সিমেন্ট সংরক্ষণ যেভাবে

সিমেন্ট

সৃষ্টির শুরু থেকে সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটাতে মানুষ নিরন্তরভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আদিকালে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত পাথর ও কাদা-মাটি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা তৈরি করা হতো। সভ্যতার ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ফলে আবিষ্কৃত হয় সিমেন্ট, যা বিভিন্ন ধরনের কংক্রিট স্ট্রাকচার (বিল্ডিং, রোড, ব্রিজ, কালভার্ট, ড্রেন ইত্যাদি) নির্মাণে কংক্রিটের বাইন্ডিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সিমেন্ট আবিষ্কার-পরবর্তী যেসব স্থাপনা নির্মিত হয়ে আসছে, তার অধিকাংশই কংক্রিট স্ট্রাকচার, যা সাধারণত ইট, পাথর, বালি, সিমেন্ট ও পানির সংমিশ্রণে তৈরি। এই কংক্রিট নির্মাণকাজে ব্যবহৃতব্য উপাদানসমূহের মধ্যে অন্যতম সিমেন্ট, যার সার্বিক গুণাগুণের ওপর নির্ভর করে নির্মিত স্ট্রাকচারের দীর্ঘস্থায়িত্বতা এবং শক্তি বা ভারবহন ক্ষমতা। সিমেন্টের নানা প্রকারভেদ আছে, এর মধ্যে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট (পিসি) ও অর্ডিনারি পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট (ওপিসি) বহুল প্রচলিত।

প্রতিটি সিমেন্টেরই অন্তর্নিহিত কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যা ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে এর সার্বিক মান নিশ্চিত করা হয়। সিমেন্টের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে-

  • ফাইননেস
  • সাউন্ডনেস
  • কম্প্রেসিভ স্ট্রেইন্থ এবং
  • সেটিং টাইম।

এসব বৈশিষ্ট্যের আলাদা আলাদাভাবে নির্দিষ্ট একটি মাত্রা নির্ধারণ করা থাকে, যার পরিমাণ ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে নির্ণয় করে ব্যবহৃতব্য সিমেন্টের সার্বিক মান নিশ্চিত করা হয়।

পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আবহাওয়াজনিত তারতম্যের ওপর সিমেন্টের গুণগত মান পরিবর্তনশীল। ফলে যেকোনো কংক্রিট স্ট্রাকচার নির্মাণকল্পে সিমেন্ট ব্যবহারের আগে তার সার্বিক গুণাগুণ যাচাই করে নেওয়া অত্যাবশ্যক। প্রসঙ্গত, শুধু বৈশিষ্ট্যগত মান যাচাই করলেই নির্মিত কংক্রিট স্ট্রাকচারের গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে না। সিমেন্টের ব্যবহার কিংবা কংক্রিট তৈরি করার জন্য নির্ধারিত কিছু নিয়মনীতি ও বিধিবিধান আছে, যা মেনে চলাও অপরিহার্য।

উল্লেখ্য, মানসম্পন্ন একটি কংক্রিট স্ট্রাকচার নির্মাণ করার জন্য শুধু সিমেন্টই নয়, ব্যবহৃতব্য প্রতিটি উপাদানেরই গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া নির্মিতব্য স্ট্রাকচারের কাক্সিক্ষত শক্তি বা ভারবহন ক্ষমতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বতা বিবেচনা করে সিমেন্ট, বালি, খোয়া, পানি প্রতিটি উপাদান একত্রে মেশানোর অনুপাত ঠিকমতো নেওয়া এবং কাজের সময় তদনুযায়ী সব উপাদান মেশানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় তদারক নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রসঙ্গত, কংক্রিট তৈরির জন্য সঠিক অনুপাতে পানির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পানি ও সিমেন্ট একত্রে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়া করার ফলে কংক্রিট জমাট বাঁধে এবং প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চার করে। ফলে, পানির ব্যবহার নির্ণিত অনুপাত থেকে কম কিংবা বেশি দুটোই কংক্রিটের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া কংক্রিট তৈরিতে বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে পানি মেশানোর পর থেকে কাজের ফিনিশিং দেওয়া পর্যন্ত সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণালব্ধ ফলাফল অনুযায়ী সিমেন্টের ‘ইনিশিয়াল’ ও ‘ফাইনাল’ সেটিং টাইম যথাক্রমে ‘৪৫ মিনিট’ ও ‘১০ ঘণ্টা’। অর্থাৎ কংক্রিট তৈরির বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে পানি মেশানোর ৪৫ মিনিট পর থেকে সিমেন্টের জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে পরবর্তী ১০ ঘণ্টায় তা পূর্ণতা লাভ করে। ফলে, নিয়মানুযায়ী যেকোনো কংক্রিট তৈরিতে পানি মেশানোর পর থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে সব কাজ শেষ করা জরুরি এবং বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।

