একটি ভবন বা শহরের ডিজাইন করার সময় আমরা খরচ ধরি ইট, সিমেন্ট, স্টিল আর শ্রমের। কিন্তু যে জমির ওপর ভবনটি দাঁড়ায়, সেখানকার বন, নদী আর মাটি যে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে, তার হিসাব সাধারণত কোথাও থাকে না। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভুটান ঠিক এই অদৃশ্য হিসাবটিকেই জাতীয় অর্থনীতির খাতায় তুলেছে। দেশটি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে গ্রস ইকোসিস্টেম প্রোডাক্ট (Gross Ecosystem Product, সংক্ষেপে জিইপি) চালু করেছে। বাংলাদেশের মতো বন্যা, ভূমিক্ষয় আর দ্রুত নগরায়ণের দেশে প্রকৃতির মূল্য ধরার এই চেষ্টা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

জিইপি কী মাপে
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে নিউ ইয়র্কে ঘোষণা করেন, ২০২৪ সালের জন্য দেশটির জিইপি প্রায় ৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল ক্যাপিটাল অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, এটি দেশটির জিডিপির প্রায় দ্বিগুণ।
জিডিপি মাপে অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার বাজারমূল্য। আর জিইপি মাপে নির্দিষ্ট একটি এলাকায় সাধারণত এক বছরে প্রকৃতির দেওয়া সেবার আর্থিক মূল্য। এটি জিডিপির বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে ভাবা হয়েছে।
প্রকৃতির এই সেবা তিন ধরনের হতে পারে:
- পণ্যভিত্তিক সেবা: বনজ সম্পদ, গবাদি পশু, মাছ।
- নিয়ন্ত্রণমূলক সেবা: কার্বন শোষণ, পরাগায়ন, কীটপতঙ্গ দমন, বাতাস ও পানি পরিশোধন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা।
- অবস্তুগত সেবা: সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক সুবিধা, যেমন ইকোট্যুরিজম।
এর কিছু সেবা বাজারে কেনাবেচা হয় বলে জিডিপিতে ধরা পড়ে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণমূলক ও সাংস্কৃতিক সেবার বেশির ভাগই প্রচলিত হিসাবে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়।

প্রকৃতির মূল্য কীভাবে ঠিক হয়
পরিষ্কার পানির পরিমাণ, শোষিত কার্বনের টন আর একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের আনন্দ সরাসরি যোগ করা যায় না। জিইপি তাই প্রতিটি সেবাকে আগে টাকার অঙ্কে রূপান্তর করে, তারপর যোগ করে।
স্ট্যানফোর্ডের ন্যাচারাল ক্যাপিটাল অ্যালায়েন্সের বরাতে জানা যায় তিনটি পদ্ধতির কথা।
- এক, যেখানে বাজারদর আছে সেখানে বাজারদর ধরা।
- দুই, প্রকৃতির দেওয়া কোনো সেবার জায়গায় অবকাঠামো বসাতে কত খরচ হতো, সেই প্রতিস্থাপন-ব্যয় ধরা।
- তিন, সেবার ধরন অনুযায়ী অন্য উপযুক্ত অর্থনৈতিক মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা।
প্রতিটি দেশ নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী সেবা বেছে নিতে পারে এবং তথ্য ও সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সেবা যোগ করতে পারে। ভুটান সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতের হিসাবে আরও বেশি সেবা যুক্ত হবে।

ভুটানের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ভুটানে বন, নদী, মাটি আর পাহাড়ি ভূদৃশ্যের ওপর মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। বন ও পানিব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে কৃষি, অবকাঠামো ও জনবসতিতেও তার প্রভাব পড়ে। সরকার আশা করছে, জিইপি টেকসই উন্নয়ন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং জলবায়ু-সহনশীলতার পরিকল্পনায় আরেকটি তথ্যের উৎস হবে।
আরও কয়েকটি সূত্র থেকে প্রেক্ষাপটটা বোঝা যায়। ভুটানের সংবিধানে অন্তত ৬০ শতাংশ বনভূমি রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। আর দেশটিকে বিশ্বের প্রথম কার্বন-নেগেটিভ দেশ বলা হয়। অন্যদিকে ইউএনডিপির একটি লেখায় বলা হয়েছে, দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতেও আছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কোথাও ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা হচ্ছে, আবার কোথাও পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে।

এক দশকের বেশি সময়ের ধারণা
জিইপি কোনো নতুন ধারণা নয়। ২০১৩ সালে চীনা বিজ্ঞান একাডেমির ঝিউন ওউইয়াং এবং আইইউসিএনের চীন কার্যালয়ের তৎকালীন প্রতিনিধি চুনছুয়ান ঝু এটি প্রথম প্রস্তাব করেন। পরে চীনা বিজ্ঞান একাডেমি, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়, স্টকহোম রেজিলিয়েন্স সেন্টার ও স্ট্যানফোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর উন্নয়নে অবদান রাখে।
২০২০ সালে চীনের কিংহাই প্রদেশে জিইপি প্রয়োগ নিয়ে ইংরেজিতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। স্ট্যানফোর্ডের বরাতে সেই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের মার্চে জাতিসংঘের পরিসংখ্যান কমিশন একে টেকসই উন্নয়নের একটি সূচক হিসেবে অনুমোদন দেয়।
এশিয়ানিউজের তথ্য অনুযায়ী, চীনের শেনজেন ও কিংহাইসহ বিভিন্ন প্রদেশ ও শহরে স্থানীয় প্রশাসনের কাজের মূল্যায়ন এবং ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনায় বহু বছর ধরে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ভুটানের নতুনত্ব হলো, তারা কোনো প্রদেশ বা শহরে নয়, পুরো দেশের স্তরে এই ব্যবস্থাটি গ্রহণ করেছে।

গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস হলো মূল ভিত্তি
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সিঙ্গাপুরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ ইয়ো-কে সিঙ্গাপুরের মানুষ সুখী নয় এমন এক সমীক্ষার ফল নিয়ে প্রশ্ন করলে জবাবে তিনি বলেন, উন্নয়ন নিয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া যায় সুখ নিয়ে নয়, এবং উন্নয়ন হলে সেখানে সুখ হ্রাস পাওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা।
উন্নয়ন বনাম মানুষের সুখ এই দুই এর মাঝে ভুটান বেছে নিয়েছে মানুষের সুখ। ভুটানের উন্নয়ন-দর্শনের নাম গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ), যা দেশটির চতুর্থ রাজা ১৯৭০-এর দশকে চালু করেছিলেন। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের কল্যাণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। জিইপি এর সঙ্গে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে: প্রকৃতির তৈরি অর্থনৈতিক মূল্য সুনির্দিষ্টভাবে অঙ্কে প্রকাশ করা।
এখানে তিনটি সূচক তিনটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর দেয়। জিডিপি দেখায় অর্থনৈতিক উৎপাদন, জিএনএইচ দেখায় জাতীয় কল্যাণের বিস্তৃত কাঠামো, আর জিইপি দেখায় প্রকৃতির অর্থনৈতিক অবদান। প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেছেন, যা মাপা হয় তার মূল্য দেওয়া হয়, আর যার মূল্য দেওয়া হয় তাকে রক্ষা করা হয়।

জাতীয় সিদ্ধান্তে জিইপির ব্যবহার
ভুটান তাদের জিইপি হিসাব তৈরি করেছে স্ট্যানফোর্ডের ন্যাচারাল ক্যাপিটাল অ্যালায়েন্সের সঙ্গে মিলে, এনলাইট ফাউন্ডেশনের সহায়তায়। স্ট্যানফোর্ড জানিয়েছে, নীতি ও অর্থায়নের সিদ্ধান্তে এই সূচক ব্যবহারের জন্য তারা ভুটানের ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস ব্যুরোর সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় জিইপি ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রকৃতির সেবার জন্য অর্থপ্রদান এবং গ্রিন ফাইন্যান্সের মতো ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। প্রতি বছর হিসাব করলে বোঝা যাবে, সমাজ ও অর্থনীতিকে ধরে রাখা প্রকৃতির সেবা বাড়ছে, কমছে, নাকি বদলাচ্ছে।

স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার জন্য এর অর্থ
- জায়গা বাছাইয়ে নতুন হিসাব: জিইপির তালিকায় বাজারজাত না হওয়া সেবার মধ্যে আছে বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং পানি ও বাতাস পরিশোধন। কোনো জমিতে ভবন বা প্রকল্প করার আগে সেই জমি ঠিক কী কী সেবা দিচ্ছে, তা হিসাবে ধরার একটি কাঠামো এতে পাওয়া যায়। ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা যে এর একটি প্রয়োগক্ষেত্র, সেটা খুবই স্পষ্ট।
- প্রকৃতি যখন অবকাঠামো: স্ট্যানফোর্ডের প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বন ও জলাভূমি ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করে, ঢাল স্থিতিশীল রাখে এবং বন্যার পানি শুষে নেয়। অর্থাৎ এগুলো জলবায়ুর চাপের মুখে এক ধরনের অপরিহার্য অবকাঠামো। প্রতিস্থাপন-ব্যয় পদ্ধতিতে ধরলে এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রকৃতি যে কাজ বিনামূল্যে করছে, তা কৃত্রিম অবকাঠামো দিয়ে করতে গেলে কত খরচ হতো, সেই হিসাবও খাতায় আসে।
- ভূমিধস-প্রবণ এলাকায় সতর্কতা: ভুটানের ঝুঁকি আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে বন ও ঢাল ধরে রাখার ভূমিকা আছে, সেখানে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেই সেবার মূল্য বিবেচনা করা জরুরি।
- মনে রাখার সীমাবদ্ধতা: জিইপির ৬.২ বিলিয়ন ডলারকে জিডিপির বিকল্প সংস্করণ ভাবা ঠিক নয়। দুটি সূচক আলাদা জিনিস মাপে, যদিও তাদের মধ্যে কিছুটা মিল আছে। আর এই সূচক শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করবে হিসাব কীভাবে উন্নত হয় এবং সিদ্ধান্ত-গ্রহণে কীভাবে ব্যবহার করা হয় তার ওপর।

ভুটানের জিইপি কেবল সংখ্যা মাত্র নয়, এটি দেখার ভঙ্গির এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যে দেশ শুধু তুলে নেওয়া সম্পদ গোনে, শেষে তার গোনার মতো কিছু থাকে না। স্থাপত্য ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এই কথাটি খাটে। যে ডিজাইন জমির বন, জল আর মাটির কাজকে হিসাবে আনে না, সে হয়তো এমন কিছু নষ্ট করে ফেলে যার প্রকৃত মূল্য পরে বোঝা যায়।
বাংলাদেশের স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য ভুটানের এই উদ্যোগ একটি প্রশ্ন সামনে আনে: আমরা কি আমাদের নদী, জলাভূমি আর সবুজকে শুধু খালি জমি হিসেবে দেখব, নাকি এমন সম্পদ হিসেবে, যা প্রতিদিন আমাদের নিরাপদ রাখছে?
তথ্যসূত্র
দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ, স্ট্যানফোর্ড ইউইনিভার্সিটি, ইউএনডিপি

















