ভারতীয় স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নোডক্র্যাফট স্টুডিও বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে একটি ফার্মহাউজ তৈরি করেছে। যা গড়ে উঠেছে মাটি ঢালাই প্রাচীর এবং কংক্রিট ভলিউমের এক গুচ্ছ নিয়ে, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বারান্দার মাধ্যমে। আলোক ফার্মহাউজ নামের ২৭৯ বর্গমিটার আয়তনের এই সাপ্তাহান্তিক রিট্রিটটি একই সঙ্গে একটি ছুটি কাটানোর বাড়ি এবং ক্লায়েন্টদের ব্যবসায়িক সভা আয়োজনের জায়গা হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে।
ডিজাইনের মূল ভাবনা
নোডক্র্যাফট স্টুডিও জানায়, পারিবারিক ব্যবহার ও মাঝেমধ্যে ব্যবসায়িক সমাবেশের জন্য পরিকল্পিত এই বাসস্থানে গোপনীয়তা ও সমষ্টিগত মেলামেশার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন ছিল। এই চাহিদা থেকেই ডিজাইনটি প্রচলিত ফার্মহাউজ মডেল থেকে সরে আসে, যেখানে সাধারণত বদ্ধ ঘরগুলো ভেতরের করিডোর দিয়ে যুক্ত থাকে। এর পরিবর্তে চলাচলের পথকে বাইরে নিয়ে আসা হয়েছে, যা চলাফেরাকে ছায়াযুক্ত পথ, উঠান ও ফ্রেমে বাঁধা দৃশ্যের এক ধারাবাহিকতায় রূপান্তরিত করেছে।

গাছ ঘিরে “প্যাভিলিয়ন” বিন্যাস
নোডক্র্যাফট স্টুডিও স্বাধীন ভলিউমগুলোকে “প্যাভিলিয়ন” হিসেবে বর্ণনা করে, যেগুলো সাইটে বিদ্যমান গাছের চারপাশে ধাপে ধাপে (স্ট্যাগার্ড) বিন্যাসে সাজানো হয়েছে, যাতে স্থাপত্য ও প্রকৃতির মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন বিনিময় বজায় থাকে। বাড়িতে প্রবেশপথ ইউ-আকৃতির (U-shaped) প্রধান ব্লকের কেন্দ্র দিয়ে, যা ঢালু সাইটে বসানো একটি রৈখিক সাঁতার পুলের গা ঘেঁষে গেছে।
প্রধান ব্লক ও ব্যক্তিগত বেডরুম
লিভিং, ডাইনিং, রান্নাঘর ও পূজার জায়গা এখানে একটি ওপেন-প্ল্যানে রাখা হয়েছে যাতে করে পুলের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তিনটি বেডরুমের প্রতিটি প্রধান ব্লকের চারপাশে একটি করে স্বাধীন ভলিউম হিসেবে পরিকল্পিত, প্রতিটিতে রয়েছে একটি ব্যক্তিগত বারান্দা, যা সাইটের ঢালের কারণে জমি থেকে ভাসমান বলে মনে হয়।

যাত্রার অভিজ্ঞতা: সংকোচন ও মুক্তি
বেডরুমগুলো প্রধান ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর ছাউনি-ঢাকা বাইরের ডেক, নিচু ছাদের বারান্দা এবং চারপাশের ল্যান্ডস্কেপে খোলা উঠানের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আর হেমন্থ বলেন, ঘন সবুজ ল্যান্ডস্কেপ থেকে নিচু ও ঘনিষ্ঠ ছাউনিযুক্ত জায়গায়, এবং সবশেষে খোলা উঠানে যাওয়ার এই রূপান্তরটি একটি ইচ্ছাকৃত সংকোচন ও মুক্তির ধারাবাহিকতা তৈরি করা। যা বেডরুমে যাওয়ার যাত্রাটিকে নিজেই একটি অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
মাটি ঢালাই প্রাচীর ও ছাদ কাঠামো
সাইট থেকে খনন করা মাটির সঙ্গে চুন, সিমেন্ট ও অ্যাগ্রিগেট মিশিয়ে প্রাচীরের আকার দেওয়া হয়েছে। এই কৌশলকে বলা হয় পোরড আর্থ বা মাটি ঢালাই। বড় কাচের খোলা অংশযুক্ত এই প্রাচীরগুলো ভলিউমগুলোর গা বরাবর অবস্থিত। ভলিউমগুলোর ওপরে একটি ইনভার্টেড বিম সিস্টেম ব্যবহার করে একটি নিরবচ্ছিন্ন ছাদ তৈরি করা হয়েছে, যা ডেক ও উঠানের ওপর ক্যান্টিলিভার হিসেবে প্রসারিত হয়েছে। স্ট্রাকচারাল দেয়ালের মাটির রঙের উপকরণ প্যালেট পুরো ফার্মহাউজ জুড়ে বিস্তৃত করা হয়েছে, যাতে ভেতর ও বাইরের সম্পর্ক অটুট থাকে।

মেঝে ও আসবাবপত্র
পুরো অভ্যন্তরে লেদার-ফিনিশড কোটা স্টোন ফ্লোরিং ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধা-খোলা জায়গায় গিয়ে “নদীতলের ফিনিশ”-যুক্ত গ্রানাইটে রূপান্তরিত হয়েছে। ফার্মহাউজ জুড়ে ছড়িয়ে আছে বোনা আপহোলস্ট্রিসহ কাঠের আসবাবপত্র, যার সঙ্গে রয়েছে পাটের গালিচা এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সাজসজ্জার সামগ্রী।
সমাপনী মন্তব্য
স্টুডিওটির ভাষায়, আলোক ফার্মহাউজ একক বদ্ধ বাসস্থানের ধারণাকে ল্যান্ডস্কেপ দ্বারা গঠিত প্যাভিলিয়নের ধারাবাহিকতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করে সমসাময়িক ফার্মহাউজ জীবনযাত্রাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। নোডক্র্যাফট স্টুডিও ২০২৩ সালে হেমন্থের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান।

আলোক ফার্মহাউজ দেখিয়ে দেয়, কীভাবে স্থানীয় মাটি ও প্রচলিত ঢালাই কৌশলের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করেও একটি বাসস্থানকে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কে বাঁধা যায়। গোপনীয়তা ও সামাজিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে, প্যাভিলিয়ন-ভিত্তিক বিন্যাস এবং সংকোচন-মুক্তির স্থানিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নোডক্র্যাফট স্টুডিও ভারতের সমসাময়িক উইকেন্ড হোম স্থাপত্যে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে, যেখানে স্থাপত্য ও প্রকৃতি একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত সংলাপে থাকে।
তথ্যসূত্র:
ডিজেইন















