সময়ের ব্যবধানে ভবনের দেয়ালগুলো আধুনিক হয়ে উঠছে। কাদামাটি আর চুনসুরকির প্রলেপ নয় প্রযু্ক্তির ছোঁয়ায় স্মার্ট হয়ে উঠেছে আমাদের গৃহস্থালির অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পাশপাশি।
ভবন নির্মাণের প্রাক-শিল্প যুগের ইতিহাস জুড়ে যে কোন স্থাপনার পৃষ্ঠতলগুলো নিষ্ক্রিয় ছিল না। বরং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ছিলো বিশেষত দেয়ালগুলো।
যান্ত্রিক ব্যবস্থার আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই, কাদামাটির প্রলেপ, চুনের প্রলেপ এবং অন্যান্য ময়শ্চার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হতো। দেয়ালের এসব উপকরণ আর্দ্রতা শোষণ ও নির্গমন করতো, তাপ নিয়ন্ত্রণ করতো এবং জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তনও প্রশমিত করতো।
বিংশ শতাব্দীতে কাঁদামাটি আর চুনসু রকির এই দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সাথে বড়ই বেমানান। আধুনিক HVAC সিস্টেম এবং শিল্পজাত নির্মাণ উপকরণগুলো আধুনিক স্থাপনাগুলোকে বাইরের পরিবেশ থেকে একেবারে আলাদা করে দেয়।
সহজলভ্য এসব উপকরণ হাতের নাগালো পাওয়া যায়। অপরদিকে কাঁদামাটি আর চুসুরকি বর্তমানে সংগ্রহ করা অনেক কঠিন। আবার আধুনিক স্থাপত্যের নকশা এবং ডিজাইনগুলো আগের চেয়ে সম্পূর্ণই আলাদা।
এ সময়ে ভবনের ডিজাইন করার সময় সম্মুখভাগ একেবারে বদ্ধ থাকে। ফলে বাইরের আলো বাতাস প্রবেশের খুব বেশি সুযোগ থাকে না। সেকারণে ভবগুলোতে কৃত্রিম আলো এবং শীতাতপ যন্ত্র (এয়ার কুলার) আবশ্যিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাকৃতিক আলো বাতাস না থাকায় দেয়ালগুলোও জলবায়ুর সহিষ্ণু হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে, পরিস্থিতি আবারও বদলাচ্ছে প্রয়োজনের তাগিদে। কথায় বলে, প্রয়োজন কোন আইন মানে না। আরও একটি ধ্রুব সত্য আছে, “ইতিহাস সত্য, ইতিহাস বারবার ফিরে আসে”। আমাদের বাস্তব জীবনে কথাটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
স্থাপত্যশিল্প যতটা গতিশলী তার চেয়েও গতিশীল শিল্পমাধ্যমগুলোতে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের বারবার ফিরে আসা আমাদের চোখে পড়ে সবার আগে। সম্প্রতি পরিস্থিতি পাল্টালে কাদামাটি কিংবা চুন সুরকি হয়তো দেয়ালে ফিরে আসবে না।
ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ, জলবায়ুর অস্থিরতা, যান্ত্রিক ব্যবস্থারের সীমাবদ্ধতার কারণে স্থপতি ও বস্তু বিজ্ঞানীরা স্থাপনার দেয়ালগুলোকে জলবায়ু সহিষ্ণু ইন্টারফেস হিসেবে ব্যবহারের ধারণাটি পুনরায় বিবেচনা করছেন।
বর্তমানে নান্দনিকতা বাড়াতে ঘরের ভেতর ও বাই পেইন্ট, কোটিং এবং পাতলা সারফেস ট্রিটমেন্ট করা হয়। এতে বাড়ে ঘরের তাপমাত্রা। অথচ মাটির ঘরের ভেতরের দেয়াল ও ছাদের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা সবসময়ই নিয়ন্ত্রিত থাকে।
আধুনিক স্থপতিরা আধুনিক উপকরণকে এমন পরিবেশবান্ধব করে উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন। তাদের উদ্ভাবন আধুনিক স্থাপনার ঘরগুলোকে মাটির দেয়ালের ঘরের মতো আরাম দেবে। এটি HVAC system (Heating, Ventilation, and Air Conditioning) সিস্টেমের উপর চাপ কমিয়ে দেয়ালের বাইরের অংশকে পুনরায় শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

দেয়ালে ব্যবহারের মতো এক ধরণের নতুন উদ্ভাবিত পণ্য আছে যা পুরোনো প্রযুক্তিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে। যুক্তরাজ্যের কর্নওয়াল-ভিত্তিক ক্লেওয়ার্কস প্রাক-আধুনিক স্থাপত্যের কৌশল অবলম্বন করেই মাটির প্লাস্টার তৈরি করেন।
এই বিশেষ মাটির প্রলেপ হাইগ্রোস্কোপিক পদ্ধতিতে কাজ করে। সহজে বললে, বাতাস আর্দ্র থাকলে এগুলো অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করে এবং বাতাস শুষ্ক হলে আর্দ্রতা ছেড়ে দেয়। অন্যান্য ইন্টেরিয়র ফিনিশের তুলনায়, পোড়ানো হয়নি এমন মাটির প্লাস্টারের হাইগ্রোস্কোপিক ক্ষমতা প্রতি ঘনমিটারে ৫২ কেজি।
তুলনামূলকভাবে, জিপসাম প্লাস্টারের ধারণক্ষমতা প্রায় ১০%, যা প্রতি ঘনমিটারে ৫.১ কেজি। অথচ সাধারণ রঙের প্রলেপের ধারণক্ষমতা শূন্য। ক্লেওয়ার্কসের পোড়ানো হয়নি এমন দেয়ালের আর্দ্রতা-নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে। এ মাটি ৪০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে বা ছেড়ে দিতে পারে।
সাধারণ রঙের আর্দ্রতা শোষণ ক্ষমতার অভাব। সেকারণেই নতুন উপকরণ উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই প্রয়োজন মেটাতেই তৈরি করা হয়েছে লিলি প্যাড যা মূলত মাটির প্লাস্টারের মতো রং। কাদামাটির প্লাস্টারের মতো, এই পরবর্তী প্রজন্মের রং ঘরের ভেতরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রয়োজনে আর্দ্রতা ছেড়েও দিতে পারে। অ্যাডেপ্ট ম্যাটেরিয়ালসের নামের একটি একটি প্রতিষ্ঠান এই লিলি প্যাড উদ্ভাবন করে। এখন পর্যন্ত এটিই একমাত্র ল্যাটেক্স-ভিত্তিক রং যা না শুকানো পর্যন্ত মাটির দেয়ালের মতো কাজ করতে পারে। এই উপাদানটি তথাকথিত “ভেপারউইস্প” প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়।
কোম্পানির মতে, প্রয়োগের পর এক গ্যালন লিলি প্যাড পেইন্ট একটি সোডা ক্যানের সমপরিমাণ জল ধরে রাখতে পারবে। পেইন্টের এই আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তাপীয় স্বাচ্ছন্দ্যকেও সরাসরি প্রভাবিত করে। কারণ তাপমাত্রা বাড়ার সময় এটি তার পরিবেশকে শীতল করার জন্য ‘ঘামে’। আবার তাপমাত্রা কমার সময় আর্দ্রতা আটকে রেখে ঠান্ডার প্রভাব কমায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে আর্দ্রতা-নিয়ন্ত্রণকারী এই লিলি প্যাডের পৃষ্ঠতলের উপর জিওলাইট কম্পোজিট কোটিং ব্যবহার করা হয়েছে। ভেপারউইস্প পদ্ধতির মতোই, এই মাইক্রোপোরাস খনিজগুলো আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে দারুণ কার্যকর।
ন্যানোফাইব্রাস ময়েশ্চার পাম্প মেমব্রেনের মতো প্রযুক্তিগুলো অত্যাধুনিক উদ্ভাবনের উদাহরণ। এই বহুস্তরীয় মেমব্রেনগুলো আর্দ্রতা পরিবহনের জন্য একটি বায়োমিমেটিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। ঠিক গাছ যেভাবে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জল সঞ্চালন করে।
এই উদ্ভাবন আধুনিক সময়ে স্থাপনার দেয়ালগুলোকে একটি প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে আমাদের। দেয়াল এখন আর কেবল বিভাজক নয়, বরং আর্দ্রতা ও শক্তির আধার।
আধুনিক এই কৌশল কেবল অতীতের মাটি কিংবা চুন সুরকির দেয়ালের অনুশীলনকেই পুনরুজ্জীবিত করেনি। আশ্চর্যজনকভাবে স্থাপত্যে নতুন প্রযুক্তিগত সাফল্যকেও উৎসাহিত করেছে। বস্তুগত দিক থেকে নির্মাণশিল্পে প্রযুক্তি যেমনই হোক আবাস যদি আরামদায়ক না হয় তবে বিলাশিতা একেবারেই অনর্থ।
সূত্র: www.architectmagazine.com
















