ঘরের সৌন্দ‍র্যে সোফা
ঘর সাজাতে সোফার আদ্যোপান্ত

মৌলিক চাহিদা মেটাতেই মানুষের প্রয়োজন ঘরের। আর এ ঘরকে সুন্দর করে তোলে আসবাব, শো-পিসসহ নান্দনিক সব অনুষঙ্গ। যে কারও বসার ঘরে ঢুকলে প্রথমেই চোখ যায় ড্রয়িংরুমে। অতিথির আতিথ্য গ্রহণের কেন্দ্রে থাকে ড্রয়িংরুমের সোফা; খাঁটি বাংলায় যাকে বলে আরামকেদারা। এটি ড্রয়িংরুমের প্রধান আসবাব। মানানসই সুন্দর সোফাসেট পুরোপুরি বদলে ফেলে ঘরের সৌন্দর্য। স্বভাবতই নিজের ঘরকে দৃষ্টিনন্দন করে উপস্থাপনের প্রয়াস থাকে সবার। কেননা এতে প্রকাশ পায় নিজস্ব রুচিবোধও। সত্যি বলতে কি, বর্তমানে সোফা শুধু বসার উপকরণ হিসেবে নয়, ঘরের শ্রীবৃদ্ধিতেও রয়েছে এর সমান স্বীকৃতি। 

বিচারকার্যে কিংবা বিদেশি বণিক মেহমানদের আবাসস্থলে সোফা ব্যবহারের চল চলে আসছে শাহি রাজা-বাদশাহের আমল থেকে। এরপর এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় ভারতবর্ষের নবাব-জমিদারবাড়িতে। আস্তে আস্তে সোফা স্থান করে নেয় ধনাঢ্যদের ড্রয়িংরুমে। সোফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে : নিজ ঘরের পরিসর, দেয়ালের রং, অন্যান্য ফার্নিচারের রং। সোফা এখন শুধু বসার ঘরেই নয়, বেডরুমের জন্যও চাই ছোট সোফা বা ডিভান। এ জন্য পরামর্শ নিতে পারেন পরিচিত ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের।

বেতের সোফা

সোফায় নতুনত্ব

এখন সোফায় লেগেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। বাজারে কাঠের সোফার আবেদন ফুরাইনি। তবে কাঠের পাশাপাশি ক্রমেই বাড়ছে রড আয়রনের সোফার কদর। তদুপরি বেতের সোফার রয়েছে আলাদা চাহিদা। সোফার নতুনত্ব বাড়াতে যুক্ত হয়েছে হরেক রকমের ডিজাইন। ন্যাচারাল লিকার, ডার্ক লিকার ও অ্যান্টিক লিকার- এই তিন রঙের কাঠের সোফার চাহিদাই তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে দামে তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ও ঘুণে ধরার ভয় না থাকায় রড আয়রনের সোফাও ক্রেতাদের মাঝে সাড়া ফেলেছে বেশ। তবে এর পাশাপাশি সমানতালে চলছে বিদেশি সোফাও। ইতালিয়ান, চায়নিজ, মালয়েশিয়ান সোফার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে যেমন বেশি, দামও তেমন অধিক। এ ছাড়া পুরোনো ধাঁচের নকশা করা সোফাও অনেককে বেশ টানে। কারণ, এগুলো দেখতে পুরোনো হলেও নকশাদার কারুকার্যে সমৃদ্ধ। তবে রুচি বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সোফার সনাতন ডিজাইন ও ক্রেতা চাহিদা।

ঘর সাজাতে…

সোফা যতই ভালো হোক না কেন তা মাটি হতে বাধ্য যদি তা ঘরের সঙ্গে না মানায়। সোফায় ঘরকে নান্দনিক করে তুলতে মাথায় রাখতে হবে কিছু বিষয়। সোফা বড় হলে ঘরের মাঝ বরাবর রাখলে সুন্দর দেখাবে। জোড়া সোফা পাশাপাশি রাখতে হবে। মাঝখানে থাকবে কারুকার্যখচিত ফুলদানি। সোফার মাঝে থাকবে টি-টেবিল এবং নিচে বড় আকারের কার্পেট। দেয়ালে অ্যান্টিক পেন্টিং ওপরে ঝাড়বাতি; এ যেন স্বপ্নের এক ড্রয়িংরুম। বড় ঘরে সোফা দুই সেট হলে ভালো হয়, কেননা এতে অতিথিদের বসার সুবিধা হয়। এ ছাড়া ফ্যামিলি লিভিংয়ে আরামদায়ক লো-লাইট সোফা ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের ঘরে রাখা যেতে পারে ছোট আকৃতির কম উচ্চতার সোফা। এ ছাড়া শিশুর পড়ার ঘরে আরও রাখা যায় ছোট লো-হাইট ডিভান। আর ঘর যদি ছোট হয় হালকা ডিজাইনের কাঠ, বেত, বাঁশ বা রড আয়রনের সোফা রাখা যায়।

নান্দনিক লেদারের সোফা

তৈরি হয় যেভাবে

মূলত সোফা তৈরিতে সময় কিছুটা বেশি লাগে। ফার্নিচার কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব কারিগরের মাধ্যমে এক দিন কিংবা দুই দিনে একটি সোফা তৈরি করে থাকে। আবার যখন সোফা তৈরির কাজটি ফার্নিচারের দোকানে করা হয়, তখন সময় বেশি লাগে। কারণ, এখানে কাজ করে কাঠমিস্ত্রিরা, তা ছাড়া এখানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তেমন আধুনিক নয়। মিস্ত্রিরা প্রথমে কাঠ বাছাই করে কেটে সাইজ করে মাপমতো। এরপর নকশা অনুযায়ী কেটে সবগুলো কাঠ জোড়া লাগিয়ে ফোমে আঠা লাগানো হয়। এভাবেই তৈরি হয় কাঠের সোফা। রডের সোফা তৈরির ধরন আবার আলাদা। প্রথমে এসএস পাইপ বা রড কাটিং করা হয় মাপমতো। এরপর ঝালাই করে গেনিং মেশিন দিয়ে কাটা হয়। সবগুলো লাগিয়ে এতে নকশা করা হয়। এরপর ফোম বিছিয়ে তৈরি হয় সোফা। এ ছাড়া আছে বেতের সোফা। প্রথমে বেতগুলো একসঙ্গে রেখে কাটিং করে মাপ নেওয়া হয়। এরপর বেতের চাটাই দিয়ে পেঁচিয়ে ডিজাইন করা হয়। এভাবে প্রস্তুত হয় দেশীয় বেতের সোফা। তবে সোফার জন্য ফোম একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এটি নরম না হলে কিন্তু টেকসই হয় না। মূলত সোফার ফোম ডাইস অনুযায়ী কাটা হয়। এরপর এগুলো আঠার সঙ্গে লাগিয়ে সোফার কাঠে যুক্ত করা হয়। তবে ফোম যত নরম হয়, সোফার নান্দনিকতা ততই বাড়ে। এ ছাড়া সোফার জন্য লাগে কাপড়, রেক্সিন আর লেদার। এগুলো ব্যবহৃত হয় মূলত সোফার ধরনের ওপর। কাপড়ের সোফায় ডিজাইন কম। লেদার বা চামড়ার সোফাগুলো হয় অপেক্ষাকৃত বেশি মজবুত। এগুলো মূলত অফিস-আদালত কিংবা করপোরেট অফিসে বেশি ব্যবহার করা হয়।

