লুই কান-এর ছায়ায়: স্থান-কাল-পাত্র প্রদর্শনী চত্বর

প্রকল্পের নাম: উন্মুক্ত স্থাপত্য বিষয়ক প্রদর্শনী ‘স্থান-কাল-পাত্র’ চত্বর

স্থান: জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ

আয়োজক: আর্ক-সামিট, ২০২৫; বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউট

উদ্বোধনের তারিখ: ১৭/১২/২০২৫

স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান: চিন্তা স্থাপত্য

প্রদর্শনী প্রাঙ্গণ ডিজাইনার: স্থপতি মাহ্‌মুদুল গনি কনক, স্থপতি আহসান হাবিব ও নাজমুল ইসলাম সৌরভ

একটি উন্মুক্ত পরিসর, যেখানে অবসরে সময় কাটাতে প্রতিদিনই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম ঘটে। ছবি: সিটি সিনট্যাক্স

গত বছর ১১-১৩ ডিসেম্বর ঢাকার আগারগাঁওয়ে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক স্থাপত্য সম্মেলন আর্কসামিট ’২৫। এতে বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নির্মাণশিল্পের নেতৃবৃন্দ অংশ নিয়েছিলেন। সম্মেলনটি স্থাপত্যচর্চায় নতুন ভাবনা, জ্ঞান বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত।

এই সামিটের অংশ হিসেবে সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত হয়েছিল ‘স্থান-কাল-পাত্র’ নামে একটি প্রদর্শনীর। প্রদর্শনী প্রাঙ্গণটি ডিজাইন করেছিল স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান চিন্তা স্থাপত্য

সংসদ ভবন সংলগ্ন ‘স্থান-কাল-পাত্র’ প্রদর্শনী চত্বর। ছবি: সিটি সিনট্যাক্স

দেশের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকর্মের সাথে সরাসরি কাজ করাটা যেমন আনন্দের তেমনি প্রতিটি সিদ্ধান্তে ছিল বাড়তি দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা।

শুরুতে সংসদ ভবনের প্লাজাতেই প্রদর্শনীর আয়োজন করার কথা ছিল। সেখানে গাছের আকৃতির যে লাইট স্ট্রাকচারটি রয়েছে, তাকে ঘিরেও চিন্তা স্থাপত্যের কিছু ডিজাইন প্রস্তাবনা ছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ স্থানে কাজ করার অনুমতি পাওয়া যায়নি। এরপর প্রদর্শনীর জন্য স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয় সংসদ ভবনের সামনের বিস্তৃত ফুটপাত। একটি উন্মুক্ত পরিসর, যেখানে অবসরে সময় কাটাতে প্রতিদিনই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম ঘটে। 

এই স্থানটির ব্যবহারকারী ক্রেতা ও বিক্রেতারা পুরো আয়োজনটিকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। ছবি: সিটি সিনট্যাক্স

এক্ষেত্রে প্রথমেই স্থপতির চিন্তা ছিল সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে তাদের জন্যই উন্মুক্ত এই আয়োজনটিকে সফল করতে গেলে এখানকার দৈনন্দিন চলাচলের স্বাভাবিক যে গতি তাকে কোনোভাবেই ব্যাহত করা যাবে না। এখানে যে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা আছেন এবং তাদের নিয়মিত ক্রেতাদের এই বিরাট অংশটাকে একেবারেই বিরক্ত করতে চাননি স্থপতি।

ফলে তারা এমন একটা কর্ণার বেছে নিয়েছেন যেটি সংসদ ভবন সীমানা সংলগ্ন হওয়ায় তাকে সম্পূর্ণরূপে দৃশ্যত অনুভব করা যায়, এবং একইসাথে জনসমাগমের নিয়মিত জীবনাচারও অক্ষুণ্ণ থাকে।

প্রদর্শনী চলাকালীন এর সুফল স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে। এই স্থানটির ব্যবহারকারী ক্রেতা ও বিক্রেতারা পুরো আয়োজনটিকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।

একজন দর্শনার্থী এই চত্বরে দাঁড়িয়ে এবং দৃশ্যগতভাবেও সংযুক্ত হতে পারেন। ছবি: আহসান হাবিব

চিন্তা স্থাপত্যের লক্ষ্য ছিল এমন একটি অভিজ্ঞতা ডিজাইন করার, যা দর্শনার্থীদের সঙ্গে অর্থবহভাবে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম। সামান্য ঢালু একটি প্রদর্শনী পৃষ্ঠের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন তারা। এর ফলে একজন দর্শনার্থী এই চত্বরে দাঁড়িয়ে এবং দৃশ্যগতভাবেও সংযুক্ত হতে পারেন।

এই ভাবনা থেকে একাধিক স্থানিক অধ্যয়ন ও ডিজাইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়, যেখানে স্কেল, অভিমুখ এবং দর্শকের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বয় আনা হয়েছে।

সংসদ ভবনের সংস্পর্শে থেকে ডিজাইন করা নিয়ে স্থপতি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কান এর ডিজাইন করা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে কিছু ডিজাইন করার একটা চাপ আছে। এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করতে গেলেই স্থপতি ভাবছিলেন কান-এর ডিজাইনের অনুকরণ যেন না হয়ে যায়, আবার এলিয়েন কিছুও যেন না হয়।

মোটকথা কোনোরূপ দৃশ্যগত বিঘ্ন সৃষ্টি না করে একটি নম্র ডিজাইন করতে চেয়েছেন তারা যা সংসদ ভবনের মহিমাকে তুলে ধরতে পারে।  

প্রদর্শনী চত্বর ডিজাইন কনসেপ্ট। ছবি: চিন্তা স্থাপত্য

ডিজাইন চলাকালীন স্থপতি টের পেলেন, তাদের কিছু প্রস্তাবিত ডিজাইন উপাদান স্থপতি কান-এর অনির্মিত প্রকল্প হুরভা সিনাগগ-এর সাথে অজান্তেই মিলে যাচ্ছে। এই মিলে যাওয়াটাকেই তারা পরবর্তীতে সচেতনভাবে স্বীকৃতি দিয়ে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।

এতে করে চূড়ান্ত ডিজাইনটি আদতে কোনো অনুকরণ নয়, বরং একটি শ্রদ্ধার্ঘ্যে পরিণত হলো। হুরভা সিনাগগ প্রকল্পে স্থপতি কান জোড়া ভলিউমকে একটি সরলরৈখিক বিন্যাসে ডিজাইন করেছিলেন।

আর এখানে স্থপতি কান-এর প্রকল্পটিকে ভাবানুবাদের চেষ্টা করেছেন স্থপতি। সেই একই গাণিতিক যুক্তিকে অনুসরণ করে ভিন্ন একটি প্রচেষ্টা এখানে করা হয়েছে। তাই এই চত্বরে উপাদানগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যাতে এখান থেকে জাতীয় সংসদ ভবন দেখতে কোনো বাধা না থাকে। 

দর্শককে দ্রুত দেখার বদলে সময় নিয়ে দেখতে উৎসাহিত করবে এই প্রদর্শনী। ছবি: সিটি সিনট্যাক্স

এ ছাড়াও একটি বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে, যাতে মানুষ হেঁটে যেতে যেতে একটু থামতে পারে, বিশ্রাম নিতে পারে, বা বসে বসে প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারে।

এই স্থানটিকে একটি বারান্দা বা আঙিনার মতো মনে হয়। এটি দর্শককে দ্রুত দেখার বদলে সময় নিয়ে দেখতে করতে উৎসাহিত করবে। প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুকে উপলিব্ধিতে আনার জন্য এটাকেই যুতসই সিদ্ধান্ত বলে স্থপতির মনে হয়েছে।

সংসদ ভবনের মহিমার ছায়ায় দাঁড়িয়ে, হুরভা সিনাগগের জোড়া ভলিউমের নীরব গল্পকার ‘স্থান-কাল-পাত্র’ প্রদর্শনী চত্বরটি তাই দর্শকদের আহ্বান জানায় থমকে যেতে, মন ভরে দেখতে, জিরিয়ে নিতে, অনুভব করতে সর্বোপরি, দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সংলাপ স্থাপন করতে।

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top