• Home
  • মূল রচনা
  • লবণাক্ত থেকে সুপেয় পানি
    লবণাক্ততা পরিশোধনের কারণ ও প্রতিকার
খাবার জন্য মানুষ সুপেয় পানি বহন করে নিয়ে আসছে

লবণাক্ত থেকে সুপেয় পানি
লবণাক্ততা পরিশোধনের কারণ ও প্রতিকার

নদী, সাগর বা খালের পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি স্বাভাবিক বিষয়। ম্যাগনেশিয়াম, সালফেটের মতো লবণও পানির একটি উপাদান। সমুদ্রের পানিতে সাধারণত ৩৫ গ্রাম/কেজি লবণের উপস্থিতি লক্ষণীয়। যেখানে নদীর পানি সাগরে এসে মিশেছে, সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণে রয়েছে ভিন্নতা। পরিমাণে এটি ০.০১ গ্রাম/কেজি থেকে ৫ গ্রাম/কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু স্থানে লবণাক্ততার পরিমাণ অনেক বেশি। যেমন- ডেড সি-তে লবণাক্ততার পরিমাণ ২০০ গ্রাম/কেজি।

মানুষ স্বভাবতই লবণাক্ত পানি পান করতে পারে না। তবে লবণাক্ত পানিকে পরিশোধন করে সুপেয় করা সম্ভব। লবণযুক্ত পানিকে সুপেয় করার প্রক্রিয়াকে ডিস্যালাইনেশন (Desalination) বলা হয়। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সুপেয় পানির চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। পৃথিবীতে বর্তমানে যে পরিমাণ সুপেয় পানির ব্যবস্থা রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। তাই সাগরের লোনা পানিকে পরিশোধন করে সুপেয় করা ছাড়া সবার জন্য বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির নিশ্চিত করা অসম্ভব। তা ছাড়া চাহিদা মেটাতে যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে শিগগিরই সমুদ্রের লোনা পানি ভূগর্ভস্থ পানির স্থান দখল করবে। এতে করে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ পরিবেশবিপর্যয়। 

পানি লবনমুক্তকরন প্ল্যান্ট, পার্থ, অস্টেলিয়া
পানি লবনমুক্তকরন প্ল্যান্ট, পার্থ, অস্টেলিয়া

যে কারণে লবণাক্ততা

প্রাথমিক পর্যায়ে লবণাক্ততা আসে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায়, যেমন- পাথরের Weathring, বৃষ্টির পানি ও বাতাস পানিতে লবণ মিশ্রণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে লবণাক্ত পানি সৃষ্টি করছে।

দ্বিতীয়ত, বিশাল ও বিস্তৃত অঞ্চলের ভূমি পরিষ্কার ও এর বহুমুখী ব্যবহারের ফলে শুষ্ক লবণাক্ত ভূমির সৃষ্টি করে। তা ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি চলাচলের মাধ্যমে লবণযুক্ত পানি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে লবণযুক্ত পানির বিস্তার ঘটে।

পানিতে লবণের উপস্থিতির ফলে পানির লবণাক্ততা যাচাইয়ের কিছু পরিমাপক রয়েছে। সেগুলো-

  • বিশুদ্ধ সুপেয় পানি হয় সাধারণত ১০০০ পিপিএমের নিচে থাকলে।
  • অল্প মাত্রায় লবণাক্ত পানিতে ১০০০ থেকে ৩০০০ পিপিএম লবণ দ্রবীভূত থাকে।
  • মধ্যম মাত্রায় লবণাক্ত পানিতে ৩০০০ থেকে ১০,০০০ পিপিএম লবণ দ্রবীভূত থাকে।
  • উচ্চমাত্রায় লবণাক্ত পানিতে ১০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ পিপিএম লবণ দ্রবীভূত থাকে। সাধারণত সমুদ্রের পানিতে ৩৫,০০০ পিপিএম লবণ দ্রবীভূত থাকে।

