নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ

বাস্তবধর্মী ও প্রয়োগমুখী বিষয় সম্পর্কে বাস্তবিক জ্ঞান লাভ করাকেই সাধারণত প্রশিক্ষণ বলা হয়। এটা শিক্ষামূলক বিশেষ কৌশল, যা অর্জনের পর একজন মানুষ আত্মনির্ভরশীলতার সাথে বিপদ মোকাবেলা করতে পারে। সে অর্থে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মীদেরকে যে কোনো ধরনের বিপদ মোকাবেলায় বিশেষভাবে দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধির লক্ষে এবং তাদেরকে অধিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে গড়ে তোলার বাস্তবমুখী প্রক্রিয়াই নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ। একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং কিভাবে দুর্ঘটনা এড়িয়ে সুষ্ঠু উৎপাদন বা নির্মাণ প্রক্রিয়া বজায় রাখা যায়, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যায় এবং শ্রমিকদেরকে সে সম্পর্কে জ্ঞানদান, দক্ষতা উন্নয়ন ও কলাকৌশল এ সবকিছুই নির্ভর করে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের ওপর। 

প্রশিক্ষণ ব্যতীত কোনো বিষয়ে তাত্তি¡ক বা ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে শিল্পকারখানা এবং যে কোনো নির্মাণ এলাকায় শ্রমিক ও পরিদর্শকদের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপত্তা কাজ ও বিভিন্নরকম দুর্ঘটনাজনিত কারণে বিপুল পরিমাণে জানমালের ক্ষতি সাধিত হতে পারে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মকাÐকে সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রত্যেক কর্মক্ষেত্রেই কিছু না কিছু নিয়ম কানুন ও বিধি-নিষেধ থাকে, যার দ্বারা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কর্মকাÐ পরিচালিত হয়। তাই প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সফলতার প্রয়োজনে এসব নিয়ম-কানুনসহ কর্মীর জন্য নির্ধারিত কাজকর্মের খুঁটিনাটি সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন এবং কর্মীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান প্রয়োজন। এ প্রশিক্ষণ কর্মীকে  বাস্তব জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে। বর্তমান উন্নততর প্রযুক্তির বিকাশের সাথে প্রশিক্ষণের যৌক্তিকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাই নবনব প্রযুক্তির সমান তালে প্রশিক্ষণের কাক্সিক্ষত দাবিও মেটাতে হচ্ছে উদ্ভাবকদের।  আর এ প্রশিক্ষণের প্রথম পাঠদান নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, Safety first do then work নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মীদের যথোপযুক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়নে এবং কিভাবে দুর্ঘটনা এড়িয়ে সুষ্ঠু উৎপাদন প্রক্রিয়া বজায় রাখা যায় ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যায় সে সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানদান, দক্ষতা উন্নয়ন ও কলাকৌশল শিক্ষা দেয়। একমাত্র প্রশিক্ষিত শ্রমিক কর্মীই কেবল দুর্ঘটনা রোধ করে একটি প্রতিষ্ঠানকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। তাই নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ শ্রমিক কর্মী ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্য কল্যাণকর। 

নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা 

নিরাপত্তা প্রশিক্ষণকে প্রতিষ্ঠানের রক্ষাকবচ বলা হয়। কারণ, এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই একজন কর্মী তার কর্মের খুঁটিনাটি দিক জানতে পারে। কর্মী যদি আগেই জানতে পারে রোলারে হাত দিলে আঙ্গুল কাটা পড়বে, ইলেকট্রিক তার স্পর্শ করলে বৈদ্যুতিক শক খেতে হবে, তখন সে খুব সাবধানতার সাথে এবং নিরাপদ সামগ্রীর সহায়তায় কাজ করবে। ফলে দুর্ঘটনাও ঘটবে কম। এটাই প্রশিক্ষণের সুফল। তদুপরি প্রশিক্ষণের অভাবে যে কোনো ছোট দুর্ঘটনাকে প্রাথমিক অবস্থায় নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে অথবা প্রশিক্ষণের অভাবে ছোট দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ভুল পদক্ষেপ নিলে অল্প সময়েই তা বিরাট দুর্ঘটনায় পরিণত হতে পারে। যেমন – ডিজেল, পেট্রোল বা কেরোসিনে আগুন লাগলে তা নির্বাপণের জন্য কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস ব্যবহার না করে যদি কোনো শ্রমিক এই বিশেষ দুর্ঘটনার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অজ্ঞতার জন্য পানির সাহায্যে আগুন নেভাতে চেষ্টা করে তাহলে আগুন না নেভে অল্প সময়ের মধ্যে ভয়ংকর আকার ধারণ করবে। 

