Barrage

বাঁধের সাতসতেরো

বাঁধ বা ব্যারেজ একটি হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার, যা নদীর আড়াআড়ি নির্মাণ করা হয়। এর প্রধান কাজ নদীর উজানে পানি সংরক্ষণ করে জলাধার নির্মাণ। তাই এর পরিচিতি Storage Headwork হিসেবে। নদীতে যখন মাত্রাতিরিক্ত বা সর্বোচ্চ পানির প্রবাহ থাকে, তখন প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে ব্যারেজ। পানির প্রবাহ কম থাকলে এই পানি আবার সরবরাহ করে নদীতে। এ ছাড়া সেচখালেও পানি সরবরাহে বাঁধ দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৫ হাজারেরও বেশি বিশালাকার বাঁধ নির্মিত হয়েছে। বিশ্বের নদীসমূহের প্রায় অর্ধেকই এসব বাঁধগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

মানুষ অনেক আগ থেকেই বৃহৎ ব্যারেজ নির্মাণের চেষ্টা করলেও উন্নত ডিজাইন, প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও মালামালের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। মূলত বিংশ শতাব্দীতেই এসবের ব্যাপক নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয়। রেগোন (রাশিয়া), নোরেক (রাশিয়া), নিউকনিলিয়া টেইলিনস (যুক্তরাষ্ট্র) বিশ্বের বৃহৎ বাঁধের উদাহরণ। তিস্তা ব্যারাজ, কাপ্তাই, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (DND),, বাকল্যান্ড প্রভৃতি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যারেজগুলোর মধ্যে অন্যতম।

বাঁধের রকমফের

নির্মাণ উপাদানের ওপর ভিত্তি করে ব্যারেজকে দুভাবে ভাগ করা যায়-

১. রিজিড বাঁধ; যেমন-

  • সলিড ম্যাসনারি বা কংক্রিট গ্র্যাভিটি
  • আর্চ ম্যাসনারি বা কংক্রিট ব্যারেজ
  • কংক্রিট বাটরেস ব্যারেজ
  • স্টিল স্ট্রাকচারের এবং
  • টিম্বার বা কাঠের তৈরি।

২. ননরিজিড বাঁধ; যথা-

  • মাটির তৈরি
  • হোমোজেনাস (Homogeneous)
  • জোন (Zoned Embankment)
  • ডায়াপ্রোগ্রাম টাইপ(Diaphragm Type)
  • রক-ফিল ব্যারেজ
  • মাটি ও রক-ফিল সমন্বিত ব্যারেজ।

হাইড্রোলিক ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে বাঁধকে দুভাগে ভাগ করা যায়-

১. ওভার ফ্লো এবং

২. নন-ওভার ফ্লো।

গ্র্যাভিটি বাঁধ

গ্র্যাভিটি বাঁধ বা ব্যারেজ এমন এক ধরনের ব্যারেজ, যা তার ওপর ক্রিয়ারত পানির চাপ ও অন্য ফোর্সসমূহ নিজস্ব ওজনে প্রতিরোধ করে। গ্র্যাভিটি ব্যারেজ মাটির তৈরি ব্যারেজের তুলনায় শক্তিশালী, দৃঢ় ও টেকসই। উপযুক্ত ফাউন্ডেশন হলে গ্র্যাভিটি ব্যারেজ যেকোনো উচ্চতায় নির্মাণ করা যায়। এ ছাড়া অধিক প্রশস্ত ও ঢালু নদীর ক্ষেত্রে গ্র্যাভিটি ব্যারেজ নির্মাণই উত্তম। গ্র্যাভিটি বাঁধের ক্ষেত্রে সহজেই ওভার ফ্লো স্পিলওয়ে স্থাপন করা সম্ভব। তা ছাড়া এ ধরনের ব্যারেজ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুবই কম। এবং এর হঠাৎ করেই ব্যর্থ হার কম। গ্র্যাভিটি ব্যারেজ যেকোনো আবহাওয়ার নির্মাণ উপযোগী।

মাটির বাঁধ

মাটির বাঁধ স্থানীয়ভাবে সহজপ্রাপ্য মাটি দিয়ে তৈরি। এটা ক্রিয়ারত সব ফোর্স মাটির শেয়ার স্ট্রেংথ দিয়ে প্রতিরোধ করে। মোটামুটি প্রশস্ত ও সমতল নদীর ক্ষেত্রে স্বল্প উচ্চতার মাটির বাঁধ তৈরি করা সম্ভব। মাটির, গ্র্যাভিটির তুলনায় সাশ্রয়ী ও অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি করা সম্ভব। এ ছাড়া এর ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা গ্র্যাভিটি ব্যারেজের তুলনায় বেশি।

