ইউরোপের অন্যান্য ঝকঝকে ও নিখুঁত ক্যাপিটাল শহরগুলোর পাশে বুখারেস্টকে দাঁড় করালে প্রথম দর্শনে একটু অগোছালো বা খাপছাড়া মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। জ্যামে আটকে থাকা ব্যস্ত রাস্তা, কমিউনিস্ট যুগের ধূসর ও একঘেয়ে কংক্রিটের অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, আর তার ঠিক পাশেই সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ১৭ শতকের অপরূপ কোনো অর্থোডক্স গির্জা বা ফরাসি শৈলীর ভিলা-এই বৈপরীত্যেই বুখারেস্টের আসল প্রাণ।
পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বুখারেস্ট কৃত্রিমভাবে পালিশ করা কোনো শহর নয়; এটি আক্ষরিক অর্থেই এক রক্তমাংসের শহর, যা নিজের শরীর থেকে ইতিহাসের ক্ষতচিহ্নগুলোকে মুছে না ফেলে বরং আত্মবিশ্বাসের সাথে বয়ে বেড়ায়।
১. ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ যখন রাজপথে ছড়াত ফরাসি আভিজাত্য
১৪ শতকে ওয়ালাচিয়ার (Wallachia) রাজপুত্রদের হাত ধরে বুখারেস্টের গোড়াপত্তন। পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে থাকায় শহরটি দ্রুতই মুখরিত হয়ে ওঠে। তবে বুখারেস্টের প্রথম জাদুকরী রূপান্তর ঘটে ১৮৭৮ সালে, অটোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে রোমানিয়া স্বাধীনতা পাওয়ার পর।
ফ্রান্সে পড়াশোনা করে আসা রোমানিয়ান শিক্ষিত অভিজাত সমাজ ও ধনকুবেররা নিজেদের শহরকে ফ্রান্সের আদলে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন।

- প্যারিসের অনুকরণ: প্যারিসের বিখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ হাউসম্যানের ধাঁচে তৈরি হতে থাকে দীর্ঘ ও প্রশস্ত বুলেভার্ড, সুন্দর বাগান আর নিয়ো-ক্ল্যাসিক্যাল প্রাসাদ।
- আভিজাত্য ও বৈষম্য: ৩০-৫০ বছরের মধ্যে বুখারেস্ট খেতাব পায় ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ (Paris of the East) বা ‘লিটল প্যারিস’। কিন্তু এই গ্ল্যামারের পেছনে লুকিয়ে ছিল চরম সামাজিক বৈষম্য-একদিকে ধনকুবেরদের বিলাসী জীবন, অন্যদিকে সেই সব চকচকে বুলেভার্ডের কয়েক কদম দূরেই বস্তির অনাহারী মানুষের কান্না।
সেই সোনালী যুগের কিছু স্মৃতিচিহ্ন:
- ক্যালেও ভিক্টোরিয়ে (Victory Boulevard): একসময় কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো এই রাস্তাটি ছিল অভিজাত আড্ডার মূল কেন্দ্র। এখানে রয়েছে টেলিফোন প্যালেস (শহরের প্রথম স্কাইস্ক্রেপার), কান্টাকুজিনো প্যালেস এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রোমানিয়ান এথেনিয়াম।
- অভিজাত পাড়া ও ট্রিউমফাল আর্চ: কোট্রোচেনি ও কিষেলেফ বুলেভার্ডে গড়ে ওঠে চমৎকার সব আর্ট-নুভো ভিলা। আর কিষেলেফ বুলেভার্ডের এক মাথায় গড়ে ওঠে ২৭ মিটার উঁচু ‘ট্রিউমফাল আর্চ’, যা ১৯১৮ সালে রোমানিয়ার একত্রীকরণকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
- ক্যাপসা ক্যাফে: জিরো কিলোমিটারের কাছে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক পেস্ট্রি শপে বসে কফি খাওয়া আজও যেন অতীত অভিজাততন্ত্রের ছোঁয়া পাওয়ার মতো।
২. কমিউনিস্ট তাণ্ডব ও এক স্বৈরশাসকের ‘মেগালোম্যানিয়া’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাবর্ষণ এবং ১৯৪০-এর দশকের ভূমিকম্প শহরের বেশ সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু আসল দুঃস্বপ্ন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে কমিউনিস্ট শাসন কায়েম হওয়ার পর। ১৯৭১ সালে উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিওংইয়ং সফর শেষে রোমানিয়ার স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কু (Nicolae Ceaușescu) সম্পূর্ণ শহরকে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় নতুন করে গড়ার উন্মাদনায় মেতে ওঠেন।

১৯৭৭ সালের এক বড় ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞকে উসিলা বানিয়ে চসেস্কু বুখারেস্টের হৃদপিণ্ডে বুলডোজার চালিয়ে দেন:
- ইতিহাস মুছে ফেলার চক্রান্ত: প্রায় ৯,০০০ শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বাড়ি এক লহমায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ৪০,০০০ মানুষকে শহরের শেষ প্রান্তে নতুন ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটে পুনর্বাসন করা হয়।
- লুকিয়ে ফেলা চার্চ: ধর্ম কমিউনিস্ট সরকারের পছন্দ ছিল না। তাই বহু প্রাচীন অর্থোডক্স গির্জা ভেঙে ফেলা হয়। তবে কিছু ঐতিহাসিক গির্জাকে বিশাল বিশাল কনক্রিটের অ্যাপারার্টমেন্ট ব্লকের পেছনে চতুরতার সাথে ‘লুকিয়ে’ রাখা হয়েছিল, যা আজও দেখা যায়।
- প্যালেস অব দ্য পার্লামেন্ট: চসেস্কুর চরম অহংকার ও মেগালোম্যানিয়ার প্রতীক এটি। পেন্টাগনের পর এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রশাসনিক ভবন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল সরকারি অবকাঠামো। ১২ তলা ও ৪ তলা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বিশিষ্ট এই দানবীয় ভবনটিতে ১,১০০টি ঘর রয়েছে। এর বিপুল খরচে দেশ দেউলিয়া হওয়ার পথ ধরেছিল, যা ১৯৮৯ সালের রক্তক্ষয়ী বিপ্লবে চসেস্কুর পতনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
সেই বিষাদময় দিনগুলোর কিছু স্মৃতি:
- রিভল্যুশন স্কোয়ার: সেন্ট্রাল কমিটির বারান্দা থেকে চসেস্কু যখন তাঁর শেষ ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন সাধারণ জনতা গর্জে উঠেছিল। চসেস্কু হেলিকপ্টারে ছাদে পালিয়ে গেলেও সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ প্রাণ হারান।
- শ্রমিকদের ধূসর জীবন: মিলিতারী বা বার্সেনির মতো এলাকায় কারখানা শ্রমিকদের জন্য রাতারাতি একঘেয়ে কনক্রিটের আবাসন ব্লক বানিয়ে পুরো শহরকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। সেযুগের মেহনতি মানুষের জীবন বুঝতে আজকেও স্থানীয় দোকানে গিয়ে টক দুধ আর প্রেটজেল (Pretzel) খাওয়া যায়।
৩. বর্তমান বুখারেস্ট- ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির উড্ডয়ন
১৯৮৯ সালের বিপ্লবের পর রোমানিয়ায় পুঁজিবাদ এলেও সেই রূপান্তর সহজ ছিল না। পরিত্যক্ত বেল এপোকে যুগের বাড়ি, নিষ্ঠুর কমিউনিস্ট স্থাপত্য এবং অনিয়ন্ত্রিত আধুনিক ভবনের এক আজব সংমিশ্রণে পরিণত হয়েছিল বুখারেস্ট। তবে ২০১০ সালের পর থেকে বুখারেস্ট নতুন করে জেগে উঠতে শুরু করে।

- ওল্ড টাউন (Lipscani): কমিউনিস্টদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া পুরানো শহরের ঐতিহাসিক অংশটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। এটি এখন ১০০টিরও বেশি ক্যাফে, বার ও রেস্তোরাঁ নিয়ে নাইটলাইফ ও সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র।
- সপ্তাহান্তের ক্যালেও ভিক্টোরিয়ে: ছুটির দিনে পুরো ‘ভিক্টোরি বুলেভার্ড’-এ গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাস্তা জুড়ে মানুষ সাইকেল চালায়, রাস্তার মোড়ে ওপেন-এয়ার থিয়েটার, আর্ট ওয়ার্কশপ আর গানের উৎসব বসে।
- ইউনিভার্স প্যালেস (Univers Palace): ৮৯-এর বিপ্লবে গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া একটি ১৯ শতকের ভবন। কিন্তু নতুন সংস্কারের সময় সেই গুলির দাগগুলো মুছে ফেলা হয়নি! গুলির ক্ষতচিহ্নগুলোকে সাথে নিয়েই ভবনটি এখন তরুণদের আর্ট গ্যালারি, ক্যাফে ও থিয়েটার স্পেস।
- নর্ স্কাই ক্যাজুয়াল (Nor Sky Casual): শহরের আধুনিক বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের উঁচু স্কাইস্ক্রেপারে বসে একনজরে বুখারেস্টের আকাশছোঁয়া ভবিষ্যৎ দেখতে চাইলে এই রেস্তোরাঁ চমৎকার জায়গা।
বুখারেস্ট আসলে কোনো ঝকঝকে, নিখুঁত সাজানো শহর না। এটা এমন একটা শহর, যেখানে ইতিহাসের প্রতিটা অধ্যায়- রাজকীয় জাঁকজমক, স্বৈরশাসনের নিষ্ঠুরতা, আর গণতন্ত্রের নতুন উদ্যম- সবকিছুই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে খোলা চোখে দেখার জন্য। আর ঠিক এই কারণেই, চকচকে পশ্চিমা রাজধানীর তুলনায় বুখারেস্ট অনেক বেশি “আসল” এক অভিজ্ঞতা দেয়- যেখানে শহরের ভাঙাগড়ার গল্পটাই তার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
সুত্রঃ অ্যামেচার ট্রাভেলার
















