কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কীভাবে আগামী দশকে স্থাপত্য পেশাকে বদলে দেবে, তা নিয়ে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (আরআইবিএ বা RIBA) একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির “ফিউচার বিজনেস অব আর্কিটেকচার” কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচালিত এই গবেষণায় আগামী দশ বছরে এআই কীভাবে পেশাটির গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে, সে বিষয়ে স্থপতিদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, আশঙ্কা ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছে।
জরিপে উঠে আসা মূল চিত্র
আরআইবিএ-র “ফিউচার বিজনেস অব আর্কিটেকচার” কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৮ শতাংশ স্থপতি মনে করেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর ঠিক পরেই গুরুত্বের দিক থেকে রয়েছে ব্যবসা উন্নয়ন, টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত পরামর্শসেবা এবং ক্লায়েন্টের সম্পদ ব্যবস্থাপনা। অন্যদিকে, একই পরিমাণগত উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, আগামী দশকে ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে বিপণন বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মতো প্রথাগত হাতিয়ারগুলো এআই-এর তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন স্থপতিরা।

ডিজাইন ও নির্মাণে এআই-এর প্রত্যাশিত প্রভাব
জরিপে অংশ নেওয়া স্থপতিদের ৫০ শতাংশ মনে করেন, ধারণাগত নকশার (কনসেপ্ট ডিজাইন) পর্যায়ে কাজ করার ধরনে প্রযুক্তির “রূপান্তরমূলক প্রভাব” পড়বে। আর ৫১ শতাংশ মনে করেন উৎপাদন ও নির্মাণ পর্যায়েও একই ধরনের প্রভাব দেখা যাবে। ।
জরিপে অংশ নেওয়াদের মাত্র ১০ শতাংশ মনে করেন, প্রকল্পের ব্রিফিং, ধারণাগত নকশা ও স্থানিক সমন্বয়ের ধাপগুলো এআই, ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন দ্বারা প্রভাবিত হবে না।
গবেষণাপত্রের কাঠামো ও তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি
“আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স: দ্য আনরিলায়েবল আউটলায়ার ড্রাইভিং দ্য ফিউচার অব আর্কিটেকচার” শিরোনামের এই গবেষণাপত্রে এআই-এর অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে স্থাপত্যের জন্য তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে—ভালো, খারাপ এবং মোটামুটি অপরিবর্তিত।
পাশাপাশি, অন্যান্য উদ্ভাবন কীভাবে “প্রযুক্তিগত বিপর্যয়” সৃষ্টি করে স্থপতিদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, তাও পরীক্ষা করা হয়েছে এতে।

গবেষকদের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদনের সহ-রচয়িতা ও আরআইবিএ-র প্রকাশনা ও শিক্ষা বিষয়ক পরিচালক হেলেন ক্যাসল বলেন, সংস্থার সদস্যদের কাছ থেকে এআই ও প্রযুক্তি নিয়ে তাদের দৈনন্দিন চর্চায় এর প্রভাব এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে তাদের কাজের ধরন বদলে দেবে বলে তারা মনে করেন সে বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করাটা ছিল আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা।
তার মতে, গুণগত গবেষণা থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যবেক্ষণ ছিল এই যে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এআই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করলেও স্থপতিরা বিশ্বাস করেন না যে এর ফলে সফট স্কিল বা ব্যবসা উন্নয়নের চাহিদা কমে যাবে। বরং উল্টোটাই ঘটবে। এআই-এর উত্থানের ফলে মানবিক সম্পর্ক, যোগাযোগ দক্ষতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ ব্যবসায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আরআইবিএ-র সভাপতি ক্রিস উইলিয়ামসন বলেন, অনেকের মতোই তিনিও এআই এবং এর মাধ্যমে স্থাপত্য ব্যবসায় আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে উত্তেজনা ও উদ্বেগের মিশ্র অনুভূতি অনুভব করেন। তিনি জানান, বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিআইএম) ও কম্পিউটার-এইডেড ডিজাইন (ক্যাড) যখন প্রথম শিল্পে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল, তখনও তার একই রকম অনুভূতি হয়েছিল।
সে সময়ও দুটি হাতিয়ারকেই সমান আমূল পরিবর্তনকারী মনে হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো স্থপতিদের ভূমিকা ও মূল্য হ্রাস করার বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, এআই-এর সক্ষমতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং এর বিশাল সম্ভাবনাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।

আরআইবিএ-র এই গবেষণা স্পষ্ট করে দেয় যে, এআই আগামী দশকে স্থাপত্যের ব্যবসা, নকশা ও নির্মাণ প্রক্রিয়ায় গভীর প্রভাব ফেলবে বলে অধিকাংশ স্থপতিই মনে করেন। তবে এই পরিবর্তনকে তারা মানবিক দক্ষতার বিলুপ্তি হিসেবে দেখছেন না। তারা মনে করছেন, প্রযুক্তি যত এগোবে, ততই যোগাযোগ, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমালোচনামূলক চিন্তার মতো মানবিক গুণাবলি স্থপতির পেশাগত মূল্য নির্ধারণে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিআইএম ও ক্যাডের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আরআইবিএ মনে করে, নতুন প্রযুক্তি স্থপতির ভূমিকাকে ছোট নয়, বরং বড়ই করে তুলতে পারে যদি পেশাটি তা যথাযথভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে।
তথ্যসূত্র:
আরআইবিএ
















