স্থাপত্যের জগতে যার নাম মানেই বাঁকানো ধাতব দেয়াল, ঢেউয়ের মতো কাঠামো আর প্রথাগত নিয়ম ভাঙার সাহস – সেই কিংবদন্তি স্থপতি ফ্র্যাংক গেহরির শেষ কয়েকটি নকশার একটি এবার বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। আবুধাবির সাদিয়াত দ্বীপে শুরু হয়েছে “দার আল ফুনুন আবুধাবি” নামের একটি বিশাল পারফর্মিং আর্টস ভেন্যুর নির্মাণকাজ।
আবুধাবির কালচার অ্যান্ড ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, সাদিয়াত দ্বীপে নির্মিত হতে যাওয়া এই ভেন্যুতে থাকবে অপেরা, ব্যালে, থিয়েটারসহ নানা ধরনের লাইভ পারফরম্যান্সের সুবিধা। ভবনটিতে থাকছে –
- ২,০০০ আসনের একটি মূল পারফরম্যান্স হল
- ৩,৫০০ আসনের উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার
- ৪০০ আসনের থিয়েটার
- ২৫০ আসনের একটি জ্যাজ ভেন্যু
অর্থাৎ একই ছাদের নিচে ক্লাসিক্যাল অপেরা থেকে শুরু করে জ্যাজ কনসার্ট পর্যন্ত সব ধরনের পরিবেশনার জায়গা থাকবে।

গেহরির শেষ সৃষ্টিগুলোর একটি
গত বছর ডিসেম্বরে ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন ফ্র্যাংক গেহরি- যিনি বিলবাওয়ের গুগেনহাইম মিউজিয়াম আর লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হলের মতো যুগান্তকারী স্থাপনার স্রষ্টা। দার আল ফুনুন হতে যাচ্ছে তার জীবদ্দশায় নকশা করা শেষ ভবনগুলোর একটি, যেটি সম্পূর্ণ হবে তার মৃত্যুর পরে। প্রকাশিত রেন্ডারে দেখা যাচ্ছে, ভবনের বাইরের অংশে কাপড়ের মতো ভাঁজ খাওয়া, ঢেউয়ের মতো একটি আবরণ- যা গেহরির স্বাক্ষর শৈলীরই ধারাবাহিকতা।
দার আল ফুনুনের প্রতিবেশী কারা
সাদিয়াত দ্বীপ এমনিতেই এখন বিশ্বমানের স্থাপত্যের এক প্রদর্শনীক্ষেত্র। এই ভেন্যুর আশপাশেই থাকছে-
- জঁ নুভেলের লুভ্র আবুধাবি
- ফস্টার + পার্টনার্সের জায়েদ ন্যাশনাল মিউজিয়াম
- মেকানুর ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম
- টিমল্যাব ফেনোমেনা
- এবং গেহরিরই আরেকটি নির্মীয়মাণ প্রকল্প, গুগেনহাইম আবুধাবি
অর্থাৎ ছোট্ট এই দ্বীপেই তৈরি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ “স্টার আর্কিটেক্ট” স্থাপত্যের কেন্দ্র।
কালচার অ্যান্ড ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খলিফা আল মুবারক বলেন, এই প্রকল্প শিল্প-সংস্কৃতিতে তাদের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগেরই প্রতিফলন। তার ভাষ্যে, শৈল্পিক রেসিডেন্সি, আন্তর্জাতিক পার্টনারশিপ আর বিশ্বমানের প্রযোজনার মাধ্যমে এই ভেন্যু আবু ধাবিকে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে।
নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গেলেও পুরো প্রকল্প সম্পন্ন হতে সময় লাগবে বেশ কয়েক বছর, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ হওয়ার কথা। এই মহাপরিকল্পনাটি সামনে নিয়ে এটি কেবল আরও একটি বিলাসবহুল অবকাঠামো নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক ভূরাজনীতি এবং বিশ্ব স্থাপত্যের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
আবুধাবি বহু বছর ধরেই তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে সংস্কৃতি ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সাদিয়াত দ্বীপ প্রকল্প তারই একটা বড় অংশ। দার আল ফুনুন সেই পরিকল্পনার সবশেষ সংযোজন- এবং একইসঙ্গে এটি বিশ্ব স্থাপত্যের এক কিংবদন্তির শেষ উপহারও বটে, যিনি নিজে হয়তো এর উদ্বোধন দেখে যেতে পারবেন না।
কাগজ দুমড়ে-মুচড়ে যে রূপরেখা আঁকতে ফ্র্যাঙ্ক গেরি ভালোবাসতেন, সেই অবিন্যস্ত সৌন্দর্যেরই আরেক নাম ‘দার আল ফুনুন’। এটি শুধু পারফর্মিং আর্টের একটি থিয়েটার নয়, এটি আধুনিক স্থাপত্যের এক নতুন দিগন্ত। ২০৩০ সালে যখন এই ভবনের পর্দা উঠবে, তখন পারস্য উপসাগরের উপকূলে বাতাসে দোল খাওয়া ধাতব চাদরের নিচে এক অমর স্থপতির প্রতিচ্ছবিই হয়তো দেখতে পাবে পুরো বিশ্ব।
সূত্র: ডিজেইন
















