ব্রিটিশ-ইরানি স্থপতি ফারশিদ মুসাভি এ বছরের সোন মেডেলে ভূষিত হয়েছেন। নির্মাণ, শিক্ষকতা ও লেখালেখি, এই তিন ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন ও কঠোর অবদানের জন্য তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান ফারশিদ মুসাভি আর্কিটেক্টস প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ডিজাইনে স্থাপত্যের অধ্যাপক।
বিচারকমণ্ডলীর মূল্যায়ন
জুরি চেয়ার স্থপতি আমিন তাহা বলেন, প্রায় চার দশক ধরে মুসাভি দেখিয়েছেন, স্থাপত্যে নীতিবোধ ঘোষণার চেয়ে চর্চাই বেশি জরুরি। ভবনের নৈতিক জীবন লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তে, যা ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই পেশায় একদিকে চাকচিক্যের প্রলোভন, অন্যদিকে হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। মুসাভি এর মাঝখানে তৃতীয় পথ দেখিয়েছেন: মনোযোগ।
তিনি শেখান, ভবন কীভাবে ব্যবহৃত বা উপলব্ধ হবে, তা স্থপতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এই অনিশ্চয়তা সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এক নৈতিক সুযোগ। এটি নম্রতা, কৌতূহল ও অন্যের জীবনের প্রতি যত্ন নিয়ে ডিজাইন করার আমন্ত্রণ।

মুসাভির প্রতিক্রিয়া
মুসাভি বলেন, যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বুঝতেন স্থাপত্য কখনোই শুধু স্থাপত্যের বিষয় নয়, সেই প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি তার কাছে সবচেয়ে অর্থবহ। এই সম্মাননা পেয়ে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেছেন।
তার মতে, সোন মিউজিয়াম স্থাপত্যের একটি নিখুঁত যুক্তি: একটি ভবন একই সঙ্গে বাড়ি, কর্মক্ষেত্র ও বিশ্বকে ভাবার উপায় হতে পারে। কারণ স্থাপত্যকে তার চারপাশের বস্তু, ইতিহাস ও ভাবনা থেকে আলাদা করা যায় না।
তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় এখানে কোনো কিছুকে আলাদা খোপে ভরে না রাখার বিষয়টি। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন, সৌন্দর্য ও চিন্তা, ভবন ও তার ভেতরের জিনিসপত্র, সবই এখানে মিশে আছে। এই প্রশ্নগুলো তার কাজ, পড়ানো ও লেখাতেও বহুদিন ধরে ফিরে এসেছে।
পুরস্কারের পরিচিতি
বার্ষিক সোন মেডেল চালু করে স্যার জন সোনস মিউজিয়াম, ২০১৭ সালে। উদ্দেশ্য ছিল জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা স্যার জন সোনকে স্মরণ করা এবং মানুষের জীবনে স্থাপত্যের গুরুত্ব তুলে ধরা। মুসাভি এর ১০ম বিজয়ী।

পরিচিতি ও শিক্ষাজীবন
মুসাভির জন্ম ১৯৬৫ সালে ইরানের শিরাজে। তিনি পড়েছেন হার্ভার্ডের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ডিজাইন, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ও ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডিতে। তিনি ভিয়েনার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচারের সাবেক প্রধান।
এ ছাড়া পড়িয়েছেন লন্ডনের আর্কিটেকচারাল অ্যাসোসিয়েশন, রটারডামের বার্লাগে ইনস্টিটিউট, ঘেন্টের হোগার আর্কিটেকচুর ইনস্টিটিউট সিন্ট-লুকাস, এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউসিএলএ, প্রিন্সটন ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।
নারী স্থপতিদের পরিচিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখার জন্য ২০২২ সালে তিনি জেন ড্রু প্রাইজ পান।

উল্লেখযোগ্য কাজ
তার উল্লেখযোগ্য ভবনের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ডের মিউজিয়াম অব কনটেম্পরারি আর্ট এবং হিউস্টনের ইসমাইলি সেন্টার, যার নির্মাণ গত বছর সম্পন্ন হয়েছে। অন্যান্য প্রকল্প:
- লন্ডনে ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর
- লন্ডনে হ্যারডসের খেলনা বিভাগ
- মঁপেলিয়েতে লা ফোলি দিভিন অ্যাপার্টমেন্ট
- প্যারিসের ইলো ১৯ লা দেফঁস-নান্তের আবাসন প্রকল্প
আগের প্রতিষ্ঠান ফরেন অফিস আর্কিটেক্টসে থাকাকালে তিনি ২০০২ সালে ইয়োকোহামা ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট টার্মিনাল সম্পন্ন করেন।
মুসাভির এই স্বীকৃতি দেখায়, স্থপতির কাজ শুধু ভবন বানানো নয় বরং ভাবা, শেখানো এবং অন্যের জীবনের প্রতি যত্নশীল থাকাও তার অংশ। আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬ লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমিতে তার হাতে সোন মেডেল তুলে দেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র
ডিজেইন

















