Image

ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৯)

মার্বেল ফ্লোর

‘মার্বেল’ পাথর আকরে প্রাপ্ত একটি নির্মাণসামগ্রী, যা প্রাকৃতিক পাহাড় হিসেবে ভূ-পৃষ্ঠে বিরাজমান। এই পাহাড় কাটা পাথর প্রাচীনকাল থেকেই নানাভাবে নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্যবহারের ক্ষেত্র হিসেবে বিভিন্নভাবে এই পাথর সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত এসব পাথর ইমারতের ফ্লোর কিংবা ওয়ালে লাগানোর জন্য ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজ থেকে ১/২”  কিংবা ৩/৪”  পুরুত্বে পাতলা শিট হিসেবে কাটা হয়। এসব পাতলা শিট আবার নির্দিষ্ট সাইজ অনুযায়ী টুকরো টুকরো করে কেটে আনফিনিশড অবস্থায় ফ্লোর কিংবা ওয়ালে লাগিয়ে পর্যাপ্ত কিউরিং শেষে মেশিন ও হাতে ঘষে ফিনিশিং দেওয়া হয়। আমাদের দেশে ফ্লোর কিংবা ওয়ালে লাগানোর জন্য মার্বেল শিট থেকে কাটা টুকরোর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ উভয়ই সাধারণত ০”-৩”  থেকে র্৪-র্০র্  পর্যন্ত হয়ে থাকে। অত্র মার্বেল ফ্লোর আভিজাত্যের প্রতীক একই সঙ্গে ব্যয়বহুল।

ইমারত নির্মাণসামগ্রী হিসেবে উৎসস্থল অনুযায়ী আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরনের মার্বেল পাথর ব্যবহৃত হয়। সেগুলো-

১.      ইন্ডিয়ান পাথর

২.     ইতালিয়ান পাথর।

ইন্ডিয়ান পাথরের সার্বিক মান ও বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে কম। মানভেদে প্রতি এসএফটি (স্কয়ার ফিট) মার্বেলের মূল্য সর্বনিম্ন ১৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩৬০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ইতালিয়ান পাথরের দাম প্রতি এসএফটি সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকা। এই দুই ধরনের পাথরই রয়েছে বাজারে। ফলে, ব্যবহারকারী তাঁর রুচি ও আর্থিক সংগতি অনুযায়ী এই পাথর ব্যবহার করতে পারে। 

প্রসঙ্গত, বিদ্যমান বাজারে উভয় দেশ থেকে আমদানি করা নানা বর্ণ, সাইজ ও কোয়ালিটির মার্বেল পাথর পাওয়া যায়। এসব মার্বেল পাথরের কোয়ালিটি, শিটের সাইজ এবং রঙের ওপর ভিত্তি করে দামের তারতম্য হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, ইতালিয়ান মার্বেলের দৃষ্টিনান্দনিকতা, স্থায়িত্ব ও দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। আর তাই ব্যবহার ও আর্থিক সচ্ছলতা পাথর নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

ফ্লোর ফিনিশিং কাজের জন্য সব ধরনের মার্বেল পাথরই ১/২”  কিংবা ৩/৪”  পুরুত্বে বিভিন্ন সাইজে কেটে অমিশ্র অবস্থায় কাজে লাগানো হয়। আরসিসি ঢালাইকৃত ফ্লোরের ওপর সিমেন্ট মর্টারের সাহায্যে সিরামিক কিংবা মোজাইক টালির মতো একই নিয়মে মার্বেল পাথর বসানো হয়। অতঃপর পর্যাপ্ত (কমপক্ষে ১৪ দিন) কিউরিং শেষে মেশিন ও হাতে কেটে ফ্লোর মসৃণ করা হয়। সর্বশেষে সিরিশ কাগজ ও অ্যাসিড পাথর দিয়ে ঘষে ফিনিশিং দেওয়া হয়।

মার্বেল ফেøারের কাজ সম্পাদনের জন্য সিরামিক টালির ফ্লোর তৈরিতে সব ধরনের সতর্কতাই অবলম্বন করা প্রয়োজন। যেমন-

  • মালামাল কেনার সময় কোয়ালিটি বুঝে নেওয়া
  • সঠিক পরিমাণে মালামাল কেনার লক্ষ্যে কাজের ক্ষেত্র ঠিকমতো পরিমাপ করা এবং তদ্নুযায়ী মালামাল ক্রয় করা
  • কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা
  • মালামালের অপচয় রোধ করা
  • লেবার রেইট (শ্রমমূল্য) সঠিকভাবে নির্ধারণ করা এবং
  • লেবার বিল পরিশোধের জন্য কৃত কাজের মাপগুলো সঠিকভাবে নেওয়া।

