কর্মব্যস্ত এ নগরে নিরন্তর ছুটে চলছে ব্যস্ত নগরবাসী। অথচ জনবলের তুলনায় গণপরিবহনের তীব্র সংকট এ নগরে। রাস্তায় গাড়ি তবুও গণপরিবহনের হাহাকার লেগেই আছে। একটি বাস বা লেগুনা এলেই তাতে উঠতে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের শুরু হয় রীতিমতো যুদ্ধ। যারা জয়ী হয়, তারা কোনো রকমে বাসে উঠলেও দাঁড়িয়ে বা বাদুরঝোলা হয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। সকাল সাতটা থেকে শুরু হয় স্কুলগামী আর কর্মজীবীদের গণপরিবহনের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। স্কুল, কলেজ ও অফিসগামী মানুষের কর্মস্থলে যাওয়ায় এ বিড়ম্বনা নিত্যদিনের। সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরতেও একই দুর্ভোগ। রাজধানীতে বাড়ছে মানুষ কিন্তু বাড়ছে না গণপরিবহন বরং কমছে। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মহানগরে অনেক রুটই নেই পর্যাপ্ত পাবলিক পরিবহন, যা আছে তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। একটু বিত্তবান নাগরিকেরা চাহিদানুযায়ী গণপরিবহন সেবা না পাওয়াই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে গণপরিবহনব্যবস্থায় সৃষ্ট সংকটে রাজধানী পরিণত হচ্ছে যানজট ও জনদুর্ভোগের এক নগরে।
নগরের গণপরিবহন চিত্র
রাজধানীতে বাসই একমাত্র গণপরিবহন। এখানে ট্রেন, মেট্রোরেল, মনোরেল, ট্রাম ইত্যাদি পরিবহন ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। নাগরিকদের পরিবহনের চাহিদায় প্রয়োজন সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার বাস। চলমান পরিবহন সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের খুব বেশি নয়। বিগত কয়েক বছরে ১৬৬টি রুটে ৫৪১৯টি বাস-মিনিবাস চলাচলের অনুমতি মিললেও এখন নেই এর অর্ধেকও। তাই গণপরিবহন সংকটে যাত্রী দুর্ভোগ পৌঁছেছে চরমে। ২০০০ সালের পর ঢাকায় সুদৃশ্য বাস চলাচলব্যবস্থা চালু হলেও এখন তা আর দেখা যায় না। সে সময় গড়ে উঠেছিল কাউন্টারভিত্তিক বাস সার্ভিস। যাত্রীরা এসব কাউন্টার থেকে যার যার গন্তব্যের টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে বাসে উঠত। টিকিট সংগ্রহ ও লাইন মানার এ সংস্কৃতিতেই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। যাতায়াতও ছিল বেশ নিরাপদ ও নিরপদ্রব। বর্তমানে এ ব্যবস্থাটি একেবারেই ভেঙে পড়েছে। নামমাত্র কিছু বাস কাউন্টার পদ্ধতিতে চলাচল করলেও অধিকাংশই পরিণত হয়েছে লোকালে। বাসগুলো স্টপেজ ছাড়াও যত্রতত্র যাত্রী ওঠায়-নামায়। ফলে বাড়ছে যানজট। তা ছাড়া রাজধানীর অনেক রুটে বেশ কিছু তাপানুকূল (এসি) বাসও চলাচল করত। কিন্তু এখন সে সংখ্যা হাতেগোনা। নগরে মানসম্মত বাস কমে যাওয়ায় বেড়েছে ফিটনেসবিহীন ভাঙাচোরা মিনিবাস ও হিউম্যান হলারের সংখ্যা। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া নগরের সব রুটেই সিটিং, ডাইরেক্ট, গেটলক, সুপার লোকাল নামধারী বাসগুলোতে গাদাগাদি ও বাদুরঝোলা হয়ে চলাচল করছে যাত্রীরা। অবশিষ্ট হাজারো যাত্রীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে অনেকেই সময়মতো অফিস, আদালত, ক্লাসসহ নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে নষ্ট হচ্ছে সময় ও কর্মঘণ্টা; ব্যবহৃত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) তথ্যমতে, যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা। যাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অথচ কয়েক বছর আগেও যা ছিল ৫২ লাখ ঘণ্টা। অর্থাৎ পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল (পরিবহন) বিভাগের এক সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ঢাকার বিভিন্ন রুটে পাবলিক বাসে যাতায়াতে যাত্রীদের যে সময় লাগে তার ২৪ শতাংশ বাসের অপেক্ষায়, ৪৪ শতাংশ ওঠানামা ও বাস পরিবর্তন এবং মাত্র ৩২ শতাংশ ব্যয় হয় বাস চলন্ত অবস্থায়। ফলে রাজধানীর অধিকাংশ যাত্রীর ভোগান্তি বহুগুণ বেড়েছে। তা ছাড়া যেসব বাস রয়েছে সেগুলো সেবার মান অত্যন্ত সঙ্গীন। ফিটনেসবিহীন আবরণ, ভাঙা ও ছেঁড়া আসন, জানালার কাচ ভাঙাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত পাবলিক পরিবহন।
নারীদের যাতায়াত সমস্যা
পুরুষ যাত্রীরা কষ্ট সহ্য করে কোনোমতে পাবলিক বাসে ঠাঁয় পেলেও অসহায় নারীযাত্রী। বাসে উঠতে চাইলেই হেলপারদের সাফ কথা, ‘মহিলা সিট নেই, যাওয়া যাবে না।’ দাঁড়িয়ে যাব, সিট লাগবে না; অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি একটু নেন না ভাই! আকুতি মহিলা যাত্রীর! বাসের যাত্রীদেরও তাগিদ মহিলা না ওঠাতে। তাই পরের বাসটির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই যেন। পরের বাসটিতেও একই ঘটনা। উপায় না পেয়ে কোনো একটি বাসে ধাক্কাধাক্কি করে; ভিড় ঠেলে কোনোমতে উঠতে পারলেও শুরু হয় নতুন বিপত্তি। ধাক্কাধাক্কি, ঠাসাঠাসি আর গরমে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। ঠিক এভাবেই যাতায়াত করতে হচ্ছে নগরের নারীদের।
জীবনধারণের ব্যয় বাড়ছে লাগামহীনভাবে। পুরুষ সদস্যের একার আয়ে সংসার চালানো হয়ে পড়ছে অত্যন্ত কঠিন। তাই সেই জীবনযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন নারীরাও। শুধু তা-ই নয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়াসহ দৈনন্দিন নানা কাজে রাস্তায় বের হতে হচ্ছে তাঁদের। বাস পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। ট্যাক্সিক্যাব-সিএনজিচালিত অটোরিকশার অপ্রতুলতা ও অত্যধিক ভাড়ার কারণে সিট নেই জেনেও গণপরিবহনে উঠতে বাধ্য হন তাঁরা। পুরুষদের পাশাপাশি বাসের পাদানিতে চরম ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা যায় কাউকে কাউকে। ভোগান্তির শেষ এখানেই নয়, লজ্জাজনক হলেও সত্য আরও যেসব প্রতিবন্ধকতার শিকার গণপরিবহনে চলাচলকারী নারীরা হচ্ছে; তা হলো-
- সংরক্ষিত মহিলা সিট পুরুষের দখলে থাকা
- বাসে পুরুষ যাত্রীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি
- প্রায়ই পুরুষ যাত্রীদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
- বাসে ওঠানামার সময় হেলপার কর্তৃক লাঞ্ছনার শিকার হওয়া
- কখনো বখাটেদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটা
- চুরির ঘটনা প্রভৃতি।
মহিলা যাত্রীদের এসব হয়রানি রোধে বিআরটিএ কয়েক বছর আগে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল, প্রতিটি মিনিবাসে কমপক্ষে ছয়টি এবং বড় বাসে কমপক্ষে নয়টি সংরক্ষিত আসন রাখতে হবে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য। কিন্তু অধিকাংশ সময় তা থাকে পুরুষ যাত্রীদের দখলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যেখানে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান, সেখানে সামান্য কয়েকটি সিট বরাদ্দ আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না?
সমস্যা যখন চরমে তখন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ১৯৯৮ সালে রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোয় প্রথমবারের মতো মহিলাদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করে। একে একে সেই সার্ভিসে কিছু বাস যুক্ত হলেও তা নারীদের পরিবহন সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট নয়। একে তো চাহিদার তুলনায় বাসের সংখ্যা কম, অন্যদিকে রয়েছে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। নারী যাত্রীদের অভিযোগ-
- নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলে না বাসগুলো;
- গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ;
- অতিরিক্ত ভাড়া আদায়;
- সব রুটে বাস না চলা;
- বাস সার্ভিস সম্পর্কে প্রচারের অভাব;
- প্রায়ই নির্ধারিত বাসে পুরুষ যাত্রী বহন।
ঠিক এ রকম নানা সমস্যা, অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার ঘেরাটোপে কর্মজীবী নারী যাত্রীরা। কোনোভাবেই যেন তাঁদের যাতায়াতের সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। অথচ দেশটা এগিয়ে চলেছে নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশকে মধ্যম আয়ে উন্নীত করতে কর্মজীবী এসব নারীদের যাতায়াতের সমস্যাকে দূর করতে হবে। সে লক্ষ্যে তাঁদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ একান্তই জরুরি।
গণপরিবহন কমার কারণ
রাজধানীতে গণপরিবহন কমে যাওয়ার অনেক কারণ থাকলেও প্রধানত দায়ী যানজট। সড়কে অতিমাত্রায় ব্যক্তিগত, দাপ্তরিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চলাচল ও অবৈধ পার্কিংয়ের ফলে যানজট লেগেই থাকে। এ ছাড়া সড়কগুলোতে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট ও পথচারীদের কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। যানবাহনের ওপর চাপ কমাতে যাত্রীদের হাঁটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় অর্থাৎ হকার, দোকানপাট, নির্মাণসামগ্রীসহ নানাভাবে ফুটপাত দখলে থাকায় পথচারীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। এতেও সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ফলে প্রতিদিন প্রতিটি গাড়ির ট্রিপ সংখ্যা কমে আসছে। সব ধরনের খরচ মিটিয়ে মুনাফা করতে পারছে না পরিবহনের মালিকেরা। তা ছাড়া গাড়ির টায়ার, টিউব, ফুয়েল, গ্যাসসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতির মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। এগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় লোকসানের কারণে অনেক বাসই উঠে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা গণপরিবহন কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক দলের হরতাল, মিছিল, সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি থাকে। এর মধ্যে গণপরিবহনের সবচেয়ে বড় হুমকি হরতাল ও অবরোধ। এসব কর্মসূচিতে নাশকতা সৃষ্টিতে প্রধান লক্ষ্যবস্তু গণপরিবহন। এসব কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এতে মালিকেরা পড়েন চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে। এ জন্য তাঁরা পরিবহনের ব্যবসায় নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ ছাড়া রাজধানীতে রয়েছে পরিকল্পিত কিছু পরিবহন সিন্ডিকেট। এরা বিভিন্নভাবে পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ¦ থাকায় এবং সদস্য না হওয়ায় বিভিন্ন রুটে কেউ চাইলেও নতুন গাড়ি নামাতে পারছেন না।
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে অনুমোদন পাওয়া অসংখ্য গণপরিবহন ইপিজেডসহ বিভিন্ন গার্মেন্ট, সরকারি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মরত ব্যক্তিদের যাতায়াতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ধরনের ভাড়ায় পরিবহনমালিকদের লাভ বেশি হওয়াই তাঁরা এদিকে ঝুঁকছেন। তা ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের আলাদা কোনো গণপরিবহনের অনুমোদনও নেই। তদুপরি গণপরিবহনে পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা ও পেশাদার সন্ত্রাসী কর্তৃক ব্যাপক চাঁদাবাজি গণপরিবহনের সংকটের অন্যতম কারণ।
ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি
ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেটকার রাজধানীর যানজট সৃষ্টির প্রধান কারণ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, ২০১০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০৩টি ব্যক্তিগত গাড়ি যোগ হচ্ছে। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি যোগ করলে এ সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ছাড়াবে। রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ বাস-মিনিবাসেরই ফিটনেস সনদ নেই। চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, ইন্স্যুরেন্সসহ আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও নেই, দরজা-জানালা ভাঙা, বসার সিট ছেঁড়া, সামান্য বৃষ্টিতেই গাড়ির ভেতরে পানি পড়াসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত পরিবহনগুলো। এসব ভাঙাচোরা বাসের দরজা-জানালায় লেগে জামা-প্যান্ট ছেঁড়া এবং শরীরের বিভিন্ন অংশও ক্ষতবিক্ষত হওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। এসব কারণে মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের মতে, হাঁটা, সাইকেল, রিকশা, বাস, স্কুটারসহ পাবলিক পরিবহন উপেক্ষা করার কারণে মানুষ প্রাইভেটকার ক্রয়ে ঝুঁকছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে গবেষণায় মেলে আরও কিছু তথ্য। যেমন-
- সড়কে পর্যাপ্ত বাস, ট্যাক্সি, অটোরিকশা না থাকা
- গন্তব্যে পৌঁছাতে গণপরিবহনের অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ ও ধীরগতি
- কাউন্টারভিত্তিক বাস কমে যাওয়া
- সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাব চালকদের যেকোনো গন্তব্যে যেতে অনীহা
- নির্দিষ্ট দূরত্বে যেতে মিটারের বদলে অতিরিক্ত ভাড়া দাবি ও আদায়
- অধিকাংশ রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ থাকা
- ফুটপাতে পথচারীদের হাঁটা-চলার সুপরিবেশের অভাব প্রভৃতি।
এসব ছাপিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ সামাজিক ও সড়ক নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক সময়ে গুম, অপহরণ, খুন, ছিনতাই এবং সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশেষ করে সন্তানের নিরাপত্তায় অভিভাবকেরা স্কুল-কলেজে যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত হন। তা ছাড়া হাতে গোনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকাও এ জন্য দায়ী। তা ছাড়া ঝামেলা এড়াতে অনেকেই এসি বাসে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এই সেবাটিও কমে যাওয়া বিভিন্ন কারণে একই পরিবারের চার-পাঁচটি গাড়ি একই সঙ্গে রাস্তায় নামছে। এভাবেই সড়ক দখল করছে প্রাইভেটকার।
সংকট নিরসনে বিআরটিসি
রাজধানীর গণপরিবহনের সংকট নিরসনে নিয়োজিত সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি)। গণপরিবহন ক্রয় এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত সংস্থাটির দায়িত্ব। বিভিন্ন সময়ে সাধারণ বাস, দ্বিতল বাস, ভলভো বাস এবং আর্টিকুলেটেড বাস ক্রয় করে যাতায়াতের সংকট নিরসনে চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতির কারণে এসব পরিবহনের অধিকাংশই নিম্নমানের। রাস্তায় নামানোর বছর যেতে না যেতেই এগুলো হয়ে পড়ছে বিকল। আশ্রয় মেলে ডাম্পিং স্টেশনে। কিছু কিছু মেরামত করে সড়কে নামানো হলেও প্রায়ই তা অকেজো হয়ে যায়। এ ছাড়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সচল বাসগুলোর অধিকাংশই চলছে ইজারা দিয়ে। ইজারাদাররা সরকারি বাসেও নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে আদায় করছেন দ্বিগুণ টাকা। এতে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি বাড়ছে অসন্তোষ। উল্লেখ্য, বিআরটিসি সূত্রমতে, ২০১০ সালের শেষ দিকে সরকার বিদেশ থেকে ২৭৫টি বিলাসবহুল বাস আমদানি করেছে। এর মধ্যে ৫২ সিটের ১০০টি এসি ও ১৭৫ নন-এসি বাস ছিল। এরপর কোরিয়া থেকে ২৫৫টি সিএনজিচালিত বাস ও ভারত থেকে ২৯০টি দ্বিতল ৮৮টি একতলা ও ৫০টি আর্টিকুলেটেড বাস আমদানি করে। সাম্প্রতিক সময়ে যোগ হওয়া ৯৫৮টি বাসের ৫৩০টি সিএনজিচালিত। অথচ এগুলোর অধিকাংশই বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্র“টি ও অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে ডাম্পিং স্টেশনে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ
রাজধানীর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার ‘স্ট্র্যাটিজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি)’ এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা মহানগরের জনপরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯২-১৯৯৩ সালে Dhaka Integrated Transport Studies (DITS) নামক একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯৯৮ সালে গ্রেটার ঢাকা ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন বোর্ড (GDTPCB) গঠন করে। পরবর্তী সময়ে GDTPCB বিলুপ্ত করে ‘ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড আইন-২০০১’ (২০০১ সালের ১৯ নম্বর আইন) জাতীয় সংসদে অনুমোদন লাভ করে। এই আইনের অধীনে এবং ক্ষমতাবলে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি) একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরিসংখ্যানমতে, গত তিন দশকে সড়ক যোগাযোগে সরকার বেশি ব্যয় করেছে। উপেক্ষিত থেকেছে রেল ও নৌযোগাযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে সড়কের ওপর চাপ কমাতে সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগকে সমান প্রাধান্য দিয়ে একটি সমন্বিত পরিবহন নীতিমালার খসড়া অনুমোদন করেছে সরকার। ঢাকা মহানগরের পরিবহনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, পরিকল্পিত, সমন্বিত ও আধুনিকীকরণ করার লক্ষ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর এবং নরসিংদী জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। অর্থাৎ আগের ‘ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি)’ এখন থেকে ‘ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সে লক্ষ্যে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে।
আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
- ঢাকা মহানগরের যানজট নিরসনকল্পে পরিবহন খাতে কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আন্তকর্তৃপক্ষ সহযোগিতা ও সমন্বয় করা;
- ঢাকার গণপরিবহনসংক্রান্ত নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান;
- আইনের উপধারা ৭৪ (১)-এর অধীন অনুমোদিত ও প্রকাশিত মাস্টারপ্ল্যান মোতাবেক ঢাকার সার্বিক উন্নয়নের নীতি-কৌশলের সঙ্গে যানবাহন, পরিবহন ও এ সম্পর্কিত অবকাঠামোর উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয় করা;
- ঢাকায় একটি নিরাপদ সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবহারকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, জনসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট সবাইকে পরামর্শ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতা ও কার্যাবলি
- ঢাকা মহানগরের যানজট নিরসনে পরিবহন নীতিমালা ও স্কিম প্রণয়ন, অনুমোদন এবং পরিবহন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কার্যক্রম তদারকি;
- সরকারি ও বেসরকারি পরিবহনব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাসহ উন্নত পরিবহন সেবা নিশ্চিত করা;
- বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার বাস্তবায়িতব্য পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রকল্পসমূহের চূড়ান্ত নকশা অনুমোদন;
- আইনের উপধারা ৭৪ (১)-এর অধীন প্রকাশিত মাস্টারপ্ল্যান, DAP, STP ও অন্যান্য সমীক্ষা বিবেচনাক্রমে ঢাকার পরিবহন, যানবাহন, রাস্তা, ফুটপাত, রাস্তাসংলগ্ন স্থানের ব্যবস্থাপনা এবং পার্কিং নীতি প্রণয়ন;
- রাস্তায় পথচারীদের চলাচলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে সমন্বয়;
- কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্মিতব্য বহুতল ভবন ও আবাসিক প্রকল্পে যানবাহনের প্রবেশ-নির্গমন ও চলাচল (Traffic Circulation) সংক্রান্ত নকশা অনুমোদন এবং তদারকি;
