সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (পঞ্চম পর্ব) 

যেকোনো কাজের মান নিয়ন্ত্রণকল্পে ব্যবহৃতব্য মালামাল এবং সম্পাদনকৃত কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্ধারিত কিছু নিয়মনীতি থাকে, যা মেনে চলা অত্যাবশ্যক। তাই, যথাযথ নিয়মানুসারে সিমেন্ট কংক্রিট রোড ঢালায় করার পর তা যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার আগে কমপক্ষে ৭ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত কিউরিং করা অপরিহার্য। অত্র কিউরিংয়ের কাজটি বিভিন্নভাবে করা হয়ে থাকে, যেমন-

  • নির্মাণকৃত রাস্তার ওপর ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে পানি আটকিয়ে রেখে
  • উন্মুক্ত রাস্তার ওপর ঘন ঘন পানি স্প্রে করার মাধ্যমে রাস্তাটি সার্বক্ষণিক ভিজিয়ে রাখা
  • অন্যান্য কোনো মালামাল ব্যবহারের মাধ্যমে নির্মিত রাস্তাটি ঢেকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা ইত্যাদি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা ঢালাইয়ের কাজের ফিনিশিং দেওয়ার পর পরবর্তী ১০ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে (যা বিদ্যমান আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল) ঢালাইকৃত রাস্তার ওপর সিমেন্ট মর্টারের সাহায্যে ছোট ছোট এলাকা নির্ধারণ করে বাঁধ দেওয়া এবং বাঁধের মর্টার শুকানোর পর রাস্তার ওপর পানি জমিয়ে কমপক্ষে ৭ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত আটকে রাখা প্রয়োজন।

নিয়মনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৮ দিন পর্যন্ত পানি আটকিয়ে রাখা জরুরি, যা নিশ্চিত করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত  ফলাফল পাওয়া সম্ভব। অন্যথায়, রাস্তা যানবাহন চলাচলের উপযোগী মনে হলেও এর দীর্ঘস্থায়িত্বতা লোপ পায়। রাস্তা কিউরিং করার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাঁধ না দিয়ে কিংবা কোনো রকম ঢাকার ব্যবস্থা না করেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিয়মিত পানি স্প্রে করার মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে রাস্তাটি ভিজিয়ে রাখা যেতে পারে।   

প্রসঙ্গত, আমাদের দেশসহ পৃথিবীর সর্বত্রই সব রাস্তা ঢেকে দিয়ে কিউরিং করার একটি পদ্ধতি বিরাজমান। সব রাস্তা ঢেকে কিউরিং করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সাধারণত চট, খড়, কচুরিপানা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিদেশে কিউরিং ব্লাঙ্কেট, জিওটেক কিংবা অন্যান্য নামে নানা ধরনের মালামাল পাওয়া যায়, যা যে কোনো ধরনের কংক্রিট কিউরিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। রাস্তা ঢেকে কিউরিং করার জন্য উপরোল্লিখিত মালামালসমূহ রাস্তায় ওপর নিরবচ্ছিন্নভাবে বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর নিয়মিতভাবে পানি স্প্রে করার মাধ্যমে রাস্তাটি সার্বক্ষণিক ভিজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কিউরিং করার ক্ষেত্রেও কমপক্ষে ৭ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত রাস্তা ভিজিয়ে রাখা নিশ্চিত করাটা জরুরি। 

সর্বশেষে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সিমেন্ট কংক্রিট ঢালাইকৃত রাস্তা নির্মাণের কাজ যতই নিয়ম মেনে করা হোক না কেন, ঢালাই শেষে পর্যাপ্ত কিউরিং করা নিশ্চিত করতে না পারলে সম্পূর্ণ কাজটিই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। তাই রাস্তা ঢালাইয়ের কাজ শেষ করার পর যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যে উন্মুক্ত করে দেওয়ার আগে যেকোনোভাবেই হোক না কেন পর্যাপ্ত কিউরিং করা নিশ্চিত করতে হবে। 

মনে রাখা দরকার, রাস্তা নির্মাণকল্পে ব্যবহৃতব্য মালামাল এবং কাজের গুণগত মান যথাযথভাবে রক্ষা করে রাস্তা নির্মাণের কাজ শেষ করার পরও যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে কিউরিং করা নিশ্চিত করা না হয় তাহলে রাস্তার দীর্ঘস্থায়িত্বতা কমে যাবে, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে এবং সেই সঙ্গে বাড়বে জনভোগান্তিও। অতএব, রাস্তা ঢালাইয়ের কাজ শেষ করার পর কিউরিং করার বিষয়টি কোনোভাবেই অবহেলা করা সমীচীন নয়।

সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তার সুবিধা-অসুবিধাসমূহ

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে অতীতে প্রচলিত ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডম রাস্তার সুবিধা-অসুবিধাদি বিবেচনায় নিয়ে সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তার প্রবর্তন। শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং যেকোনো ধরনের আবহাওয়ায় যানবাহন চলাচলের উপযোগী হয়ে থাকে। এ ছাড়া, সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা সব ধরনের ট্রাফিক চলাচল করতে পারে। অন্যান্য রাস্তার তুলনায় এই রাস্তার বহন ক্ষমতা বেশি। যা-ই হোক, প্রতিটি কাজ বা জিনিসেরই সুবিধা-অসুবিধা কিংবা ভালো-মন্দ দুটি দিক থাকে। এখানেও এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। তাই সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তার সুবিধা-অসুবিধাসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

