কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাকে মূল্যায়নের আগে আমরা বিবেচনা করতাম এর অ্যালগরিদম, ডেটা এবং কম্পিউটিং ক্ষমতা।
কোন কোম্পানির মডেল বেশি শক্তিশালী। অথবা ভাবতাম কে সবচেয়ে উন্নত ভাষা মডেল তৈরি করছে, বা কোন অ্যালগরিদম সবচেয়ে নির্ভুল ফলাফল দিচ্ছে।
এসব প্রশ্নই ছিলো কিছু দিন আগের প্রযুক্তি জগতের প্রধান বিতর্কের বিষয়। আজ বিষয়টি পাল্টে যাচ্ছে মানুষের জীবনের সাথে যুক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং নিবিড় সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের সাথে। সেগুলো হলো ভূমি, জ্বালানি আর পানি। ছিল।
এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পরিচালনা করার জন্য বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়। এসব ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ, সার্ভার এবং কুলিং সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহৃত হয়। নতুন প্রজন্মের এআই প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই বড় আকারের ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রয়োজন বাড়ছে। আর এসব স্থাপনা গড়ে তুলতে দরকার বিপুল পরিমাণ জমি।
বিশ্বের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ শুরু করেছে। তাদের লক্ষ্য হলো এমন স্থানে ডেটা সেন্টার তৈরি করা, যেখানে বিদ্যুতের সহজলভ্যতা, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ থাকবে। সেকারণেই ফলে ভূমি এখন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে।
এই প্রবণতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও গভীর। অনেক এলাকায় ডেটা সেন্টারের জন্য জমির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জমির দাম বাড়ছে লাগামহীনভাবে। স্থানীয় জনগণ, কৃষক এবং ছোট ব্যবসাগুলো কখনও কখনও জমি অধিগ্রহণের চাপে পড়ছে।
একই সঙ্গে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে এআই-এর বিকাশ শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটেও একটি বড় প্রশ্ন।
পরিবেশগত দিক থেকে বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল পরিমাণ শক্তি ব্যবহার করে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে শীতলীকরণের জন্য প্রচুর পানি প্রয়োজন হয়। যদি এই শক্তি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে না আসে, তবে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই ভবিষ্যতের এআই প্রতিযোগিতায় কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতাই নয়, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এছাড়া ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে এ সমস্যার পাশপাশি। বিভিন্ন দেশ এখন বুঝতে পারছে যে এআইয়ের সক্ষমতা অর্জনের জন্য শুধু দক্ষ প্রকৌশলী বা উন্নত চিপই যথেষ্ট নয়।
পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ভূমি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো। ফলে এআই উন্নয়নের প্রশ্নটি ক্রমশ জাতীয় কৌশল ও নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে।
এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে বলতে গেলে কেবল অ্যালগরিদম, ডেটা বা সফটওয়্যারের দিকে তাকালে চলবে না। প্রযুক্তির এই নতুন যুগে ভূমি, শক্তি এবং অবকাঠামোই হয়ে উঠছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আগামী দিনের এআই প্রতিযোগিতা তাই কোডের ভেতরে যতটা হবে, তার চেয়ে কম নয় বাস্তব পৃথিবীর জমি ও সম্পদের ওপর। বলা যায়, এআই-এর পরবর্তী যুদ্ধ অ্যালগরিদম নিয়ে নয়—ভূমি নিয়ে।
সূত্র: Architectmagazine




