উপরোল্লিখিত কাজসমূহ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে অভিজ্ঞ জনবল (মিস্ত্রি ও প্রকৌশলী) নিয়োগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নইলে, অপচয় রোধ করা এবং মালামাল ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অভিজ্ঞ মিস্ত্রি ও প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে খরচের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। কিন্তু, পিছু হটা ঠিক নয়। কারণ, সামগ্রিকভাবে এতে খরচ সাশ্রয় হয় এবং কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা যায়।  

গ্রানাইট টপিং

মার্বেল ফ্লোর নির্মিত বসত বাড়ির সিঙ্ক, বেসিন এবং কিচেনের ওয়ার্কস টপসমূহে সাধারণত গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়, যা মার্বেল পাথরের তুলনায় ব্যয়বহুল এবং দৃষ্টিনন্দন। গ্রানাইট পাথর গাঢ় রঙের (কালো, লাল, সবুজ ইত্যাদি) বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ব্যবহারকারী তাঁর নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী এই পাথর ব্যবহার করতে পারে। অত্র পাথর বসানো, ফিনিশিং দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলো মার্বেল পাথরের মতো একই পদ্ধতিতে সম্পাদন করা হয়।

প্রসঙ্গত, ওয়ার্কস টপ হিসেবে ব্যবহৃত গ্রানাইট পাথরসমূহের উন্মুক্ত প্রান্তগুলো ব্যবহারের সুবিধার্থে তথা দৃষ্টিনান্দনিকতা বাড়াতে বিভিন্ন ডিজাইনে মোল্ডিং করা হয়ে থাকে। এই মোল্ডিংয়ের কাজটি পাথর বসানোর আগে বা পরে যেকোনো সময় করা যেতে পারে। এ ছাড়া, সিঙ্ক, বেসিন এবং কিচেনের ওয়ার্কস টপ হিসেবে পাথর বসানোর সময় এর লেভেল এবং প্রয়োজনীয় স্লোপ ঠিকভাবে রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 

ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস

একটি ইমারতের পার্টিশন ওয়ালের কাজ শেষ করার পর ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিংয়ের কাজ করা হয়। অত্র কাজটি করার আগে কোথায় কোথায় কিসের ভিত্তিতে (লাইট, ফ্যান, এসি, গিজার, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ, ওভেন ইত্যাদি) কয়টি পয়েন্ট থাকবে তার একটি সঠিক দিকনির্দেশনা থাকা অত্যাবশ্যক, যা সাধারণত একটি ড্রইংয়ের ওপর স্পষ্ট করে দেখানো থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উপরোল্লিখিত প্রতিটি জিনিসের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের তার ও সুইচ-সকেটের প্রয়োজন হয়।

আবাসিক একটি ইমারতের ইন্টারনাল ওয়্যারিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব তার ও সুইচ-সকেট ব্যবহার করা হয়, তার একটি তালিকা দেওয়া হলো-

তার

  • লাইট, ফ্যানের জন্য ১.৫ আরএম (মাল্টি ওয়ার রাউন্ড কন্ড্রাক্টর)
  • কম্পিউটার, মাইক্রো ওভেন, ফ্রিজ ইত্যাদির জন্য ২.৫ আরএম
  • এসি, গিজার, ইলেকট্রিক ওভেন, আইরণ (ইস্ত্রি) ইত্যাদির জন্য ৪.৫ আরএম

উপরোল্লিখিত তারের সঙ্গে ক্রমানুসারে যে ধরনের সুইচ-সকেট ব্যবহার করা হয়ে থাকে-

সুইচ-সকেট

  • ১০ অ্যাম্পিয়ার ২-পিন
  • ১৩ অ্যাম্পিয়ার ৩-পিন (চ্যাপ্টা)
  • ১৫ অ্যাম্পিয়ার ৩-পিন (গোল)।

