শ্রমিক

নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তার জরুরি ১১ পদক্ষেপ

আমাদের চারপামে কত সুন্দর বাড়ি, ল্যান্ডস্কেপ আর নান্দনিক স্থাপনা। এর পেছ কার হাত? নি:সন্দেহে ইঞ্জিনিয়ার এবং আর্কিটেক্টদের নামই সবার আগে আসবে। কখনো শ্রমিকের কথা আমাদের মাথায় আসে না। অথচ নির্মাণশিল্পের বিশাল কর্মযজ্ঞ তাদের ছাড়া সম্ভবই নয়। এই আধুনিক ভারি ভারি যন্ত্রপাতি, রোবট, এআই যাই বলি সব কিছুর পরও নির্মাণে শ্রমিকের কোন বিকল্পই নেই। অথচ তাদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কতটা ভাবি?

নির্মাণস্থল এমন একটি কর্মপরিবেশ, যেখানে প্রতিদিন শ্রমিকদের ভারী যন্ত্রপাতি, উচ্চতা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক পদার্থ এবং নানা ধরনের নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে কাজ করতে হয়। ফলে এখানে ছোট একটি অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। একটি নিরাপদ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য শুধু শ্রমিকদের সতর্ক থাকলেই হয় না। তাদের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আর্কিটেকচার ম্যাগাজিন ‘লাথামে’ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে নির্মাণ শ্রমিকদের জরুরি কিছু নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে ১১টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সাইট নিরাপত্তা, নিরাপদ কাজের পদ্ধতি, সাইনেজ, যানবাহন চলাচল, রাসায়নিক সংরক্ষণ, আবহাওয়া মোকাবিলা, ফার্স্ট এইড, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং ওপর থেকে বস্তু পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ।

১. নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ

নির্মাণস্থলের নিরাপত্তার প্রথম ধাপ হলো সঠিক প্রশিক্ষণ। কোনো শ্রমিককে কাজ শুরু করার আগে তাকে সাইটের নিয়ম, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন শ্রমিকদের জন্য ‘সাইট স্পেসিফিক ইনডাকশন’ প্রশিক্ষণ দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে সাইটের বিপজ্জনক এলাকা, জরুরি বহির্গমন পথ এবং নিরাপত্তা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যায়।

স্টিল কাটার

লাথামের মূল নির্দেশিকায় অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে হোয়াইট কার্ড এবং সাইট স্পেসিফিক ইনডাকশন প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। তবে এর মূল ধারণাটি হলো—কাজ শুরু করার আগে শ্রমিককে কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করা।

২. ঝুঁকি কমানো ও ব্যবস্থাপনা

নির্মাণকাজে সব ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু নিয়মিত ঝুঁকি শনাক্ত ও মূল্যায়নের মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়। এজন্য নিয়মিত নিরাপত্তারর বিষয়গুলো পুন:নিরীক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি রিপোর্ট, মূল্যায়ন ও সমাধানের ব্যবস্থা রাখা দরকার।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো ভবনের নির্দিষ্ট তলায় যদি খোলা ছাদ থাকে, তাহলে সেটি শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আগে থেকেই বিষয়টি চিহ্নিত করে দেয়াল বা বেষ্টনী ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কমানো যায়।

৩. নির্মাণস্থলের নিরাপত্তা

নির্মাণস্থলে কে প্রবেশ করছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কোন এলাকায় কাজ চলছে—এসব নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।

সাইটের নিরাপত্তা শুধু নির্মাণসামগ্রী চুরি বা ক্ষতি ঠেকানোর জন্য নয়। আশপাশের পথচারী, দর্শনার্থী এবং অন্যান্য ব্যক্তিকেও নির্মাণের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে অনুমোদিত দর্শনার্থীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা উচিত।

৪. নিরাপদ কর্মপদ্ধতি বিবরণী

উচ্চ ঝুঁকির নির্মাণকাজ শুরু করার আগে কীভাবে কাজটি নিরাপদে সম্পন্ন করা হবে, তার একটি লিখিত পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। লাথামের নিবন্ধে এটিকে নিরাপদ কর্মপদ্ধতি বিবরণী বা SWMS হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে কাজের পরিধি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সেই ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয় উল্লেখ থাকে। ফলে শ্রমিকরা কাজ শুরু করার আগেই বুঝতে পারেন কোন পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে এবং কোন বিষয়গুলোতে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

৫. স্পষ্ট নিরাপত্তা সাইনেজ (সাইনবোর্ড)

নির্মাণস্থলে সঠিক জায়গায় স্পষ্ট সাইনবোর্ড বা নির্দেশনা থাকা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোথায় প্রবেশ করা যাবে, কোথায় প্রবেশ নিষেধ, কোথায় ফাস্ট এইড আছে, কোথায় অগ্নি নির্বাপক রাখা হয়েছে—এসব তথ্য সাইনবোর্ডের মাধ্যমে জানানো যায়।

জরুরি যোগাযোগ নম্বর, সাইট অফিসারের অবস্থান, প্রবেশ ও বহির্গমন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দৃশ্যমান জায়গায় রাখা উচিত। এতে নতুন শ্রমিক বা দর্শনার্থীরাও দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারেন।

এক্সকেভেটর

৬. প্রবেশ ও বহির্গমন আলাদা করা

ভারী নির্মাণযান ও শ্রমিক একই পথে চলাচল করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ব্যস্ত নির্মাণস্থলে এক্সকেভেটর, ট্রাক, ক্রেন বা অন্যান্য যানবাহনের চলাচল শ্রমিকদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

