• Home
  • সর্বশেষ
  • রাস্তা থেকে রেস্তোরাঁ: কাপ-পিরিচে মন হাল্কা করার স্থাপত্যের গল্প
Image

রাস্তা থেকে রেস্তোরাঁ: কাপ-পিরিচে মন হাল্কা করার স্থাপত্যের গল্প


প্রকল্পের স্থপতি: মোঃ ইমরান ইসলাম।

শুরুর কথা

কিছু গল্প শুধু বলার জন্য না, শোনার মানুষটাও দরকার
এক কাপ চা, দুইটা মন…একজন বলবে, আরেকজন শুধু শুনবে।

এই অনুভূতির মুহূর্তগুলোকে একটু বেশি সুন্দর করে তুলতে চলে আসুন কাপ পিরিচ-এ। আপনার প্রিয় মানুষের সাথে এক কাপ চায়ে জমুক গল্প। 

স্থানীয় উপকরেণ নির্মিত রেস্তরাঁ, প্রচলিত জাঁকজমককে নতুনভােব ভাবায়।

কাপ পিরিচ, খুলনার মজিদ সরণিতে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে রেস্টুরেন্টটি। আর উপরের কথাগুলো তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পোস্টে লেখা। প্রায় ১১ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত রেস্তোরাঁটি তৃতীয়বারের মতো স্থানানন্তরিত হয়েছে এবছরই। 

ক্লায়েন্টের চাহিদা ছিল স্থানীয় উপকরণ দিয়ে এবারের রেস্তোরাঁটি বানাতে হবে। ক্লায়েন্টের এমন উদ্যোগ প্রকল্পটিকে একটি ভিন্ন মাত্রা দেয়। কেননা রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র জাঁকজমক হবে এটাই প্রচলিত ধারণা।   

রাতের বেলা টালির ছাদের নিচে একান্তে আড্ডা।
ডিজাইন দর্শন 

বেশ বড় সাইট হলেও নির্মিত কাঠামো দিয়ে জায়গাটিকে ভরে ফেলার কোনো অভিপ্রায় স্থপতির দেখা যায়নি। এটা নিঃসন্দেহে একটা দারুন বিষয়। প্রকল্পের প্রতিটি সিদ্ধান্তে পরিবেশচিন্তা একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। 

সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই ধরনের উপকরণচিন্তা এক ধরনের স্থাপত্যিক অবস্থানও নির্দেশ করে। ইট, বাঁশ, কাঠ, মাটির টালি, চট, গোলপাতা, মুলি বাঁশ-এর মত উপকরণ ব্যবহার করাটা ছিল এই প্রকল্পের প্রাণ। লোকজ উপকরণে দেশীয় শেকড়ের ঘ্রাণে একটা উন্মুক্ত পরিবেশে খেতে খেতে ভাবুক বন্ধুরা এখানে আড্ডা দেবেন সেটাই যেন স্থপতির চাওয়া।

দুট পুরো দুরকম আঞ্চলিক উপাদানে তৈরি বিল্ট ফর্ম,আ র ইট বাঁধানো পথ।
ডিজাইন স্কিম

প্রবেশ: উত্তর-দক্ষিণ কোণাকুণি করা থাকা এই সাইটের চিকন রাস্তা পেরিয়ে আসতে হয় রেস্টুরেন্টে। 

ইনডোর: এখানে আছে মূলত দুটি বিল্ট ফর্ম। যার একটা টালি ছাদের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত স্থান। এটিকে সাইটের বড় কিণার ঘেঁষে উত্তর-পূর্ব দিকে ভাবা হয়েছে। এতে করে সামনে পাওয়া যায় বেশ বড়সড় একটি উঠান।

উঠান: এখানেই উন্মুক্ত পরিসরে আরেকটি বসার জায়গা করা হয়েছে যার উপরে আছে গাছ লতাপাতার শেড। এই কারণে এখানে হাওয়া চলাচল অনেক যা ভবনের ভিতরেও টের পাওয়া যায়। 

সেমি-আউটডোর: সাইটে প্রবেশের সাথে সাথে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটে মেহগনি গাছ দেখা যায়। এর সামনেই তৈরি হয়েছে একটি নান্দনিক টি-স্টল। স্থানীয় উপকরণে তৈরি বলে জায়গাটি হয়ে উঠেছে আন্তরিক।  

ঘরের ভিতরে বসার জায়গা, ঘরের বাইরে বসার জায়গা, টি-স্টলের সামনে বসার জায়গা এমন কতগুলো ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা এখানে ডিজাইন করা হয়েছে অতিথিদের জন্য। সকলের একটা দৃশ্যত সম্পর্ক থাকলেও চিন্তাশীল ডিজাইনের কারণে ব্যক্তিগত স্পেসের অনুভবটাও অটুট থাকে।   

