দ্বীপে ভাসমান ইয়ট

ইয়টে ভাসমান দ্বীপ

ডাচ শব্দ ইয়াখ্ৎ শব্দটির অর্থ শিকার (Hunt) হলেও বর্তমানে এর প্রতিশব্দ ‘ইয়ট’। শব্দটির সঙ্গে শিকার বা শিকারির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এখন ইয়ট শব্দটি শুনলেই মনের মাঝে ভেসে ওঠে এক বিলাসবহুল প্রমোদতরির দৃশ্য। কিন্তু কারও মনে কোনো দ্বীপের দৃশ্যপট ভাসবে বলে মনে হয় না। তবে যে দৃশ্যই ভেসে উঠুক না কেন, ‘ককোমো আইল্যান্ড’ নামের ইয়টটি যে সত্যিই একটি ভাসমান দ্বীপ তাতে কোনো সন্দেহ নেই! অস্ট্রিয়ার জাহাজ নির্মাতা কোম্পানি মিগালু এই বিলাসবহুল সুপার ইয়টটি তৈরি করেছে সম্পূর্ণ একটি দ্বীপের আদলে।

ইয়টভেদে বিভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য ও সুযোগ-সুবিধা থাকতে পারে। হয়তো অনেক ইয়টে সুইমিংপুল থেকে শুরু করে ব্যায়ামাগার, সিনেমা হল, ভিআইপি সুইট, একক কেবিন, ডাবল কেবিন, হোটেল সুইট, সুপরিসর ডাইনিংসহ রয়েছে অনেক কিছুই। কিন্তু কিছু কিছু সুপার ইয়টের এমন বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যার কারণে এটি মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

যেমন ধরা যাক ‘সানবর্ন জিব্রাল্টার’-এর কথা। এটা বিশ্বের প্রথম সুপার ইয়ট ক্যাসিনো হোটেল। চীন থেকে আসা সোমালি জলদস্যুদের একটি পণ্যবাহী জাহাজে তৈরি এটি এবং এখনো এই ইয়টটির গায়ে লেগে আছে কিছু বুলেটের চিহ্ন; এমন দাবি কেউ কেউ করলেও এটিকে ২০১৩ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়ার একটি শিপইয়ার্ডে বিশ্বের প্রথম বিলাসবহুল ‘ইয়ট হোটেল’-এ রূপ দেওয়া হয়। জিব্রাল্টার সাগরের তীরবর্তী গ্রাম মারিনার কাছে এখন স্থায়ীভাবে ইয়টটি রাখা। এর পেছনে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ফুটের বিশাল একটি প্রাকৃতিক শিলাখন্ড। এই শিলাখন্ডটি প্রাকৃতিকভাবেই আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে ইয়টটিকে রাখে নিরাপদ, আর পাশের জঙ্গলে রয়েছে কিছু বানর, তাদের মজার মজার অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ অতিথিদের বিশেষভাবে বিনোদিত করে। সাততলাবিশিষ্ট ১৫ হাজার ৫০০ বর্গমিটার জায়গাসমৃদ্ধ এই ইয়টটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ১২০ মিলিয়ন পাউন্ড।

ককোমা আইল্যান্ড, অস্ট্রিয়া

আবার যদি ১৮০ মিটার দীর্ঘ ‘আজজাম’ ইয়টের কথা বলি, জার্মানির লারসেন কোম্পানির তৈরি এই ইয়টটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের দীর্ঘতম ইয়ট। এই ইয়টটির টেকনিক্যাল কিছু তথ্য ও ফ্রান্সের রাজকীয় নির্মাণশৈলীর ইন্টেরিয়র ছাড়া তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অনুমান করা হয় যে ২০১৩ সালের দিকে আবুধাবির কোনো রাজপরিবারের জন্য ৬০৫ মিলিয়ন ডলার বা পাঁচ হাজার কোটি টাকা মূল্যের এই ইয়টটি বানানো হয়েছিল। এই দীর্ঘ ইয়টটি ৩১ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলাচলে সক্ষম।

গতির দিক থেকে বিবেচনা করলে এর চেয়ে দ্রæতগতির ইয়টও রয়েছে। যেমন ‘ওয়ার্ল্ড ইজ নট এনাফ’। এটি সাধারণত ৫০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারে। তবে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৭০ নটিক্যাল মাইল। প্যাক্সম্যান কোম্পানির ১৮ সিলিন্ডারবিশিষ্ট দুটি প্রধান ডিজেল ইঞ্জিনে অশ্বশক্তি উৎপাদিত হয় ১০ হাজার ৮৭০। আর একটি হাজার ২০০ অশ্বশক্তির ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় টারবাইনের জন্য। একবার ১৫ হাজার গ্যালন জ্বালানি ভরে নিলে একটানা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ নটিক্যাল মাইল ভ্রমণ করতে পারে। ২০০৪ সালে মিলেনিয়াম সুপার ইয়ট কোম্পানি এই ইয়টটি তৈরি করে।

‘আজজাম’ আকারে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর ‘ওয়ার্ল্ড ইজ নট এনাফ’ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রæতগামী ইয়ট হলেও সবচেয়ে দামি ইয়ট নয়। এ জায়গাটি ধরে রেখেছে রাশিয়ান বিলিয়নিয়ার আব্রামোভিচের ইয়ট ‘এক্লিপস’। এর প্রকৃত মূল্য কত তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর নির্মাণ ও সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে অনেকে মনে করেন এর খরচ ৮০০ মিলিয়ন ডলারের কম নয়। তবে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ২০১০ সালে জার্মানির হামবুর্গের ‘বেøাম অ্যান্ড ভোস’ কোম্পানির নির্মিত এই ইয়টটির দৈর্ঘ্য ১৬২ দশমিক ৫ মিটার। আকারের দিক থেকে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইয়ট। চারটি শক্তিশালী ইঞ্জিন এই ইয়টটিকে ২১ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চালাতে সক্ষম। ‘এক্লিপস’-এ রয়েছে দুটি সুইমিংপুল ও দুটি হেলিপ্যাড। আরও রয়েছে দুটি লঞ্চ বোট ও একটি মিনি সাব-মেরিন, যেটি পানির তলদেশে ৫০ মিটার পর্যন্ত যেতে সক্ষম। প্রতিটি মাস্টার বেডরুম বুলেট ও মিশাইল থেকে সুরক্ষা দিতে পারে এখানে আগত অতিথিদের।

স্ট্রিট অব মোনাকো

কিন্তু এত কিছুর পরও এমন সব ইয়টের কোনোটিকেই দ্বীপ বলা চলে না। কারণ, এসব ইয়টের কোনোটিতেই একসঙ্গে জলপ্রপাত, সবুজ গাছ, সার্ক ফিডিং স্টেশন কিংবা বিচ ক্লাব নেই। কিন্তু ৯ হাজার ১২৬ বর্গমিটারের ‘ককোমো আইল্যান্ড’-এ ভোক্তাদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এখানে রয়েছে একটি গার্ডেন ডেক, একটি জলপ্রপাতসহ জঙ্গল ডেক, পামগাছ, বোটানিক্যাল গার্ডেন। এমনকি হাসপাতাল পর্যন্ত রয়েছে এই ভাসমান দ্বীপে। আর স্পা, জিম, বিউটি সেলুন, সুইমিংপুলসহ অন্য যেসব বিলাসবহুল সেবা সাধারণ ইয়টগুলোতে থাকে, তার সবই রয়েছে এখানে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ যাতে কোনো ক্ষতি করতে না পারে ইয়টের বাসিন্দাদের, সে কারণে পানি থেকে প্রায় ৮০ মিটার উচ্চতায় পেন্টহাউস নির্মাণ করা হয়েছে। পেন্টহাউস বা সার্ক ফিডিং স্টেশনে ওঠানামার জন্য রয়েছে দুটি লিফট। পেন্টহাউসের ঠিক পেছনেই রয়েছে একটি হট টাব, যেখানে চাইলেই সমুদ্রের বুকে সূর্য ডোবা দেখতে দেখতে উষ্ণ পানিতে এলিয়ে দেওয়া যাবে শরীর।

পুরো ইয়টটি চালাতে ব্যবহার করা হয়েছে মোট আটটি শক্তিশালী ইঞ্জিন। ঘণ্টায় আট নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে সক্ষম দ্বীপটির ভারসাম্য ঠিক রাখতে ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ধরনের উন্নতমানের প্রযুক্তি। খুব সহজেই যেন একটি হেলিকপ্টার এখানে ওঠানামা করতে পারে, তার জন্য রয়েছে একটি হেলিপ্যাড। এই ভাসমান দ্বীপটি বাণিজ্যিক উদ্দেশে ভাড়া দেওয়া হবে কি না সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিগলু। তবে বিশাল সব করপোরেট কোম্পানি এই ভাসমান দ্বীপটির ক্রেতা হতে আগ্রহী বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ককোমো দ্বীপ তৈরিতে প্রকৃত ব্যয় কত সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। যেহেতু ক্রেতার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এসব দ্বীপ তৈরি করা হয়, সেহেতু এর দামও ক্রেতার চাহিদার ওপর নির্ভর করে। তবে ২০১৫ সালে মিগালু কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির কাছ থেকে স্বপ্নের এই ইয়ট দ্বীপটি তৈরির কোনো অর্ডার পায়নি। ‘ককোমো আইল্যান্ড’-এর মূল্য কত তা জানা না গেলেও এ রকম আরেকটি আইল্যান্ডের খরচ জানা গেছে। ‘স্ট্রিট অব মোনাকো’ নামের ১৫৫ মিটার দীর্ঘ এই ভাসমান দ্বীপটির মূল্য পড়বে এক বিলিয়ন ডলার। ‘ককোমো আইল্যান্ড’-এর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে অর্থাৎ ১৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারবে দ্বীপটি। ‘স্ট্রিট অব মোনাকো’-এর নির্মাণে প্রকৃতির চেয়ে শহরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ওপরের ডেকে তৈরি করা হয়েছে মোনাকো দ্বীপের বিখ্যাত সব স্থাপনা যেমন ‘হোটেল ডি প্যারিস’, ‘প্রিন্সেস প্যালেস’, ‘লয়েজ হোটেল’, ‘পোর্ট হারকিউল’ ও ‘লা রাসকাস’-এর ক্ষুদ্র সংস্করণ। এখানে যে গো কার্ট রেস ট্র্যাকটি রয়েছে, তা বিখ্যাত গ্র্যান্ড প্রিক্স ট্র্যাকের অনুকরণে নির্মিত। ক্যাসিনোর সামনে রয়েছে গাছপালাসমৃদ্ধ চমৎকার বসার জায়গা। পাশেই রয়েছে জলপ্রপাত ও শিশুদের খেলার জায়গা। সুইমিংপুল, ক্যাফে, জিম, স্পা, সানডেকের মতো সুবিধা তো আছেই। এখানে আরও আছে এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে যাওয়ার জন্য সুপরিসর লিফট ও ৫৫০ ফুটের একটি টেনিস কোর্ট। তবে আলাদা কোনো হেলিপ্যাড নেই, টেনিস কোর্টটিকেই হেলিপ্যাড হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ‘স্ট্রিট অব মোনাকো’ এখনো নির্মাণাধীন। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এই ভাসমান দ্বীপটি সাগরে ভাসতে পারবে বলে ধারণা এর নির্মাতাদের।

ইয়টের সুসজ্জিত ডেক

এখন প্রশ্ন হলো, ‘ককোমো আইল্যান্ড’ বা ‘স্ট্রিট অব মোনাকো’র মতো এসব ভাসমান দ্বীপ যদি কারও জন্য ইয়ট হিসেবে যথেষ্ট না হয়? কারও যদি প্রয়োজন হয় একটা আস্ত শহরের? হতেই পারে অসম্ভব কি! তা না হলে বিখ্যাত ওয়েবসাইট PayPal-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থেইল কেনের ‘ব্লু সিড’ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলেই পাবেন সমুদ্রের মাঝে থাকার ভাসমান সুবিধা? ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রে এই ভাসমান শহর হবে শুধু তরুণ পেশাদার বা উদ্যোক্তাদের জন্য। এই ভাসমান শহর কবে সাগরের নোনা জলে ভাসবে বা কত টাকা লাগবে জলে ভাসাতে তা জানা যায়নি এখনো। তবে এখানে থাকা বা কাজ করার জন্য প্রতিমাসে দিতে হবে ১ হাজার ৬০০ ডলার (প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা)।

আবু সুফিয়ান

প্রকাশকাল: বন্ধন ৭৩ তম সংখ্যা, মে ২০১৬

Related Posts

এস্কিমোদের তুষারবাড়ি ইগলু

ইগলু!!! উহু! আইসক্রিম নয়, বলছি তুষারবাড়ির কথা। চিরতুষার দেশের বাসিন্দা এস্কিমোরা যে বাড়িতে বাস করে, সেটিই আসলে ইগলু…

কোকেনহফে টিউলিপের দুনিয়ায় স্বাগত

কোকেনহফ। আক্ষরিক অনুবাদ করলে বলা যেতে পারে সবজির বাগান, প্রচলিত ভাষায় যেটা ‘কিচেন গার্ডেন’। আর যদি চাক্ষুষ অনুবাদ…

রঙে রাঙা রঙিন শহরে

একটি শহরের সৌন্দর্য্য কী? এটি বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন: অবকাঠামো, স্থাপত্যশৈলী, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ, বসবাসকারী বাসিন্দাদের…

যানজট এড়াবে ট্রানজিট এলিভেটেড বাস

নিত্যদিনকার যানজট আর কত ভালো লাগে বলুন! কোনো উপায়ই কি নেই এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার? রাজধানী ঢাকায়…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq