বিবি মরিয়মের মৃত্যুর পরে সমাধি স্থাপনার পাশে তাঁর পিতা বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর বাসনা ছিল এই মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে তাঁর কন্যার আত্মার শান্তি ও কল্যাণ কামনা করবে। এই মসজিদের উছিলায় মহান আল্লাহপাক তাঁর মেয়ের নাজাতের ব্যবস্থা করবেন। সেই সময়কাল ছিল মুঘল আমল। তাই নিঃসন্দেহে মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর পরিচয় বহন করে আসছে।
মসজিদ সম্পর্কিত দলিল
বিবি মরিয়ম মসজিদ সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত কিংবা কোনো বই বা নথিপত্রে মেলে না। যতটুকু তথ্য আছে তার কিয়দংশ মেলে বাংলাপিডিয়াতে। এখানে বাংলাপিডিয়াতে উল্লেখিত তথ্য হুবহু তুলে ধরা হলোÑ ‘বিবি মরিয়ম মসজিদ। নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ মহল্লায় অবস্থিত। এটি হাজীগঞ্জ মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি বাংলার মুঘল সুবাহদার শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৮৮) কর্তৃক নির্মিত বলে কথিত। অনতিদূরে একটি সৌধে সমাহিত এবং নবাব শায়েস্তা খানের কন্যা বিবি মরিয়মের নামে মসজিদটির নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির মধ্যবর্তী গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ। পার্শ্বদেয়াল পুরু করে গম্বুজের ভিত রচনা করে পার্শ্বগম্বুজ দুটোকে আকারে ছোট করা হয়েছে। কোনো কোনো মুঘল মসজিদে যে মধ্যবর্তী অর্ধগম্বুজ বসিয়ে এ কাজটি সম্পন্ন করতে দেখা যায়, এ মসজিদে সে রীতি অনুসরণ করা হয়নি। গম্বুজের নিম্নভাগের পত্রাকার অলঙ্করণ এবং সচ্ছিদ্র মারলন নকশায় প্রচলিত রীতি অনুসৃত হয়েছে। ছাদের উপরিভাগে শুধুমাত্র সম্মুখ দিকের প্যানেলেই পত্রাকার অলঙ্করণ রয়েছে। মসজিদের পূর্বদিকের সদরে আছে তিনটি খিলান প্রবেশপথ। প্রতিটি প্রবেশপথের উপরিভাগ অর্ধ গম্বুজাকৃতির। মধ্যবর্তী প্রবেশপথটি অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত। দক্ষিণ ও উত্তর দিকে একটি করে জানালা সম্ভবত পরবর্তী সময়ে নির্মিত। ইমারতের চার কোণে সন্নিহিত বুরুজ অনেকটাই দেয়ালে প্রোথিত এবং ছাদ-পাঁচিল ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বে সম্প্রসারিত। মসজিদের প্রধান হলঘরের পার্শ্বে রয়েছে সাদামাটা পার্শ্বখিলান। পার্শ্বদেয়াল পুরু করে পার্শ্ববর্তী স্তম্ভপথকে বর্গাকার করা হয়েছে। মসজিদটি বেশ কয়েকবার মেরামত ও পুনর্র্নির্মাণ করা হয়েছে। মেরামতের ফলে অনেকটাই অপসৃত হয়েছে মসজিদের আদি নির্মাণবৈশিষ্ট্য; বিশেষ করে চারকোণের চারটি সন্নিহিত বুরুজকে সম্পূর্ণ আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। পূর্বদিকের সদরে ইট নির্মিত স্তম্ভের ওপর টিনশেড বারান্দা নির্মাণের ফলে মসজিদের সম্মুখ দিকের অবয়ব সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে। মসজিদটি এখন জামে মসজিদ রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অবস্থান
মসজিদটি বিবি মরিয়ম সমাধি ও মসজিদ কমপ্লেক্সের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। মসজিদের প্রধান প্রবেশপথ পূর্বমুখী। পশ্চিমে অবস্থিত মসজিদের দুই পাশে রয়েছে প্রতিরক্ষা প্রাচীর। প্রতি দুই প্রতিরক্ষা প্রাচীর একটি বিন্দুতে বা কোণে মিলিত হয়েছে। এই কোণে রয়েছে একটি করে টরেন্ট। পূর্বদিকে রয়েছে মসজিদের শান। এই শানেই পরবর্তী সময়ে নতুন মসজিদ গড়ে তোলা হয়। মূলত মুঘল মসজিদের সঙ্গে লাগোয়া একটি আধুনিক মসজিদ, যা খুবই দৃষ্টিকটূ দেখা যায়।
নির্মাণ পরিকল্পনা
মুঘল আমলের অপরাপর মসজিদ বনাম বিবি মরিয়মের মসজিদ
মুঘল আমলের মসজিদের বহুল প্রচলিত বৈশিষ্ট্য হলো তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকার মসজিদ। বিবি মরিয়মের মসজিদটিও মুঘল আমলের। এই মসজিদের আকার আয়তাকার। ছাদে এক সারিতে অবস্থিত তিন গম্বুজের আসন মুঘল আমলের বহু মসজিদে এমন দৃষ্টান্ত মেলে। এমন ইসলামিক স্থাপনার মধ্যে আরও রয়েছে- ঢাকায় অবস্থিত মালিক আম্বরের মসজিদ (১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দ-১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ), ঢাকায় হাজী খাজা শাহবাজের মসজিদ (১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দ), খন্দকারটোলা মসজিদ (সতেরো শতকের প্রথমার্ধ), রাজশাহীর শাহ নিয়ামত উল্লাহ ওয়ালীর মসজিদ (সতেরো শতকের মধ্যভাগ), পুরান ঢাকার লালবাগ দুর্গ মসজিদ (সতেরো শতকের শেষার্ধ), খান মুহাম্মদ মৃধার মসজিদ (১৭০৬ খ্রিষ্টাব্দ), চট্টগ্রামে অবস্থিত কদম মুবারক মসজিদ (১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দ), মুসা খানের মসজিদ (আঠারো শতক), তারা মসজিদ (আঠারো শতক), নোয়াখালীর বজরা মসজিদ (আঠারো শতক), চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামির মসজিদ (আঠারো শতক) প্রভৃতি।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
বিবি মরিয়মের মসজিদের আকার
বিবি মরিয়মের মসজিদটি আয়তাকার। দৈর্ঘ্য ৪৯ ফুট ৮ ইঞ্চি, প্রস্থ ২৮ ফুট প্রায়। সম্পূর্ণ ক্ষেত্রফল প্রায় ১৩৯৪.৪ বর্গফুট। মসজিদের দেয়াল বেশ পুরু। পূর্ব-পশ্চিমের দেয়ালের পুরুত্ব ২ ফুট ১০ ইঞ্চি। উত্তর-দক্ষিণের দেয়ালের পুরুত্ব ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি প্রায়। অভ্যন্তরভাগের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪ ফুট, প্রস্থ প্রায় ১৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। ক্ষেত্রফল প্রায় ৬৯৫.২ বর্গফুট।
মসজিদের গাঠনিক উপাদান
বিবি মরিয়মের মসজিদটি ইটের তৈরি। তিনটি মিহরাবের সমন্বয়স্থলে রয়েছে পাথরের তৈরি স্তম্ভ। দরজাগুলো কাঠের তৈরি। এই মসজিদেও কোনো শিলালিপি নেই, তবে ভেতরে অনেক অলংকরণ রয়েছে। বিশেষত কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অধিকতর অলংকৃত। বলা চলে, এই সময়টিতে মসজিদটিতে অত্যাবশকীয় রঙের ব্যবহার মসজিদের অলংকরণশৈলীকে দৃষ্টিকটূ করে তুলেছে।
প্ল্যান বা নকশা