লবণাক্ততার প্রভাব
লবণাক্ত পানি পানে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, মস্তিষ্ক বিকৃতি, মানসিক পরিবর্তনসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, যার শেষ পরিণতি মৃত্যু। উচ্চমাত্রার লবণাক্ত পানি পরিবেশ, কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। লবণাক্ততা বাড়ায় ফসল উৎপাদন দারুণভাবে হ্রাস পায়। এভাবেই, লবণাক্ততা কৃষি ও প্রকৌশল অবকাঠামো ধ্বংসের কারণ হয়।

সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি লবনমুক্তকরন
সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি লবনমুক্তকরন

বাংলাদেশের কৃষিতে লবণাক্ত পানির প্রভাব

লোনা পানির অনুপ্রবেশে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষির জন্য মারাত্মক সমস্যা। বাংলাদেশে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন হেক্টর উপকূলীয় অঞ্চলভুক্ত। জলবায়ুর পরিবর্তন ও শুষ্ক মৌসুমে নদীপ্রবাহ ক্রমাগত কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র ভূ-ভাগের অনেক গভীরে সমুদ্রের লোনা পানি অনুপ্রবেশ করে মাটির লবণাক্ততা বাড়াছে। বর্ষা মৌসুমে বিশেষ করে জুন থেকে অক্টোবর মাসের দিকে উপক‚লীয় এলাকায় বন্যার প্রভাবে সরাসরি লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে যায়। দেশের পশ্চিমাংশের নদীনালার পানি অধিকাংশ সময় লবণাক্ত থাকে। তবে বর্ষাকালে তিন-চার মাস লবণাক্ততার মাত্রা অনেকাংশে কমে যায়। দেশের পূর্বাংশে বর্ষাকালে নদী-নালা দিয়ে মিঠা পানি প্রবাহিত হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির লবণাক্ততা ১-২ ডিএম/মি. থাকে, যা সেচের জন্য উপযোগী নয়। লোনা পানির অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক এক সমস্যা। বর্তমানে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর। বাংলাদেশের মোট উপকূলীয় এলাকার পরিমাণ প্রায় ২৫ লাখ হেক্টর, যার মধ্যে ৮ দশমিক ৩ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সমস্যাটি উপকূলীয় অঞ্চল থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও কুমিল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা ধীরে ধীরে আরও উত্তরে বিস্তৃত হতে পারে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এসব অঞ্চলের বিশাল আবাদি জমি থাকছে পতিত। 

জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বের কয়েক শ কোটি মানুষ পড়বে ভয়াবহ পানির সংকটে, যা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। লবণাক্ততার প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তনে ঋতু বদল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জমির উর্বরাশক্তি হ্রাস, বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া, উপকূলীয় জেলার মানুষের অবস্থার পরিবর্তন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বৃষ্টির পরিমাণ কমে যাওয়া, নদীভাঙন ও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, বনভূমি উজাড় করে ফেলা, মিঠা পানির উৎস কমে যাওয়ায় বাড়ছে  পানির লবণাক্ততা।

পানি লবনমুক্তকরন প্ল্যান্ট, সৌদি আরব

পরিশোধনে যখন লবণাক্ত পানি
সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে সুপেয় করার জন্য প্রথমে এতে থাকা লবণকে দূর করতে হবে। লবণযুক্ত পানিকে খুব সহজেই সুপেয় পানিতে পরিণত করা সম্ভব লবণযুক্ত পানিকে ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করে। যেকোনো একটি পাত্রে এই বাষ্প সংরক্ষণ করে পরে তা খাবার পানি হিসেবে গ্রহণ করা যায়। দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে পরিষ্কার, বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির পর্যাপ্ত উৎস না থাকায় ওই সব স্থানে অতিরিক্ত সুপেয় পানির বিধান নিশ্চিত করা বড় ধরনের সমস্যা। তাই ওই সব স্থানের জন্য স্থানীয়ভাবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা একান্ত জরুরি। 

