প্রমত্তা মেঘনার মতোই বাণিজ্যে বহমান ভৈরব, যা কিশোরগঞ্জের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। আবহমানকাল থেকেই জনপদটির প্রসিদ্ধি ব্যবসা-বাণিজ্যে। ভৈরবের মেঘনা ফেরিঘাটস্থ মেসার্স জিসান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মাসুদুর রহমান জিসান এলাকার তরুণ ও উদীয়মান ব্যবসায়ী। ব্যবসাটা নির্মাণপণ্যকে ঘিরে। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা এনামুল হককে সঙ্গে নিয়ে বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে তরুণ এ ব্যবসায়ীর দিনবদলের গল্প এবারের সংখ্যায়।
তরুণ ব্যবসায়ী জিসানের জন্ম ১৯৯৩ সালের ১৯ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবে। বাবা হাজি মো. জিল্লুর রহমান ও মা মাজেদা বেগম। আর আছে দুই বোন। কমলপুর হাজি জহির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে এসএসসি ও ঢাকার আইডিয়াল কমার্স কলেজ থেকে ২০১০ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ)-এ। হঠাৎই বাবার অসুস্থতায় পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় হাল ধরতে হয় ব্যবসার। ইতি ঘটে শিক্ষাজীবনের। ঢাকা ছেড়ে আসতে হয় নিজ এলাকা ভৈরবে। পা রাখেন ব্যবসায়িক জীবনে।
সদ্য কৈশোর পেরোনো জিসানের ছিল না ব্যবসার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা। নির্মাণপণ্যের মতো জটিল ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া তার জন্য ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং। এমন সময় পাশে এসে দাঁড়ায় অসুস্থ বাবা। ব্যবসার নানা কলাকৌশল শেখান ছেলেকে। সব সময় সাহস দিয়েছেন সফল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে উঠতে। যদিও বাবার ছিল সীমিত পরিসরের খুচরা ব্যবসা। কিন্তু ব্যবসায়ী জিসান তাঁর ব্যবসাকে আবদ্ধ করেননি কোনো গণ্ডিতে। ব্যবসার পরিসর বাড়াতে খুচরার পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসায়ও দিয়েছেন সমান গুরুত্ব। শুরুতে কোনো পণ্যের ডিলারশিপ না পেলেও নিজ ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে স্বল্প সময়ে এলাকায় অনুমোদিত ডিলারশিপ পান পিএইচপি ইস্পাতের। তাঁরই নিয়ন্ত্রণে পণ্যটি সরবরাহ করা হয় পার্শ্ববর্তী ১৫টি জেলায়। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত হয়েছে তাঁর নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা। এভাবে ব্যবসায় পণ্য বিক্রিতে তিনি হয়ে ওঠেন অনবদ্য। আর তাই তো আকিজ সিমেন্ট বিক্রিতে ভৈরবে তিনি শীর্ষে। সর্বোচ্চ পণ্য বিক্রির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন সেরা বিক্রেতার সার্টিফিকেট। একটি সিমেন্ট কোম্পানির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ভ্রমণ করেছেন থাইল্যান্ড। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির নির্ধারিতসংখ্যক পণ্য বিক্রির সুবাদে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে এ বছরই যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন থাইল্যান্ডে।
মাত্র কয়েক বছরেই তরুণ ব্যবসায়ী জিসানের পক্ষে এসব সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে নির্মাণপণ্য ব্যবসায় বাবার পরিচিতি ও সুনামের সুবাদে। দীর্ঘ দিনের ব্যবসা তাঁদের। তবে অন্যতম আরও একটি কারণ ব্যবসাটির সঙ্গে যুক্ত একদল দীপ্ত তারুণ্য। জিসান ছাড়াও ব্যবসাটিতে যুক্ত আছে মো. জহিরুল ইসলাম, মো. সুজন মিয়া ও রাজীব আহমেদ। তিনজনই ম্যানেজার। বয়সে সবাই তরুণ ও সমবয়সী। প্রত্যেকের সঙ্গে রয়েছে জিসানের চমৎকার বোঝাপড়া। ব্যবসার প্রয়োজনে কঠোর পরিশ্রমী তাঁরা। ব্যবসায়ী জিসানের সঙ্গে সঙ্গে মাঝেমধ্যেই যেতে হয় লোকালয়ের পর লোকালয়ে। অন্যরা তখন দোকান সামলায়। এ ছাড়া স্বল্প মুনাফায় গুণগতমানের পণ্য, সঠিক ওজনে বিক্রি করার পাশাপাশি ভালো ব্যবহারের কারণে ক্রেতারা ভিড় করেন জিসানের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে। এভাবেই বিস্তৃত হচ্ছে ব্যবসার পরিসর। আর ব্যবসার প্রয়োজনে বাজারে রয়েছে বড় একটি শোরুম ও গোডাউন। যেখানে কাজ করছে ১২-১৫ জন কর্মচারী।
ব্যবসায়ী জিসান বিয়ে করেন ২০১৩ সালের এপ্রিলে। স্ত্রী নুসরাত জাহান রিমি। এক মাস হলো তাঁদের ঘর আলো করে এসেছে মেয়ে নুসাইবা রহমান ত্যায়িবা। সপ্তাহজুড়ে খোলা থাকে ভৈরব ফেরিঘাট এলাকার মার্কেট। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত হওয়ায় পরিবারকে সময় দিতে পারেন কমই। তবুও একটু অবসর পেলেই অবসরের পুরো সময়টাই পরিবারের। ছোটবেলা থেকেই ঘোরাঘুরি তাঁর শখ। আর তাই সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন এখানে-ওখানে। কক্সবাজার তাঁর পর্যটনপ্রিয় জায়গা। গিয়েছেন অনেকবার। এমনকি হানিমুনেও গিয়েছেন এই সমুদ্রনগরে। ভালো ক্রিকেটার ছিলেন। স্কুলের দৌড় প্রতিযোগিতা, মোরগ লড়াই, জাম্প খেলায়ও পেয়েছেন পুরস্কার।
পড়ালেখা শেষ না করেই সংসারের হাল ধরতে নামতে হয়েছে ব্যবসায়। বাবার ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে পড়ানোর। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আফসোস থাকলেও ব্যবসায় এখন তাঁর এগিয়ে যাওয়ার সময়। নির্মাণপণ্যের এ ব্যবসাটি বাবার হাতে গড়া, তাই ছাড়তে চান না একে। পরিসর বাড়াতে চান ব্যবসার। সুযোগ পেলে ইচ্ছে আছে এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করার। তারুণ্যে ভরপুর এ ব্যবসায়ীর ইচ্ছাপূরণ হোক! দিনবদলের এ রূপকারের জন্য শুভকামনা বন্ধন পরিবারের পক্ষ থেকে।
মাহফুজ ফারুক
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৩ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৪