মনে রাখা দরকার, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলেও সিমেন্টের ইনিশিয়াল সেটিং ঠিকই শুরু হয়ে যায়। ফলে কংক্রিটের প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চার এবং দীর্ঘস্থায়িত্বার ক্ষেত্রে অদৃশ্য কিছু ক্ষতি হয়, যা আমরা কখনো পরিমাপ করে দেখি না। সিমেন্টের সেটিং বিঘ্নিত হওয়ার ফলে কীভাবে কংক্রিটের অন্তর্নিহিত ক্ষতি হয় সে বিষয়টি হিউম্যান বডির সঙ্গে তুলনা করলে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে সহজেই বোধগম্য হবে। সিমেন্টের সেটিং টাইম বিঘ্নিত হওয়া হিউম্যান বডির সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি এমন যে একজন মানুষ যখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন যদি তাকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয় এবং বারবার এমনটি ঘটতে থাকে, তাহলে তার শরীরে অবসাদ নেমে আসায় চলৎশক্তি লোপ পায়, এমনকি স্বাস্থ্যহানিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তদ্রƒপ, সিমেন্টের সেটিং টাইম বিঘ্নিত হলেও কংক্রিটের অন্তর্নিহিত গুণাগুণ লোপ পায় এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্মুুখীন হয়। অতএব, যেকোনো কংক্রিট স্ট্রাকচার নির্মাণের ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।

প্রতিটি কংক্রিট স্ট্রাকচারেরই একটি জীবন চক্র আছে, আছে তার শক্তি সঞ্চার ও ক্ষয় সাধিত হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি যা সঠিকভাবে জেনে রাখার পাশাপাশি মেনে চলা অত্যাবশ্যক। প্রসঙ্গত আরও উল্লেখ্য, নির্মিতব্য একটি সিমেন্ট কংক্রিট স্ট্রাকচারের কাক্সিক্ষত শক্তি বা ভার বহনক্ষমতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বতা নিশ্চিত করতে মালামাল মেশানোর অনুপাত, কাজের পদ্ধতি ঠিক রাখার পাশাপাশি নিয়মিত কিউরিং করার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো কংক্রিট স্ট্রাকচার ঢালাই করার ১০ ঘণ্টা পর থেকে পরবর্তী ৭-২১ দিন পর্যন্ত কিউরিং করা অপরিহার্য।        

সিমেন্ট সংরক্ষণ বা স্টোরেজ

সিমেন্টের বিশেষ কতগুলো বৈশিষ্টের মধ্যে ‘স্ট্রেইন্থ’ অন্যতম, যা ব্যবহার-পূর্ব স্টোরিংয়ের সময় ব্যবধানে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। উল্লেখ্য, সিমেন্টের কাক্সিক্ষত স্ট্রেইন্থ যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে নির্মিত কংক্রিট স্ট্রাকচারের স্ট্রেইন্থ নিশ্চিত করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ফলে, সিমেন্ট উৎপাদন-পরবর্তী সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে স্টোর করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্মুক্ত ও আর্দ্র আবহাওয়ায় সিমেন্ট অতীব নাজুক। ওয়েদার অ্যাকশনে সিমেন্টের স্ট্র্রেইন্থ প্রতিনিয়ত কমতে থাকে। ফলে, যত দীর্ঘ সময় সিমেন্ট অরক্ষিত থাকবে, ততই এর স্ট্রেইন্থ  কমে যাবে।

উৎপাদন-পরবর্তী প্রলম্বিত স্টোরেজের কারণে আনুপাতিক হারে সিমেন্টের স্ট্রেইন্থ যে কমতে থাকে তা বিভিন্নভাবে পরীক্ষিত। সিমেন্ট দীর্ঘসময় স্টোরিং করার ফলাফলসংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণালব্ধ একটি সমীক্ষা তুলে ধরা হলো; (সূত্র: সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স হ্যান্ডবুক)।

সংরক্ষণের সময়কাল (Period of Storage)স্ট্রেইন্থ হ্রাসের হার (Reduction in Strength)
৩ মাস২০%
৬ মাস৩০%
১২ মাস৪০%
২৪ মাস৫০%

অতএব, সিমেন্টের প্রলম্বিত স্টোরেজ অবশ্যই বর্জনীয়। এ ছাড়া স্টোরেজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা যথাযথভাবে মেনে চলা অত্যাবশ্যক। তাই সিমেন্ট স্টোরিংয়ের জন্য বাধ্যতামূলক কিছু নিয়ম উল্লেখ করা হলো, যা সিমেন্ট ব্যবহারকরীকে অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন।

  • সিমেন্ট যত দূর সম্ভব স্বল্প সময়ের জন্য স্টোর করতে হবে।
  • শুষ্ক এবং আবৃত স্থানে স্টোর করতে হবে।
  • আর্দ্র কিংবা খোলা জায়গায় সিমেন্ট স্টোর করা আদৌ সঠিক নয়।
  • সরাসরি মাটি কিংবা ফ্লোরের ওপর স্টোর করা যাবে না।
  • মাটি কিংবা ফ্লোর থেকে ৬-১২ ইঞ্চি উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে তার ওপর সিমেন্ট রাখতে হবে।
  • পাশের দেয়াল ৬-১২ ইঞ্চি ফাঁকা রেখে সিমেন্টের ব্যাগ স্ট্যাক করতে হবে।
  • সিমেন্টের স্টোর এয়ারটাইট হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এ ছাড়া, ভালো ফল পেতে যেকোনো স্ট্রাকচার ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে কাজের আগের দিন সিমেন্ট এনে শুষ্ক এবং আবৃত স্থানে স্টোর করা উত্তম। কোনো কারণে সিমেন্ট বেশি দিন স্টোর করা হলে, কাজে লাগানোর আগে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এর সার্বিক গুণাগুণ যাচাই করে নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, ঢালাইয়ের বিভিন্ন প্রকার উপাদানের মধ্যে শুধু সিমেন্টই অন্য সব উপাদানকে একসঙ্গে জমাট বাঁধার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত শক্তি সঞ্চারে সাহায্য করে।

এ-সংক্রান্ত একটি গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, দীর্ঘসময় স্টোরিংয়ের কারণে সিমেন্টের স্ট্রেইন্থ লস করার বিষয়টি দুভাবে (সাধারণ ও রক্ষণশীল) স্টোর করা সিমেন্ট দিয়ে একই স্ট্যান্ডার্ডে দুই প্রকারের স্পেসিমেন তৈরি করত ৩ দিন, ৭ দিন এবং ২৮ দিন পর টেস্ট করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফলাফলের পার্থক্য চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। (সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রিসার্চ ইন সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, ভলিউম ২, ইস্যু-৩, মার্চ-২০১৩)

ওপরে প্রদর্শিত ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৩ নম্বর চিত্রে দুভাবে (সাধারণ ও রক্ষণশীল) স্টোর করা সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা ‘সিমেন্ট কিউব’ যথাক্রমে ৩ দিন, ৭ দিন ও ২৮দিন পর টেস্টের ফলাফলের পার্থক্য দেখানো হয়েছে।

অপর দিকে, নিম্নে প্রদর্শিত ৪ নম্বর, ৫ নম্বর, ৬ নম্বর ও ৭ নম্বর চিত্রে একইভাবে দুই ধরনের স্টোর থেকে সিমেন্ট নিয়ে দুই প্রকার কংক্রিট (এম-১৫ ও এম-২০) তৈরিকরত যথাক্রমে ৭ দিন ও ২৮ দিন পর টেস্ট করে তার ফলাফলের পার্থক্য দেখানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিমেন্ট কংক্রিট ঢালাইয়ের পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে স্ট্রেইন্থ গেইন করতে থাকে, যা সাধারণত কোনো পরিমাপ করে দেখা হয় না। তবে, প্রাথমিক অবস্থায় খুব দ্রুত স্ট্রেইন্থ গেইন করে, তাই সিমেন্ট কংক্রিট ঢালাই-পরবর্তী শুধু ৩ বা ৭ এবং ২৮ দিনের টেস্ট করে কাক্সিক্ষত ফলাফল জেনে নেওয়া হয়। এরপর লম্বা সময় ধরে আস্তে আস্তে স্ট্রেইন্থ বাড়তে থাকে এবং একটা সময় পর কমা শুরু করে।

পুনরায় উল্লেখ্য, প্রতিটি স্ট্রাকচার নির্মাণ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটা ‘স্ট্রেইন্থ’ ও ‘লাইফ টাইম’ ধরে কংক্রিটের মিক্স ডিজাইন করা হয় এবং তদ্নুযায়ী স্ট্রাকচার নির্মাণ করা হয়ে থাকে। ফলে সিমেন্ট কংক্রিট স্ট্রাকচার নির্মাণকাজে প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। যেমন- ব্যবহৃতব্য সকল মালামালের গুণগত মান, কাজের পদ্ধতি এবং কাজের পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে মেনে চলার জন্য বিভিন্ন নিয়মনীতি ও বিধিনিষেধসমূহ।

সর্বশেষ, যেকোনো কাজে অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। ফলে, উপরোল্লিখিত প্রতিটি কাজ যথাযথ ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে সব পর্যায়ের কাজসমূহ নিয়মিত তদারক করা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top