তাই সম্ভব হলে ভারী যন্ত্রপাতি ও যানবাহনের জন্য আলাদা প্রবেশ এবং এক্সিট তৈরি করা উচিত। একই সঙ্গে পথচারীদের চলাচলের জন্য আলাদা নিরাপদ পথ রাখলে শ্রমিক ও যানবাহনের সংঘর্ষের সম্ভাবনা কমানো যায়।

৭. রাসায়নিক পদার্থের নিরাপদ সংরক্ষণ

নির্মাণস্থলে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হতে পারে। রঙ, সলভেন্ট, জ্বালানি বা অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ ভুলভাবে সংরক্ষণ করলে আগুন, বিস্ফোরণ, বিষক্রিয়া, শ্বাসকষ্ট বা পরিবেশদূষণের মতো সমস্যা হতে পারে।

তাই রাসায়নিক পদার্থ নির্দিষ্ট ও নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা স্টোর ব্যবস্থা, সঠিক লেবেল এবং ছিটে পড়ে যাওয়া রোধ করার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোন রাসায়নিক কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও দায়িত্বশীল কর্মীদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

৮. পরিবেশগত পরিস্থিতি

প্রচণ্ড বৃষ্টি, ঝড়, বজ্রপাত, অতিরিক্ত গরম বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নির্মাণস্থলের নিরাপত্তাকে হঠাৎ পরিবর্তন করতে পারে। তাই জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

কোন পরিস্থিতিতে কাজ বন্ধ করতে হবে, শ্রমিকরা কোথায় নিরাপদে আশ্রয় নেবেন এবং কীভাবে সাইট খালি করা হবে—এসব বিষয় জরুরি পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত।

৯. ফাষ্ট এইড ব্যবস্থা

দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই নির্মাণস্থলে সহজে পৌঁছানো যায় এমন জায়গায় ফাষ্ট এইড কিট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখা উচিত।

প্রশিক্ষিত প্রাথমিক চিকিৎসাকর্মী থাকলে ছোটখাটো আঘাতের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়। গুরুতর দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার জন্য জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখতে হবে। লাথামের নিবন্ধে ২৫ জন শ্রমিকের জন্য একজন ফাষ্ট এইড অফিসার রাখাকে সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১০. ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE)

ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম হলো নির্মাণস্থলে শ্রমিকের ব্যক্তিগত সুরক্ষার শেষ স্তর। কাজের ধরণ অনুযায়ী হেলমেট, উজ্জ্বল রঙের ভেস্ট, নিরাপত্তা চশমা, দস্তানা, নিরাপত্তা জুতা এবং নিরাপত্তা হারনেস প্রয়োজন হতে পারে।

তবে PPE শুধু সরবরাহ করলেই হবে না। শ্রমিককে সঠিকভাবে এগুলো ব্যবহার করার প্রশিক্ষণও দিতে হবে। যেমন, উচ্চতায় কাজ করলে শুধু হেলমেট যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া রোধক সরঞ্জামও ব্যবহার করতে হবে।

১১. ওপর থেকে বস্তু পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি

নির্মাণস্থলে ওপর থেকে কোনো যন্ত্রপাতি বা নির্মাণসামগ্রী পড়ে গেলে নিচে থাকা শ্রমিক গুরুতর আহত হতে পারেন। বিশেষ করে বহুতল ভবন নির্মাণের সময় এই ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।

পিলার

তাই ওপরের স্তরে রাখা বস্তু ভালোভাবে সিকিউর করতে হবে। সরঞ্জাম, উপকরণ এবং অন্যান্য বস্তু যেন নিচে পড়ে না যায়, সেজন্য প্রয়োজনীয় বাধা, নিয়ন্ত্রণ বা অন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে নিচের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে অপ্রয়োজনীয় চলাচল সীমিত করা যেতে পারে।

নিরাপদ নির্মাণের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা

এই ১১টি ব্যবস্থা আলাদা আলাদা বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এগুলো একটি সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার  অংশ। প্রশিক্ষণ ছাড়া PPE কার্যকরভাবে ব্যবহার করা কঠিন। ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়া নিরাপদ কাজের পদ্ধতি তৈরি করা যায় না। আবার সঠিক সাইনেজ ও সাইট নিরাপত্তা ছাড়া সেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা সবার কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছানো কঠিন।

তাই একটি নির্মাণ প্রকল্পে নিরাপত্তাকে অতিরিক্ত কাজ হিসেবে না দেখে মূল নির্মাণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নির্মাণের সাফল্য শুধু একটি ভবন দাঁড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই ভবন তৈরি করতে গিয়ে শ্রমিক, প্রকৌশলী, ঠিকাদার এবং আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা গেছে, সেটিও একটি সফল প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সূত্র: লাথাম

Related Posts

মানুষের জন্য হবে আগামীর স্থাপত্য

স্থাপত্য কখনোই শুধু ইট, কংক্রিট, স্টিল কিংবা কাচের সমন্বয়ে তৈরি কোনো স্থির বস্তু নয়। এটি মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি,…

স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) ২০২৬ সালের পুরস্কার তালিকায় জায়গা করে…

দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগ: কারণ কী, সমাধান কী

বৃষ্টির মৌসুম শেষ হতে না হতেই বেডরুমের দেয়ালে হালকা একটা কালচে ছোপ চোখে পড়ে। প্রথমে ভাবি, “থাক, শুকিয়ে…

কংক্রিটের আড়ালে সাও পাওলোর স্থাপত্য ও নগরজীবন

ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর সাও পাওলোকে অনেকে শুধু একটি কংক্রিটের জঙ্গল হিসেবে চেনেন। রিও দে জেনেইরোর সৈকত বা ব্রাজিলের…