বিবি মরিয়মের মসজিদের নকশা আয়তাকার। এর প্রতি দুই বাহুর পরিমাপ সমান। পূর্ব-পশ্চিম বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৯ ফুট ৮ ইঞ্চি। উত্তর-দক্ষিণ বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ ফুট। মসজিদের উচ্চতা প্রায় ৩৩ ফুট ৩ ইঞ্চি।
প্রবেশপথ
মুঘল আমলের স্থাপনায় তিন দিক থেকেই প্রবেশপথের দেখা মেলে। বিবি মরিয়ম মসজিদের ক্ষেত্রেও তেমন। এর পূর্বদিকে তিনটা প্রবেশপথ বা খিলান রয়েছে। প্রবেশপথ অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত। উত্তর দিকে আরও একটি করে প্রবেশপথ রয়েছে। দক্ষিণে একটি করে খিলান সেই হিসেবে থাকার কথা কিন্তু বর্তমানে সেটি অনুপস্থিত। খিলানের পরিবর্তে রয়েছে প্রশস্ত দেয়াল। পূর্বে অবস্থিত তিনটি প্রবেশপথের মধ্যে কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি আকারে বড়। দৈর্ঘ্য ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। অপর দুই প্রবেশপথ আকারে ছোট হলেও পরিমাপ সমান। দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। উত্তর-দক্ষিণে প্রবেশপথের দৈর্ঘ্য ৪ ফুট প্রায়। প্রতিটি দরজার উচ্চতা ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি। প্রতিটা প্রবেশপথের পূর্ণাঙ্গ উচ্চতা ৯ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর মধ্যেই অর্ধবৃত্তাকার খিলান রয়েছে। দরজার দুই পাশে দুইটা কলামসদৃশ অর্ধকলাম রয়েছে। দরজার ওপরভাগে অর্ধবৃত্তাকার ভাগে ফুলের প্যাটার্ন রয়েছে। এটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর উদাহরণ ও প্রয়োগ।
উঁচু ভিত্তি
মসজিদ সামান্য প্রস্থবিশিষ্ট উচ্চতায় অবস্থিত। এই উঁচু ভিত্তির ভেদনযোগ্যতা প্রায় ২ ফুট ৬ ইঞ্চি। কমপ্লেক্সে অবস্থিত অপরাপর স্থাপত্যের ন্যায় এই স্থাপনার মাটি থেকে উচ্চতা অনেক বেশি।
দেয়ালের ভেদনযোগ্যতা
মসজিদের দেয়ালের থিকনেস বা ভেদনযোগ্যতা প্রায় ২ ফুট ৬ ইঞ্চি।
মিহরাব
বিবি মরিয়মের মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালে তিনটা মিহরাব রয়েছে। এই মিহরাব তিনটি একই সমান্তরালে অবস্থিত। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পার্শ্ববর্তী মিহরাব দুইটা থেকে আকারে বড়। মিহরাবসমূহ আদি অবস্থায় মুঘল অলংকরণে অলংকৃত ছিল। বর্তমানে এই অলংকরণ নিশ্চিহ্ন করে টাইলস লাগানো হয়েছে, যা মিহরাবটিকে দেখতে অনেকটাই দৃষ্টিকটূ করে তুলেছে।
মিম্বার
মুঘল আমলের অপরাপর মসজিদগুলোতে মিহরাবের পাশাপাশি মিম্বার দেখা যেত। কিন্তু এই মসজিদটিতে কোনো মিম্বারের অস্তিত্ব নেই।
মিনার
মসজিদের চারপাশে চারটা মিনার রয়েছে। মিনারগুলোর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতায় একই পরিমাপবিশিষ্ট। মিনারের ওপরে কপুলাশোভিত রয়েছে। মিনার ও মিনারের ওপরে কপুলা এই ধরনের রীতি মুঘল আমলের অপরাপর মসজিদগুলোতেও কমবেশি দেখা যায়। তবে বিবি মরিয়ম মসজিদটিতে বর্তমানে এই মিনারগুলো ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পূর্বকোণে আজান দেওয়ার জন্য নতুন করে আরও একটি মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।
গম্বুজ
মসজিদের ছাদে তিনটা গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজ তিনটা একই শ্রেণিতে অবস্থিত। এই ধরনের তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ মুঘল আমলেই দেখা যেত বেশি। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি দুই পাশের গম্বুজ থেকে আকারে একটু বড় আকৃতির, তবে পরিমাপ সমান। গম্বুজের গাত্রবর্ণ বর্তমানে কটকটে সবুজ রং করা। মসজিদেও ভেতরে অর্থাৎ, গম্বুজের ভেতরের দিকে নিচের অংশে টাইলস বসানো ও ওপরের অংশে সাদা পলেস্তারা করা। গম্বুজ তিনটা অষ্টভুজাকৃতি ড্রামের ওপরে বসানো রয়েছে।
অন্ধমারলন
মসজিদের ছাদে তিন গম্বুজের অষ্টভুজাকৃতি ড্রামের চারপাশে অন্ধ মারলন বৃত্তীয়ভাবে বসানো রয়েছে। প্রতিটা মারলনের দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে এক। বর্তমানে মারলনগুলো সাদা রং করা। গম্বুজের চারপাশে এই অন্ধমারলনের উপস্থিতি মুঘল স্থাপত্যবৈশিষ্ট্যের এক অনন্য মাধ্যম।
পদ্ম
তিন গম্বুজের ওপরে ওলটানো পদ্ম বসানো হয়েছে। এই ওলটানো পদ্ম বৃত্তীয়ভাবে বসানো হয়েছে।
কলসচূড়া
ওলটানো পদ্মের ওপরে কলসচূড়া বসানো হয়েছে। এই কলসচূড়া ক্রমহ্রাসমান। ওলটানো পদ্মের ওপরে ক্রমহ্রাসমান কলসচূড়ার ব্যবহার মুঘল স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য।
পলেস্তারা
মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য দেয়ালের ওপর পলেস্তারা। বিবি মরিয়মের মসজিদটিও মুঘল স্থাপত্যশৈলী রূপে ব্যতিক্রম নয়। এই মসজিদের সমগ্র দেয়াল ও গম্বুজ পলেস্তারা করা। বর্তমানে নানাবিধ রঙের ব্যবহার দেখা গেলেও একসময়ে পলেস্তারা করা অংশটাই প্রধান বা মুখ্য ছিল। বর্তমানে, এই মসজিদের ভেতরের দিকে অনেক অংশে টাইলসের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যা মসজিদটিকে করে তোলে খুবই দৃষ্টিকটু।
অর্ধবৃত্তাকার খিলান
মসজিদে তিন দিকে খিলান রয়েছে। এই খিলান আবার বহু খাঁজবিশিষ্ট সুচালো রীতির। মসজিদের পূর্ব দিকের বাহুতে অর্থাৎ, সামনের দিকে তিনটা করে অর্ধবৃত্তাকার খিলান রয়েছে। দুই পাশে অর্থাৎ, উত্তর-দক্ষিণ দিকে একটা করে খিলান রয়েছে। প্রতিটা খিলানের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ ফুট ১ ইঞ্চি।
প্যানেল
প্রতিটা এলিভেশনের আরেকটা বিশেষত্ব হলো, দেয়ালে ছোট-বড় অসংখ্য প্যানেলসমৃদ্ধ। মাঝের তিনটি খিলানের ওপরে বড় আকারের একটি প্যানেল রয়েছে। দুই পাশে আড়াআড়িভাবে একটা করে প্যানেল রয়েছে। কেন্দ্রীয় তিনটি খিলানের দুই পাশে আরও দুইটা খিলান রয়েছে। এই খিলানের উপরিভাগে বড় আকারের প্যানেল রয়েছে। খিলানের ডানে ও বামে প্যানেল রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণ দিকের খিলানের ওপরে ও দুই পাশেও প্যানেল বিদ্যমান।
কার্নিশ
ছাদের কার্নিশ মুঘল আমলকে প্রকাশ করে। কার্নিশটি সরল আকারের। নেই কোনো বক্রতা।
মারলন
ছাদের কার্নিশের চারদিকে অহৃমারলনের উপস্থিতি দেখা যায়। কার্নিশের উপরিভাগে ছোট ছোট অসংখ্য মারলন রয়েছে। মারলনগুলো সম-আকৃতির। এই ধরনের মারলন ক্রমান্বয়ে সিরিজ আকারের। মারলনের সংখ্যা অনেক। প্রতিটা মারলন দেখতে একই আকারের। গম্বুজের চারদিকে অষ্টভুজাকৃতি ড্রামের ওপরেও অন্ধমারলনের উপস্থিতি দেখা যায়। এই ধরনের মারলনের উপস্থিতি থাকাটা মুঘল স্থাপত্যশৈলীর দৃষ্টান্ত।