  • ব্যারেজের ওপর ক্রিয়ারত ভলসমূহ
  • পানির চাপ
  • অল্প লিফট চাপ
  • ভূমিকম্পজনিত ফোর্স
  • সিল্ট চাপ
  • ওয়েভ চাপ
  • বরফের চাপ
  • নিজস্ব ওজনের কারণে ক্রিয়ারত গ্র্যাভিটি ফোর্স।

বাঁধের আকার

International Commission on Large Dams (ICOLD) মতে, ব্যারেজ বা ব্যারেজের উচ্চতা ১৫ মিটারের বেশি অথবা ৫ থেকে ১৫ মিটারের মধ্যে। এবং পানি সংরক্ষণক্ষমতা ৩ মিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি হলে তাকে বৃহৎ ব্যারেজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

  • ব্যারেজ নির্মাণের সুবিধাসমূহ
  • সারা বছর কৃষিজমিতে সেচ প্রদান
  • বন্যানিয়ন্ত্রণ ও পানি অপসারণ
  • জলবিদ্যুৎ উৎপাদন
  • কৃষি আবাদ এলাকা বৃদ্ধি
  • শস্য উৎপাদন বাড়ানো
  • ব্যারেজ ওপর দিয়ে হাইওয়ে বা রেলওয়ে সড়ক নির্মাণ।

বাধঁ নির্মাণের উপকারিতা কি কি?

  • নদীর উজানে স্থায়ীভাবে ভূমি প্লাবিত হয়
  • উজানে বসবাসরত মানুষের বাড়িঘর ও তাদের সম্পত্তির স্থানচ্যুতি ঘটে
  • পানি দিয়ে প্লাবিত অঞ্চলের গাছপালা বিনষ্ট হয় ও পশুপাখির জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

ব্যারেজ নির্বাচনের ফ্যাক্টরসমূহ

বাঁধ একটি বিশাল কাঠামো; এর নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ জন্য নির্দিষ্ট ধরনের ব্যারেজ নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য

  • জিওলজি ও ফাউন্ডেশনের অবস্থা
  • নির্মাণ উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা
  • স্পিলওয়ের সাইজ ও অবস্থান
  • ভূমিকম্প জোন
  • ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা
  • ব্যারেজের স্থায়িত্বকাল
  • সার্বিক ব্যয়।

ব্যারেজ ব্যর্থ হবার কারণ-

  • হাইড্রোলিক ব্যর্থতা
  • Seepage ব্যর্থতা
  • স্ট্রাকচারাল ব্যর্থতা।

ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা, লে-আউট, ডিজাইন, নির্মাণ ও কার্যপদ্ধতির নানা ধাপ-

  • সাইট পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহ
  • ব্যারেজের অ্যালাইনমেন্ট বা কেন্দ্ররেখা নির্ধারণ
  • ব্যারেজের নকশা ও লে-আউট তৈরি করণ
  • হাইড্রোলিক ডিজাইন
  • স্ট্রাকচারাল ডিজাইন
  • বাঁধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কাঠামোসমূহের ডিজাইন
  • খালের হেড রেগুলেটর ডিজাইন
  • প্রয়োজনীয় মালামাল ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহকরণ
  • নির্মাণকরণ
  • রক্ষণাবেক্ষণ ও চালনাকরণ।

ডাইভারসন হেডওয়ার্ক (Diversion Headwork)

সেচ খালের পানি সরবরাহ সাধারণত একটি নদী থেকে করা হয়। নদীর পানি সেচ খালে সরবরাহ করার জন্য নদীর আড়াআড়িভাবে কিছু হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার নির্মাণ করা হয়। এগুলোকে Headworks বলা হয়। নদীর পানির প্রবাহ কম হলেও এগুলো সেচ খালে নিয়মিত পানি সরবরাহের সুনিশ্চয়তা দেয়।

