আমরা প্রত্যেকেই চাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অন্দর। আর এই অন্দরের পরিচ্ছন্নতায় নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে পাপোশ নামক ছোট্ট জিনিষটি। তাই তো বাইর থেকে এসে ময়লা পা নিয়ে সরাসরি ঘরে ঢুকি না আমরা। কেননা শখের কার্পেটে ময়লা লেগে গিয়ে ঝকঝকে টাইলসটা অপরিচ্ছন্ন হতে পারে। পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ভূমিকাটি পালন করে পাপোশ। কেননা, সদর দরজায় রাখা পাপোশটিতে পা মুছেই অন্দরে প্রবেশ আপনার। আবার বাথরুম থেকে ভেজা পা নিয়ে বের হয়ে টাইলসে পেছলে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ওই মুহূর্তে আপনার পাশে পাবেন পাপোশকেই। একটা সময় ছিল যখন ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে কেবল পাপোশ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে ঘরের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন উভয় ক্ষেত্রেই পাপোশ ব্যবহৃত হয়। আধুনিক বাসাবাড়িতে ঘর সাজাতে হরেক রকম জিনিস ব্যবহার করেন গৃহকর্তা। তাই ঘর সাজানোর অন্যান্য অনুষঙ্গের সঙ্গে পাপোশটিও হওয়া চাই মানানসই।
পাপোশের রকমফের
আগে সুতি ও উলের পাপোশই ঘরে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে পাপোশের ব্যবহার শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই। অফিস-আদালত, দোকানপাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাপোশের ব্যবহার দেখা যায়। আবার পাপোশ তৈরির উপকরণেও এসেছে ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য। ইদানীং সিনথেটিক পাপোশ, নারিকেলের ছোবড়ার তৈরি পাপোশ, রাবার ও প্লাস্টিকের পাপোশ, পাট কাপড়ের পাপোশ, সিনথেটিক ম্যাট পাপোশ, নাইলনের পাপোশ, সুতার তৈরি পাপোশ, মখমলের পাপোশ পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। এ ছাড়া বিদেশি পাপোশের মধ্যে চায়নিজ, মিসরীয়, টার্কিস ও ইরানি পাপোশের বেশ কদর রয়েছে ক্রেতাদের মাঝে। বিদেশি পাপোশগুলো মূলত ফ্লানেল, ক্রিস্টাল, পলিস্টার, ন্যাচারাল রাবার, লেটেক্স, কেমিক্যাল ফাইবার ইত্যাদি দিয়ে তৈরি। ফ্যাশনেবল চায়নিজ পাপোশ ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় বলে বিদেশি পাপোশের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। রকমারি ও বৈচিত্র্যময় পাপোশের সমারোহ ও ব্যবহার ভিন্নতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সৌন্দর্যবর্ধনে।
বিচিত্র পাপোশ
বিভিন্ন রং ও নকশার পাপোশ অন্দরসজ্জায় এনেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। লাল, কমলা, নীল, বাদামি, সবুজ, হলুদ, গোলাপিসহ বিভিন্ন রঙের পাপোশ রয়েছে বাজারে। পাপোশের নকশায়ও রয়েছে বৈচিত্র্য। স্ট্রাইপ, চেক, ফুল, ফল, মাছ, লতাপাতা, আলপনা, প্রজাপতি, জ্যামিতিক মোটিফ, বিভিন্ন কার্টুন চরিত্রসহ রকমারি নকশা দেখা যায় পাপোশগুলোতে। তবে একরঙা ও প্রিন্টেড উভয় ধরনের পাপোশেরই বেশ চাহিদা রয়েছে ক্রেতার কাছে। আকৃতিগত দিক থেকে চারকোনা, গোল, ডিম্বাকৃতি, ত্রিভুজাকৃতি, আয়াতকার, প্রাণী ও মানুষের পায়ের পাতা, প্রজাপতি, ফুল, পানপাতা, তারাসহ বিভিন্ন শেপের পাপোশের দেখা মেলে বিপণিবিতানগুলোতে।
ঘরভেদে পাপোশ নির্বাচন
পাপোশ কেনার সময় একটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে পাপোশটিকে কোথায় ব্যবহার করতে যাচ্ছেন। আপনি যদি সদর দরজার জন্য পাপোশ কিনতে চান, সে ক্ষেত্রে নারিকেলের ছোবড়ার তৈরি ভারী পাপোশই কেনা ভালো। কারণ, বাইরের ধুলাবালু ও ময়লার প্রবেশ প্রতিরোধে এ ধরনের পাপোশেই ভালো কাজে দেয়। ড্রয়িংরুমে ব্যবহারের জন্য মখমলের পাতলা কাপড়ের কিংবা উলের নান্দনিক ডিজাইনের পাপোশ বেশ মানানসই। বেডরুমে বিছানার সামনের ফ্লোরে ব্যবহার করতে পারেন মখমল বা সুতার বড় আকারের পাপোশ। লিভিংরুমে ব্যবহার করা যেতে পারে ফ্যাশনেবল ডিজাইনের ইরানি কিংবা টার্কিশ পাপোশ, যা ফুটিয়ে তুলবে গৃহকর্তার সময়োপযোগী রুচিবোধ। ডাইনিং টেবিলের সামনে পাপোশের খুব একটা প্রয়োজন না পড়লেও বেসিনের সামনে ব্যবহার করতে পারেন মাছ বা ফুল আকৃতির মাঝারি আকারের পাপোশ। তাতে করে পাপোশটি খাবারঘরের পরিবেশের সঙ্গে যেমন মানিয়ে যাবে, তেমনি দেখতেও লাগবে চমৎকার।
বাথরুম বা রান্নাঘরের পরিবেশ কিছুটা স্যাঁতসেঁতে থাকায় সেখানকার পাপোশ প্রায়ই ভেজা থাকে। এ ক্ষেত্রে এমন পাপোশ ব্যবহার করা উচিত যেটি পানি সহজেই শুষে নেয় এবং শুকাতেও সময় লাগে না। সে ক্ষেত্রে পাতলা সুতি কাপড়ের পাপোশ কিংবা রাবারের পাপোশ ব্যবহার করাই উত্তম। শিশুদের ঘরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্টুন, ফুল বা প্রজাপতি আকৃতির মখমল বা কৃত্রিম তন্তুর পাপোশ খুব ভালো মানায়। বারান্দায় ব্যবহার করতে চাইলে গাছের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বর্ণিল চটের পাপোশ ব্যবহার করতে পারেন, যা কিছুটা প্রাকৃতিক রূপ দেবে পুরো পরিবেশকে। অন্যান্য রুমে ব্যবহারের জন্য সুতি, উল কিংবা সুতার পাপোশ মানিয়ে যায় বেশ। অফিস বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ম্যাট, প্লাস্টিক ও রাবারের পাপোশ ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
যত্নআত্তি
ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নিয়মিত পাপোশের যত্ন নেওয়া জরুরি। এতে করে পাপোশটি ভালো থাকবে বহুদিন। প্রতিদিন পাপোশ ঝেড়ে আলগা ধুলা-ময়লা ফেলে দিন। সপ্তাহে এক দিন পাপোশ কড়া রোদে দিলে স্যাঁতসেঁতে হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তবে অবশ্যই পাপোশটিকে উল্টো পিঠে রোদে দিতে হবে। এতে পাপোশের রং নষ্ট হবে না। মাসে অন্তত দুইবার কুসুম গরম পানির সঙ্গে গুঁড়া সাবান মিশিয়ে পাপোশ পরিষ্কার করে নিন। পাপোশ পরিষ্কার করতে ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন। তাতে করে পরিষ্কারের কাজটিও সহজ হয়ে যাবে। পাপোশ কেনার সময় গাঢ় রং দেখে কিনুন। কেননা, তাতে করে ময়লা হলেও কম বোঝা যাবে।
দরদাম
তৈরির উপকরণ ও আকারের ওপর পাপোশের দাম নির্ভর করে। প্লাস্টিক ও রাবারের বুটিওয়ালা পাপোশের দাম পড়বে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। কৃত্রিম তন্তু ও মখমলের পাপোশের দাম পড়বে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। গেঞ্জির কাপড়ের তৈরি পাপোশ পাওয়া যাবে ৮০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। নেট পাপোশ পাবেন ২০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। চটের পাপোশ কিনতে পারবেন ৮০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে। নারিকেলের ছোবড়ার তৈরি পাপোশের দাম পড়বে ১২০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। বিভিন্ন ধরনের কম্বল ও কার্পেট পাপোশ পাওয়া যাবে আকারভেদে ৪০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। মিসরের তৈরি বিভিন্ন সাইজের নাইলনের পাপোশের দাম পড়বে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে এবং সুতার তৈরি পাপোশের দাম পড়বে ৩৫০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। চায়নার তৈরি রাবারের পাপোশ পাবেন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। ইরানি নাইলনের পাপোশ পাবেন আকারভেদে ৫০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে এবং সুতি পাপোশ পাওয়া যাবে ২৫০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া শতরঞ্জির আদলে বানানো দেশীয় পাপোশ মিলবে ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে।
পাবেন যেখানে
ঢাকার মৌচাক মার্কেট, আনারকলি মার্কেট, বায়তুল মোকাররম মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, গাউছিয়া, নিউমার্কেট, রাজধানী সুপার মার্কেট, ফার্মগেট, গুলশান ১ ও ২, ডিসিসি মার্কেটসহ দেশের বিভিন্ন প্লাস্টিক ও হার্ডওয়্যার সামগ্রী বিক্রির দোকানে পাবেন হরেক রকম পাপোশ। তা ছাড়া ফ্যাশন হাউস আড়ং, যাত্রা, রঙ, শতরঞ্জিতে পাবেন নান্দনিক ডিজাইনের সুতা, উল ও পাটের তৈরি দেশীয় পাপোশ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯১তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭।