ঢাকায় ইডেন গার্ডেন ও সেকেন্ড ক্যাপিটাল : নতুন সচিবালয়

ঢাকার নগরায়ণের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও এতে কখনো কোনো কিছুই পরিকল্পিত বা কাক্সিক্ষতভাবে গড়ে ওঠেনি। দৃশ্যত এর কোনো স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বা প্রকল্পেরও পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। শাসক বা সরকার পরিবর্তনের পর পরিকল্পনা বদল হয়, প্রকল্পের রূপরেখা পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় নামও। অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিকল্পনাই হয় উপেক্ষিত কিংবা চলে যায় অন্য উদ্দেশ্যে। ফলে যা কিছু হয়েছে, তার প্রায় এরই অতীত ইতিহাস বিকৃত হয় বা হারিয়ে যায়। অথচ নগরায়ণ হচ্ছে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের যেকোনো নগরীতে গেলে তার নগরায়ণ প্রক্রিয়া বোঝা যায়, জানা যায় অতীত। কিন্তু বারবার নাম বদল তথা পরিকল্পনার রূপরেখা পরিবর্তনের কারণে, বিশ্বের অতীব পুরোনো একটি নগরী ঢাকার গড়ে ওঠার ইতিহাস প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। যেমন মোগল আমলে ঢাকার নাম ‘জাহাঙ্গীরনগর’ করা, ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার বুকে ‘ইডেন গাডেন্স’ বিনির্মাণ বা পাকিস্তান আমলে নতুন ঢাকা সৃষ্টির প্রয়াসে ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’ স্থাপন সম্পর্কে আজকের দেশবাসী বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম কতটুকুই-বা জানে! অনুরূপ ‘ঢাকা’ নামের নামকরণ নিয়েও অনেক গপ্পো ও কাহিনি রয়েছে- ইতিহাসবিদেরা যে যাঁর মতো করে এসব নামের উৎপত্তি নিয়ে বিশ্লেষণও করেছেন। সর্বশেষ, সামরিক শাসক এরশাদের আমলে ঢাকার প্রাক-ঐতিহাসিক ইংরেজি বানানের নাম ‘Dacca’ হয়ে যায় ‘Dhaka’-তে। 

অবশ্য ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ঢাকার অনেক কিছু উলটপালট হয়ে গেছে। যেমন ১৬০০ শতাব্দীর শুরুতে মোগল শাসকেরা ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শুরু সেই ভূ-রাজনীতির। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে ঢাকার নামকরণ হতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি তখন ঢাকা থেকে রাজধানী অন্যত্র অপসারণের ষড়যন্ত্রও শুরু হয়। ইসলাম খাঁ, শাহ সুজা, মীর জুমলা, শায়েস্তা খাঁর আমলে ঢাকার প্রভূত উন্নয়নে ঈর্ষান্বিত হয়ে চক্রান্তকারীরা ১৭০০ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকা থেকে রাজধানী প্রথমে মুর্শিদাবাদে অতঃপর কলকাতায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন। এভাবে বারবার বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র, অবহেলা ও উন্নয়ন বৈষম্যে একদা যে ঢাকা বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছিল, সেই ঢাকা ১৮০০ শতাব্দীতে পরিণত হয় একটি জরাজীর্ণ জেলা শহরে। ১৮২৪ সালে বিশপ হারবার নামক  ইউরোপিয়ান নাগরিক ঢাকা ভ্রমণ করে তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন- ‘Dhaka is merely the wreck of its ancient grandeur; its trade is reduced to a sixteenth part of what it was, and all its splendid buildings, the castle of its founder Shah Jahangir, the noble mosque he built and places of the ancient Nawabs, the factories and churches of the Dutch, French and Portugese nations are all sunk into ruin and overgrown with jungle.’

অতঃপর দীর্ঘদিন পর ১৯০০ শতাব্দীর শুরুতে আরেক ভূ-রাজনীতিতে বঙ্গভঙ্গের (Partition of Bengal) মাধ্যমে ঢাকাকে পূর্ববাংলা ও আসামের রাজধানী হিসেবে ঘোষণার করা হলে কালজীর্ণ নগরীর উন্নয়নে বিশেষ করে তৎকালীন ঢাকার শহরতলিকে কলকাতার Eden Gardens এর মতো গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ গৃহীত হয়। ব্রিটেনের Garden City Concept-এর আদলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইনের উত্তরে দিলকুশা-মতিঝিল থেকে পশ্চিমে আজিমপুর-পলাশী ও উত্তরে ইস্কাটন-শাহবাগ এলাকায় বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ভবনাদি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মচারীদের বাসস্থানের সমন্বয়ে ওই পরিকল্পনাটি করা হয়। তন্মধ্যে রমনা এলাকায় Esplanade আকারে সুবিন্যস্ত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে লাটভবন ও অপরাপর অনেক স্থাপনা নির্মাণের কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু হয়। বর্তমান ঢাকার কেন্দ্রবিন্দুতে আজও ওইসব সড়ক অবকাঠামোর পরিকল্পনাদৃষ্টে সেই Garden City-এর ভাব পরিলক্ষিত হয়। 

কিন্তু, দুর্ভাগ্য ছিল- উল্লিখিত ভবনাদি ও অবকাঠামোর নির্মাণ শেষ হতে না-হতেই ঢাকা আবারও ষড়যন্ত্রে পড়ে। আকস্মিক বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে চলমান সব নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে, অল্প কিছুদিনে ঢাকা আবার তার গুরুত্ব হারায়। তবে এবার ঢাকার শিক্ষিত হিন্দু-মুসলিমরা একত্রিত হয়ে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী তথা পশ্চিম বাংলার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তখন তাঁরা সরকারকে কর-খাজনা প্রদানও বন্ধ করে দেয়। ওই সময় অনেকটা উপায়হীন অবস্থায় শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে ঢাকার উন্নয়নের প্রতি আবার নেক নজর দেয়। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়াও শুরু হয় তখন। পাশাপাশি মুম্বাই ও মাদ্রাজ নগরীর পরিকল্পনা উপদেষ্টা বিশিষ্ট ব্রিটিশ জীব ও সমাজবিজ্ঞানী প্যাট্রিক গ্যাডেসকে ঢাকাকে সার্বিকভাবে উন্নয়নের লক্ষ্যে একটা পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নিযুক্ত করা হয়। ১৯১৭ সালে গ্যাডেসের দাখিলকৃত ‘Report on Town Planning, Dacca’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে অনেক ধরনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু তখন সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তথা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঢাকার উন্নয়ন তেমন গুরুত্ব পায়নি অর্থাৎ গ্যাডেসের সুপারিশ মালার মাত্র যৎকিঞ্চিত বাস্তবায়িত হয়। যেমন বঙ্গভঙ্গের পর যেসব ভবনাদির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার প্রায়ই ডিজাইনে পরিবর্তন এনে নতুন আঙ্গিকে নির্মাণ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। লাট ভবনকে পরিণত করা হয় আদালত ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবহারে; কার্জন হল ও ঢাকা হলকে পরিণত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান-বিষয়ক অনুষদ ও ছাত্রদের হল হিসেবে; সচিবালয় হিসেবে পরিকল্পিত ভবনে স্থাপিত হয় মেডিকেল কলেজ; ছাপাখানা ভবনকে পরিণত করা হয় প্রকৌশল বিদ্যালয়ের অংশ হিসেবে।

আর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তোপখানা ও নবাব আবদুল গণি রোডের মাঝে নির্মিত ইডেন বিল্ডিংয়ে পূর্ববাংলার প্রশাসনিক দপ্তর স্থাপিত হয়। প্রসঙ্গক্রমে তৎকালীন কলকাতার কেন্দ্রস্থলে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ইডেনের নামে Eden Gardens গড়ে তোলা হয়। পাকিস্তান আমলে ওই ইডেন বিল্ডিংয়ে স্থাপিত হয় প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার সচিবালয়। তখন হাতেগোনা কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছিল। স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে ৪৮টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পররাষ্ট্র, পরিকল্পনা, শিল্প ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্যান্য সব মন্ত্রণালয় এই সচিবালয় কমপ্লেক্সে অবস্থিত। প্রতিদিন সারা দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ তাদের বিভিন্ন কাজে সচিবালয় আসে। আগে সচিবালয়ে আগত বাইরের কর্মকর্তা ও মানুষজনের গাড়ি ভেতরে প্রবেশ ও পার্কিং করতে দেওয়া হলেও নিরাপত্তাজনিত কারণ তথা পার্কিং স্পেসের অভাবে বিগত কয়েক বছর থেকে তা বন্ধ রয়েছে। সচিবালয়ের স্টিকারবিহীন কোনো গাড়িকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়না। ফলে সচিবালয়ে আগত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও মানুষের গাড়ির চাপে আবদুল গণি রোডসহ পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজটের। আর যেদিন সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভা বসে সেদিন তো পুরো নগরীতে সৃষ্টি হয় বেহাল অবস্থার।

প্রসঙ্গক্রমে ঢাকার মহাপরিকল্পনায় সচিবালয় কমপ্লেক্সটি বর্তমান জায়গায় স্থাপন করার কথা ছিল কি না, তা অস্পষ্ট। কারণ, ১৯৫৯ সালে প্রণীত মহাপরিকল্পনায় সচিবালয়ের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে যেহেতু মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের দপ্তর (পরে যা বঙ্গভবনে রূপান্তরিত করা হয়) তথা সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরসমূহ অত্র এলাকায় অবস্থিত, সে বিবেচনায় হয়তো-বা সচিবালয়টি এখানেই রয়ে যায়। সে সময় ইডেন বিল্ডিং কমপ্লেক্সে কয়েকটি দুই-তিনতলাবিশিষ্ট ইমারতে সচিবালয়ের কার্যক্রম চলত। মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ও কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সচিবালয় কমপ্লেক্সের বিল্ডিংগুলোর উচ্চতা বাড়ায় এবং আরও কয়েকটি নতুন ও ২২ তলাবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্পেস স্বল্পতায় কিছু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টিনশেডে অফিস করে, যেগুলো মূলত সচিবালয়ের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারীদের বসবাসের জন্যই নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে অবস্থা এমনই যে কোনো একটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরই সচিবালয়ে পরিপূর্ণভাবে বসার জায়গা হয় না, ফলে অনেক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম চলে কোনো রকমে। এতে ভোগান্তির শিকার হতে হয় সেবা গ্রহণে আগত মানুষদেরকে।

যেহেতু সচিবালয় কমপ্লেক্সটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি এবং জায়গার স্বল্পতাসহ সম্প্রসারণেরও সুযোগ নেই, সেই পরিপ্রক্ষিতে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পরিকল্পিতভাবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নেন। তিনি শেরেবাংলা নগরের লুই আই কানের পরিকল্পনাতে সংশোধনী এনে সংসদ ভবনের উত্তরে খালি জায়গায় তৎকালীন ২৭টি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর ওই উদ্যোগটি হারিয়ে যায়। অতঃপর সেখানে একটি জাতীয় কবর স্থাপনসহ আরও বিভিন্ন কিছুর নির্মাণ ও স্থাপন করা নিয়ে শুরু হয় অপরাজনীতির। তন্মধ্যে ১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের কবর স্থাপন করা ছিল খুবই আলোচিত বিষয়। কারণ, দুনিয়ার কোনো জায়গায় রাষ্ট্রীয় স্থাপনার মধ্যে বা প্রাঙ্গণে এ ধরনের স্থাপনা নেই বা করা হয় না বলা যায়। অনুরূপ দক্ষিণাংশে লুই কানের পরিকল্পনায় সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দিন খান, মুসলিম লীগ নেতা সবুর খান, সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ও সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়ার করর দেওয়া নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে। সে সঙ্গে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে আরেক ধরনের রহস্যজনক রাজনীতিতে শেরেবাংলা নগর ও গণভবন এলাকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ক্রিসেন্ট লেক ও জিয়াউর রহমানের কবর এলাকাটিকে যথাযথভাবে উন্নয়ন করে সেখানে নতুন করে একটি মসজিদ নির্মাণসহ জায়গাটির নাম রাখা হয় ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’। তখন অবশ্য জিয়াউর রহমানের কবরের উত্তরাংশের অবশিষ্ট জায়গায় নতুন সচিবালয় নির্মাণেরও প্রচেষ্টাও চলে। ওই অবস্থায় ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর চন্দ্রিমা উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে ‘জিয়া উদ্যান’ রাখা এবং ক্রিসেন্ট লেকের ওপর প্রথমে ঝুলন্ত সেতু ও পরে দ্বিতীয় মেয়াদে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

এদিকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিজড়িত কার্যালয় গণভবনকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর কিছুদিন পর জেদাজেদির রাজনীতিতে ক্রিসেন্ট লেকের ওপর জিয়াউর রহমানের কবরে যাওয়ার জন্য নির্মিত ঝুলন্ত সেতুটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সে সময় জিয়াউর রহমানের কবরের উত্তরাংশের অবশিষ্ট জমিতে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রস্তাবিত সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রচেষ্টা চলে, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তখন বিষয়টি তেমন এগোয়নি। তবে ১৯৯৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ন্যাম সম্মেলন আয়োজনকে কেন্দ্র করে আগতব্য রাষ্ট্রীয় অতিথিদের থাকার ব্যবস্থাকরণে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের একদিকে (মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পাশে) সম্পূর্ণ ভিন্নতর ডিজাইনে বহুতল আবাসন কমপ্লেক্স নির্মাণ (যা অতঃপর সাংসদদের আবাসন হিসেবে ব্যবহত হচ্ছে) এবং অন্যদিকে সচিবালয় নির্মাণের জন্য চিহ্নিত জায়গার অংশবিশেষে আধুনিক ডিজাইনে চীন মৈত্রী কমপ্লেক্স (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার) নির্মাণ করায় লুই কানের পরিকল্পনা তথা সচিবালয়ের জন্য চিহ্নিত স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় স্থাপনের সম্ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

উইকিপিডিয়া

বাস্তবে, লুই কানের প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে উল্লেখিত বিভিন্ন স্থাপনা এমনকি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমেও কিছু স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। তন্মধ্যে ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের পশ্চিমে একটা সিএনজি ফিলিং স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন নির্মাণ নিয়ে লুই কানের মূল পরিকল্পনার ব্যত্যয়ের অভিযোগে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও পরিবেশবিদেরা একপর্যায়ে রাস্তায় নেমে আসেন। অতঃপর তাঁরা সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে মামলাও রজ্জু করে বসেন। আর উচ্চ আদালতও লুই কানের পরিকল্পনা মোতাবেক সেখানে সবকিছু নির্মাণের জন্য নির্দেশ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে কে কার কথা শোনে! আইন ও বিচারের ফাঁকফোকরে (মামলাটি চলমান অবস্থায়) স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসা নির্মাণ শেষ করে ইতিমধ্যে তাঁরা সেখানে বসবাসও করছেন। সর্বশেষ, সংসদ ভবন এলাকার পূর্ব পাশে খেজুর বাগানের ওপর দিয়ে মেট্রো রেলের (MRT-6) রুট টানা নিয়ে তো সরকার ও উল্লেখিত পেশাজীবী মহল মুখোমুখি অবস্থানে, যাতে মেট্রোরেল প্রকল্পটির ডিজাইন চূড়ান্তকরণ ও নির্মাণকাজ শুরুতে বিলম্ব হচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ!

আসলে এসব বিভিন্ন কারণে এত দিন সেখানে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘদিন পর ঢাকায় যানজট ও জলজটের ভয়াবহতায় বিশেষ করে নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সচিবালয়ে আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগের কারণে আবদুল গণি রোড থেকে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের নিমিত্ত সেখানে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য একনেক সভায় প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবটি গ্রহণ না করে তিনি এটি ওই প্রকল্প স্থপতি লুই আই কানের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা সাংঘর্ষিক কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দেন এবং সে সঙ্গে লুই কানের মূল পরিকল্পনা সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন। এ জন্য লুই কানের মূল পরিকল্পনাটি সংগ্রহে তিনি প্রায় ৪ কোটি টাকা পরিশোধেরও নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে ২০০৯ সালেও আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের কথা উঠেছিল, কিন্তু তখন বিষয়টি আর তেমন এগোয়নি।

এখানে উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শাসনামলে ১৯৬১-৬২ সালে ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদের আদলে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর নামে (‘আইয়ুব নগর’) একটি Second Capital প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে ওই পরিকল্পনাটি প্রণীত হয়। অথচ ঢাকার মূল মহাপরিকল্পনায় (১৯৫৯ সালের) এ ধরনের কিছু নির্মাণের জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে জিনজিরা-কেরানীগঞ্জকে উপযুক্ত স্থান বলে উল্লেখ করা হয়। মহাপরিকল্পনায় তেজগাঁও বিমানবন্দরের পশ্চিমে এই জায়গাটিকে Experimental Farms হিসেবে উন্নয়নের জন্য সুপারিশ করা হয়। সে সময় সেখানে ধান-পাট ও অন্যান্য কৃষিজ সামগ্রীর গবেষণাকেন্দ্র, কৃষি কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সে থেকে সার্বিকভাবে জায়গাটিও খামারবাড়ি বা Farm Gate নামে বিকশিত হতে থাকে। অথচ ১৯৬০ সালে ঢাকার মহাপরিকল্পনা অনুমোদনের পর সরকারিভাবে প্রথম এখানে পরিকল্পনাটির ব্যত্যয় ঘটানো হয়। যদি তখন মহাপরিকল্পনার সুপারিশ মোতাবেক বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে Second Capital-টি স্থাপিত হতো, আজ নিশ্চয় বুড়িগঙ্গা নদীর এই অবস্থা হতো না এবং নগরীর উত্তর-দক্ষিণ Balanced Growth-ও হতো।

অন্যদিকে জানা মতে, ঢাকায় Second Capital স্থাপন ও পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স নির্মাণে লুই কানের পরিকল্পনাটি ছিল অনেকটা Conceptual এবং তেজগাঁওস্থ বিমানবন্দর সড়কের পশ্চিমে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ ধান-পাট গবেষণা কেন্দ্র থেকে উত্তরে আগারগাঁওস্থ কৃষি কলেজ এলাকা পর্যন্ত তাঁর পরিকল্পনার পরিধি ছিল। সে ভিত্তিতে পাকিস্তান আমলেই দক্ষিণাংশে লুই কানের পরিকল্পনা ও স্থাপত্য ডিজাইনের ভিত্তিতে সংসদ ভবনের কাঠামো (Civil Structure) নির্মাণ সম্পন্ন হলেও সেখানে জাতীয় কবরস্থান প্রতিষ্ঠা ও উত্তরাংশের জায়গায় নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনাগুলো তাঁর প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা মোতাবেক করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বরাবর বিতর্ক চলছে। লুই কান কর্তৃক আদৌ উত্তরাংশের জায়গার উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে কি না এবং হলেও এর কোনো কপি সরকার বা স্থাপত্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, ১৯৬৪-৬৫ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিশীলতায় পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে, যখন অর্থাভাবে সংসদ ভবন নির্মাণের কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় স্থপতি লুই কানকে তাঁর প্রাপ্য পরামর্শক ফি পরিশোধ না করায় তিনিও তাঁর লোকজন নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করে চলে যান এবং প্রকল্পের নকশা কারও কাছে হস্তান্তর করে যাননি।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে লুই কান ঢাকা এলেও তিনি নিজে আর প্রকল্পটির সঙ্গে তেমনভাবে সম্পৃক্ত হননি। তবে তাঁর মনোনীত David Wisdom and Associates (DWA) নামক একটি মার্কিন উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে সংসদ ভবনের ফিনিশিং কাজ শুরু করা হয়। সে সঙ্গে মূল প্রকল্পস্থ অন্য স্থাপনাসমূহের বিস্তারিত নকশা প্রণয়নসহ উত্তরাংশের জায়গার পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ১৯৭৫-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিয়োজিত উপদেষ্টাকে তাঁদের কাজের ফি পরিশোধ না করায় তাঁরা (DWA) দেশ ছেড়ে চলে যান। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বা স্থাপত্য অধিদপ্তরের কাছে লুই কানের পরিকল্পনার মূল কপি নেই। অর্থাৎ ৪০ বছর ধরে যে সরকার যেভাবে ও যা চেয়েছে সেভাবে লুই কানের প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনার ছায়া কপির ওপর ঘষামাজা করে আইয়ুব খানের Second Capital বা আজকের শেরেবাংলা নগর এলাকার উন্নয়ন ও বিস্তার ঘটিয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে, লুই কানের মুল পরিকল্পনা বা প্রস্তাবনায় সেখানে আজকের গণভবনটিও হওয়ার কথা ছিল কি না, তাও অস্পষ্ট! কারণ, একটা অতীব ব্যস্ত সড়ক (মিরপুর সড়ক) ঘেঁষেই কখনো পরিকল্পনাবিদ/স্থপতিরা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের সুপারিশ করতে পারে না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং আবার রাষ্ট্রপতি হলেও অজ্ঞাত কারণে তিনি বঙ্গভবনে অফিস না করে প্রথমে রমনা পার্কের পূর্বদিকে বেইলি-মিন্টুর সংযোগস্থলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনটিকে (সুগন্ধা) প্রথমে ‘গণভবন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সেখানে তিনি বৈকালিক অফিস করতেন। অতঃপর ১৯৭৩-৭৪ সালে শেরেবাংলা নগরে গণভবনের স্থানে বিদ্যমান (যা প্রকৃত কী উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হয়েছিল তা অজ্ঞাত) স্থাপনাকে সংস্কার ও অধিকতর সম্প্রসারণ করে সেখানে বঙ্গবন্ধু তাঁর বৈকালিক অফিস স্থাপন করেন এবং সংলগ্ন জলাশয়ে (ক্রিসেন্ট লেকে) তিনি মৎস্য চাষ করতেন ও মাছ ধরতেন বলে প্রকাশ। ওই সময় তিনি গণভবনের উত্তর-পূর্ব দিকের বিস্তীর্ণ খালি জায়গায় একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই করার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় বিভিন্ন সরকারের আমলে লুই কানের লাল ইটের ডিজাইনে পরিকল্পনা কমিশন/সচিবালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল (পূর্বের ‘আইয়ুব হাসপাতাল’), শিশু হাসপাতাল ইত্যাদির উন্নয়ন ও অধিকতর সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা/ প্রতিষ্ঠানকে (বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইত্যাদি) তাদের অফিস নির্মাণের জন্য জমিও বরাদ্দ করা হয়। এভাবে বিভিন্ন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অভিপ্রায় ও নির্দেশনায় স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত নকশার ভিত্তিতে পুরো জায়গাটি সার্বিকভাবে আজকের এই অবস্থায় দাঁড়ায়।

এই অবস্থায় শেরেবাংলা নগর এলাকায় নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণ, নগরীর সার্বিক পরিস্থিতি ও দৃষ্টিকোণ থেকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য ও উপযুক্ত হবে তা নিয়ে সর্বমহলে আলোচনা চলছে। লুই কানের মূল পরিকল্পনা বা ১৯৭৪ সালের সংশোধিত পরিকল্পনায় সেখানে সচিবালয় নির্মাণের প্রস্তাব বা জমি চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না এবং নগরীর বর্তমান অবস্থায় সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণ করা ঠিক হবে, নাকি এটি অন্যত্র নির্মাণ করা উচিত তা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। আরও অদ্ভুতভাবে সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রীর আজব ধরনের কথাÑ লুই কানের নকশায় জিয়াউর রহমানের মাজার নির্মাণের জন্য জায়গা সংরক্ষিত ছিল কি না ((মন্ত্রীর ভাষায়, ‘লুই কানের নকশায় জিয়ার কবর আছে কি না’), তাও নাকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন! দুর্মুখ লোকজনের কথা-  Second Capital বা ‘আইয়ুব নগর’-এর পেিকল্পনা প্রণয়নকালে লুই কান কি জানতেন সেখানে একসময় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে কবর দেওয়া হবে!! সত্যিকার অর্থে, সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের লোকজনের এ ধরনের কথাবার্তা সাধারণ মানুষজনের মধ্যে হাস্যরসেরই সৃষ্টি করে বটে। এমনিতে সচেতন মানুষজন তো জাতির অহংকারের এই জায়গাটিতে কবরস্থান বানানো ও অন্যান্য বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণসহ সেগুলোর নাম পরিবর্তনের খেলায় খুবই ক্ষুব্ধ।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থানটিতে সচিবালয় নির্মাণ করা হলে যানজট সমস্যার প্রকটতা আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ, ওই স্থানের সঙ্গে কোনো দিকে সরাসরি সংযোগ সড়ক নেই। রোকেয়া সরণি তথা বঙ্গবন্ধু কনভেনশন সেন্টারের সম্মুখ থেকে তেজগাঁওস্থ পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের নিচ দিয়ে জাহাঙ্গীর গেটের সম্মুখ পর্যন্ত টানেল নির্মাণের মাধ্যমে যেই সংযোগ সড়কটি হওয়ার কথা ছিল, তাও একটি মহল বিশেষের প্রভাবে আটকে গেছে। বর্তমানে ওই সড়কটি পশ্চিম দিকে মিরপুর সড়কের সঙ্গেও সরাসরি সংযোগ করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন যেসব লোকজন এই জায়গায় (সচিবালয়ে) আসবেন, তাঁদের থাকার জন্যও আশপাশে প্রয়োজনীয় হোটেল নেই, যা বিদ্যমান সচিবালয়ের আশপাশে দেখা যায়। এতদ্্ভিন্ন সংসদ ভবন ও গণভবনের অতি সন্নিকটে বহুতলবিশিষ্ট সচিবালয় নির্মাণ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার (KPI) ঝুঁকির বিষয়টিও রয়েছে। এমতাবস্থায় ২৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে (যা প্রচলিত নিয়মে বাস্তবায়নকালে বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ হয়ে যেতে পারে) সমস্যাসঙ্কুল এই জায়গায় নতুন সচিবালয় নির্মাণ না করে নগরবিদেরা এটি পূর্বাচল নতুন শহরে বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে নির্মাণের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে ঢাকার আশপাশে যোগাযোগব্যবস্থার দৃষ্টিতে পূর্বাচল সবচেয়ে উত্তম জায়গা। রাজউকের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই নতুন শহরে একটি সেক্টর প্রশাসনিক ব্লক হিসেবে