ডিজাইনের প্ল্যান ও জোনিং।
ডিজাইনের সিদ্ধান্ত 

মূলত ক্লায়েন্টের ইচ্ছে এবং স্থাপত্যেরও একটি অনন্য হিসেবে স্থানীয় উপকরণের বিষয়টিই এই স্থাপনাটিকে পরিচালনা করেছে। যদি ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যায়: 

১. প্রধান সড়ক থেকে ৮ ফিট চওড়া এবং ৭২ ফিট লম্বা একটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে এই রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করতে হয়। এই অংশটা তাই স্বাভাবকিভাবেই প্রকল্পের থ্রেশল্ড (threshold) হিসেবে নির্মাণ করার একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। 

এই জায়গাটির মধ্য দিয়ে স্থপতি রাস্তার ব্যস্ত জীবন থেকে একটা বিরতি ডিজাইন করতে চেয়েছেন যেন। একইসাথে মিশে আছে শেকড়ের ঘ্রাণ। হেরিংবোনের রাস্তার মাঝে আছে ছোট ছোট পাথর। দুই পাশ দিয়ে সারিবদ্ধভাবে আছে গাছের টব। আর উপরে আছে বাংলার বিখ্যাত চট বা hessian cloth, এই চটকে ধরে রেখেছে কতগুলো বাঁশের খুঁটি। 

সাধারণত এমন সোজাসুজি লম্বাটে বাঁশ পাওয়া যায় না। তাই সিলেট থেকে এই বিশেষ ধরনের প্রসেসড বাঁশকে আনানো হয়েছে যার নাম ‘মুলি বাঁশ’। বৃষ্টির পানি এই ছালা ঠেকায় না। স্থপতি চেয়েছেন হয়তো অতিথিরা ছাতি নিয়ে আসবেন অথবা প্রকৃতির একটু স্পর্শ মেখেই রেস্তরাঁয় প্রবেশ করবেন। 

চা-এর কোণ।

২. মূল প্রবেশ থেকে শুরু করে ভেতরের পুরো হাঁটার পথটা ইটের তৈরি। একটা ঘরোয়া ভাব এখান থেকেই তৈরি হয়। সাইটে দুইটা বিল্ট ফর্ম দেখা যায়। এরমাঝে যেটা বেশি উন্মুক্ত এবং ঢুকতেই চোখে পড়ে সেটা হলো চা-এর দোকান। এই জায়গাটা বাংলার চিরায়ত চা-এর দোকানেরই আরো নান্দনিক একটি রূপ বলতে হয়। 

এর চাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে গোলপাতা। এই ছাদ দাঁড়িয়ে আছে আটটি বাঁশের খুঁটির উপরে। মজার বিষয় হলো, সাইটে থাকা হলো মেহগনি গাছকে সামনে রেখেই এই টি-স্টলটি গরে উঠেছে। এখানে জুসও পাবেন অতিথিরা।

প্রবেশপথে চট, বাঁশ ও ইট বাঁধানো পথের মনোময়তা

৩. আরেকটি বিল্ট ফর্মের ছাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে টালি। ইটের গাঁথুনির দেয়ালের উপরে এই টালির দেয়াল বেশ আন্তরিক একটা অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এখানে বিম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় তালকাঠ। এই পুরো প্রকল্পে কোনো প্রকার মেটাল স্ট্রাকচার ব্যবহার করা হয়নি। ভবনের একটা দেয়ালে জালি করা আছে যেন জানালা খুলে দিলেই প্রাকৃতিকভাবে বায়ু চলাচল অব্যাহত থাকে। 

৪. যেহেতু রাস্তা থেকে অনেকটাই ভিতরে মূল রেস্তোরাঁটি, তাই মানুষকে আলাদা করে নজরে ফেলার জন্য সদর দরজাতে দেওয়া হয়েছে বিশেষ মনোযোগ। কাঠ দিয়ে গ্রামের গোয়ালঘরে দরজা বানানোর যে পদ্ধতি আছে সেরকমই একটা ভিন্ন ধরনের দরজা এখানেও বানানো হয়েছে যা মানুষের নজর কাড়ে। 

সেইসাথে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য সাইট সংলগ্ন ভবনে যে রঙ আছে তার চাইতে ভিন্ন রঙ এর ব্যবহার এই দরজায় করা হয়েছে। আগের রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড ব্যবহার করে নস্টালজিয়াকে জিইয়ে রাখাও হয়েছে।  

তালকাঠের বিমের নিচে বন্ধু ও পরিবারের সাথে সঙ্গ।

৫. চিকন রাস্তা পেরিয়ে রেস্তোরাঁর উঠোনে ঢুকলে সীমানা দেয়ালে দেখা যায় স্থানীয় আরেকটি আনকোরা উপকরণ যার নাম ‘গ্যারা’। মূলত বাঁশের তৈরি এই গ্যারার দেয়ালটি লোকজ আবহকে আরো জোরালো করে তোলে। গ্যারার ওপারেই অন্য জমি। কিন্তু মজার বিষয় হলো জায়গাটা ব্যবহার হচ্ছেনা বলে সেখানেই স্থপতি কিছু গাছ রোপণ করেছেন যার শোভা গ্যারার উপর দিয়ে দেখতে পাচ্ছেন রেস্তোরাঁর অতিথিরা।

শহুরে কোলাহলের মাঝে এক মেহগনি গাছকে ঘিরে চা পান।

৬. রাতের বেলায় এই জায়গাটি হয়ে ওঠে আরো জীবন্ত। বিশেষ করে বাইরে খাওয়ার জায়গাটি তখন গমগম করে। এর উপরে থাকা গ্রিড কাঠামোতে ঝুলন্ত গাছ ও আলোর সমন্বয়ে জায়গাটি বেশ প্রাণবন্ত দেখায়। 

এই কাঠামোটি তৈরি হয়েছে লোহার ট্রাস এবং মুলি বাঁশের সমন্বয়ে। আধুনিক ও লোকজের মিলনে বেশ দারুন একটা অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। এখানে আছে পরিকল্পিত প্ল্যানটার বক্স। বর্ষার সময় ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে এই প্রাঙ্গণ ও শেড।  

৭. কেরোসিন কাঠের বেঞ্চ ও প্লাইবোর্ডের টেবিল টপ করা হয়েছে তাতে সময় ও খরচ কমে যায় এবং দেখতেও সুন্দর লাগে। 

মুলি বাঁশের মাচার নিচে উন্মুক্ত পরিবেশে আড্ডা ও খাওয়ার শঠ

৮. ওয়াশরুমের দেয়াল গাঁথুনি ৭ ফিট দিয়ে এর উপরে হাফকাট বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। আর উপরে ছাদ করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় উপকরণের কন্টিনিউটিটা সবখানেই বিদ্যমান। 

৯. অন্দরের দেয়ালে কিছু ঘুড়ির টেক্সচার করা হয়েছে। দেয়ালের ঘুড়ির টেক্সচারে ধরা পড়ে এক উড়ন্ত মানসিকতা যেখানে হালকা হাওয়া আর স্মৃতির সুর মিলেমিশে যায়। 

টেকসই শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং আমাদের শেকড়ে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে।
শেষকথা

কাপ পিরিচ রেস্টুরেন্ট শুধু একটি খাবার জায়গা নয়, এটি একধরনের অভিজ্ঞতা, যেখানে স্থাপত্য নীরবে মানুষকে শান্ত করে দেয়। শহরের ব্যস্ততা থেকে সরু একটি পথ পেরিয়ে এখানে পৌঁছানো যেন এক ধরনের মানসিক যাত্রা। এখানে প্রকৃতি, উপকরণ এবং স্মৃতির মেলবন্ধন ঘটে।

এই প্রকল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্থাপত্যের জৌলুস সবসময় কংক্রিট, কাচ কিংবা ইস্পাতে নয়, কখনো কখনো তা খুঁজে পাওয়া যায় বাঁশের ছায়ায়, টালির উষ্ণতায়, কিংবা চটের নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়। 

স্থানীয় উপকরণ ও প্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই রেস্তোরাঁ ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। তা হলো, টেকসই শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং আমাদের শেকড়ে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে।

Related Posts

প্রতি বছর পুড়িয়ে ফেলা হয় যে নগরী

স্থাপত্য মানেই কি ইট, কংক্রিট, ইস্পাত আর বছরের পর বছর টিকে থাকা কোনো ভবন? উত্তরটি যদি হয়—না, তাহলে…

নোডক্র্যাফটের মাটি ঢালাই করা প্রকৃতির কাছাকাছি এক ফার্মহাউজ

ভারতীয় স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নোডক্র্যাফট স্টুডিও বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে একটি ফার্মহাউজ তৈরি করেছে। যা গড়ে উঠেছে মাটি ঢালাই প্রাচীর এবং…

স্থাপত্যের ভাষায় সুরের মূর্ছনা

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিল শহরকে বলা হয় মিউজিক সিটি। সংগীতই এই নগরের পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সেই শহরের কাম্বারল্যান্ড নদীর…

একরঙা শহর: স্থাপত্য থেকে রঙের হারিয়ে যাওয়া

আজকাল যেকোনো বড় শহরে হাঁটতে গেলে একটা বিষয় চোখ এড়ানো কঠিন। সেগুলো হলো- খোলা কংক্রিট, সাদাটে দেয়াল, জানালার…