সে জন্যে জানমালের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বল্পতম রাখার লক্ষ্যে বিভিন্ন রকমের দুর্ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করার জ্ঞান অর্জনের জন্য পদ্ধতিগত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ একান্ত প্রয়োজন। 

নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ না থাকার ফলে কি কি কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, কিভাবে দুর্ঘটনা রোধ করা যায় ইত্যাদি সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান অর্জিত হয় না ফলে শিল্প কারখানায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ফলে জানমালের ক্ষতি তো হয়ই, কখনো কখনো বাজারের পণ্যের সরবরাহ কমে যায়, দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যায়।

উল্লেখ্য যে কোনো কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণকে ফলপ্রসূ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন হয় কর্মীর জন্য নির্ধারিত কাজের সম্ভাব্য বিপজ্জনক বিষয়সমূহ চিহ্নিতকরণ। পরবর্তীতে কাজের এসব বিপজ্জনক বিষয়সমূহের নিরাপদ কৌশল সম্পর্কে কর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান। ফলে কর্মস্থল নিরাপদ হয় এবং দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমে যায়। তাছাড়া নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীগণ বিপদসংকুল পরিস্থিতিতেও দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হয়।

বিভিন্ন ধরনের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। নিম্নে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের কতিপয় প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হলো-

১। প্রয়োজনীয় দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মী না পাওয়া গেলে, নতুন কর্মী নিয়োগের পরে তাদেরকে কাজের উপযোগী করার জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রয়োজন হয়।

২। নতুন যন্ত্রপাতি, কলাকৌশল, পদ্ধতি ইত্যাদি ধারণ, অবলম্বন এবং আয়ত্তে আনয়নের জন্য বিষয়ভিত্তিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। 

৩। যন্ত্রপাতি ও মালামালের নিরাপদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপত্তা বিষয়ে কর্মীগণের দক্ষতা 

বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ আবশ্যক। 

৪। কর্মক্ষেত্রের অনিরাপদ অবস্থা এবং কর্মীদের কাজকর্মের সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়ার লক্ষ্যে কর্মীদেরকে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দিতে হয়।

৫। প্রযুক্তি পরিবর্তনের কারণে দুর্ঘটনার প্রকৃতির ও পরিবর্তন হয়। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কার্যকরী করার লক্ষ্যে প্রতিরোধের কৌশল পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়। তাই পরিবর্তিত প্রতিরোধ কৌশল সম্পর্কে কর্মীগণকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

৬। শত প্রতিরোধী ব্যবস্থা সত্তে¡ও অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। এসব দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন করার পর দুর্ঘটনা মোকাবিলায় নতুন কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। 

৭। দুর্ঘটনা পরবর্তী আহতদের উদ্ধার এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়ে কর্মীদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। 

নিরাপত্তা সরঞ্জাম

নির্মাণ কাজে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াবার জন্য যেমন সতর্ক থাকতে হয়, তেমন কিছু নিরাপত্তামূলক সাজ সরঞ্জাম ব্যবহার করা প্রয়োজন হয়। ফলে দুর্ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস পায়।  এ ধরনের কতিপয় নিরাপত্তা সাজসরঞ্জামের তালিকা দেয়া হলো-

  • হেলমেট
  • নিরাপদ চশমা
  • হাতমোজা
  • অ্যাপ্রোন
  • নিরাপদ কোমর বন্ধনী
  • নিরাপদ পোশাক
  • গ্যাস মুখোশ
  • বায়ু শোষক
  • পায়ের নিম্নাংশের গারটার
  • গাম বুট
  • অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র
  • বহনযোগ্য আলো
  • নিরাপত্তামূলক জুতা। 

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা

প্রকাশকাল: বন্ধন ২৬ তম সংখ্যা, জুন ২০১২

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top