মসজিদের অলংকরণ
বিবি মরিয়মের মসজিদের অলংকরণের অবশিষ্ট এখন আর বাকি নেই। বারবার নবায়ন ও সংস্কারের ফলে এই মসজিদের আদিরূপ নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। এমনকি আদি অলংকরণেও যথেচ্ছ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এই মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মসজিদের প্রাচীনত্ব যতটুকু চোখে পড়ে। বাইরের দিক থেকে দেখলে একটি নতুন মসজিদের আদল প্রাচীন মসজিদটিকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে রয়েছে বা গ্রাস করে আছে। মসজিদের বাইরে থেকে দেখার মতো যতটুকু প্রাসঙ্গিক অংশ আর তা হলো মূল মসজিদের প্রাচীন গম্বুজ। মসজিদের ছাদে তিন-তিনটা গম্বুজ। গম্বুজ তিনটি অষ্টভুজাকৃতি ড্রামের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। ড্রামের চারধারে মুঘল অলংকরণ অর্থাৎ, অন্ধমারলন রয়েছে। তা ছাড়া গম্বুজের চূড়ায় রয়েছে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য উদাহরণ পদ্ম ও ক্রমহ্রাসমান কলসচূড়া। এই কলসচূড়া দেখতে অনেকটা মানবদেহের আকৃতির মতো। মসজিদের বাইরের দেয়ালের অলংকরণের কিছুই রাখা হয়নি। ধারণা করা হয়, সমাধি স্থাপনা, অভ্যর্থনাগার ও তোরণদ্বারের বাইরের দেয়ালে যেমন মুঘল প্যানেলের ক্রমবর্ধমান কাজ ছিল, তেমন কাজ এই মসজিদের দেয়ালেও ছিল, যা বর্তমানে নেই। মসজিদের ভেতরের অংশে অনেক কুলুঙ্গির ব্যবহার ছিল, যা এখন আর চোখে পড়ে না। ঢেকে আছে কালের করালগ্রাসে। মসজিদের পূর্বদিকের প্রবেশপথ ছাড়াও উত্তর-দক্ষিণ দিকে আরও দুইটা প্রবেশপথ ছিল, যা এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের সামনের যে বারান্দা বা শান ছিল, তাতে নতুন মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। স্থাপত্যশৈলীর দিক দিয়ে দেখতে খুবই নাজুক এর চেহারা। তা ছাড়া পূর্বদিকে অজুখানা নির্মাণ করা হয়েছে। মুঘল আমলের যেরূপ বৈশিষ্ট্য আজ থাকার কথা ছিল তার পুরোটাই এখানে বিলুপ্ত।
নবায়ন ও সংস্কার
আদি অবস্থায় বিবি মরিয়ম মসজিদ
আদি অবস্থায় বিবি মরিয়ম মসজিদ ছিল মুঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- শুরু থেকেই তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। খুবই জাঁকজমক ও চাকচিক্য ধরনের গম্বুজ। গম্বুজে রয়েছে বিস্তর অলংকরণ, রয়েছে মারলনের উপস্থিতি। গম্বুজের বহির্ভাগে ও অভ্যন্তরভাগে মারলনের উপস্থিতি রয়েছে।
- মসজিদ ও মসজিদসংলগ্ন অপরাপর মুঘল স্থাপত্য অর্থাৎ সমাধি, অভ্যর্থনাগার, তোরণদ্বার ও প্রতিরক্ষা প্রাচীরের সহাবস্থান।
- আদি অবস্থায় বারান্দা ছিল, যা মুঘল স্থাপত্যকলার শান নামে পরিচিত।
- মসজিদ ও মসজিদসংলগ্ন অপরাপর স্থাপত্যের মধ্যে রাস্তা ছিল। চারপাশে প্রচুর ফুল-ফলগাছ শোভিত ছিল।
- মূল প্রবেশপথ ছাড়াও উত্তর-দক্ষিণ দিক থেকেও মসজিদে প্রবেশ করার পথ ছিল।