Headworks দুই রকম-

১. ডাইভারসন (Diversion) Headworks

২. স্টোরেজ (Storage) Headworks

ডাইভারসন হেডওয়ার্কস নদীর আড়াআড়িভাবে নির্মিত যাতে নদীর স্বাভাবিক পানির স্তর বৃদ্ধি পায়, ফলে সেচ খালে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি সরবরাহ হতে পারে। তবে ডাইভারসন স্ট্রাকচার অধিক পানি সংরক্ষণ করতে পারে না, এর মূল কাজ নদীর পানি যাতে সহজে সেচ খালে সরবরাহ হতে পারে এর ব্যবস্থা করা। স্টোরেজ হেডওয়ার্কস দিয়ে অধিক পানি সংরক্ষণসহ ডাইভারসন হেডওয়ার্কসের কার্যাবলি সম্পন্ন করা সম্ভব। ডাইভারসন হেডওয়ার্কস হিসেবে Weir ev Barage নির্মাণ করা হয়।

যখন নদীর পানির বেশির ভাগ বা পুরো অংশ সুউচ্চ Crest দিয়ে রোধ করা হয় তখন তাকে Weir বলে। আর যখন পানির বেশির ভাগ অংশ সাটার বা গেট দিয়ে রোধ করা হয়, তখন তাকে Barage বলা হয়। ওয়্যারের তুলনায় ব্যারাজ দিয়ে নদীর প্রবাহের ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। ব্যারাজের ওপর দিয়ে সড়ক বা রেল ব্রিজ তৈরি করা যায়। ব্যারাজ দিয়ে নদীর উজানে পলি জমার প্রবণতা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে ব্যারাজের নির্মাণব্যয় ওয়্যারের তুলনায় বেশি। মূলত সেচ প্রকল্পের জন্যই ওয়্যার বা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়।

স্পিলওয়ে (Spillway)

নদীর মাত্রাতিরিক্ত পানি বা বন্যার পানি ব্যারেজের উজান থেকে ভাটিতে কার্যকরীভাবে অপসারণের জন্য ব্যারেজে যে কাঠামো নির্মাণ করা হয়, তাকে স্পিলওয়ে বলে। মূলত নদীর পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ বন্যাসীমা অতিক্রম করলে বাঁধ ব্যর্থ হতে পারে। এমতাবস্থায় স্পিলওয়ে অতিরিক্ত পানি অপসারণের পর্যাপ্ত নির্গম পথের ব্যবস্থা করে। এ জন্য স্পিলওয়েকে ব্যারেজের সেফটি ভাল্ব বলা হয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

নদীতে বাধঁ কেন দেওয়া হয়?

নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহ রোধ করতেই নদীতে বাধঁ দেয়া হয়। কখনো সেচের পানি ধরে রাখতে কখনোবা নিম্নাঞ্চলের বন্যা ঠেকাতেও বাধঁ দেয়ার দরকার হয়।

বাধঁ নির্মাণের নেতিবাচক প্রভাব কী কী?

বাধঁ নির্মাণের নেতিবাচক প্রভাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পরিবেশের অবক্ষয়, কৃষি জমির প্রাথমিক উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, জীববৈচিত্রের ক্ষতি এবং স্থানীয় প্রজাতি হ্রাস।

প্রকাশকাল: ৫৫তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪

Related Posts

প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি

একটি ভবন বা শহরের ডিজাইন করার সময় আমরা খরচ ধরি ইট, সিমেন্ট, স্টিল আর শ্রমের। কিন্তু যে জমির…

রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প

অনেকের ধারণা, ভবনে বেশি রং ব্যবহার করলে ডিজাইনের গাম্ভীর্য আর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। রং যেন কেবল সাজসজ্জা, স্থাপত্যের…

প্রকৃতি ও মাটির সঙ্গে মিশে থাকা এক অতিথিশালা

ইন্দোনেশিয়ার বালির উলুওয়াতু অঞ্চলে স্থাপত্য ও প্রকৃতির সম্পর্ককে নতুনভাবে তুলে ধরেছে কায়মানা আর্থ ভিলা। ২০২৬ সালে নির্মিত এই…

প্রতিযোগিতায় জিতে ১.৯ বিলিয়ন পাউন্ডের স্মিথফিল্ড বাজার গড়বে কারমোডি গ্রোয়ার্ক

যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরের কেন্দ্রস্থলে চলমান ১৯০ কোটি পাউন্ডের বিশাল স্মিথফিল্ড পুনরুন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। লন্ডনভিত্তিক…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি