শীত এলে প্রকৃতির সঙ্গে বদলে যায় আমাদের অভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনাচরণ। অন্দরসজ্জা পাল্টে যায় সেই ছন্দের তালে। শীতে আরাম ও প্রয়োজন- দুটোকে মাথায় রেখেই নির্বাচন করতে হয় অন্দরসজ্জার উপকরণ। শীতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডা কিংবা হালকা হিমেল বাতাস দুটোই কিন্তু ঋতুবৈচিত্র্যের আমেজে ভরপুর। তবে ঘরের ভেতরেও আনুষঙ্গিক বাড়তি কিছু সতর্কতা খুব প্রয়োজন শীতের এই মৌসুমে। শীতের সময়টাতে একটু গুছিয়ে চললে যেমন আপনার ঘরবাড়ির সৌন্দর্য বেড়ে যাবে কয়েকগুণ, তেমনি বাড়িতে থাকা অবস্থায় শীতের হাত থেকেও বেঁচে যাবেন। শীতের সময় দিনে সূর্যের আলো পাওয়া যায় অল্প। এই অল্প আলোকেও ব্যবহার করে আলোকিত করা যেতে পারে পুরো ঘরকে। সে জন্য দরকার শুধু একজন দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শ। শীতকালে চারদিকে সবকিছুই থাকে শুষ্ক, রুক্ষ। শীতকালের আবহাওয়া তো এমনই সেটা তো আর পাল্টানো সম্ভব নয় বরং ঘরের মধ্যে কিছু জিনিস অদল-বদল করে বাড়াতে পারেন ঔজ্জ্বল্য, যাতে ঘরও হয়ে উঠবে উষ্ণ।
শীত তাড়াতে রং
ঘরে উষ্ণ ভাব আনতে দেয়ালো রঙের জুড়ি নেই। দেয়ালের রং পাল্টে দিতে পারে পুরো পরিবেশকে। আমরা গ্রীষ্মকালে ঘরের সাজে হালকা রঙের প্রাধান্য দিই। কিন্তু শীতের সাজ হবে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। শীতকালে ঘরে থাকবে গাঢ় আর উজ্জ্বল রঙের সমারোহ। এ সময়ে হালকা বা ¤øান রঙের বদলে লাল, নীল, হলুদ, কমলার মতো গাঢ় রং ছড়িয়ে দিতে পারেন আপনার ঘরের চার দেয়ালে। এর ফলে শীতের হিমেল হাওয়া খুব একটা জবুথবু করতে পারবে না আপনার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে। আবার গাঢ় ও উজ্জ্বল রঙে ঘরের প্রতিটি কোণ থাকবে দারুণ উষ্ণ আর আরামদায়ক। যাঁদের রং করাটা ঝামেলার মনে হয় অথবা যাঁদের অন্দর আগে থেকেই সাদা রঙে রাঙানো, তাদের চিন্তার কারণ নেই। দেয়ালের রং পরিবর্তন করতে না চাইলে ব্যবহার করতে পারেন ওয়ালপেপার। বর্তমানে বাজারে নানা ধরনের ডিজাইন আর নকশার ওয়ালপেপার পাওয়া যাচ্ছে। ঠিকভাবে দেয়ালের জন্য ওয়ালপেপার নির্বাচন করে আপনিও বাড়িয়ে তুলতে পারেন ঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য।
আলোর খেলা
শীতের দিনে আলোর পরিমাণ বাড়াতে ঘরের যে স্থানটিতে আলো পড়ছে, সেখানে সুবিধামতো আয়না স্থাপন করে রিফিলেক্টের মাধ্যমে আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন সর্বত্র। এ সময় প্যাচারালের তুলনায় ঘরে কৃত্রিম আলোর ওপর বেশি নির্ভরশীল থাকতে হয় বলে লাইটিংয়ের মাধ্যমে ঘরের পরিবেশে আনতে পারেন উষ্ণতার আমেজ। বাজারে আজকাল নানা ধরনের, নানা সাইজ ও রঙের ল্যাম্প শেড পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে বেডরুমের পাইটিংয়ের জন্য ওয়াম আলো যেমন হলুদ, লাল, কমলা, বেগুনি ব্যবহার করতে পারে। বেডরুমের বেডের হেড রেস্টের দুই পাশে অথবা সাইড দিয়ে লাইটিং সিস্টেম করলে ভালো। ঘরের কোনো এক কর্নারে অথবা বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে দিতে পারেন ডেকোরেটিভ ল্যাম্পশেড। তা ছাড়া বেডের ওপর অথবা এক কর্নারে ফলস সিলিং ডিজাইন করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের লাইট ব্যবহার করে তৈরি করতে পারেন অসাধারণ এক পরিবেশ।