মুঘল আমলে বিবি মরিয়ম মসজিদের বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ইট নির্মিত মসজিদের দেয়ালের ওপরে পলেস্তারা করা হয়। বাইরে থেকে যে ইটের উপস্থিতি দেখা যেত, তা মুঘল আমলে পলেস্তারার প্রলেপে ঢাকা পড়ে।
- মসজিদের বহির্ভাগের চতুর্দিকের দেয়ালের প্যারাপেটে যে বক্রভাব ছিল তা পরিহার করা হয়। প্যারাপেট সরলীকরণ এই মুঘল আমলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
- তা ছাড়া মসজিদের বহির্ভাগের চতুর্দিকের দেয়ালে যে সামান্য কার্নিশ ছিল, তা নিশ্চিহ্ন করা হয়।
- প্যারাপেটের ওপরে যে অন্ধমারলন দেখা যায়, সেগুলোতে পলেস্তারা করা হয়।
- গম্বুজের চারপাশে যে অন্ধমারলন যুক্ত করা হয়, তার ওপরে ওলটানো পদ্ম বসানো হয়।
- ওলটানো পদ্মের ওপরে কলসচূড়া বসানো হয়। এই চূড়ার শৃঙ্গ পিতলের তৈরি।
- গম্বুজের চারপাশে ও অভ্যন্তরে মারলন যুক্ত করা হয়।
সময়ের প্রেক্ষাপটে আদি মসজিদের পরিবর্তন
বাংলাদেশের অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মতো এই স্থাপনাটিও নিজের অস্তিত্বসংকটে ভুগছে। মানুষের পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য অদম্য লড়াই করে চলেছে। যদি কোনোভাবে একটু করে হলেও মানুষের সহমর্মিতা ও সাহায্যের নাগাল পায়, তবেই না সে বেঁচে যায়। বর্তমানে আদি মসজিদ ও তারসংলগ্ন বারান্দার সঙ্গে আরেকটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। বলা চলে, নতুন মসজিদটি আদি মসজিদকে চারপাশ থেকে এমন করে ঘিরে রেখেছে যে এতটুকু আলো চলাচলের সুবিধা নেই। স্থানীয় মসজিদ কমিটির লোকজনদের মূর্খ মনমানসিকতার বেড়াজালে বন্দী। তারা আদি মসজিদের পর্যাপ্ত সম্মানটুকুও দিতে ব্যর্থ। রক্ষণাবেক্ষণের নামে তারা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাইরে থেকে ফটো নেওয়ার মতো সামান্যটুকু জায়গাও অবশিষ্ট রাখেনি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো অন্ধ সেজে বসে আছে আজ।
বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মসজিদের পুনর্জীবন লাভ
আদি মসজিদকে উপেক্ষা করে মসজিদের লাগোয়া নতুন মসজিদ নির্মাণ মোটেও কাম্য নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের নিয়ম ও রীতিবিরুদ্ধ এই কাজ। মসজিদ ধর্মীয় স্থাপত্য নিদর্শন। অনেক সময় ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে মসজিদের নবায়ন, পরিবর্ধন, সম্প্রসারণ ও সংযোজন করা হয়েছে। কখনো অধিক লোকের স্থানসংকুলানের জন্য মসজিদ সম্প্রসারণ করে মূল মসজিদের ক্ষতি সাধন করা হয়, ফলে প্রাচীন ঐতিহ্যের অনেকটাই বিলুপ্তি ঘটে। তাই বলে এই ধরনের কাজের দোহাই দিয়ে একশ্রেণির সুবিধাবাদী, সুবিধাভোগী ও কাঠমোল্লাদের প্রশ্রয় দিয়ে ঐতিহ্যের বিনষ্টকরণ মোটেও কাম্য নয়। এ ক্ষেত্রে প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের নিয়মকানুনের যথার্থ প্রয়োগ ঘটিয়ে ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার ও দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান জরুরি। সমসাময়িককালের অন্যান্য স্থাপনাগুলোর মতো মরিয়ম মসজিদ এতটা ভগ্ন অবস্থায় পতিত