সমুদ্রের লোনা পানি থেকে যেভাবে সুপেয় পানি পাওয়া সম্ভব- 

সাতক্ষীরা ও খুলনায় পানির সংকট নিরসনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তা সম্পূর্ণ সফল তা কিন্তু বলা যাবে না। এসব উদ্যোগের মধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হলেও বর্তমানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

দরিদ্র মানুষের কথা চিন্তা করে জনস্বাস্থ্য বিভাগের স্যান্ড ফিল্টারের (পিএসএফ) মাধ্যমে পুকুরের পানি খাবার উপযোগী বা সুপেয় করে সবার জন্য খাবার পানির ব্যবস্থা করা যায়। যদিও সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা তীব্র মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় টিএসএফের মাধ্যমে খাবার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এককিউরডের উদ্ভাবিত ক্যারোসেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানিকে বিশুদ্ধ ও সুপেয় করা সম্ভব। এটা সরাসরি সৌরশক্তি দ্বারা চালিত লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি, যা বিশ্বব্যাপী অন্যতম সর্বাধিক কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে দূষিত নোংরা শিল্পবর্জ্যমিশ্রিত পানি, ভূগর্ভস্থ লবণপানি ও সাগরের পানিসহ যেকোনো পানির উৎস থেকে নিরাপদ ও উন্নতমানের পানযোগ্য পানি সরবরাহ করা সম্ভব। সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমসি) বাস্তবায়নে ও দাতা সংস্থা ইউএনডিপির অর্থায়নে ক্যারোসেল সৌরশক্তিচালিত লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তির দ্বারা ২৫টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্যানেল নির্মাণ করা হয়েছে, যা সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ২৫ জন অসহায় ও প্রতিবন্ধী পরিবারকে দেওয়া হয়েছে।

পাত্রে ঢালুন লবন পানি ও রোদে রাখুন কয়েক ঘণ্টা
পাত্রে ঢালুন লবন পানি ও রোদে রাখুন কয়েক ঘণ্টা

জলোচ্ছ্বাস ‘আইলা’দুর্গত এলাকায় পুকুরের পানি লবণাক্ত ও নলকূপের পানিতে অতিমাত্রায় আর্সেনিক থাকায় এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের খাবারের পানি কিনে পান করতে হয়। তাই আইলাদুর্গত এলাকার মানুষের জন্য ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিট (সিসিএইচপিইউ) পানি বিশুদ্ধকরণ কার্যক্রম হাতে নেয়। এ উদ্দেশ্যে এ অঞ্চল থেকে ১০টি পুকুরকে মডেল পুকুর হিসেবে নির্বাচন করা হয়। মডেল পুকুরের পানি শোধনের জন্য পুকুরগুলোর নিকটবর্তী স্থানে একটি করে বিভাস অসমোমিম প্রক্রিয়ায় পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট স্থাপন করে সিসিএইচপিইউ। প্রশিক্ষণ দেয় এর রক্ষণাবেক্ষণের। এ প্লান্টগুলোর মাধ্যমে পানি শোধন করে বর্তমানে ওই সব স্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ ও সুপেয় খাবার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে থাকে মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড। তাই এই পানি পানের অনুপযোগী। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) কয়েকজন শিক্ষার্থী স্বল্প খরচে সমুদ্রের পানি সুপেয় করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প খরচে খুব সহজেই সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে খাবার উপযোগী করে তোলা সম্ভব। স্বল্প খরচে সমুদ্রের পানি সুপেয় করার এই পদ্ধতি বা প্রযুক্তিটি বাংলাদেশে প্রথম। অন্যান্য দেশে সৌরশক্তি ব্যবহার করে পানি বিশুদ্ধ করার গবেষণা হলেও বাংলাদেশে এটিই প্রথম। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাওয়ায় সমুদ্রের পানিকে খাবার উপযোগী করে তুলতে গবেষণাটি চালানো হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র চার হাজার টাকা খরচে পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট তৈরি করা যাবে। এতে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হবে সূর্যকে।