ফলে এ ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকলে মিস্ত্রি তাঁর ইচ্ছামত কাজ করে, যাতে ভবিষ্যতে নানা ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। সামান্য একটি আনস্পেসিফাইড তার কিংবা সুইচ-সকেটের কারণে অত্যন্ত দামি একটি জিনিস পুড়ে নষ্ট হতে পারে। এমনকি শর্টসার্কিট হয়ে পুরো বাড়িটিও জ্বলে যেতে পারে। অতএব, ইলেকট্রিক্যাল মালামাল নির্বাচন ও সঠিকভাবে স্থাপন করাসহ সব কাজের মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইলেকট্রিক্যাল কাজগুলো সাধারণত দুই ধাপে করা হয়। প্রথমত, ওয়্যারিং করা, দ্বিতীয়ত, ফিটিংস ফিক্সারস লাগানো। পার্টিশন ওয়াল তৈরির পর ড্রইংয়ে নির্দেশিত পয়েন্ট অনুসারে তার টানার জন্য পাইপ বসানো এবং সুইচ-সকেট লাগানোর জন্য বক্স বসানোর কাজগুলো আগেই সম্পন্ন করতে হয়, যা সাধারণত প্লাস্টার করা কিংবা ফিনিশিং কাজের আগেই করা হয়ে থাকে। এরপর রঙের ফাইনাল কোট দেওয়ার আগে ফিটিংস-ফিক্সারসসমূহ লাগানো হয়।

ইমারত নির্মাণ প্রকল্পের জন্য লিফট, জেনারেটর এবং সাব-স্টেশন বসানোর কাজগুলোও ইলেকট্রিক্যাল কাজের আওতায় পড়ে। এর প্রতিটি কাজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অত্র কাজসমূহ সময়মতো এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার বিষয়টি অতীব জরুরি। সর্বোপরি, ইলেকট্রিক কানেকশন ও লোড ডিস্ট্রিবিউশনের বিষয়গুলো বিশেষ সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করাসহ সব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করণার্থে সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করা আবশ্যক।

অতএব, উপরোল্লিখিত কাজগুলো সুসম্পন্ন করার জন্য যে যে বিষয়সমূহ খুবই সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার-

  • প্রয়োজনীয় মালামালের গুণাগুণ নিশ্চিত করা
  • অপচয় রোধ করা এবং
  • কাজের গুণগত মান রক্ষা করা।

এ ছাড়া, মালামালের অপচয় রোধ করা এবং কাজ বাস্তবায়ন-পরবর্তী ব্যবহারিক সুবিধাদি পাওয়ার জন্য ভৌত কাজ বাস্তবায়ন করার আগেই ব্যবহৃতব্য মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাসমূহ সুচিন্তিতভাবে প্রণয়ন করা এবং তা যথাযথভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

মনে রাখা দরকার যে তার ও সুইচ-সকেট দিয়ে একটি বাল্ব জ্বালানো যায়, তা দিয়ে একটি ইস্ত্রি বা ইলেকট্রিকওভেন চালানো যায় না। তাই, এসি, ফ্রিজ, গিজার, আয়রন, ওভেন, লাইট, ফ্যান ইত্যাদি প্রতিটি অ্যাপ্লাইয়েন্স চালানোর জন্য আলাদা আলাদাভাবে তার ও সুইচ-সকেট নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

ইলেকট্রিক্যাল কাজসমুহ সুনির্দিষ্টভাবে সম্পাদন করা বেশ জটিল একটি বিষয় বিধায়, এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করণার্থে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেওয়া অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি, সব কাজ সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত তদারক করার বিষয়টিও তীক্ষèভাবে খেয়াল রাখা অপরিহার্য।

সর্বশেষ, ড্রইং মোতাবেক কাজ করতে গিয়ে কোথাও কোনো সংশয় দেখা দিলে কিংবা ড্রইংয়ের সবকিছু সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে, কাজ বাস্তবায়ন করার আগেই সংশ্লিষ্ট ডিজাইনারের কাছ থেকে তা ভালোভাবে বুঝে নেওয়া এবং ডিজাইনার কর্তৃক দেওয়া সব নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলা অতীব জরুরি।

(চলবে)

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।

Related Posts

নির্মাণে উচ্চশক্তির রড ব্যবহারে বিএনবিসি কোড

কি সত্যিই অন্তরায়? ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উঠে আসা পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের মধ্যে ৩২তম শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশ।…

প্লাস্টার ও প্লাস্টারে ফাটল

একটি ইমারতের ইটের গাঁথুনি কিংবা অমসৃণ কংক্রিটকে মসৃণ করতে সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণে যে বহিরাবরণ দেওয়া হয়, তার নামই প্লাস্টার…

নগর পরিকল্পনায় বিবেচ্য বিষয়াদী

নগর পরিকল্পনা একটি কারিগরী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ভূমির ব্যবহার এবং নাগরিক জীবনব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন করা হয়।…

বৃষ্টির দিনে কংক্রিটিং

কয়েক দিন আগে একজনের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তার বাসার তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের ৪০-৫০ মিনিট পর বৃষ্টি…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Buet
কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra