যানজট নিরসনে এলিভেটেড রোড

যানজট নিরসনে বাংলাদেশের প্রকল্পগুলো চলছে খুবই ধীর গতিতে। যানজটে রাজধানী ঢাকার নগরজীবন এখন কার্যত অচলপ্রায়। অনেক জায়গায় তো সারাক্ষণ যানজট লেগেই থাকে, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে পড়ে থাকতে হয়। নগরে আগে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেখানে ১০-১৫ মিনিট লাগত, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রে এক থেকে দুই ঘণ্টা লেগে যায়। এতে প্রতিদিন একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে হাজারো কর্মঘণ্টা তেমনি ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি। এক সমীক্ষামতে, যানজট নিরসনের অভাবে দেশে প্রতিবছর গড়ে ৩৩ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় টাকায়, যার পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। তা ছাড়া যানজটের কারণে প্রতিবছর অতিরিক্ত জ্বালানি বাবদ ৫৭৫ কোটি এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণে আরও প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো আমাদের রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে এত দিন নিশ্চয় অনেক এলিভেটেড রোড নির্মিত হতো। যানজট নিরসনে কোন উদ্যোগ না থাকায় থাইল্যান্ডের ব্যাংকক বিমানবন্দর থেকে আগে ব্যাংকক শহরে যেতে ভয়াবহ জ্যামে পড়তে হতো, এখন আর তা নেই। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড রোড দিয়ে সহজে রাজধানী কুয়ালালামপুর ও পুত্রজায়ায় যাওয়া যায়। ভারতের প্রায় শহর-নগরেও একই অবস্থা। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও জাপানের পরিবহনব্যবস্থা তো অতুলনীয়। জাপানের টোকিও নগরে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থার সুবাধে যানজট নিরসন হয়েছে। ভূমির ওপর রাশি রাশি ফ্লাইওভার-এলিভেটেড রোড, ভূপৃষ্ঠে সুশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা ও ভূগর্ভে পাতাল কিংবা মেট্রোরেলের সমন্বয়ে মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্ট বিরতিহীনভাবে চলছে। একই অবস্থা সিটি এস্টেট সিঙ্গাপুরে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে এই দুটি নগর জনসংখ্যার ঘনত্বে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও সেখানে ভূপৃষ্ঠে তেমন বেশি মানুষ দেখা যায় না, যানজট নিরসনও সম্ভব হয়েছে। আধুনিক নির্মাণশৈলীর উৎকর্ষতায় এসব মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্ট Intelligent System হিসেবে পরিচিত। যাতে কারও পক্ষে বিনা টিকিটে ও কম ভাড়ায় ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।

আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের কলকাতায় একসময় যানজট নিরসন না হওয়ায় চলাই যেত না, অথচ সেখানে এখন সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে যানজট নিরসন হয়েছে। এভাবে অনেক পেছনে পড়ে থাকা মিয়ানমার আর ভিয়েতনামও হালে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। অথচ স্বাধীনতা-উত্তরকালে এসব দেশের অবস্থা আমাদের চেয়ে তেমন ভালো ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, তাহলে আমরা কেন পারছি না? আমাদেরও তো মেধা ও দক্ষতা আছে। আর আমাদের দেশের মানুষগুলোর শ্র্রম আর দক্ষতাই তো ওসব দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। স্বাধীনতা-উত্তর কিছু সময়কাল ব্যতীত আর কখনো অর্থের অভাবে উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল এ কথা বলা যাবে না। সত্যিকারভাবে চাইলে যেকোনো সমস্যা অনায়াসে সমাধান করা সম্ভব, তার অনেক প্রমাণ এখন আমাদের সামনে। যেমন- বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসন, ঢাকায় হাতিরঝিলের পুনরুজ্জীবিতকরণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু এলিভেটেড রোড নির্মিত হচ্ছে, যা হতে পারত আরও অনেক আগে ও সমন্বিতভাবে।

যানজট নিরসনে উন্নয়নে সমন্বয়হীনতা

রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অসমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। বরাবরই নগরে চলতে থাকে অসমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের  প্রতিযোগিতা। ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট মহাপরিকল্পনা’য় (DMDP, 1995-2015) নগরের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে যেসব সুপারিশ ছিল তার কিয়দংশও বাস্তবায়িত হয়নি। আবার যা বাস্তবায়িত হয়েছে তারও বেশির ভাগ ডিএমডিপির সুপারিশ বহির্ভূত। উপরিউক্ত প্রেক্ষাপটে ১৯৯৫-৯৭ সালে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তদারকির জন্য বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত DITS (Dhaka Integrated Transportation Study)  শীর্ষক সমীক্ষায় ভিন্ন একটি সংস্থা স্থাপনের সুপারিশ করা হয়, যার আলোকে ১৯৯৮ সালে যোগোযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে DTCB (Dhaka Transport Coordination Board) নামক একটি সংস্থার সৃষ্টি হয়। অতঃপর ওই সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে ২০০৫-০৬ সালে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (STP) প্রণীত হয়, যা ২০০৮ অনুমোদিত হয়। যাতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি তিনটি BRT Lines এবং তিনটি MRT Lines নির্মাণের প্রস্তাবনা রয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রণয়নকালে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে অসংখ্য সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয় এবং সবাইকে ঢাকায় যেকোনো ধরনের সড়ক বা যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে DTCB থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত হয়। সম্প্রতি এই সংস্থাটিকে আরও অধিকতর ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়ে DTCA (Dhaka Transport Coordination Authority) নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সওজ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সেতু বিভাগ, এলজিডি ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের স্ব-স্ব পরিকল্পনা মোতাবেক নগরে মনোরেল, স্কাইরেল, মেট্রোরেল বা এলিভেটেড রোড নির্মাণে অনেক প্রকল্প উত্থাপিত হয়। STP-তে ঢাকা মহানগরের পরিবহন সমস্যা নিরসনে অনেক সুপারিশ ছিল- MRT, BRT, Commuting/Circular Trains স্থাপনের কথা ছিল। অথচ আজ অবধি এসবের কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি এবং দিনে দিনে যেভাবে ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বয়হীন উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রাজধানী ঢাকা আদৌ একটি বসবাসযোগ্য নগর থাকবে কি না, তা ভাবার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় হয়েছে। অন্যদিকে উল্লেখিত অবস্থায় রাজউকের অধীনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বৃহত্তর ঢাকার নতুন মহাপরিকল্পনা (Regional Development Plans) প্রণয়নের কাজ চলছে, আর জাপান সরকারের (JICA সহযোগিতায়) অর্থায়নে DTCA-এর অধীনে বৃহত্তর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুর জেলার মধ্যে Mass Rapid Transit System-এর সমন্বয়ে STP সংশোধনের কাজ চলছে।

এলিভেটেড রোড নির্মাণের বিকল্প নেই

সার্বিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে রাজধানী ঢাকার যে অবস্থা, তাতে দ্রুততর Multimodal গণপরিবহনব্যবস্থা (Urban Mass Rapid Transit) নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। ভূপৃষ্ঠে এলোপাতাড়ি ইমারত ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে এখন DMDP/STP-তে সুপারিশকৃত নগরের কোনো সড়ক চওড়া বা সংযোগ রোডগুলো (Missing Links) নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। নগর এলাকায় সড়ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করাও অত্যন্ত জটিল কাজে পরিণত হয়েছে। ফলে এলিভেটেড রোড নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশাল ব্যয় তথা এলোপাতাড়ি উন্নয়নের কারণে ভূগর্ভে Underground সার্ভিসেসও সহজে নির্মাণ করা যাচ্ছে না। তাই এখন সব ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভূ-ঊর্ধ্বে এলিভেটেড রোড আকারে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে STP-এর সুপারিশমালার আলোকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বনানী রেলক্রসিংয়ের ওপর একটি ওভারপাশ এবং রাজউকের অধীনে কুড়িলে ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তা ছাড়া রাজউকের অধীনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে (PPP’তে) শান্তিনগর থেকে গুলিস্তান-বাবুবাজার হয়ে ঢাকা-মাওয়া রোড পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার নির্মাণেরও প্রক্রিয়া চলছে। PPP-এর আওতায় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেতু বিভাগের অধীনে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল হয়ে যাত্রাবাড়ী-কুতুবপুর পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটা এলিভেটেড রোড নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। অরার DTCA-এর আওতায় জাপান সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় Dhaka Urban Transportation Network Developmet Study (DHUTS) শীর্ষক সমীক্ষার আওতায় MRT-6 প্রকল্পের ডিজাইন প্রণয়নের কাজ চলছে।

এ ক্ষেত্রে যেই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো উল্লেখিত সার্বিক প্রেক্ষাপটে মহানগর ঢাকার অবকাঠামোগত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ঘনিষ্ঠ মনিটরিং জন্য একটি উপযুক্ত Apex Body প্রতিষ্ঠা করা। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত DTCA-এর পক্ষে বর্তমানে তাদের সীমিত সামর্থ্যরে কারণে কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে এ পর্যন্ত যে কটা সড়ক মোড়ে ওভারপাশ নির্মিত হয়েছে, সেখানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নয়ন হলেও সার্বিকভাবে নগরের যানজট নিরসন হয়নি। যেমন নগরের প্রবেশপথে বনানী রেলক্রসিং ওভারপাশ অতিক্রম হওয়ার পর টানা যানজট আগের মতোই রয়ে গেছে। এই সমস্যার নিরসন হতো, যদি কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী পর্যন্ত টানা এলিভেটেড রোড সময়মতো নির্মিত হতো। এই এলিভেটেড রোডটির নির্মাণে ‘ইথাল-থাই’ গ্র“প নামক একটি বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত ‘কনশেসন চুক্তি’ অনুসারে ২০১১ সালে কুর্মিটোলা থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত প্রস্তাবিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৪-১৫ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন হয়ে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্থের সংকুলান করতে না পারায় ও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় অদ্যাবধি বাস্তবে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়নি। এই অবস্থায় ২০১৩ সালে ডিসেম্বরে ‘ইথাল-থাই’ গ্র“পের সঙ্গে সংশোধিত ‘কনশেসন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। অতঃপরও বর্তমানে যে ধীরগতিতে প্রকল্পটির কাজ চলছে, তাতে কখন যে এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ হবে ও কত প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াবে তা ভবিতব্যই জানে!

তাছাড়া, ‘ইথাল-থাই’ গ্র“পের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরকালে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই এলিভেটেড রোডটিকে রাজধানী ঢাকার অপরাপর সব কয়টি প্রবেশমুখের (উত্তরে জয়দেবপুর চেšরাস্তা, দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ, পূর্বে কাঁচপুর ও পশ্চিমে মাওয়া ঘাটে পদ্মা ব্রিজ) সঙ্গে বিস্তৃত করা হবে। যানজট নিরসনে একইভাবে মিরপুর-গাবতলী এবং সাভারকেও এলিভেটেড রোডের আওতায় আনার কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু আজ অবধি এসবের ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এর মধ্যে আবার রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা ঢাকার চতুর্দিকে প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ অনুসরণ করে সেখানে এলিভেটেড সার্কুলার ট্রেন চালু করবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত MRT-6 মেট্রোরেল পথটিও এলিভেটেড ট্রেকের ওপর নির্মিত হবে। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, DMDP/STP এর প্রস্তাবনা অনুসারে ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ যাত্রাবাড়ীতে সমন্বিতভাবে ডিজাইন করে ‘একটি পিলারের’ ওপর দিয়েই MRT & BRT (এলিভেটেড রোড ও মেট্রোরেল) রুট নেওয়া যেত, কিন্তু সেখানে সিটি করপোরেশনে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ওরিয়ন-বেলহাসা গ্র“প’ যাত্রাবাড়ী অংশে একতরফাভাবে নিজেদের সুবিধামতো ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করায় বিমানবন্দর থেকে আগতব্য এলিভেটেড রোড এবং উত্তরা-মিরপুর থেকে আগতব্য মেট্রোরেল প্রকল্পটির রুট সঞ্চালন করা সম্ভব হচ্ছে না। 

যানজট নিরসনে হাতিরঝিল প্রকল্পে এর চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোসমূহ এবং কুড়িল ইন্টারচেঞ্জ ও বনানী ওভারপাশ কাম মিরপুর ফ্লাইওভারটি। দেশীয় স্থপতি-প্রকৌশলী ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যথাত্বরিত বাস্তবায়িত হওয়ায় একদিকে যেমন আর্থিক সাশ্রয় হয়েছে। এছাড়া যানজট নিরসনে দেশীয় পেশাজীবীরা ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কাজের বাস্তবায়নে দিনে দিনে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। মোট কথা, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যেকোনো ধরনের এলিভেটেড রোড ডিজাইন ও নির্মাণ করা সম্ভব। এর ফলে যানজট নিরসন অনেকটাই সম্ভব হয়েছে।

এ জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা ও দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার। দেশের ও বহির্বিশ্বের অনেক বিনিয়োগকারীরাও দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু তাঁরা দেশের ধারাবাহিক অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। তা ছাড়া যানজট নিরসনে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যোগ্য জনবল নিয়োগও প্রয়োজন। দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে দেশের দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতিতে পেশাজীবীদের মধ্যেও বিভক্তির রাজনীতি চলছে! যার সুবাধে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোকজনের নিয়োগের ফলে অনেক প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বা যেভাবে হওয়া প্রয়োজন সেভাবে হচ্ছে না। আর এতে দিন দিন বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে রাজনৈতিক অনৈক্যের মধ্যেও উন্নয়নে কোনো বিভেদ নেই। প্রয়াত জ্যোতি বসু যা করে গেছেন, মমতা ব্যানার্জি তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। যানজট নিরসনে আমরা কি তাঁদের থেকে শিক্ষা নিতে পারি না! দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দলমত-নির্বিশেষে প্রথিতযশা পরিকল্পনাবিদ-স্থপতি ও প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি Thank Tank ও স্থায়ী কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যাঁদের তত্ত্বাবধানে বৃহদাকার সব অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিকল্পনা, পর্যালোচনা ও সমন্বয় সাধন করা যেতে পারে।    

শেষের আগে

ঢাকা দেশের রাজধানী ছাড়াও বর্তমানে প্রধান শিল্পনগর, বাণিজ্যিক, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। তা ছাড়া ভৌগোলিকভাবে দেশের প্রায় কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত হওয়ায় সব আন্তজেলা যোগাযোগব্যবস্থাও ঢাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। রিকশা, ট্যাম্পু, বেবিট্যাক্সি, ঠেলাগাড়ি, কার-জিপ-মাইক্রোবাস, বাস, দুরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক-লরি, কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদি সবকিছুই নগরের ওপর দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু নগরের সড়কগুলো সেভাবে নির্মিত হয়নি। সে কারণে যানজটও নিরসন হয়নি। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের কর্মজীবন ও অর্থনীতি এবং বেড়ে গেছে পরনির্ভরতা। যানজট নিরসন না হওয়ায় অসুস্থ মানুষকে অ্যাম্বুলেন্সে পরিবহন বা নগরের কোনো জায়গায় আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি যেতে পারে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। যানবাহনের দ্রুত চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকার ভেতরে বিদ্যমান সড়ক ও রেলপথ অনুসরণে এলিভেটেড রোড স্থাপন করতে হবে। একইভাবে নগরের সঙ্গে সংযুক্ত সব সড়ক-মহাসড়কের ওপর দিয়ে এলিভেটেড হাইওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য বিশ্বের অন্যান্য নগরের মতো DTCA-কে একটি যথাযথভাবে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং সমস্যাসংকুল রাজধানী ঢাকার বিশালতার বিবেচনায় সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে উপযুক্ত জনবলের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী Apex Body স্থাপনের বিকল্প নেই- যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে সিঙ্গাপুরে, মালয়েশিয়ায় ও দক্ষিণ কোরিয়ায়, আর এখন হচ্ছে ভিয়েতনামে ও আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে। 

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top