ড্রেনেজ ও সিউয়েজ সিস্টেম (পর্ব ১)

পৃথিবীর অন্যতম বন্যাপ্রবণ একটি দেশ বাংলাদেশ। প্রতিবছরই কোনো না কোনো এলাকা প্লাবিত হয়ে দুর্যোগ বয়ে আনে জনজীবনে। মাঝেমধ্যে প্রবল আকার ধারণ করে বিপন্ন করে তোলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বর্ষার মৌসুম এলেই প্রতিবছরই কমবেশি দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয় শহর বা নগর নির্বিশেষে কোনো কোনো অঞ্চলের অধিবাসীকে। বন্যাকবলিত এলাকায় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সংকটসহ নানা রকম অসুখ-বিসুখের প্রকোপ দেখা দেয়। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশ অষ্টম। এ দেশের বন্যাজনিত দুর্যোগ এড়াতে ড্রেনেজ ও সিউয়েস সিস্টেম সার্বিকভাবে কার্যকর হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের অদূরদর্শিতা, বিরাজমান দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যমান ড্রেনেজ ও সিউয়েস সিস্টেম প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে, ক্ষণিকের তরে হলেও অচল হয়ে যায় ঢাকা শহরের কোনো কোনো অঞ্চল, মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম ভোগান্তি।

‘নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ’-এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ও সিউয়েজ সিস্টেম কার্যকর করার জন্য সুষ্ঠু ও সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। অত্র শহর একসময় নদী, খাল, পুকুরসহ অসংখ্য জলাশয় দ্বারা বেষ্টিত ছিল। সময়ের বিবর্তনে সব হারিয়ে ইট-পাথরের শহর এখন ঢাকা। বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে/উঠছে আবাসিক এবং বাণিজ্যিক ভবন।

যেকোনো শহর/নগর অঞ্চলে আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক ভবনসমূহ গড়ে তোলার আগে নির্ধারিত অঞ্চলের যোগাযোগ এবং পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় রাস্তা এবং ড্রেনেজ ও সিউয়েস সিস্টেম নির্মাণকল্পে প্রস্তাবিত এলাকায় জনসংখ্যা ও ধরন অনুযায়ী সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তদনুযায়ী অবকাঠামো ডিজাইন ও ভৌতকাজ বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক। নইলে, জনবসতি গড়ে ওঠার পর নানা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

যা হোক, বর্তমান ঢাকা শহরের বিভিন্ন আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকা সার্ভে করলে দেখা যায়, বিদ্যমান ড্রেনেজ ও সিউয়েজ সিস্টেম অনেক ক্ষেত্রেই নাজুক। একদিকে পর্যাপ্ত ড্রেনের অভাব, অন্য দিকে যা আছে তাও আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর। কোথাও আবার বিদ্যমান ড্রেনসমূহের নির্মাণ ত্রুটি কিংবা সংস্কার করার অভাবে সেগুলোর ধারণ/পরিবহনক্ষমতা কমে গেছে। ফলে, বর্ষাকালে এলাকার মানুষ প্রায় পানিবন্দী হয়ে পড়ে।

ঢাকা শহরের নতুন পুরোনো সব এলাকাতেই কমবেশি সমস্যা আছে। পুরোনো এলাকায় ড্রেনেজ ও সিউয়েজ সিস্টেমের সমস্যা হওয়ার যৌক্তিকতা থাকলেও নতুন এলাকাতে এমন সমস্যা দেখা দেওয়া সমীচীন নয়। পুরোনো এলাকাগুলোতে আগের তুলনায় জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বাড়েনি অবকাঠামো। জনসংখ্যার তুলনায় বিদ্যমান ড্রেনসমূহের ধারণক্ষমতা কম, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ময়লা-আবর্জনা কিংবা পলি পড়ে কমে গেছে ড্রেইনের ধারণ/পরিবহনক্ষমতা। কিন্তু, নতুনভাবে গড়ে ওঠা এলাকাগুলোতেও শুধু সঠিক পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের অভাবে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ‘বসুন্ধরা’ আবাসিক এলাকা, বলতে গেলে সদ্য গড়ে ওঠা একটি শহর, যেখানে বৃষ্টির চাপ একটু বাড়লেই পানিবন্দী হয়ে পড়ে এলাকার মানুষ, যা আদৌ কাক্সিক্ষত নয়। এমন একটি এলাকা গড়ে তোলার আগে এর ভবিষ্যৎ চিন্তা মাথায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে কষ্ট হয়।

আমার বিবেচনায়, যেকোনো নতুন এলাকা বা অবকাঠামো নির্মাণ করার পূর্বে কমপক্ষে ৫০ বছর লাইফটাইম ধরে এর পরিকল্পনা, ডিজাইন এবং ভৌত কাজ বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া পুরোনো এলাকাসমূহের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রথমেই এর অবকাঠামো নিয়ে ভাবা উচিত। ‘ধানমন্ডি’ এলাকার প্রাথমিক পরিকল্পনায় ১০/২০ কাঠা জমির ওপর একটি পরিবার চিন্তা করা হলেও বর্তমানে সেখানে কমপক্ষে ৩০টি পরিবার বাস করছে। কিন্তু রাস্তা, ড্রেনের পরিসর একবারেই  বাড়েনি। 

আমাদের সার্বিক অব্যবস্থাপনা আর অসীম দুর্নীতিই জনভোগান্তির একমাত্র কারণ। দেশের প্রতিটি বিষয়ের জন্য নির্ধারিত কিছু নিয়মনীতি ও বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় প্রকট সংকটের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। বিদ্যমান ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা’, ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ পরিবেশ উন্নয়ন নীতিমালা এবং বিভিন্ন প্রফেশনের জন্য ‘কোড অব এথিক্স’ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনোটাই মানা হয় না।

এ পরিস্থিতিতে সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইন ও জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। সুন্দর, সুজলা, সুফলা এই দেশটাকে একসময় তলাবিহীন ঝুড়ি বলা হতো, সেদিন পার হয়েছে। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হয়েছি আমরা। ভবিষ্যতে উন্নত দেশসমূহের কাতারে শামিল হওয়ার প্রতিযোগিতা করছি। অবশ্যই বিষয়গুলো আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে। ফলে, আমাদের প্রতিটি কর্মে নিজের স্বার্থ ভাবার আগে অন্যের স্বার্থ তথা দেশের স্বার্থের কথা ভাবা উচিত। এতে অন্যের স্বার্থের পাশাপাশি নিজের স্বার্থ পূরণেও কোনো ঘাটতি হবে বলে আমার মনে হয় না। ভালো কাজ মানুষকে মহৎ করে; এনে দেয় মানসিক পরিতৃপ্তি। তাই দেশ, জাতি তথা নিজের স্বার্থে আমাদের মানসিক পরিবর্তন আনা দরকার, দরকার আমাদের নিজ নিজ কাজের সার্বিক গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং দেশ ও জাতির কাছে দায়মুক্ত হওয়া। 

যা হোক, আমি আমার প্রাসঙ্গিক লেখার মধ্যে কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার চেষ্টা করব এবং আশা করব, পাঠকবৃন্দ যে যাঁর অবস্থান থেকে আত্মসচেতনতার পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টি/বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করবেন। আমরা আমাদের এই দেশটাকে সুন্দর দেখতে চাই, বাঁচতে চাই সুন্দরভাবে। অবলোকন করতে চাই আপামর জনসাধারণের সুখ ও সমৃদ্ধি। আসুন আমরা একযোগে দুর্নীতিকে না বলি, আইনকে শ্রদ্ধা করি, সোচ্চার হই অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে।

এখন আমি উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর আলোকে একটি নগর/শহরের জন্য কার্যকর ড্রেনেজ ও সিউয়েজ সিস্টেম নির্মাণকল্পে এর সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, অবকাঠামো ডিজাইন, ভৌতকাজ নির্মাণ এবং ব্যবহৃতব্য মালামাল ও কাজের গুণগত মান নিয়ে ধারাবাহিক তথ্যভিত্তিক আলোচনার চেষ্টা করছি।

ড্রেনেজ সিস্টেম

বৃষ্টিপাত কিংবা অন্যান্য কারণে ভূপৃষ্ঠে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে ড্রেনেজ সিস্টেম বলা হয়। পৃথিবীর উপরিভাগের পানি সাধারণত প্রাকৃতিক ঢালের মাধ্যমে নির্মিত ড্রেন, খাল কিংবা নদী দ্বারা প্রবাহিত হয়ে মাটির নিচে অথবা সমুদ্রবক্ষে স্থান করে নেয়। এই প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করণার্থে নির্মাণ এলাকার আশপাশে উন্মুুক্ত মাটি এবং নির্মিত অবকাঠামোগুলোর ঢাল ঠিক রাখা জরুরি, যাতে জমা হওয়া পানি সহজেই নিষ্কাশিত হতে পারে।

সিউয়েজ সিস্টেম

সিউয়েজ সিস্টেম বলতে আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক ভবনসমূহে ব্যবহৃত পানি এবং পয়ো ও বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়ে থাকে, যার পুরোটাই পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে নির্মাণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে যথাযথ ডিজাইন এবং তদ্নুযায়ী অবকাঠামোসমূহ নির্মাণ করা অত্যাবশ্যক। সিউয়েজ সিস্টেমের জন্য সাধারণত কভার্ড ড্রেন নির্মাণ করা হয়। একসময় পয়ো ও বর্জা নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সেপ্টিক ট্যাঙ্ক এবং সোক ওয়েল নির্মাণ করা হতো। কিন্তু ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় জায়গার অসংকুলান হেতু একদিকে যেমন বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পাঠানোর জন্য উন্মুক্ত মাটির অভাব, অন্যদিকে জায়গার অভাবে সেপ্টিক ট্যাঙ্ক ও সোক ওয়েল নির্মাণ করার বিষয়টি বিলুপ্তপ্রায়। ফলে, আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক উভয় এলাকাতেই বৃষ্টির পানি, পয়ো ও বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়ে একেক সময় একেক এলাকার জনগণকে পানিবন্দী অবস্থায় দিনাতিপাত করতে হয়।

বর্ষার মৌসুম আসার আগে তোড়জোড় লেগে যায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যমান ড্রেনেজ ও সিউয়েজ সিস্টেমসমূহ সংস্করণের কাজে। ওয়াসা এবং সিটি করপোরেশন যে যার অবস্থান থেকে প্রতিবছরই কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং ভৌতকাজ বাস্তবায়নে নানা রকম অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে বিরাজমান অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি ঘটাতে পারে না। উপরন্তু, বিভিন্ন প্রকার অনিয়মের কারণে যেমন:

  • প্রকল্পসমূহের কাজ বর্ষা আসার আগে শেষ করার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে কার্যাদেশ না দেওয়া।
  • কার্যাদেশ দেওয়ার পরও নানা রকম গড়িমসি করে কাজ শুরু করতে বিলম্ব করা।
  • যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ সম্পাদন না করা ইত্যাদি কারণে জনজীবনে নেমে আসে অতিরিক্ত ভোগান্তি।

বর্ষাকালীন দুর্ভোগ এড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করার আগেই বর্ষা এসে যায় এবং চলমান বর্ষার মধ্যে কাজ করায় নতুন কিছু সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার ফলে শহর/নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। তাই আমাদের উচিত যখনকার কাজ তখন করা, যেভাবে করার কথা সেভাবে করা। অসময় তথা প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে কাজ করতে গিয়ে নতুন যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয় তা হলো:

  • যত্রতত্র নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করা
  • দিনের পর দিন ফেলে রাখা
  • সার্বিক কাজের গুণগত মান রক্ষা করতে না পারা।

উল্লিখিত সমস্যাগুলোর পাশাপাশি আরও যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয় তা হলো:

  • প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বেড়ে যায়
  • প্রকল্পের নির্মাণব্যয় বাড়ে এবং
  • স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের অনিয়ম ও অবহেলার কারণে সমূহ বিড়ম্বনা পোহাতে হয় সর্বসাধারণকে।

চলবে…..

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top