উড়ন্ত সুপারম্যান; ঝুলন্ত ব্যাটম্যানের মস্তক, কুংফু পান্ডাসহ হলিউডের জনপ্রিয় সব চরিত্রের ভিড় যেন এখানেই। তবে বাস্তবে নয়! কোনোটা ভাস্কর্যে আবার কোনোটা দেয়ালচিত্রে। ওয়াট রং খুন (Wat Rong Khun)-এ প্রথমবার যাঁরা প্রার্থনা কিংবা দর্শন করতে আসেন, মন্দির প্রাঙ্গণে হলিউডি সিনেমার জনপ্রিয় এসব চরিত্র দেখে তাঁদের চোখ তো ছানাবড়া। ভাবনায় আসে এটি কি মন্দির না ডিজনিওয়ার্ল্ড? স্বপ্নেও হয়তো ভাবেননি বৌদ্ধ এক মন্দিরের এ হাল হতে পারে! কট্টরপন্থী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা নির্মাতাদের দুকথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়েন না- ‘কী যুগ এল রে বাবা; সবখানেই তামাশা!’ তবে ওয়াট রং খুনের স্থপতি চালার্মচাই কোজিতপিপাত মন্দির সজ্জায় স্বর্গ, নরক, পাপাচার ও পরিণতির এমন এক জাগতিক ও পারলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, যা মানুষের অনুভূতিকে নাড়া দেবেই। ভগবান বুদ্ধের বাণী হৃদয়ে ধারণ করা যাবে সহজেই।
পর্যটন স্বর্গখ্যাত থাইল্যান্ড। সমুদ্র, পাহাড়, সুস্বাদু খাবার, সংস্কৃতির মেলবন্ধনে বিশ্বখ্যাত বিনোদন তীর্থ। এখানকার সিংহভাগ মানুষের ধর্ম বৌদ্ধ। তাই দেশটিজুড়ে রয়েছে চোখ ধাঁধানো চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর অসংখ্য বৌদ্ধমন্দির। এর মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু ওয়াট রং খুনে। অনিন্দ্যসুন্দর এই মন্দিরটির পুরোটাই সাদা যেন শ্বেত-শুভ্র তুষার। চোখ ধাঁধানো শ্বেতমন্দিরটি ঐতিহ্য আর আধুনিক স্থাপত্যিক অনুষঙ্গের দারুণ মিশেলে নির্মিত। থাইল্যান্ডের চিয়াং রয় (Chiang Rai) শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান মন্দিরটির। স্থাপনা আর ভাস্কর্যটির সূ² কারুকাজ ও স্থাপত্যশৈলী এতটাই নয়নাভিরাম যে দেখলেই মনে হবে এটি মর্তের স্বর্গ। ঐশ্বরিক ও পবিত্রতার প্রতীকস্বরূপ এ নান্দনিক স্থাপনাটির সর্বত্রই ব্যবহৃত হয়েছে শান্তির রং সাদা। বৌদ্ধমন্দিরটির স্থপতি ঐতিহ্যবাহী ও গতানুগতিক ধারায় একে না সাজিয়ে অলংকরণ করেছেন স্বকীয় ভাবনায়; কিছুটা অপ্রচলিত মোটিফে।
১৯৯৭ সালে স্থপতি চালার্মচাই কোসিতপিপাত (Chalermchai Kositpipat) মন্দিরটির ডিজাইন করেন। নিজ দেশে তিনি যেমন স্থপতি, তেমনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পীও। স্পেনের বার্সেলোনার বিখ্যাত গির্জা সাগরদা ফ্যামিলিয়ার মনোমুগ্ধকর কারুকাজ ও নির্মাণশৈলী দেখে মন্দিরটি নির্মাণে অনুপ্রাণিত হন। পরের বছরই শুরু হয় এর নির্মাণকাজ। শুরুতেই স্থপতি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেন, যেখানে স্থাপনাটিতে স্থান পাবে ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, উপাসনালয়, জাদুঘর, গ্যালারিসহ বিশ্রামাগার। পেয়ে যান তিন একর জায়গাও। নির্মাণ ও সৌন্দর্যায়নের কাজ শেষের সময়কাল ধরা হয় ২০২০ সাল। মূল স্থাপনায় যোগ হতে থাকে নিত্যনতুন উপকরণ। প্রধান প্রধান অবকাঠামোগত কাজগুলো শেষ হয়। টুকিটাকি যে কাজ চলত, তাতে মন্দিরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু এরই মাঝে ঘটে ভয়াবহ এক ভূমিকম্প। অনেক ক্ষতি হয় মন্দিরটির। নিরন্তর চেষ্টায় স্থপতি আবার মন্দিরটির আগের আদল ফিরিয়ে আনেন। ফাটলের কিছু কাজ করা বাকি থাকলেও স্থাপত্যের সঙ্গে যোগ হয় নিত্যনতুন অনুষঙ্গ। তাই সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে কবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও স্থপতি আশাবাদী ২০৭০ সাল নাগাদ এর সব ধরনের নির্মাণকাজ শেষ হবে। বিশাল পরিসরের এই মন্দিরের যে নকশা, তাতে এত সময় লাগাটা অস্বাভাবিক নয়।
রাস্তার দুই ধারে লালরঙা মাথার খুলি! প্রধান সড়ক থেকে বাঁক নিয়ে যখন মন্দিরের সড়কে প্রবেশ করবেন, খটকা লাগার শুরুটা কিন্তু তখন থেকেই। ঠিকঠাকমতো এগোচ্ছি তো! এমন দোমন্যতা নিয়ে যখন মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করবেন, তখন নিজের অজান্তেই বলে উঠবেন, আহ্ কী সুন্দর! যেন এক শুভ্রময় পবিত্র নগর। দ্বিগুণ উৎসাহে যখন সামনে এগোতে থাকবেন, দেখবেন একটি সোজা রাস্তা প্রধান মণ্ডপে ঢুকেছে। সামনে কী আছে! সমানে বাড়তে থাকবে কৌত‚হলটা। চোখ যাবে একটি জলাশয়ে, যার ওপর একটি সেতু। দুই পাশে অগণিত হাত; হাজারে হাজার। প্রতিটি হাতই যেন আপনার কাছে সাহায্য চাইছে! দেখলেই মনে হবে নরক-যন্ত্রণা ভোগরত একেকটা যেন নরকের প্রেতাত্মা পুনর্জন্মের অপেক্ষায়। হাতের ওপর বেশ কটি পাত্র, যেখানে চাইলে আপনি দুই পয়সা দক্ষিণা দিতে পারবেন। ফিরে আসতে পারবেন না আপনি, এগোতে হবে সামনে। সদা প্রহরারত ভয়াল দর্শনের দুই প্রহরী যেন সাক্ষাৎ যমদূত; বিশাল তরবারি উঁচিয়ে রেখেছে আপনারই অপেক্ষায়। যদি আত্মা পরিশুদ্ধ না হয় অথবা কুমতলবে কেউ ভগবান বুদ্ধের দরবারে প্রবেশ করতে চায়, তবে শিরশ্চেদ অনিবার্য। মন্দিরটিকে ঘিরে রহস্যের কমতি নেই। প্রাঙ্গণের গাছে হয়তো ঝুলছে ভয়ংকর ভূত-প্রেত, সবুজ ঘাসের ওপর মাথার খুলি, সিনেমার চরিত্র প্রিয়েডেটরসসহ হরেক রকম ভাস্কর্য। তবে অপরূপ দর্শন ভাস্কর্যেরও কমতি নেই। ভাসমান পদ্মের ওপর দণ্ডায়মান অথবা ধ্যানমগ্ন ভগবান বুদ্ধ যেন প্রকাশ করছে চির শান্তি ও জ্ঞানের বার্তা। প্রাগৈতিহাসিক যুগের শুঁড় উঁচিয়ে থাকা হাতি কিংবা ড্রাগন, সবই দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে। তবে পরির ভাস্কর্যের কাছে যেতেই মনে হবে এইমাত্র স্বর্গ থেকে এল বুঝি; উড়াল দেবে এক্ষুনি। ভেতরের দেয়ালে তো চিত্রকর্মের শেষ নেই। সুপারম্যান, ম্যাট্রিকস সিনেমার নিও, টুইন টাওয়ারের ধ্বংসযজ্ঞ, স্পেসশিপ, কল্পবিজ্ঞানের গ্রহচিত্রসহ আরও কত কি!
ওয়াট রং খুন থাইল্যান্ডের সবচেয়ে ব্যতিক্রম ও সুন্দর মন্দির। তবে এটা প্রথাগত মন্দিরের মতো সোনালি নয় বরং সাদা। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ভাস্কর্য পাশাপাশি দেয়ালচিত্র মন্দিরটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। স্থপতির যুক্তি, এসবের মাধ্যমে তিনি ভগবান বুদ্ধের মহানবাণীগুলো শৈল্পিক ঢংয়ে উপস্থাপন করেছেন। প্রতীকী সব ভাস্কর্যের মাধ্যমে সু’র কাছে কু’র পরাজয়ই যেন মুখ্য। প্রতিটি ভাস্কর্যের গায়ে ব্যবহার করা হয়েছে ভাঙা আয়নার অসংখ্য টুকরো। রোদেলা দিনে সূর্যের আলোয় চিকচিক করে ওঠে। আয়নার টুকরোগুলো প্রতিমুহূর্তে সূর্যরশ্মিতে প্রতিফলিত হয়, যা গৌতম বুদ্ধের জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয় বিশ্বময়; গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। এই মন্দিরে একটি শিক্ষালয় এবং একটি মেডিটেশন কেন্দ্র স্থাপন করেছেন স্থপতি, যেখানে মানুষ ধর্মচর্চার মাধ্যমে আত্মার শুদ্ধতা আনে, যা লোভ, হিংসা, কাম, ক্রোধসহ সব কুঅভ্যাস বর্জনে দেখায় সুপথের দিশা।
পর্যটকপ্রিয়তায় দিন দিন খুবই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে ওয়াট রং খুন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে মন্দিরটি। প্রবেশ সবার জন্যই উন্মুক্ত। তবে শর্ত, নম্রতা বজায় রাখতে হবে। মন চাইবে সাদা ভাস্কর্যগুলো একটু ছুঁয়ে দেখতে কিন্তু তা করা যাবে না একেবারেই। মন্দিরের বাইরে ছবি তোলার অনুমতি থাকলেও ভেতরে কিন্তু তা নেই। কোনো তথ্য জানতে চাইলে মন্দিরের গেরুয়া বসনের বৌদ্ধভিক্ষু ও শিক্ষার্থীরা সহায়তা করবেন। মন্দিরের আর্ট গ্যালারিতে রয়েছে বিখ্যাত শিল্পীদের সব মাস্টারপিচ চিত্রাঙ্কন। চাইলে এগুলো কেনা যাবে, পাশাপাশি কিছু দুর্লভ বই, পোস্টার ও কার্ডও কেনার সুযোগ রয়েছে। মন্দিরটি দুপুরের রোদ ও বিকেলের গোধূলিতে অন্য রূপ ধারণ করে। এর প্রতিটি ভাস্কর্যই যেহেতু রোদে প্রতিবিম্বিত হয়, তাই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সঙ্গে রোদচশমা থাকাটাই উত্তম।
মারুফ আহমেদ
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৪ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৪