দেয়ালে ব্যবহার করতে পারেন ওয়াল মাউন্ট লাইট। ডাইনিং স্পেসের আলো সাধারণত সলিড হয়ে থাকে। তাই স্যান্ডেলিয়ার ও বিভিন্ন ধরনের ল্যাম্পের ব্যবহার করে রুমে আনতে পারেন বৈচিত্র্য। ডাইনিং টেবিলটিকে সাজানো যেতে পারে কালারফুল সব মোমবাতি দিয়ে। অসাধারণ একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এই ক্যান্ডেল লাইট ডিনার।
বসার ঘরের একপাশ বেছে নিতে পারেন ডেকোরেশনের জন্য। সেই কর্নারে বিভিন্ন ধরনের মাটির পটারির সঙ্গে রাখতে পারেন বাঁশ ও বেতের ল্যাম্প সেড। সিলিংয়ের বিভিন্ন কর্নারে ঝুলিয়ে দিতে পারেন বিভিন্ন ধরনের হ্যাংগিং লাইট। খাবার টেবিলের ওপর পছন্দসই শেডযুক্ত পেনডেন্ট লাইটের ব্যবস্থা রাখতে পারেন। খাবার টেবিল বরাবর সিলিং থেকে ছোট-বড় কয়েকটি হ্যাংগিং লাইটও ঘরের পরিবেশে যোগ করবে ভিন্নমাত্রা।
ছোটদের ঘরেও ব্যবহার করুন বিভিন্ন ডেকোরেটিভ লাইট। যেমন খেলার ঘর সাজাতে পারেন রিকশা, সাইকেল, জিপ, ফুটবল, প্রজাপতি, ফুল ইত্যাদির আদলে তৈরি সিলিং হ্যাংগিং লাইট দিয়ে। পড়ার টেবিলে রাখার জন্য মজার ছড়া বা কবিতা লেখা ল্যাম্পশেডও এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
ঘরজুড়ে কার্পেট
শীতে প্রিয় অন্দরে উষ্ণ আবহ দেয় রকমারি কার্পেট। যদিও শৌখিন অন্দরসজ্জার এ উপকরণ রুচিশীল বাড়ি ও অফিসে সব ঋতুতেই ব্যবহারযোগ্য। তবে শীতে কার্পেট হয়ে পড়ে আরাম ও প্রয়োজন দুটোই। অন্দরশৈলীর অন্যতম অনুষঙ্গ কার্পেট সাধারণত ঘরের আকার, আসবাবের ধরন, দেয়াল ও পর্দার রং ইত্যাদির সঙ্গে মিলিয়ে মেঝেতে জুড়ে দেওয়া হয়। ঘরের আবহ ও গোছানো ভাব অনেকটাই নির্ভর করে কার্পেটের রং ও ডিজাইনের ওপর।
ছোট ঘরজুড়ে হালকা একরঙা অথবা স্বল্প কারুকাজের কার্পেট ও বড় ঘরে ভারী কাজের কার্পেট ভালো লাগে। কখনো ঘরজুড়ে কার্পেট না বিছিয়ে জায়গা ও আসবাব বুঝে ছোট, মাঝারি ও গোলাকার কার্পেট বিছালে ভালো লাগে। কার্পেট ব্যবহারের সময় আকার ও রং নির্বাচন করাটা খুব জরুরি। মাথায় রাখা প্রয়োজন, ঘরের আলোর ব্যবস্থার কথাও। আমাদের দেশের আবহাওয়া যেমন, তাতে বলতে গেলে সারা বছরই বাতাসে ধুলাবালুর প্রকোপ থাকে বেশি। শীতে তো এমনিতেই ধুলোবালু বেশি জমে। খুব সহজে কার্পেটে ধুলো ময়লা আটকায়। তাই পরিষ্কারের সুবিধার্থে ও যাঁদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের একটু চিন্তা করে কার্পেট ব্যবহার করা উচিত। বাজারে উলেন, হ্যান্ডমেড উলেন, অ্যাক্রেলিক, পিভিসিসহ নানা ধরনের কার্পেট পাওয়া যায়। ঘরের রঙ, ফার্নিচার, পর্দা, কুশন আর বেড কভারের সঙ্গে মিল রেখে বাছাই করুন কী ধরনের আর কী রঙের কার্পেট আপনি নির্বাচন করবেন। দেশীয় আমেজ আনতে নানা রকমের শতরঞ্জিও ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া ঘরে ধুলো যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য প্রতিটি রুমে দরজার সামনে পাপোশ কিংবা ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
পর্দায় উষ্ণতা
যেহেতু শীতের দিনে ঠান্ডার একটা ব্যাপার থাকে, তাই এ সময় সাধারণত ডাবল লেয়ার পর্দা ব্যবহার করা উত্তম। এতে ঘরে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করতে বাধা পাবে কিছুটা। ডাবল পর্দা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ঘরে তুলনামূলক ঠান্ডা একটু কম লাগবে। আর যদি সিঙ্গেল পর্দা হয় তবে সে ক্ষেত্রে পর্দার কাপড় একটু ভারী নির্বাচন করতে হবে। পর্দার কাপড়গুলো সাধারণত নির্বাচন করার সময় যে বিষয়টি লক্ষ রাখতে হবে তা হলো দেয়ালের রং ও লাইটিংয়ের সঙ্গে যেন সাদৃশ্যপূর্ণ থাকে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পর্দার কাপড়ের রং উজ্জ্বল হলে ঘরে আসবে উষ্ণ আমেজ। ডাবল লেয়ার পর্দার ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট রং ব্যবহার করলে ঘরে পাবেন নান্দনিকতার ছোঁয়া। পর্দার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কুশন কভার, বেড কভার, সোফা কভার নির্বাচন করুন। শীতকাল যেহেতু ফুলের জন্য উপযুক্ত সময় তাই ফেব্রিক্সের ক্ষেত্রে ফ্লোরাল প্রিন্টকে প্রাধান্য দিতে পারেন। এর সঙ্গে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় তাজা ফুলের ব্যবহার আপনার মনকে আরও প্রফুল্ল করবে।
সবুজে উষ্ণতার ছোঁয়া
শীতের সময় উজ্জ্বল রঙের ইনডোর প্ল্যান্ট শুধু আপনার ঘরের শোভাই বাড়াবে না, আপনার ঘরকে দূষণমুক্ত রাখবে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা শুষে নিয়ে ঘরকে রাখবে উষ্ণ। শীতকালে কুয়াশার কারণে দূষণের পরিমাণ কিন্তু বছরের অন্য সময় থেকে বেশিই থাকে। তাই শীতকালের অন্দর সজ্জায় ইনডোর প্ল্যান্ট ঘরের আর্দ্রতার পরিমাণে ভারসাম্য রক্ষা করে ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে উষ্ণ রাখে। এই ধরনের বেশ কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট বাজারে পাওয়া যায়, যা আমাদের দেশের শীতকালীন আবহাওয়ায় উপযুক্ত। অ্যাসপ্যারাগাস ফার্ন, বোস্টন ফার্ন, অ্যাকালিক হিসপিডা, গোল্ডেন হানি, পামগাছ, মানি ফ্যান্ট, পিস লিলি, ডারবেরা, ¯েœক প্ল্যান্ট ইত্যাদি ইনডোর প্ল্যান্ট দিয়ে সাজিয়ে তুলুন আপনার সাধের অন্দর। এ ছাড়াও বিভিন্ন রকম ক্যাকটাস এই শীতে আপনার অন্দরসজ্জায় যোগ করবে অন্য মাত্রা। এমনিতে বেশির ভাগ ইনডোর প্ল্যান্ট অল্প হাওয়া-বাতাসেই দিব্যি তরতাজা থাকে। তবে শীতের রুক্ষ পরিবেশে এদের একটু অতিরিক্ত যত্নআত্তির প্রয়োজন আছে বৈকি! ফার্ন-জাতীয় গাছের বেড়ে ওঠার জন্য আর্দ্রতার প্রয়োজন। শীতকালে মাঝেমধ্যে এদের বাথরুমে বা কোনো ভেজা জায়গায় রাখুন। যাতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা শুষে নিতে পারে।
শীতকালে খুব তাড়াতাড়ি গাছে ধুলো-ময়লা জমে। এতে সংক্রমণের ভয় থাকে। তাই গাছ রাখুন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গাছগুলো যাতে ভালো করে সূর্যের আলো পায় সেই ব্যবস্থা করুন। সকালের আলো গাছের জন্য উপযুক্ত।
প্রয়োজনীয় টিপস
শীতকালে ঘরে ভারী কার্পেট না রাখাই ভালো। এতে ধুলাবালু জমে বেশি। পাতলা কার্পেট কিংবা ম্যাট রাখুন।
উল কিংবা ভেলভেটের বেডসিট ব্যবহার করতে পারেন। শীতে যা আরামদায়ক হবে বেশ।
দিনের বেলা ঘরে যেন রোদ আসতে পারে সেটা নিশ্চিত করাটা জরুরি।
আপনার বাসার গাছগুলো যদি কোনো কাচের জানালার পাশে রাখা থাকে তবে জানালার কাচ ভেতর ও বাহির দুই দিক থেকেই পরিষ্কার করুন। যাতে করে গাছ প্রচুর পরিমাণে আলো পায়।
চিফ অপারেটিং অফিসার
ইকো ইনোভেটরস
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