- সুষ্ঠু পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অবকাঠামো নির্মাণে এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী নির্মিত অবকাঠামো অপসারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ প্রদান;
- সকল প্রকার ব্যক্তিমালিকানাধীন যানবাহন, সরকারি ও বেসরকারি পরিবহন নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা প্রণয়ন, ওই নীতিমালা বাস্তবায়নসংক্রান্ত নির্দেশাবলি প্রণয়ন এবং পরিবহন পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পাদন;
- যানবাহন চলাচলের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান;
- পরিবহন ব্যবহারকালে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে ও পরিবহনসংক্রান্ত নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন;
- সব শ্রেণির ও প্রকারের যানবাহনের পরিবেশসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদান;
- যানবাহন ও পরিবহন ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিম প্রণয়ন এবং অনুমোদন;
- যানবাহনের পার্কিং-সুবিধার লক্ষ্যে গৃহীত পার্কিং প্ল্যান ও যানবাহন চলাচলের নকশা অনুমোদন;
- যানবাহনের ডিপো, টার্মিনাল, ইত্যাদি স্থাপনার বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে পরামর্শ প্রদান ও তদারকি;
- পরিবহন খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকি;
- বিভিন্ন শ্রেণির পরিবহনের সংখ্যা ও প্রকৃতি নির্ধারণ;
- যানবাহন ও পরিবহনসংক্রান্ত আইন প্রয়োগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কর্তৃপক্ষকে সহায়তা প্রদান;
- ত্র“টিপূর্ণ যানবাহন চলাচলের কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণরোধে সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান;
- দ্রুতগামী গণপরিবহন (Mass Rapid Transit) ব্যবস্থাসংক্রান্ত নীতি ও প্রকল্প প্রণয়ন, ক্ষেত্রবিশেষে বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে পরামর্শ প্রদান ও তদারকি;
- বিভিন্ন পরিবহন রুটের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং রুট ও লেন নির্ধারণের বিষয়ে নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন;
- নৌপরিবহন রুটের সঙ্গে স্থল পরিবহনের সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবায়নে পরামর্শ প্রদান;
- দ্রুত ও উন্নত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে দ্রুতগামী গণপরিবহনব্যবস্থার আওতায় বাস র্যাপিড ট্রানজিট, মেট্রোরেল এবং রুট ভাড়া অথবা লিজ প্রদানের মাধ্যমে (রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ) বাস বা রেল (মেট্রো/ মনো/ সার্কুলার/ কমিউটার) বা এক্সপ্রেসওয়ে (উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন লেন) পরিচালনার জন্য সরকারি, বেসরকারি অথবা সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানায় পরিবহন পরিচালনার কার্যক্রম, ভাড়া নির্ধারণ এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও অনুমোদন;
এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ওপর। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিটের মতো বড় দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ডিটিসিএ। ক্ষমতাধর এ প্রতিষ্ঠানটির উচিত সুষ্ঠু, সমন্বিত ও পরিকল্পিত গণপরিবহন সেবা বাড়িয়ে নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা।
সংকট নিরসনে করণীয়
রাজধানীর জনসংখ্যার অনুপাতে সড়কের সীমাবদ্ধতায় বাসের মতো গণপরিবহন বাড়ালে যাতায়াত কিছুটা সহজ হলেও যানজট থেকে রেহাই মিলবে না। এ জন্য প্রথমেই জোর দিতে হবে ব্যবস্থাপনায়। যথাযথ পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ও আইনের কঠিন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যাগুলোকে অনেকাংশেই নিরসন সম্ভব। সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বাস-মিনিবাস, ট্যাক্সিক্যাব ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার পরিমাণ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সারোয়ার জাহানের মতে, ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এই শহরের যাতায়াতব্যবস্থায় সংকট আরও বাড়াবে। যানজট নিরসনে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ছোট ও মাঝারি শহরের উন্নয়ন করা প্রয়োজন। সেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা বৃদ্ধি করা হলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে।