প্রযুক্তিটি তৈরি করতে যা যা প্রয়োজন হবে-

  • দুটি পাত্র
  • কাচ
  • জিআই শিট
  • প্লাস্টিকের পাইপ
  • ককশিট।

যেভাবে করবেন
কাচ, জিআই শিট, কর্কশিট দিয়ে তৈরি করতে হবে সোলার স্টিল। প্রথম পাত্রটি লবণযুক্ত পানি প্রবেশ করানোর জন্য। সোলার স্টিলে সূর্যের তাপে যে বাষ্প হবে, সেই বাষ্পের পানি অন্য একটি নল দিয়ে অপর পাত্রে গিয়ে জমা হবে। আর এই পানি সম্পূর্ণরূপে খাওয়ার উপযোগী পানি। মাত্র চার হাজার টাকা খরচ করে সহজেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব।

সংগ্রহ করুন বিশুদ্ধ পানি
সংগ্রহ করুন বিশুদ্ধ পানি

বিশ্বে নানা পদ্ধতিতে ছোট-বড় প্লান্ট ও পদ্ধতির মাধ্যমে লোনা পানিকে সুপেয় করা হচ্ছে। যেমন- 

অপ্রয়োজনীয় তাপশক্তির সাহায্যে
গ্রাম বা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সাধারণত ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হয়, যার দ্বারা মূলত শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। পানি লবণমুক্তকরণ পদ্ধতির মেমব্রেনকে যদি ধোঁয়া নির্গমনকারী এক্সহস্টের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে এই অপচয়কৃত অপশক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই লবণযুক্ত পানি থেকে লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশুদ্ধ সুপেয় পানি পাওয়া যায়। তা ছাড়া লবণমুক্তকরণ সিস্টেমের মেমব্রেন ডিজেল জেনারেটরকে ঠান্ডা রাখে এবং এর কর্মদক্ষতা বাড়ায়।

কম তাপমাত্রার থার্মাল পদ্ধতিতে
কম তাপমাত্রার থার্মাল লবণমুক্তকরণ পদ্ধতিতে কম চাপে ও চারপাশের পরিবেশের তাপমাত্রায় পানিকে ফুটিয়ে লবণমুক্ত করা হয়। এই ব্যবস্থায় সাধারণত ভ্যাকুয়াম পাম্প দিয়ে নিম্নচাপ সৃষ্টি করে এবং পরিবেশের তাপমাত্রায় ৮০ থেকে ১০০ সেলসিয়াস বা ৪৬০ থেকে ৫০০ ফারেনহাইট তাপমাত্রায় দুটি ভিন্ন আয়তনের পানির মধ্যে পানিকে ফুটতে সাহায্য করে। সমুদ্রের ঠান্ডা পানিকে সাধারণত ৬০০ মিটার বা ২০০০ ফুট গভীর থেকে পাম্প দিয়ে টেনে আনা হয়। এই পানিকে লবণমুক্তকরণ ব্যবস্থায় এর ঈড়রষং-এর মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয়, যাতে করে এটা লবণমুক্তকরণ পদ্ধতিতে সৃষ্ট বিশুদ্ধ সুপেয় পানির বাষ্পকে জমতে সাহায্য করে।

শাবি কর্তৃক উদ্ভাবিত লবনপানি বিশুদ্ধকরন প্ল্যান্ট ও পলিথিনের সাহায্যে পানি লবনমুক্তকরন
শাবি কর্তৃক উদ্ভাবিত লবনপানি বিশুদ্ধকরন প্ল্যান্ট ও পলিথিনের সাহায্যে পানি লবনমুক্তকরন

রিভার্স অসমোসিস
বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের লবণমুক্তকরণ পদ্ধতি চালু থাকলেও রিভার্স অসমোসিস বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। এটা এমন একধরনের লবণমুক্তকরণ পদ্ধতি, যাতে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে লবণযুক্ত পানির দ্রবণকে বিশেষভাবে নির্মিত মেমব্রেনের বা পর্দার ভেতর দিয়ে চালিত করা হয়। এটা পানিতে মিশ্রিত লবণকে আটকে দেয়। এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে কম শক্তি অপচয় হয়। 

ফরোয়ার্ড অসমোসিস
এ পদ্ধতিতে মূলত প্রাকৃতিক ব্যাপনপ্রক্রিয়াকে কাজে লাগানো হয়। যাতে কম ঘনত্বের দ্রবণসমূহ বেশি ঘনত্বের দ্রবণের দিকে ধাবিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় মূলত রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়া থেকে অর্ধেক শক্তির প্রয়োজন হয়। কেননা এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে অনেক কম শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় চাপের মাধ্যমে লবণযুক্ত পানির দ্রবণকে সামনের দিকে একটি আংশিক ভেদনযোগ্য মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে তখন অ্যামোনিয়া লবণের দ্রবণ সমুদ্রের লবণকে মেমব্রেনের অপর পাশে যুক্ত করে দেয়। অতঃপর তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পানি থেকে অ্যামোনিয়া লবণকে মুক্ত করে। এই লবণ পুনরায় সমুদ্রের পানির লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যায়।

ইলেকট্রোডায়ালাইসিস
ইলেকট্রোডায়ালাইসিস লবণমুক্তকরণ পদ্ধতিতে রিভার্স অসমোসিসের মতো মেমব্রেনের বিপরীতমুখী কার্যক্রমকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু এতে লবণযুক্ত পানির মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক আধান পাঠিয়ে মেমব্রেনের এক পাশে ঋণাত্মক আধান যুক্ত প্লেটে মেটাল আয়নকে আকর্ষণ করে এবং অন্যান্য আয়নসমূহ; যেমন- লবণ ঋণাত্মক আধানযুক্ত প্লেট দ্বারা আকর্ষিত হয়। চার্জকে মাঝে মাঝেই দিক পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। যাতে করে মেমব্রেনটি অতিমাত্রায় দূষণমুক্ত না হয়ে পড়ে। এখন মেমব্রেনের দুটি প্লেটে সঞ্চয়কৃত আয়নসমূহকে বের করে আনা যায় এবং সংগৃহীত সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ পানি একটি নির্দিষ্ট পাত্রে জমা হয়। সম্প্রতি নির্মিত মেমব্রেনগুলো অনেক বেশি কর্যকরী। এরা রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়ার থেকে অনেক বেশি ক্ষতিকর আয়নকে পানি থেকে পৃথক করতে সক্ষম।

থার্মাল প্রক্রিয়ায় লবণমুক্তকরণ
থার্মাল লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় পানি বিশুদ্ধ বা সুপেয়করণ পদ্ধতিটি একত্রে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে করা হয়। এতে লবণযুক্ত পানিকে লবণমুক্ত করার পাশাপাশি পানির অন্যান্য দূষণকেও মুক্ত করা যায়। থার্মাল লবণমুক্তকরণ পদ্ধতিতে তাপ দিয়ে পানিকে বাষ্পে পরিণত করা হয় এবং পরে পানির বাষ্পকে ঠান্ডা করে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা হয়। 

এই পদ্ধতিতে দুই ধরনের লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়- 

মাল্টি-স্টেজ ফ্লাস ডিস্টিলেশন
এ প্রক্রিয়ায় লবণ পানিকে পুনরায় আরও কয়েক ধাপে তাপ দিয়ে উত্তপ্ত করা হয়। একাধিকবার পানিকে তাপ দেওয়ার আগ থেকে ক্রমান্বয়ে কম চাপে পানিকে তাপ দিয়ে ফুটানো হয়। মাল্টি-স্টেজ ফ্লাস ডিস্টিলেশন প্লান্টকে সাধারণত পাওয়ার প্লান্টের পাশেই স্থাপন করা হয়, যাতে পাওয়ার প্লান্টের অপচয়কৃত তাপ দিয়ে এর কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। এ ধরনের লবণমুক্তকরণ পদ্ধতিতে রিভার্স অসমোসিস পদ্ধতির চেয়ে অনেক কম শক্তির প্রয়োজন হয়। সৌদি আরবে বিভিন্ন বৃহৎ আকারে মাল্টি-স্টেজ ফ্লাস ডিস্টিলেশন প্লান্ট দিয়ে মোট চাহিদার প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। 

মাল্টিপল-ইফেক্ট ডিস্টিলেশন
মাল্টিপল-ইফেক্ট ডিস্টিলেশন খুবই সাধারণ একটি পদ্ধতি। এটার সঙ্গে মাল্টি-স্টেজ ফ্লাস ডিস্টিলেশন পদ্ধতির মিল রয়েছে। এতে লবণযুক্ত পানির দ্রবণকে তাপ দিয়ে বাষ্পে পরিণত করা হয়। এর মাধ্যমে সৃষ্ট বিশুদ্ধ পানিকে একটি আলাদা চেম্বারে সঞ্চয় করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বাষ্পের তাপীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন পানিকে বাষ্পীভূত করা হয় এবং অধিক পরিমাণে পানির বাষ্প সৃষ্টি হয়। এ ধরনের লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়া ছোট পরিসরের জন্য দারুণ কার্যকর। 

সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি লবনমুক্তকরন ও ভ্যাপোরেশন পদ্ধতিতে পানি লবনমুক্তকরন
সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি লবনমুক্তকরন ও ভ্যাপোরেশন পদ্ধতিতে পানি লবনমুক্তকরন

ভবিষ্যতের লবণমুক্তকরণ প্লান্ট
সমুদ্রের লবণযুক্ত পানি থেকে বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির উৎপাদন ও ব্যবহার বর্তমানে শুধু উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। যাদের এ ধরনের প্লান্ট পরিচালনার জন্য যথাযথ অর্থায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে। যদি সময়ের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভব হয় অথবা বর্তমান প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে ভালো ও স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়, তবে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশও এসব প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহী হবে। বিশেষ করে যেসব দেশ বর্তমানে তীব্র খরা আক্রান্ত। 

সমুদ্রের লবণযুক্ত পানিকে লবণমুক্তকরণ আধুনিক প্রযুক্তিটি এখনকার নয়। পানি লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়া মানবসভ্যতা সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসছে। মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করছে। এটিই বর্তমান বিশ্বের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বহুল পরিচিত ও জনপ্রিয় লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়া। অতি প্রাচীনকাল থেকেই অনেক জাতি এই পদ্ধতিতে জাহাজে অবস্থানকালীন সমুদ্রের লবণযুক্ত পানিকে সুপেয় পানিতে পরিণত করত খাবার পানির ব্যবস্থা করতে। বর্তমান সময়ে লবণমুক্তকরণ প্লান্টের মাধ্যমে জাহাজে লবণযুক্ত পানিকে সুপেয় পানিতে পরিণত করে সুপেয় ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়। তা ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলের পানিতে বিভিন্ন ধরনের দূষণের শিকার হয়, তা এই পদ্ধতিতে পরিশোধন করলে পানির অনেক ধরনের দূষণমুক্ত করে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব।

