ফ্ল্যাট কেনার আগে যা জানতেই হবে

আবাসনশিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মন্দাবস্থা এ খাতের ব্যবসায়ীদের যেমন তাঁদের নিজস্ব পেশাদারি থেকে অনেক ক্ষেত্রে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি এ শিল্পের প্রতি সাধারণ ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে বেশ। বলা যায়, ইতিমধ্যে এ শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই অনেকেই তাঁর একান্ত প্রয়োজনীয় ফ্ল্যাটটি কেনার আগে হচ্ছেন চরম বিড়ম্বনার শিকার। পাশাপাশি আস্থা ও বিশ্বাসের অভাবে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভুগছেন সিদ্ধান্তহীনতায়।

তিল তিল করে গড়া সঞ্চয়ে একজন ক্রেতা তাঁর নিজের জন্য একটি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেন। অনেক আবাসন কোম্পানির কথা আর বাস্তবে কাজে অনেক ফারাক থাকায় ক্ষেত্রবিশেষে প্রতারণায় শিকার হয়ে ফিকে হয়ে যায় ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নে বিভোর ক্রেতাটির আপন নীড়ে থাকার স্বপ্ন! এ পরিস্থিতি এড়াতে ফ্ল্যাট ক্রেতারও রয়েছে কিছু দায়িত্ব। খুব সচেতনভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ফ্ল্যাট ক্রেতাকে। ফ্ল্যাট কেনার সময় সিদ্ধান্তসহ আনুষঙ্গিক ব্যাপারে ভুল করলে তা শুধরানো সত্যিই দুরূহ হয়ে ওঠে। ফ্ল্যাট কেনার আগে যে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন; তা হলো-

  • আপনি যে প্রকল্পে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন, প্রথমে প্রকল্পটির রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক অনুমোদিত নকশার ফটোকপি নেবেন। সম্ভব হলে একটা অনুমোদিত প্ল্যানের ফটোকপি সংগ্রহে রাখুন। ওই নকশা আসলেই রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত কি না তা নিশ্চিত হোন। রাজউক অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণের প্রবণতা বর্তমানে অনেকটা কমলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্নভাবে কমবেশি রাজউক অনুমোদনের বাইরে ভবন নির্মাণের কাজ করে থাকে, যা আপনার জানা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হয়। এ ক্ষেত্রে মূলত নিম্নলিখিত তিনটি বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া দরকার-

প্রথমত, ভবনের যে ড্রয়িংটা রাজউক অনুমোদিত ড্রয়িং হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা হতে পারে ভুয়া বা জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। এ ক্ষেত্রে ড্রয়িংটা সঠিক কি না তা রাজউক অফিস থেকে নিশ্চিত হতে হবে। রাজউকের ওয়েবসাইট (www.rajukdhaka.gov.bd) থেকেও এটি যাচাই করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রকৃত অর্থে কোনো প্রকল্পের জন্য রাজউক হয়তো অনুমোদন দিয়েছে ৭ তলা ভবন, কিন্তু বাস্তবে ভবন নির্মিত হয়েছে ৮ তলা  বা আরও বেশি। সুতরাং ৭ তলার ওপরে যা নির্মিত হবে তার পুরোটাই অবৈধ ফ্ল্যাট। এ ধরনের কোনো ফ্ল্যাট আপনি কিনছেন কি না তা অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে। যাচাই-বাছাই ছাড়া ফ্ল্যাট কিনে অনেকে হচ্ছেন প্রতারিত।

তৃতীয়ত, রাজউক অনুমোদন অনুযায়ী প্রতিটা ফ্ল্যাট কত বর্গফুট হওয়া উচিত তার হিসাব খুব কম ক্রেতাই বুঝে নেন। ধরুন, রাজউকের অনুমোদন মোতাবেক একটি ফ্লোরের নেট এরিয়া ১,২০০ বর্গফুট এবং প্রতিটা ফ্লোরে করা হয়েছে দুটি ইউনিট। অর্থাৎ প্রতিটা ইউনিট হবে ৬০০ বর্গফুট। নিচতলায় ও ছাদের ওপরে নিয়ম অনুযায়ী কমন এরিয়া যোগ করলে ফ্ল্যাটের এরিয়া হবে কম-বেশি ৭০০ বর্গফুট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজউকের নিয়ম অমান্য করে এ ধরনের ফ্ল্যাটকে ১১০০-১২০০ বর্গফুটে উন্নীত করা হয়। অর্থাৎ রাজউকের অনুমোদিত এরিয়ার চেয়ে বিক্রয়যোগ্য এরিয়া হিসাব করলে বাড়ে প্রায় শতভাগ! এ ধরনের ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধান হতে হবে।

  • ভবনের স্থায়িত্ব ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বা কাঠামোগত নকশা। স্ট্রাকচারাল ডিজাইনে মারাত্মক ক্রটি থাকাটা সাভারের রানা প্লাজা ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। ফাউন্ডেশন, পিলার এবং বিমÑএ কয়টি কাঠামোগত উপাদানে কোনোভাবেই দুর্বলতা থাকলে চলবে না। এ জন্য অভিজ্ঞ এবং পেশাদার প্রকৌশলীর মাধ্যমে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করানো হয়েছে কি না তা খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হতে হবে। ভবনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন সম্পন্নকারী প্রকৌশলীর নাম ও তাঁর পেশাগত রেজিস্ট্রেশন নম্বর জেনে নিন।
  • ভবনের বাহ্যিক আকৃতি ও সৌন্দর্য এবং ভেতরে জায়গার ব্যবহারের উপযোগিতা হচ্ছে স্থাপত্য নকশার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। একজন স্থপতি এ কাজটি করে থাকেন। ভবনের প্রবেশ, চলাচল, আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, ওপরে-নিচে ওঠানামা, সম্পূর্ণ জায়গার লে-আউট, ভেতরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো কেমন হবে তার সম্পূর্ণ নকশা করা হয়। ভবনের সার্বিক বসবাসের পরিবেশ, অগ্নি নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হলে স্থাপত্য নকশা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থপতি এবং প্রকৌশলীর সমন্বিত ডিজাইন না হলে ভবনে মারাত্মক ক্রটি থেকে যেতে পারে। অনেক ক্রেতা এ বিষয়গুলোর দিকে তেমন নজর না দিয়ে ফ্ল্যাট কত কম মূল্যে কেনা যায় সে দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। ফলে, কমমূল্যে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব হলেও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ফ্ল্যাটে রয়ে যায়, যা আরামদায়ক বসবাসের জন্য একেবারেই অনুপযোগী। ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে।
  • জমির প্রকৃত পরিমাণ, মূল ফ্ল্যাট এরিয়া এবং কমন এরিয়ার পরিমাপ জেনে নেবেন। কমন এরিয়া আসলে কতটুকু তা খুব কম প্রতিষ্ঠানই পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে অনেকেই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধরুন, ৪,৫০০ টাকা বর্গফুট দামে আপনি ফ্ল্যাট কিনলেন। আপনার ফ্ল্যাট এরিয়ার মধ্যে যদি মাত্র ২৫ বর্গফুট বেশি ধরা থাকে তাহলে আপনাকে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে ১,১২,৫০০ টাকা! অথচ মাত্র ২৫ বর্গফুট বেশি আছে কি নেই, তা কিন্তু আপনি স্বাভাবিকভাবে বুঝতে পারবেন না।  আসলে এ ধরনের বিষয়ের সঙ্গে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সরাসরি সততা জড়িত। যা হোক, যত বর্গফুট ফ্ল্যাট এরিয়ার মূল্য আপনি পরিশোধ করবেন তার বিস্তারিত হিসাব (Break-Up) অবশ্যই লিখিতভাবে বুঝে নেবেন। বাউন্ডারি দেয়াল থেকে মূল ভবন পর্যন্ত আলো-বাতাসের জন্য বাস্তবে কতটুকু জায়গা ছাড় দেওয়া হয়েছে তা জেনে নিন। 
  • প্লট বা জমির সব কাগজপত্রের একসেট ফটোকপি সংগ্রহ করুন এবং এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিন। জমির কাগজপত্রের সঙ্গে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির একটা কপি নিন। এসব কাগজপত্র সঠিকভাবে না থাকলে আপনি ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিতে পারবেন না। এমনকি ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করার সময়ও ঝামেলা হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন নাও হতে পারে। সুতরাং এ বিষয়টিকে খুব গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। 
  • যে রিয়েল এস্টেট কোম্পানি থেকে ফ্ল্যাট কিনবেন তারা ইতিপূর্বে কোনো প্রকল্প শেষ করেছে কি না তার খোঁজ নিন। জেনে নিন ইতিপূর্বে তারা কি সময়মতো প্রকল্প হস্তান্তর করেছে? যদি কোনো প্রকল্প শেষ করে থাকে তবে প্রকল্পের কাজের গুণগতমান কেমন তা জানার জন্য বাস্তবে সেই প্রকল্প ভিজিট করুন। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ কারও সহায়তা নিন। প্রকল্পের কাজের মান পছন্দ হলে তবেই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিন।
  • আপনি যে প্রকল্পে ফ্ল্যাট কিনবেন তা কি সময়মতো হস্তান্তর করতে পারবে বলে আপনি নিশ্চিত হতে পেরেছেন? প্রকল্পটি কি আদৌ শেষ করতে পারবে বলে আপনার মনে হয়? ইতিবাচক জবাব পেয়েই অগ্রসর হোন। যদিও এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া বেশ কঠিন, তবে যতটুকু সম্ভব খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • যে কোম্পানি থেকে ফ্ল্যাট কিনবেন, তারা রিহ্যাব (REHAB)-এর সদস্য কি না জেনে নিন এবং মেম্বারশিপ নম্বর (www.rehab-bd.org/member_list.php) কত তাও জেনে রাখুন। যদি রিহ্যাবের সদস্য হয় তবে কোনো সমস্যার উদ্ভব হলে তার সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রিহ্যাবের সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
  • যে প্রকল্প থেকে ফ্ল্যাট কেনার চিন্তা করছেন, তার নির্মাণকাজ যদি চালু থাকে তাহলে প্রকল্পটিতে মৌলিক মালামাল যেমন রড, সিমেন্ট, পাথর, বালু, ইট ইত্যাদির গুণগতমান সম্পর্কে ভালো করে খবর নিন। প্রয়োজনে বাস্তবে তাদের প্রকল্পগুলো ভিজিট করুন। মৌলিক মালামালের পাশাপাশি ফিনিশিং মালামালের গুণগতমান সম্পর্কে ভালো করে খবর নিন। মালামাল যতই ভালো হোক, যদি সুপারভিশন দক্ষ প্রকৌশলী দ্বারা করা না হয় তাহলে কাজ কখনোই ভালো মানের হবে না। সুতরাং প্রকল্পের কাজ নিয়মিতভাবে দৈনিক কে বা কারা সুপারভিশন করেন, সে ব্যাপারটিও জানতে হবে।
  • অনেক প্রকল্পে দেখা যায় কাজ শুরু করেও শেষ হচ্ছে না বা কাজ খুব ধীরগতিতে চলছে। এমন প্রকল্পের ফ্ল্যাট কিনলে সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর হবে কি না তা বলা মুশকিল। অর্থাৎ প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হয়েছে এবং তার বর্তমান স্ট্যাটাস সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ  কি না তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন।
  • কোম্পানি পরিচালনায় যাঁরা যুক্ত, তাঁরা কি সংশ্লিষ্ট কাজে প্রফেশনাল? তাঁদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, আন্তরিকতা ও সততা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা আপনাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। কোম্পানি ব্যবস্থাপকেরা যদি সংশ্লিষ্ট কাজে অপেশাদার হন তাহলে তাঁদের সঙ্গে চুক্তি করার আগে অবশ্যই ভাবা দরকার।

এ ছাড়া অনেক বিষয় আছে যা বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে ও অন্যের সহায়তা নিয়ে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। এখানে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে তা ফ্ল্যাট কিনতে একজন ক্রেতাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫

প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top