শিশু বিকাশ কেন্দ্র
শিশুর বিকাশ হয় যেখানে

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে চাই খেলাধুলা ও বিনোদন। দরকার প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যও। কিন্তু নগরের স্কয়ারফিটে বন্দী শিশুরা এর কতটা পাচ্ছে? খেলাধুলা বা মনের খেয়ালে সৃষ্টির উন্মাদনায় মাতার সুযোগ তাদের নেই। কিন্তু শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য এমন সব ব্যবস্থা থাকা দরকার, যেখানে স্বল্প পরিসরে মিলবে সবকিছু। ভাবনাটা ভাবায় স্থপতি শাহিদা শারমিন দিশাকেও। এ ভাবনারই সফল রূপকল্প ‘অনুপ্রেরণা ও সম্ভাবনা অন্বেষণের স্থান’ নামক প্রকল্পটি। যেখানে শিশুরা একই সঙ্গে খেলবে, ঘুরবে আর শিখবে। শুধু তা-ই নয়, যার মূল বিষয় ছিল শিশুর উপযোগী রিসোর্স সেন্টার ডিজাইন, যা একবিংশ শতাব্দীর শিশুদের জ্ঞানের আলোয় করবে আলোকিত। বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশ শিক্ষা হবে এ মাধ্যমে আনন্দের বড় উপলক্ষ, যা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে ঐতিহ্যবাহী দেশীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তি সংরক্ষণে। প্রকল্পটির ডিজাইনার স্থপতি শাহিদা শারমিন দিশা বুয়েটের শিক্ষার্থী থাকাকালীন ডিজাইনটি করেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আর্কেশিয়া স্টুডেন্ট ডিজাইন কম্পিটিশন-২০১০-এ প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মডেল

প্রকল্পের উদ্দেশ্য
প্রকল্পটিতে ‘চিলড্রেন রিসোর্স সেন্টার’কে কল্পনা করা হয়েছে অনুপ্রেরণার অনন্ত উৎস হিসেবে। যেখানে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালানো হবে নতুন নতুন সম্ভাবনা, সচেতনতা, উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা সৃষ্টির লক্ষ্যে। প্রকল্প প্রস্তাবনার মূল উদ্দেশ্য ছিল আনন্দদায়ক ও অনুসন্ধানী পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার নানামুখী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে; তাদেরকে বাইরের পরিবেশ ও নিজেদের ভেতরের সম্ভাবনা আবিষ্কার ও উপলব্ধিতে সহায়তা করা।

প্রকল্পের স্থান
প্রকল্পটি নির্মাণে স্থান বা সাইট নির্ধারণ করা হয় ঢাকার ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ফার্মগেটের বহুল পরিচিত পার্ককে। প্রতিদিন নানা বয়সের ও ধরনের মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে জায়গাটি। পার্কের আশপাশে রয়েছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর তাই আশপাশের মানুষজন ছাড়াও এখানে ভিড় লেগে থাকে শিশু-কিশোরদের। কিন্তু তাদের বয়স ও মননের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধাই নেই পার্কটিতে। তা ছাড়া পার্কে ঘটা নানা রকম অসামাজিক ও পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপ শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ফেলছে বিরূপ প্রভাব। আর তাই এলাকাটিতে ‘চিলড্রেন রিসোর্স সেন্টার’ তৈরির প্রস্তাবনা রাখা হয় সম্ভাবনা উন্মোচনের উপায় হিসেবে, যা সুস্থ-সুন্দর কর্মচাঞ্চল্য পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে শিশু-উপযোগী আনন্দময় পরিবেশের সূত্রপাত ঘটিয়ে কোমলমতি শিশুদের শেখার প্রক্রিয়াকে করবে উদ্দীপ্ত।

প্রকল্পের বিভিন্ন আঙ্গিক

যাদের ঘিরে প্রকল্পটি
এলাকাসংলগ্ন ৮-১২ বছর বয়সী শিশুরা প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনার অংশ। যে শিশুরা বেড়ে উঠছে জটিল ও সংগ্রামী আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে। অধিকাংশই লেখাপড়ার প্রাথমিক সুযোগটুকু ছাড়া শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা জানে না নিজেদের সম্ভাবনা ও সামর্থ্য সম্পর্কেও। অথচ শারীরবৃত্তীয় বিকাশের এই স্তরে শিশুদের চিন্তাধারায় যুক্তি ও সংঘবদ্ধতা বিকাশ লাভ করায় একই সঙ্গে একাধিক কাজে নিয়োজিত হওয়ার সক্ষমতা বাড়ে। আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারার প্রাধান্য কমে গিয়ে তৈরি হতে থাকে সামাজিকতার বোধ। বয়সটি শিশুদের অনুসন্ধানী করে এসব ভাবনায় পরবর্তী সময়ে প্রকল্প ডিজাইনে মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

ভিন্নতা যেখানে
প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে ডিজাইনটিতে চেষ্টা করা হয়েছে কতগুলো চতুস্তলক নিয়ে কাজ করার। যারা একসঙ্গে নানারূপে সংযুক্ত ও একীভূত হয়ে স্থান বা স্পেস তৈরি করে। এ ধরনের ত্রিমাত্রিক বহিঃপ্রকাশ বেছে নেওয়ার নেপথ্যে ছিল- এমন কতগুলো সম্ভাবনাময় ঘটনার সূচনা করা, যেগুলো শিশুদের কল্পনাশক্তির উন্মেষ ঘটিয়ে সাহায্য করবে তাদের নিজেদের ও চারপাশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে। আর এ সবকিছুই ঘটবে আনন্দ আর খেলাধুলার মাধ্যমে।

কেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশের নকশা

যা আছে প্রকল্পে
প্রকল্পটিতে রয়েছে তিন ধরনের স্পেস বা স্থান ডিজাইনের প্রচেষ্টা। মিথোস্ক্রিয় স্থানান্তর, মগ্নচিন্তাশীল মিথোস্ক্রিয় ও অংশগ্রহীতার স্তর।  প্রথম স্তরটির অবস্থান মাটির ওপরে, যা তৈরি হয়েছে অনেক চতুস্তলকীয় কাঠামোর সমন্বয়ে। এই স্তরটিতে রয়েছে লবি, পরিচালনাকারীর অফিস, ক্যাফে ও প্রদর্শনীর স্থান, যা শিশুদের নিজের মধ্যে ও পরিবেশের সঙ্গে আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করে তাদের করে তোলে সামাজিক। স্থানান্তরিত স্তরটি ধারণ করে সেই জায়গাগুলো, যেখানে এই স্বচ্ছ ও অর্ধ স্বচ্ছ চতুস্তলকীয় কাঠামোগুলো রূপান্তরিত হয়ে নিরেট ফর্মের আকার ধারণ করে মাটির নিচে প্রবেশ করতে শুরু করে। এই স্পেসগুলোতে রয়েছে মূলত মাটির ওপর থেকে নিচের স্তরে যাওয়ার সিঁড়ি। মগ্ন-চিন্তাশীলতার স্তরটিতে রয়েছে লাইব্রেরি, অডিও-ভিজুয়াল গ্যালারি ও স্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষ। স্তরটি আংশিকভাবে মাটির নিচে স্থাপিত যেন তা বাইরের ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ থেকে আলাদা হয়ে একটি শান্ত জগতে শিশুদের একাগ্র ও মনোযোগী হতে সাহায্য করে।

প্রকল্পটির প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল, যেন তা নানাভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। চতুস্তলকগুলোর দ্বারা তৈরি করা নানামাত্রিক আগ্রহোদ্দীপক ও অনুসন্ধানী স্পেস শিশুদের সৃষ্টিশীলতায় উদ্বুদ্ধ করে শুধু তা-ই নয়, তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাগুলোকে আবিষ্কার করে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিতে শেখে ও অবচেতনভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোর ওপর লাভ করে দক্ষতা। চতুস্তলকীয় কাঠামোগুলোর স্বচ্ছ থেকে নিরেটে রূপান্তর ও সৃষ্ট সব আলো-ছায়ার খেলা, মাটির ওপর ও নিচের স্পেস এ সময়ের সঙ্গে আলো, বাতাস ও রঙের তারতম্য এ সবকিছুই শিশুদের নানামুখী উপলব্ধি অর্জনের পথে পরিচালিত করে। প্রকল্পটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রস্তাবনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই চেষ্টা করা হয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে শিশুদের আত্মিক বন্ধন গড়ে তোলার, যা থেকে তারা অবচেতনভাবেই বুঝতে পারে বাস্তুসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব দিকগুলো সম্পর্কে।

শিশু বিকাশকেন্দ্র প্রাঙ্গণ

প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুষঙ্গ
প্রকল্পটি নির্মাণে প্রাধান্য পেয়েছে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার। বাঁশ, কাঠ ও কংক্রিটের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে কার্বন ফুটপ্রিন্টের পরিমাণ কমানোর। স্থানীয় নির্মাণকৌশল ব্যবহারের প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। বৈচিত্র্যময় ল্যান্ডস্কেপ ও প্রাকৃতিক জলাশয় একদিকে যেমন অনুমোদিত শব্দের মাত্রা, বাতাসের গুণমান, স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে পরিসরের ভেতরে একটি আরামদায়ক মাইক্রো-ক্লাইমেট তৈরি করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোলজিক্যাল সিস্টেম বিকাশকে করে অনুপ্রাণিত। 

স্থাপনার অবস্থান নির্ণয়, জানালার অবস্থান ও ধরন ও অন্য নানা বিষয় স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি সূর্যের বিকিরণের কারণে উদ্ভূত তাপকে রাখে নিয়ন্ত্রণে। সাইটের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে প্রস্তাবিত বাঁশঝাড়টি শুধু ডিজাইনের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক, বৃদ্ধি ও রূপান্তরকেই নির্দেশ করে না, এটি প্রকল্পের পরবর্তী স¤প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাঁচামালেরও জোগান দেয়। খেলার মাঠের পাশের প্রস্তাবিত নিচু জমিটি বর্ষাকালে রূপান্তরিত হয় অগভীর প্রাকৃতিক জলাশয়ে, পরবর্তী সময়ে যার পানি আবার শুকিয়ে যায় সূর্যের তাপে কিংবা মাটির বিশোষণে। আর এভাবে যা হয়ে ওঠে শিশুদের জন্য পানিচক্রের একটি ব্যবহারিক প্রদর্শন; একই সঙ্গে নিত্যনতুন খেলার জায়গা। অত্যন্ত সহজ নির্মাণকৌশল; ছোট ছোট মডিউল যোগ করে কাঠামোটিতে আনা যায় অবিরাম রূপান্তর। আর এভাবে শিশুরা স্থাপনাটির শুধু ব্যবহারকারী নয়, বরং হয়ে ওঠে সৃজনশীল অংশীদার। 

প্রকল্পের নকশা

পরিচিতি
স্থপতি শাহিদা শারমিন দিশার বাবা শহীদুল হক। মা আমাতুল আজিজ মিনা। দিশার বেড়ে ওঠা ঢাকায়। মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি হায়ার সেকেন্ডয়ারি গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে। এখানে পড়াকালীন ও পরে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক দেশি-বিদেশি ডিজাইন প্রতিযোগিতায় পেয়েছেন সম্মানজনক পুরস্কার। 

তানজিনা আফরিন ইভা

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৮ তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৪

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top