সুবিধাসমূহ

  • অন্যান্য রাস্তার তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হয়
  • যেকোনো আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে
  • সব ধরনের আবহাওয়ায় ট্রাফিক চলাচলের উপযোগী
  • ঢালাইয়ের ভেতরে পানি ঢোকা কিংবা রাস্তার ওপর ধুলাবালুর সৃষ্টি হয় না
  • রাস্তার ওপর কোনো ঢেউ দেখা দেয় না
  • যেকোনো মালামালের সাহায্যে তৈরি সাব-গ্রেডের ওপর সিমেন্ট কংক্রিট ঢালাই করা যায়
  • ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার জন্য সহজেই রড ব্যবহার করে এর বহন ক্ষমতা বাড়ানো যায় 
  • এই রাস্তার ওপর থেকে সহজে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা যায় 
  • সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা সাধারণত নন-স্লিপারি  হয়ে থাকে
  • এই রাস্তা রাতে ট্রাফিক চলাচলের জন্য সহজে দৃশ্যমান হয়
  • সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম।

অসুবিধাসমূহ

  • প্রাথমিকভাবে নির্মাণ খরচ বেশি
  • তাপমাত্রা বাড়া-কমার কারণে রাস্তার উপরিভাগে ফাটল সৃষ্টি হয়
  • যানবাহন চলাচলে ঘর্ষণজনিত কারণে সারফেস উঁচু-নিচু হয়ে যেতে পারে
  • লৌহার চাকাযুক্ত কোনো যানবাহন কিংবা যন্ত্রপাতি চলাচলে অস্বাভাবিক শব্দের সৃষ্টি হয়
  • সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা নির্মাণের জন্য দক্ষ জনবল এবং নিবিড় পরিদর্শন/পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে
  • বিটুমিনাস কিংবা ওয়াটাবাউন্ড ম্যাকাডম রাস্তার তুলনায় সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তার স্থিতিস্থাপকতা কম
  • রাস্তা নির্মাণ শেষে সুষ্ঠুভাবে কিউরিং করা নিশ্চিত করণার্থে দীর্ঘসময় রাস্তা বন্ধ করে রাখতে হয়।

সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ

সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা মেরামতের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অর্থাৎ ফাটল দেখা দেওয়া কিংবা ওরনড আউট হওয়া অংশটুকু আলাদাভাবে তুলে ফেলে আবার নতুনভাবে ঢালাই করে দেওয়া যায়। প্রসঙ্গত, ফাটল দেখা দেওয়া কিংবা ওরনড আউট হয়ে যাওয়া অংশটুকু তুলে পুরোনো সারফেসটিকে ভালোমতো পরিষ্কার করার পর সিমেন্ট গ্রাউটিং করা প্রয়োজন। অতঃপর নতুনভাবে কংক্রিট ঢালাই করে পর্যাপ্ত পরিমাণে কিউরিং করা নিশ্চিত করা দরকার।  

সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল ও যন্ত্রপাতির একটি তালিকা: 

কোর্স এগ্রিগেট হিসেবে ব্যবহৃত মালামাল

  • ওয়েল গ্রেডেড স্টোন চিপস 
  • ওভার বার্ন্ট ব্রিকস চিপস 
  • কঙ্কর ইত্যাদি।

ফাইন এগ্রিগেট ও বাইন্ডিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত মালামাল

  • বালু এবং
  • সিমেন্ট। 

যন্ত্রপাতি

  • লেভেলিং ইনস্ট্রুমেন্ট
  • কংক্রিট মিক্সার মেশিন
  • ফিনিশার মেশিন
  • ওয়াটার ট্যাঙ্ক ইত্যাদি।

পুনশ্চ, সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা নির্মাণকল্পে ব্যবহৃতব্য মালামাল এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করণার্থে কংক্রিট ঢালাইয়ের জন্য ব্যবহৃতব্য সিমেন্ট, বালু, খোয়া প্রতিটি কাঁচামালের নির্দিষ্ট একটি স্পেসিফিকেশন থাকে, যা যথাযথভাবে মেনে চলা অত্যাবশ্যক। ফলে, কংক্রিট ঢালাই করার আগে এসব মালামালের গুণগত মান যাচাই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকার ফিল্ড টেস্ট করা ছাড়াও কিছু ল্যাব টেস্ট করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে:

ল্যাব টেস্ট

  • খোয়া – গ্রেডিং এবং অ্যাব্রেশন টেস্ট
  • বালু – এফএম, ক্লে/সিল্ট এবং স্যালাইনিটি টেস্ট
  • সিমেন্ট – ফাইননেস এবং সেটিং টাইম ইত্যাদি।

এ ছাড়া কাজের গুণগত মান যাচাই করার জন্য কংক্রিটিং করার সময় কংক্রিটের স্যাম্পল নিয়ে তিনটি করে দুই সেট (২ X ৩) সিলিন্ডার তৈরি করে রাখা হয়, যা ৭ দিন এবং ২৮ দিন পর ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করার মাধ্যমে অত্র কংক্রিটের কমপ্রেসিভ স্ট্রেইন্থ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, মালামাল ও কাজের মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত ল্যাব টেস্টগুলো করানো অপরিহার্য একটি বিষয়।

সর্বশেষ, সিমেন্ট কংক্রিট রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল এবং নিবিড় পরিদর্শন/পর্যবেক্ষণের কথা আগই বলা হয়েছে। বিষয়টি অতীব জরুরি, ফলে নির্মাণকাজ শুরু করার আগেই প্রয়োজন অনুসারে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। নয়তো অত্র কাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল এবং কাজের গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ার আশঙ্কা থেকে যেতে পারে।

(চলবে)

ডিজিএম (কিউএ) অ্যান্ড এমআর 

দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্য, জানুয়ারী ২০১৯ 

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top