চিহ্নিত আছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসভবন নির্মাণের জন্যও সেখানে জায়গা সংরক্ষিত আছে। ইতিমধ্যে সেখানে প্লটবরাদ্দ প্রদান সম্পন্ন করে বর্তমানে প্রকল্পের বিবিধ উন্নয়নকাজ চলছে। কুড়িল মোড়ে একটি দৃষ্টিনন্দন ট্রাফিক ইন্টারচেঞ্জ ৩০০ ফুট চওড়ায় পূর্বাচল সংযোগ সড়কের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। অতি সম্প্রতি সড়কটির উভয় পাশে ১০০ চওড়ায় দুটি খাল খননের জন্য আরেকটি প্রকল্প গৃহীত হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে পূর্বাচল শহরে প্রবেশে বৈচিত্র্যতা আনবে এবং সবাইকে আকর্ষণ করবে। পূর্বাচল প্রকল্পের ওপর দিয়ে ঢাকা বাইপাশ সড়কটিও ক্রস করেছে, যেটিকে অধিকতর চওড়া ও সম্প্রসারণ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগসহ দেশের অন্যান্য বিভাগ ও জেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজীকরণের পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। পূর্বাচল সংযোগ সড়কের ওপর দিয়ে মেট্রোরেলের একটি রুট নির্মাণেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে নগর অভ্যন্তর থেকে পূর্বাচলে যাওয়া-আসা অনেকটা সহজ হবে। অন্যদিকে, ইতিমধ্যে সরকার চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় পূর্বাচলে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তা ছাড়া ইতিমধ্যে সেখানে একটি নতুন ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণেরও ঘোষণা এসেছে। অনুরূপ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গলফ কোর্স, ইকো পার্ক, লেক উন্নয়নসহ অন্যান্য বিভিন্ন সুবিধাদির সংস্থান রয়েছে। এলাকাটি ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার পরিধির বাইরে বিধায় সেখানে ভিন্নভাবে একটি পৌর সভা বা সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা প্রতিষ্ঠার সুপারিশ রয়েছে এবং এসব কার্যক্রমের জন্য সেখানে জায়গার সংস্থান রয়েছে।

কাজেই, পূর্বাচল ও এর চতুর্দিকে প্রস্তাবিত বেসরকারি প্রকল্পগুলোকে যদি যৌথ প্রয়াসে সমন্বিতভাবে Re-Planning ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে এখনো সেখানে একটি Self-Contained Town গড়ে তোলা ও ঢাকার বিকল্প নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এভাবে পূর্বাচলকে ঢাকার বিকল্প প্রশাসনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলে সেখানে মতিঝিল-দিলকুশা-হাটখোলা-গুলিস্তানে আবদ্ধ রাষ্ট্রপতি ভবন, তেজগাঁও-বিমানবন্দর সড়ক-বিজয় সরণির মহা যানজটস্থল থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, বেইলি-মিন্টু রোড থেকে মন্ত্রীপাড়া, গুলশান-বনানী-বারিধারার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের দপ্তর ও বাসভবন ইত্যাদিও সুপরিকল্পিতভাবে সেখানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। যার মাধ্যমে Push & Pull হিসেবে পূর্বাচল শহরটির উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে। এ জন্য যথাযথভাবে পূর্বাচল প্রকল্পের পুনঃপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সমন্বিতভাবে উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি  New Capital Development Authority গঠন করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি, ২০১৬

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top