বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সাগর উপকূলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা বাংলাদেশের জন্য খুবই সাধারণ ব্যাপার। বছরের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের নিচু-সমতল এলাকা বর্ষার পানিতে জলমগ্ন থাকে। এটি বাংলাদেশের জন্য এক অতিবাস্তবতা।
বন্যা বাংলাদেশের কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয়। এই দুর্যোগ প্রায় বছরেই হয়ে থাকে একই নিয়মে। ফুঁসে উঠা জলরাশি আর উজানের ঢলের ধারায় প্রতি বর্ষায়ই কমবেশি বন্যার আশঙ্কা থাকে। বর্ষা ও বন্যার নিয়ম অনুযায়ী এ সময় সামান্য উঁচু জমির মাটি জলের স্রোতে ভেসে যায়। দেখা দেয় ভাঙ্গন মাটির বুকে। ভাঙ্গনে ভেসে যায় বাড়িঘর আর প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন।
সময়ের ব্যবধানে স্থাপত্যকলায় অনেক কিছুই সংযোজিত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। সময়োপযোগী বাড়ি বানানোর প্রতিযোগিতায় প্রান্তিক মানুষের আবাসন পরিকল্পনায়ও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।
বর্ষা ও বন্যার জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে আধুনিক স্থাপত্য শিল্প ভেসে যাওয়া প্রান্তিক মানুষের জীবন বদলে দেবে তাদের স্বপ্নের মতোই। বন্যার তোড়ে সব ভেসে যাওয়ার আগে বন্যা কবলিরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয় মানবেতর জীবনের জন্য।
বাড়িঘরের অনেক কিছু উৎসর্গ করলেও ঘরের বেড়া এবং চালা ভেসে যাওয়ার আগেই একত্রিত করে সংরক্ষণ করেন। কেউ কেউ মাচা বেধে একই চালার নিচে মানবেতর দিন পার করেন।
বন্যা অপ্রত্যাশিতভাবে আসে না। এটি ফিরে আসে প্রতি বছর, সেই একই ফুলে ওঠা নদী আর বর্ষার আকাশকে অনুসরণ করে, মাটি আলগা করে দেয় এবং এমন সব বাড়িতে ঢুকে পড়ে যা একে প্রতিরোধ করার জন্য তৈরিই হয়নি।
দেয়ালগুলো হারিয়ে যাওয়ার আগেই খুলে ফেলা হয়, উপকরণগুলো ভেসে যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীরা। লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া ঘরের উপকরণগুলো আবারও সাজানো হয় নতুন কাঠামোর রূপ দিতে।
এগুলোর বিন্যাশ এমনই থাকে যা থেকে বোঝা যায় এটি ধ্বংস নয়, বরং এক প্রাচীন ধারাবাহিকতা। যে ভূখণ্ডে প্রতি বছর জল ফিরে আসে, সেখানে টিকে থাকার সংজ্ঞা নির্ধারিত হয় নতুন করে জীবন শুরু করার ক্ষমতার মাধ্যমে।
দেশের বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের জীবন এমনই। তাদের জীবনযাপন সংজ্ঞায়িত করতে হয় ভিন্ন উপায়ে। বর্ষা ও বন্যার সময় যারা সবকিছু সবচেয়ে সহজে গুচিয়ে নিতে পারে তারাই যেনো সবচেয়ে সুখী।
বাংলাদেশের বন্যাকে বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান মূল্যায়ন করে শুধু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, স্থায়িত্ব ও প্রতিরোধের সক্ষমতা বিবেচনা করে। বাস্তবে এটি কোন সঠিক মাপকাঠি নয়।এই মাপকাঠিতে বন্যার ক্ষয় ক্ষতি সামান্য পরিমাণেই বুঝা যায়। আর এই মাপকাঠির ভিত্তিতেই বাংলদেশে নির্মাণ করা হয় সব অবকাঠামো।
নতুন স্থাপনা নির্মাণে গতানুগতিক ধারার বাইরে গবেষক ও স্থপতিরা এমন পরিকল্পনা ও নির্মাণকৌশল আবিস্কার করছেন যা একেবারেই প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত বাস্তবায়নে সহজ, ব্যয়সাশ্রীয় এবং দুর্যোগসহনীয়।
বাংলাদেশের খুদি বাড়ি আবাসন ব্যবস্থা এই যুক্তিকে সুস্পষ্ট করে তোলে তাদের প্রকল্পে। হালকা বাঁশের কাঠামোতে নির্মাণ করে বসতি। যা সহজেই সংস্কার করা যায়, বর্ধিত করা যায়। এর ফলে কোন প্রকৌশলী বা স্থপতির উপর নির্ভর করতে হয় না। দরকার হয় না বাড়তি শ্রমিকের। স্থানীয় শ্রমিক ও মিস্ত্রিরা সহজেই এ ধরণের আবাসন ব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারেন।
এ ধরণের আবাসনে বন্যা কোন বাধা নয়। বর্ষা কিংবা বন্যায় চারদিকে জল টয়টম্বুর পরিবেশেও ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে বাঁশের তৈরি বাড়িগুলো।
বাংলাদেশে নির্মিত স্থাপনার স্থায়িত্ব কম হওয়ার এটিও একটি বিশেষ কারণ। এর জবাবে, স্থাপত্যকলা ভিন্ন উপায়েও নির্মাণ কাজকে সমর্থন করে। যে উপায়গুরো সময়োপযোগী, পরিবেশবান্ধব এবং সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য।
আফ্রিকার দেশ বেনিনের একটি উপহ্রদের ওপর নির্মিত গ্রাম গানভিয়ে এমন সব বাড়ির জন্য আদর্শ উদাহরণ। বাড়িগুলো খুঁটির ওপর উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্য নৌকা।
এখানে নিত্যদিনের জীবন এমন এক পৃষ্ঠে অতিবাহিত হয় যা কখনোই পুরোপুরি শুকনো থাকে না। বলতে গেলে সারাবছরই জলমগ্ন থাকে গানভিয়ে গ্রামটি। এ ধরণের স্থাপনা বন্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে না বরং বন্যাই এর কাঠামো তৈরি করে।
হয়তো মনে হবে বাঁশের খুঁটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো মাটির সাথে দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে বলে বেশি দৃঢ় এবং বন্যা প্রতিরোধী। বাস্তবতা একদমই এরকম নয়। প্রয়োজনে এ ধরণের বাড়িগুলো উচুঁ-নিচু করা যায়। হালকা ও মডুলার ধরণের এ স্থাপত্যগুলো আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়ারও কোন সুযোগ নেই।
বাড়ি কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অংশটুকুও মেরামত করা যায়। সেকারণেই গানভিয়ে গ্রামে বাঁশের তৈরি বাড়িই সবচেয়ে নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময়।
অপরদিকে ভারী ও অধিক দৃঢ় কাঠামোগুলো ডিজাইন ও নকশার ক্ষমতা পর্যন্তই দৃঢ়। এর চেয়ে বেশি চাপ ও ঝুঁকি নেয়ার সক্ষমতা সাধারণ অবকাঠামো ও স্থাপনাগুলোর থাকে না বলে তা সবসময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ।
একটি ভবন ভূমিকম্পে দেবে যেতে পারে, চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যেতে পারে। এতে ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়। অথচ একটি বাঁশের বাড়ি ভূমিকম্পের আঘাতে সর্বোচ্চ হেলে পড়তে পারে। গুড়িয়ে গেলেও তা পুন:নির্মাণ করা খুব বেশি ব্যয়বহুলও নয়। এ ধরণের স্থাপনাগুলো গুড়িয়ে গেলেও তার উপকরণগুলো পুন:ব্যবহারযোগ্য।
এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে স্থিতিস্থাপকতা সবসময় ক্ষতি প্রতিরোধের চেয়ে পুনরুদ্ধারের সময় কমানোর ক্ষেত্রেই বেশি প্রয়োজন। সাধারণত ভারী স্থাপনা পুনরুদ্ধারের সময় এবং ব্যয় দুটোই বেশি।
ভিয়েতনামে এইচঅ্যান্ডপি আর্কিটেক্টস-এর ‘ভাসমান বাঁশের বাড়ি’কম জটিলতায় নির্মাণ করা যায়। খালি ব্যারেলের পাটাতনে বাঁশ ও কাঠের নির্মিত বাড়িগুলো খুবই হালকা। তাছাড়া খালি ব্যারেলের উপর নির্মাণ করায় প্লাবনের সময় জলের উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথেই বাড়ির উচ্চতাও বাড়তে থাকে সমানুপাতিক হারে। এরকম স্থাপনায় বন্যার সময়ও কোন ঝুঁকি থাকে না, বাড়ি ছাড়তে হয় না বাসিন্দাদের।
বাংলাদেশ বন্যাপ্রবণ দেশ। সামান্য বর্ষায়ও অনেক নিচু এলাকার বাসিন্দাদের থাকতে হয় ঝুঁকির মধ্যে প্লাবনের সময় তাদের কথা তো ভাবাই যায় না। বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট ২০০৭ সাথে এমন এক উদ্যোগ নিলেও পরে তার কোন প্রচার, প্রসার কিংবা বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি। বাংলাদেশের স্থাপত্যকলায় সময়োপযোগী পরিবেশবান্ধব, প্রকৃতির সাথে ভারসাম্য বজায় থাকে এমন স্থাপনার উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়।