বিভিন্ন ধরনের জরিপ বলছে, পৃথিবীর শতকরা ৩০ ভাগ জমি লবণাক্ততার বিরূপ প্রভাবে আক্রান্ত। এটার লবণ বিমুক্তকরণপ্রক্রিয়া অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ। ২০০২ সালের দিকে ১২০টি দেশে প্রায় ১২ হাজার ৫০০টি লবণমুক্তকরণ প্লান্ট ছিল। এসব প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৪ মিলিয়ন ঘন মিটার বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানি উৎপাদন সম্ভব, যা মোট পানির চাহিদার শতকরা মাত্র এক ভাগের মতো।

লবণমুক্তকরণ প্লান্টের মাধ্যমে উৎপাদিত বিশুদ্ধ পানির বেশির ভাগ ব্যবহৃত হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। সারা বিশ্বে এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত মোট পানির শতকরা ৭০ ভাগ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহৃত হয়। লিবিয়া ও আলজেরিয়ায় প্রায় শতকরা ছয় ভাগ পানি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা এসব প্লান্টের মাধ্যমে উৎপাদিত পানি ব্যবহারকারীদের মধ্যে অন্যতম।

অপ্রয়োজনীয় তাপশক্তির সাহায্যে পানিতে লবন পৃথকীকরন
অপ্রয়োজনীয় তাপশক্তির সাহায্যে পানিতে লবন পৃথকীকরন

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব উদ্যোগ কোনো না কোনোভাবে হুমকির মুখে। এসব উদ্যোগগুলোর মধ্যে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলেও অধুনা নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কম। বৃষ্টিপাত কম হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া পানির উৎস কমে যাওয়ায় পানি সরবরাহের উদ্যোগগুলো হুমকির মুখে পড়ে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খাবার পানির সংকট নিরসনে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ওপর জোর দিতে হবে গুরুত্বসহকারে।

শেষের আগে

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সাতক্ষীরার কয়রা উপজেলার মাত্র ৬০-৬৫ শতাংশ মানুষকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায়। ফলে একটা বিরাট জনগোষ্ঠী পুকুরের পানি পান করে। লবণাক্ততায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২০ উপজেলায় পানির তীব্র সংকট। এসব উপজেলায় গভীর নলকূপ বসে না। একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস কমছে অপর দিকে ভূপৃষ্ঠের পানিও লবণাক্ত হচ্ছে। তাই স্বল্প খরচে সোলার প্যানেলের সাহায্যে পরিচালিত ওয়াটার ডিস্যালাইনেশন পিউরিফিকেশন প্লান্ট চালুর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জন্য বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে প্লান্টগুলো পরিচালনায় যথাযথ উদ্যোগের অভাব দেখা দেবে। এসব প্রকল্প খুব শিগগিরই হুমকির মুখে পড়বে। পানির লবণাক্ত সমস্যা সমাধানে স্থানীয় বাসিন্দাদের এ ধরনের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রকৌশলী সনজিত সাহা
sonjit7022@gmail.com

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৪ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৪

Related Posts

হাইওয়ের বুকে খাড়া শহর: নগরের নতুন ভাষা

হাইওয়ে একদিকে যেমন চলাচলের জন্য অপরিহার্য, অন্যদিকে এটি শহরের ভেতরের জীবনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমনই এক দ্বন্দ্বের মধ্যে…

ByByshuprova Apr 20, 2026

বন্যা প্রতিরোধী বাঁশের বাড়ি নির্মাণের এখনই সময়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সাগর উপকূলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা বাংলাদেশের জন্য খুবই…

পাহাড়ের ঢালে খোদাই করা ‘নট আ হোটেল সেতোউচি’

এর নকশাটি ছিল সরাসরি জাপানি লোকজ স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংবেদনশীলতার মাধ্যমে এর যুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।…

নদীর মাঝে ফুটে ওঠা কংক্রিটের টিউলিপ পার্ক

প্রায় আড়াই একর জায়গাজুড়ে রয়েছে ঘোরানো হাঁটার পথ, সাজানো বাগান, আর ৭০০ আসনের একটি এম্ফিথিয়েটার। ২৬০ মিলিয়ন ডলারের…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq