকাশিত হয় এই বাড়িতে।

পুনঃশ্চ- এই বাড়িটি রবীন্দ্রনাথের আরামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বাড়ির একটি অংশ ছাদহীন, কয়েকটি দেয়ালহীন এই বাড়িটির নাম তিনি তাই দেন পুনঃশ্চ।

উদিচি- সংস্কৃত শব্দ ‘উদি’ এবং ‘চি’ থেকে আগত এই নাম। উদিচি অর্থ ওপরের দিকে উত্থান। এই বাড়িটিও একটি চমৎকার ডিজাইনের সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সেখান থেকেই এর নামকরণ হয় উদিচি।  

তালধ্বজ- রবীন্দ্রনাথের তরুবিলাসী এক বন্ধু শান্তিনিকেতনে পথের একধারে একটি গোলাকার কুটির রচনা করেন। যেটি একটি পুরোনো তালগাছকে কেন্দ্র করে তৈরি। রবীন্দ্রনাথ এই তালধ্বজ নিয়ে বলছেন, ‘এটি যেন মৌচাকের মতো, নিভৃতবাসের মধু দিয়ে ভরা। লোভনীয় বলেই মনে করি, সেই সঙ্গে এও মনে হয়, বাসস্থান সম্বন্ধে অধিকারভেদ আছে; যেখানে আশ্রয় নেবার ইচ্ছা থাকে, সেখানে হয়তো আশ্রয় নেবার যোগ্যতা থাকে না।’

স্থাপনার অবয়বে বাংলা ভাষা ও স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর

স্থাপত্যের অবয়বে বাংলা ভাষা স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরের একেবারেই একান্ত একক প্রচেষ্টা। তাঁর নিনাকাব্য প্রকল্পে এই ব্যবহার আমরা প্রথমবারের মতো দেখেছি। কিন্তু স্থপতি নির্ঝর বর্ণ, শব্দ ও ভাষা নিয়ে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ব্যক্তি নির্ঝরকেও সেই শিশুকাল থেকে আকৃষ্ট করেছে বাংলা ভাষা ও তার সুমধুর শ্রæতি অভিজ্ঞতা। ক্লাস ফোর থেকেই দেয়ালিকা পত্রিকা করার সময় দেয়ালে নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে হাতে লিখে, এঁকে এবং আল্পনা করে সাজানোর আনন্দটি জেনেছিলেন স্থপতি। পরে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘ভূত’-এর দেয়ালেও লেখা ছিল নানা কথা। দুর্বোধ্য সেসব কথা সবাই আগ্রহ নিয়ে পড়তও। ‘ডুং গ্রæ’ নামের যুগল ধারণার রেস্তোরাঁর দেয়ালেও স্থপতি লিখেছিলেন অনেক মজার কথা। যেমন ‘জুতা থাকতে মুখ কেন’। বাঙালির রসিক মনকে স্থাপনার দেয়ালে এভাবে আর কখনো দেখা যায়নি। ইংল্যান্ডে রেস্তোরাঁর কাজ করতে গিয়েও স্থপতি নির্ঝর দেয়ালে লিখেছিলেন এবং সেটা ছিল রীতিমতো বাংলায়। সেই লেখনীর একাংশ কম্পিউটার ফন্টের হরফে এবং একাংশ হাতে লিখেছিলেন। কেন এমন করে লেখা হলো এই হেঁয়ালিটা সবাইকে বেশ তাক লাগিয়েছিল।

স্থপতি নির্ঝর এখন তাঁর কোনো প্রকল্পের নাম বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় লেখেন না। ভারতে কাজ করেছেন হিন্দি ভাষায়। অর্থাৎ মাতৃভাষার গুরুত্ব স্থপতির কাছে সবার আগে। স্থপতি জানালেন তাঁর ডিজাইন করা বাড়ির নামকরণের কিছু গল্প। একটি বাড়িতে থাকবেন মা-বাবা ও তাদের দুই সন্তান। মা-বাবাকে স্থপতি জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের জীবনের সব থেকে বড় জিনিসটা কী বলে তাঁরা ভাবেন। এই মা-বাবা বলতে পেরেছিলেন যে তাঁদের বাচ্চাদের জন্য তাঁরা এই বাড়িটা বানাবেন নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে, বাচ্চারা কি সেটা বুঝতে পারবে যে কতটা আদর, ভালোবাসা, স্নেহ এখানে জড়িয়ে আছে! এই চিন্তা থেকে স্থপতি বাড়িটির নাম নির্ধারণ করেন ‘মর্ম’। অর্থাৎ মা-বাবার এই মমতার মর্মটি যেন বাচ্চারা উপলব্ধি করতে পারে। বাসাটির অভ্যন্তরেও স্থপতি নানা শব্দ লিখেছেন, যার মধ্য দিয়ে বাচ্চারা বেড়ে উঠছে এবং তাদের নিজেদের মতো করে শব্দগুলোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, নিজেদের অর্থ বের করে নিচ্ছে, বাক্য নির্মাণ করছে। সম্প্রতি আরেকটি বাড়ির কাজ করছেন স্থপতি, যার নাম ‘প্রামাণ্য’। এই বাড়িটির দিকনির্দেশনায় একটা ধাঁধা আছে। একদিক বাদে সব দিকের দেয়ালে সে দিকের কথা উল্লেখ করে লেখা আছে, ‘দক্ষিণে নাই কিন্তু সবদিকে পাই’। যার উত্তরই হলো ‘উত্তর’। এভাবে বাড়ির কোন দিক উত্তর তা জানা গেল এবং নিমেষেই বাড়িটির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতির দারুণ একটি আন্তরিক সম্পর্কও স্থাপন করা গেল।

স্থপতি চান আমাদের অনুভূতিগুলোকে উসকে দিতে। এভাবেই সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে একটা সময়ে আমরা সমষ্টিগতভাবে নিজেদের মেধার প্রকাশও সেক্ষেত্রে করতে পারব। চিন্তাজগতে এই ছোট স্ফুলিঙ্গ একটা বিশাল আন্দোলন তৈরি করে আমাদের আরও সরস-বর্তী করে তুলতে।  

নিনাকাব্য

বাংলা হরফের দেখা স্থাপনায় মিলবে এমন ভাবনা তিনিই একমাত্র স্থপতি, যিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। বাংলাদেশে একমাত্র এই একটিমাত্র সার্থক স্থাপনা রয়েছে, যেখানে বাংলা ভাষা, বাংলা বর্ণ ও বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে কাজ করা হয়েছে। যদিও এখন এই ধারণাকে কেন্দ্র করে নানা স্থাপনার কথা ভাবা হচ্ছে কিন্তু নিনাকাব্য আমাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

দেয়ালে নানা রাজনৈতিক কথা লেখা থাকে, থাকে বিজ্ঞাপন। তাহলে কবিতা নয় কেন- এমন একটি  চিন্তা থেকেই নিনাকাব্যের শুরুটা। কবি হওয়ার উদ্দেশ্যেই কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম ঢাকায় এসেছিলেন স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর। ফলে ভাষা নিয়ে তাঁর প্রেম দীর্ঘদিনের। কংক্রিট ও তাপনিরোধক কাচ দিয়ে তৈরি নিনাকাব্যের প্রতিটা ফ্লোরের প্ল্যান খুবই সরলরৈখিক, যেন একটি স্পষ্টতা নিশ্চিত করা যায়। নিনাকাব্যে নেই কোনো সীমানাপ্রাচীর। বরং একটি জলাধার আর গাছপালায় সমৃদ্ধ করে ফুটপাতের নিকটবর্তী এই জায়গাটায় যেন পথচারীরা বসতে পারেন, সেটি মমতা দিয়ে করা হয়েছে। স্থপতি নির্ঝরের মতে আমাদের আশপাশের সবকিছুরই খুব মানবিক হওয়া উচিত, এমনকি ছুরি-বন্দুকেরও মানবিক হওয়া উচিত যে সবাইকে সে কাটবে না। নিনাকাব্যের স্নেহভরা দৃশ্যগতভাবে তা স্পষ্ট।

নিনাকাব্য নির্মাণে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কবিতার শব্দ খোদাই করা কংক্রিটের দেয়ালগুলোতে। সেই সঙ্গে লেখাসমেত সঠিক মাপ ও জোড়া ডিজাইন করা কংক্রিটগুলোর। এখানে একটা বানান ভুল হলে পুরো দেয়াল নষ্ট হবে। তা ছাড়া এই ব্যাপারটি যেহেতু আগে কখনো করা হয়নি, তাই প্রযুক্তিগতভাবেও অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে স্থপতিকে। বাংলা বর্ণমালার কারুকার্য শোভাকে ধরে রাখতে কাঠ দিয়ে, লোহা দিয়ে, রাবার দিয়ে নানাভাবে চেষ্টা করে একটা কর্মশালার মধ্য দিয়ে স্থপতি ও তার প্রকৌশলী দল গিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। এই গোটা প্রকল্পে একটিও বানানও ভুল হয়নি। করপোরেট সংস্কৃতিকে বাংলা সংস্কৃতির মেলবন্ধনের চেষ্টা করা হয়েছে নিনাকাব্যে। পুরো করপোরেট ভবনকে কবিতায় মুড়িয়ে দেওয়া নিশ্চয় ব্যবসায়ীর কাজ নয়, এমনই নিরেট চিন্তাকে উড়িয়ে দেয় নিনাকাব্য। ভবনের দেয়ালে লেখা এই কবিতার শব্দগুলো ভবনের অভ্যন্তরেও দৃশ্যমান, তাই যাঁরা ভেতরে কোনো লবিতে বসে আছেন, তাঁরাও ভাষার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন সমানভাবে। 

নিনাকাব্যের অবয়বে লেখা কবিতাগুলো বাছাই করেছেন কবি সাজ্জাদ শরিফ। ঠিক করা হলো তেরোতলা এই ভবনটির বারোটি তলার একেকটি উৎসর্গ করা হবে বারোজন কবিকে এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরে সব কবির উপস্থিতির একটি ভাব তৈরির চেষ্টা করা হবে। যে বারোজন কবিকে নিয়ে কাজটি করা হলো তাঁরা হলেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্‌দীন, সুফিয়া কামাল, আহসান হাবিব, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ ও নির্মলেন্দু গুণ।

কিছু কবিতার চরণ যা এই ভবনে অঙ্কিত হয়েছে-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান

– কাজী নজরুল ইসলাম

যেখানেই যাও চলে, হয় নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর

– জীবনানন্দ দাশ

স্বাধীনতা তুমি উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন

– শামসুর রাহমান

সহজ কথা যায় না বলা সহজে

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মরিতে চাহিনা আমি আমি সুন্দর ভুবনে

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিনাকাব্য আসলে এই সময়ের এক সৃষ্টি যেখানে এ সময়ের ভাবনাচিন্তা, আমাদের নিজস্বতা, ভাষার শক্তি, আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তি এই সবকিছুকে এক জায়গায় নিয়ে আসে, যাতে করে ভবিষ্যতের স্থাপত্য বাংলায় আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। স্থপতি বলেন, আমরা পরিবেশবান্ধব কথাটি খুবই বলি কিন্তু সংস্কৃতিবান্ধব বলি না। আমাদের বাঙালি আবেগে টোকা দিয়ে সচেতন করতেই নিনাকাব্যের সূচনা।

বিশ্ব স্থাপনার অবয়বে ভাষা

স্থাপত্যমাত্রই যোগাযোগ স্থাপন করে, কথা বলে। শিলালিপি এ ক্ষেত্রে খুবই প্রাচীন-পরিচিত একটি প্রথা। মিসরের পিরামিডের ভেতরের দেয়ালে প্রাচীন শিলালিপি ও অঙ্কিত চিহ্নের দেখা মেলে। চীনের ঐতিহাসিক কিছু স্থাপনাতে এমন ভাষাগত চরিত্র দেখতে পাওয়া যায় যেমন ‘অন্তহীন’। চীনের টেলিভিশনসংক্রান্ত প্রধান অধিদপ্তরের দেয়ালে লেখা আছে ‘মুখ’। গির্জার স্থাপনার সূত্রে থেকেছে বাইবেলের লেখনী। মন্দির মসজিদের ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা যায়। ধর্মীয় দারুণ সব মুহূর্তের ঘটনাগুলো বর্ণিত হয় স্থাপনার অবয়বে। উনিশ শতকে বই-পুস্তক আর ছাপাখানার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে স্থাপনার অবয়বে লেখার দরকারটি জীবনের দরকারের খাতা থেকে উঠে আসে। 

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২১

Related Posts

অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান এখনকার অবকাঠামো জলবায়ুসহিষ্ণু হতে হবে

দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথটি চলতি বছরের অক্টোবরে উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে স্বল্প খরচ ও ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকা…

অটোমেশন সিস্টেমে স্মার্ট হোম

আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি চমৎকার এক আবাসের। বসবাসের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একটি গৃহ আমাদের ধারণ করে। এই বসবাস ও…

ভবন ‘নির্মাণ’ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৭)

আজকের আলোচ্য বিষয় নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃতব্য স্টিলসামগ্রী (এমএস রড, অ্যাঙ্গেল ও ফ্ল্যাট বার)। এমএস রড একটি ভবন নির্মাণ…

মিথেনে নতুন বিপদ

গ্রামে প্রায়ই রাতের আঁধারে কৃষিখেত বা ডোবা-নালায় দেখা যায় হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুন, গোলা হয়ে উড়তে থাকে এক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Award
দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউলের আবাসন স্থাপত্যে নতুন দিগন্ত
ভবিষ্যতের ৮টি স্টেডিয়াম যা প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে
নুহাশ পল্লী: হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সবুজ রাজ্য
Cover
Ramna Park
রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়
Qatar
Electric