সোফা মার্কেট

ঢাকা শহরের প্রায় সর্বত্রই রয়েছে আসবাবপত্রের শোরুম। তবে সোফার সবচেয়ে বড় মার্কেট হলো মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া। এ এলাকার রাস্তার দুই পাশেই রয়েছে বিভিন্ন ফার্নিচারের দোকান, কারখানা ও শোরুম। এ ছাড়া আরেকটি বড় মার্কেট আছে পান্থপথে। কাঠ, ফেব্রিক, বেত, রড, আয়রনের তৈরি মোটামুটি সব ধরনের সোফাই পাওয়া যায় এখানে। শাহজাহানপুর থেকে খিলগাঁও পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে রয়েছে বেশ কিছু আসবাবের দোকান। তবে পুরোনো আসবাব কিনে নতুন করে ব্যবহারে আগ্রহী অনেকেই। সেগুনবাগিচা এ ক্ষেত্রে উত্তম জায়গা। কমমূল্যে পুরোনো এ সোফাগুলো রিপিয়ার করা হয় এখানে। দেখে বোঝাই যায় না এগুলো পুরোনো। এ ছাড়া ভালো মানের সোফা পাওয়া যায় অটবি, আকতার, নাভানা, হাতিল, পারটেক্স, ব্রাদার্সের মতো দেশসেরা সব ফার্নিচারের শোরুমে।

দরদাম

নিজস্ব সংগতি রেখে সোফা কিনুন। সোফার জন্য সবচেয়ে বেশি খ্যাতি রয়েছে অটবি ওয়ার্ল্ড ক্লাস ফার্নিচারের। উডের ফেব্রিক কিংবা লেদারের সবচেয়ে সুন্দর ও মজবুত সোফা এখানে পাওয়া যায়। সাইজভেদে সোফায় রয়েছে ভিন্নতা। সিঙ্গেল উডেন সোফার দাম ১৬-২০ হাজার টাকা এবং তিন সিটের ক্ষেত্রে ৪০-৫০ হাজার টাকা। অটবিতে মডেলভেদে পুরো সোফা পাওয়া যাবে ৪৫ হাজার থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে। হাতিল ফার্নিচারের সোফা কাঠ, উড, ওক ও বেড ওকে তৈরি। এদের রয়েছে ন্যাচারাল লিকার, ডার্ক লিকার ও অ্যান্টিক লিকার এ তিন রঙের সোফা। এখানে ৪৪ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দামে পাওয়া যাবে নানা ধরনের সোফা। এ ছাড়া মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়ার ফার্নিচারের শোরুমগুলোয় সোফার দাম পড়বে ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যে। রড আয়রনের সোফার দাম ২০ থেকে ৫০ হাজার এর মধ্যে। বেড সোফার দাম পড়বে ২০-৪০ হাজার টাকার মধ্যে। তবে পান্থপথে সেটভেদে সোফার দরদাম করার সুবিধা আছে।

ঘরের রঙে সোফার রং

যত্নআত্তি

ঘরে রাখা সোফার যত্নের প্রয়োজন। কারণ, যত্ন না নিলে সোফার নান্দনিকতা নষ্ট হয়। সোফা যদি ফেব্রিকের হয়, তবে ওয়াশার দিয়ে বাতাসের সাহায্যে পরিষ্কার করা যায়, এ ক্ষেত্রে পানি লাগানো যাবে না। পানিতে ফেব্রিকের ক্ষতি হয়। লেদারের সোফা হলে ক্লিনার সহযোগে পাতলা কাপড় দিয়ে মুছতে হবে। এতে বাড়বে রঙের উজ্জ্বলতা। বেতের সোফার ক্ষেত্রে পানি না লাগিয়ে সপ্তাহে দুই-তিনবার কাপড় দিয়ে মুছতে হবে। সোফা কিন্তু শুধু বসার জিনিস নয়, ঘরের অলংকারও। এটি যত সুন্দর ও নান্দনিক হবে, আপনার ঘরের ঔজ্জ্বল্য ততই বাড়বে।

মো. ওয়ালিউর রহমান

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৫ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৪

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top