হয়নি। মসজিদের গাঠনিক উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মসজিদের চারকোণে যে জোড় প্রস্তরস্তম্ভ রয়েছে, তা ইমারতের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে। মসজিদের গাঠনিক উপাদান ইট হলেও তিন মিহরাবের সংযোগস্থলে যে পাথরস্তম্ভ বসানো হয়েছে, তাও এই মসজিদের স্থায়িত্ব বাড়ায়। এমনিতে বিবেচনাহীন সংস্কারের কারণে এই মসজিদের অলংকরণের বহু ক্ষতি সাধিত হয়। মুঘল আমলে এই মসজিদের যতটুকু পরিবর্তন হয় তা কেবল এর সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করে। তবে বর্তমানে এই মসজিদের অনেকাংশের পলেস্তারা, রং, বৈচিত্র্যে বেশ খারাপ অবস্থা রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই ধর্মীয় স্থাপনার সংরক্ষণ জরুরি।
সাইট পর্যবেক্ষণ করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও প্রস্তাবিত সমাধান
সাইট সমস্যা ০১
বিবি মরিয়মের মসজিদের আদি নকশা ও বর্তমান নকশার মধ্যে গভীর পার্থক্য লক্ষ করা যায়। আদি নকশা অধ্যয়ন করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে তিন দিকেই প্রবেশপথ ছিল। পশ্চিম দিকে ছিল মিহরাব ও মিম্বার। পরবর্তী সময়ে এই মসজিদের ভূমি নকশায় অনেক পরিবর্তন আনা হয়। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা মোটেও ঠিক কাজ হয়নি।
সাইট সমস্যা ০২
দেয়ালের পলেস্তারা খসে আদি মসজিদের গাঠনিক উপাদান ইট দেখা যাচ্ছে। বাইরের দেয়ালে পলেস্তারা খসে পড়ার পরিমাণ সর্বাধিক ছিল। পরবর্তী সময়ে টাইলস করে মসজিদের চেহারা পরিবর্তন করা হয়, যা মোটেও কাম্য নয়।
সাইট সমস্যা ০৩
মসজিদের গম্বুজ ও ছাদের প্যারাপেটে যে মারলন সুশোভিত আছে, সেগুলোতে বাইরের আর্ক অংশে সাদা চুনকাম করা ছিল ও মাঝের অংশে লাল পলেস্তারা করা ছিল। কিন্তু আবহাওয়া ও জলবায়ুগত কারণে এই রং উঠে গিয়ে বিবর্ণ ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে সবুজ রং করে এই চেহারার পরিবর্তন করা হয়।
সাইট সমস্যা ০৪
মসজিদের উপরিভাগের অনেকাংশে কিছু কিছু অংশ ভেঙে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। যেমন মসজিদের চারকোণে যে স্তম্ভগুলো রয়েছে, সেগুলোর উপরিভাগের তিরের ফলার মতো অংশগুলো ভেঙে, হারিয়ে বা চুরি গেছে। উল্লেখ এই ফলাগুলো পিতলের তৈরি।
সাইট সমস্যা ০৫
মসজিদের সবদিকে টাইলসের ব্যবহার দৃশ্যনীয়, যা মসজিদটিকে দেখতে দৃষ্টিকটু করে তুলেছে।
পুনর্র্নির্মাণ, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ
পুনর্র্নির্মাণ, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এই কাজগুলো সরকার, মন্ত্রণালয়, প্রতœতত্ত¡ বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সংস্থাগুলো দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক বিবি মরিয়ম মসজিদ ইতিমধ্যে তার মূল অস্তিত্ব ও আবেদন হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের নজরের আড়ালে ঢাকা পড়েছে এই মসজিদ। নচেৎ এই মসজিদ টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হতো না। মুঘল আমলের অনবদ্য দৃষ্টান্ত এই মসজিদ। এই মসজিদটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে দেশীয় পদ্ধতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করা দরকার। যেন আমরা খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারি কোনটা আদি মসজিদ, কী এর বর্তমান অবস্থা? পুনর্র্নির্মাণ, সংরক্ষণের কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এর রক্ষণাবেক্ষণের দিকেও নজর দিতে হবে। একদিন বা সাময়িক উন্নয়নে এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ অসম্ভব। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ টিকিয়ে দিতে পারে এই মসজিদকে।
উপসংহার
ঐতিহাসিক কোনো স্থাপনাকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু ওই স্থাপনার সংরক্ষণ ও সংকলন পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে হবে না বরং উপর্যুক্ত স্থাপনার জন্য যথেষ্ট মান বৃদ্ধি করতে হবে। এই ধরনের মান হবে ঐতিহ্যগত মান, যা সার্বিকভাবে ঐতিহ্যের জন্য কাজ করবে। ঐতিহ্যের সার্বিক দিক এতে করে যেমন বিবেচিত হবে, পাশাপাশি এই ঐতিহ্যের গুরুত্বও বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটা ঐতিহ্যের মান বজায়ের পাশাপাশি তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কীভাবে কাজ করবে সে বিষয়েও যথেষ্ট নজরদারি প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে এই নিদর্শনকে একটি মাস্টার পিস হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এই মাস্টার পিস মসজিদের সংরক্ষণ ও সংকলনের জন্য যত ধরনের নিয়মকানুনসহকারে সব ধরনের নীতি ও কৌশলগত দিকের প্রতি আলোকপাত করবে।
পাশাপাশি জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। জনসাধারণকে অবশ্যই বুঝতে হবে একটি হেরিটেজ সাইট কী? এর প্রতি সর্বসাধারণের কীরূপ আচরণ করা সম্ভব? এসব আর-কী? একটি হেরিটেজ সাইটের প্রতি আমাদের দেশে জনসাধারণের ধারণা বা উপলব্ধি অনেকটাই হরর থিমের চাঞ্চল্যকর স্থানের মতোই, যা দিনের শেষে রাতের আঁধারের সঙ্গে মিলেমিশে বন্ধ হয়ে গিয়ে এক আত্মঘাতী স্থানের আবহ পেশ করে। তাই সাধারণের আচরণগত মানসিকতার একটা আমূল পরিবর্তন দরকার।
ঐতিহাসিক কাঠামোর পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য পুনর্নির্মাণকাজের জন্য পেশাদার এবং বিশেষজ্ঞদের ভারসাম্যসহকারে প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: বিবি মরিয়মের মসজিদ সম্পর্কে দলিল, বিবি মরিয়মের মসজিদ, বাংলাপিডিয়া তথ্যভান্ডার।
বিবি মরিয়মের সমাধি ও মসজিদ কমপ্লেক্স
বিবি মরিয়মের সমাধি ও মসজিদ কমপ্লেক্সের প্ল্যান অথবা, বিবি মরিয়মের কেল্লা
বিবি মরিয়মের মসজিদসংলগ্ন বর্ধিত নতুন মসজিদ স্থাপনা
বিবি মরিয়ম মসজিদের প্ল্যান বা নকশা
প্রবেশপথের ড্রয়িং
বিবি মরিয়মের মসজিদের এলিভেশন
বিবি মরিয়মের মসজিদের গম্বুজ
বিবি মরিয়মের মসজিদের গম্বুজে অন্ধমারলনের ব্যবহার
বিবি মরিয়মের সমাধি ও মসজিদ কমপ্লেক্স
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৯তম সংখ্যা, মে ২০২১