উন্নতমানের গণপরিবহন সেবা বৃদ্ধি করে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বিশ্বের দেশগুলো যখন প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিচ্ছে আর আমরা চলছি উল্টো পথে। সে ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক প্রাইভেটকার ব্যবহারে উচ্চহারে করারোপ, সিএনজিসুবিধা প্রত্যাহার, আমদানি শুল্কবৃদ্ধিসহ কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রাইভেটকার ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। এ ছাড়া কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব। সে লক্ষ্যে-
- উন্নতমানের বাস সার্ভিস চালু করা
- বাসের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা
- ট্যাক্সিক্যাবের সংখ্যা বাড়ানো
- যাত্রীদের বসার জন্য যাত্রীছাউনি নির্মাণ
- ফুটপাতের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বাভাবিক হাঁটাচলার ব্যবস্থা করা
- সড়কগুলোর দুই পাশ সংস্কার এবং প্রশস্ততা বাড়ানো
- যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করা
- নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া গাড়ি না থামানো
- ব্যক্তিগত গাড়ির লাইসেন্স সীমিত করা
- অফিসের সময়সূচি একই সময়ে না করে একটু আগে-পরে করা
- সময়োপযোগী মোটরযান আইন প্রণয়ন প্রভৃতি।
তবে সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে নগর পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে প্রাধান্য পাবে গণপরিবহনসংকট। বিশ্বের অনেক দেশ সমস্যাটি মোকাবিলা করেছে এবং যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে তা সমাধানও করেছে। সেগুলো তাদের নগর কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। যেমন- চীনের মতো বিশাল জনগোষ্ঠীর নগরে মেট্রোরেল, পাতালরেল ও উড়ালরেল-ব্যবস্থার মাধ্যমে; থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুর সিটি উড়ালরেল; ইংল্যান্ডের লন্ডন ও রাশিয়ার মস্কো দ্বিতল বাসের সাহায্যে সমস্যাটি সমাধান করেছে। বিভিন্ন দেশে ট্রাম নগর যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। ইতালির ভেনিস শহরের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌকা। এ ছাড়া নেদারল্যান্ড, স্পেন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ আলাদা সাইকেল লেনের মাধ্যমে এ সমস্যাটি সমাধান করেছে। এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকার জন্য যে ব্যবস্থাটি উপযুক্ত তা গ্রহণ করা উচিত। যেমন-
- র্যাপিড বাস ট্রানজিট দ্রুত বাস্তবায়ন
- রাজধানীকে ঘিরে চক্রাকার নৌপথ সৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত নৌযান বৃদ্ধি
- দ্বিতল ও আর্টিকুলেটেড বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি
- মেট্রোরেল, মনোরেল ও সমন্বিত রেলব্যবস্থা চালু করা।
রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থার দৈন্যদশা দীর্ঘদিনের। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। যাতায়াতের বর্তমান দুর্ভোগ এবং আসন্ন বিপর্যয় নিরসনে অনতিবিলম্বে গণপরিবহনকেন্দ্রিক সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিকসহ প্রায় সব ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে। তাই ঢাকাকে দেশের হৃৎপিণ্ড বলা যায়। হৃৎপিণ্ড সুস্থ ও সচল রাখতে যেমন রক্ত চলাচল নিরবচ্ছিন্ন হতে হয়, তেমনি এ মহানগরের উন্নয়ন ও স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে গণপরিবহনের স্বাভাবিকতা প্রয়োজন। তা না হলে মানুষ কর্মবিমুখ হয়ে পড়বে। নষ্ট হবে কর্মঘণ্টা। স্থবির হয়ে পড়বে নগরব্যবস্থা। পরিণামে রাজধানী পরিণত হবে পরিত্যক্ত বসবাসের অযোগ্য এক নগরে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৫৫তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