শিক্ষার্থীর নাম: তাসফিয়া মাশিয়াত
সাইট এরিয়া: ১০৬৪৮০ স্কয়ার ফিট
প্রকল্প ডিজাইনের সময়: ২০২৩
দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সেমিস্টার (স্পোর্টস সেন্টার)
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক
ক্রীড়াকেন্দ্রের গুরুত্ব
স্পোর্টস সেন্টার, বা ক্রীড়া কেন্দ্র একটি আধুনিক সুবিধাযুক্ত স্থাপনা। এটি এমন একটি স্থান যেখানে একসাথে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হতে পারে। যেমন, ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল, টেনিস, ভলিবল, হকি ইত্যাদি। এখানে খেলোয়াড়রা নিজেদের শারীরিক দক্ষতার উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তবে নেইবারহুড স্পোর্টস সেন্টার মানে পাড়ার ক্রীড়াকেন্দ্র আকারে ছোট হয়। তবে সুস্থ দেহমন গঠনে এর প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী।
বাংলাদেশে স্পোর্টস সেন্টারের গুরুত্ব অনেক। প্রথমত, এটি দেশের ক্রীড়াবিদদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের জন্য একটি আধুনিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। যেখানে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, কোচিং ও ফিজিওথেরাপির সুবিধা থাকে। এছাড়া, স্পোর্টস সেন্টার সাধারণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ক্রীড়ার উন্নয়নের পাশাপাশি যুব সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও ভূমিকা রাখে স্পোর্টস সেন্টার। ক্রীড়া কর্মসূচির মাধ্যমে যুব সমাজের মধ্যে একটি ইতিবাচক মনোভাব ও শৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা তাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সাহায্য করে। ফলে, এসব সেন্টারে তরুণদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া দলগতভাবে খেলার দক্ষতা বৃদ্ধি পায় বলে সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ে সুস্থতা বজায় থাকে।
পাশাপাশি স্পোর্টস সেন্টার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রীড়া আয়োজনগুলোর জন্য দেশের পর্যটন শিল্প, হোটেল, স্পন্সরশিপ, সরঞ্জাম বিক্রি ইত্যাদি খাতে প্রবৃদ্ধি আনতে পারে। এটি স্থানীয় এবং জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
তাসফিয়া মাশিয়াত এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্বিবিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল প্রজেক্ট হিসেবে তার স্পোর্টস কমল্পেক্স প্রকল্পটি বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলো। স্থপতির সমাজ দর্শনের জায়গায় তার ডিজাইনের সিদ্ধান্তগুলো বিশেষভাবে বিজ্ঞজনদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ঢাকার মতো জনবহুল একটি শহরের মাঠ নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তার চিন্তক মনের সংবেদনশীলভাব শ্যামলি ক্লাব মাঠের জন্য আশীর্বাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যিকারের সাইটে কল্পিত এই একাডেমিক স্টুডিও প্রকল্পের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের এই লেখা।
শ্যামলি ক্লাব মাঠটি সরকারি তত্ত্বাবধায়নে চলে। এখানে একটি টিনশেডের ক্লাব হাউজ এবং ক্রিকেট পিচ আছে। নির্বাচিত কিছু মানুষ ছাড়া এই ক্লাবে সাধারণ মানুষের তেমন আনাগোনা নেই। ক্লাবের ভিতরে নেই কোনো কর্মকাণ্ড। ফাঁকা এবং পরিত্যাক্ত অবস্থায় এটি দীর্ঘদিনই পড়ে আছে। মাঠের সীমানা প্রাচীর হিসেবেও কিছু কিছু অংশে ব্যবহার করা হয়েছে টিন। শ্যামলি রিং রোড সংলগ্ন এই পার্কটির অন্য তিনপাশে আছে কিছু বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক ভবন এবং একটি মসজিদ। মাঠের এরিয়া হলো, ১০৬৪৮০ স্কয়ারফিট।
তাসফিয়া চেয়েছেন মাঠটিকে যতটা সম্ভব নির্মিত ভবন থেকে অনেক বড় রাখতে। স্বাভাবিকভাবেই ভবনের গুরুত্ব এখানে কম। ঢাকা শহরে সবুজের দেখা নেই বললেই চলে, তাই এই মাঠের গুরুত্ব অসীম। তাছাড়া মোহাম্মদপুরের মতো এলাকা যেখানে অনেক শিশু কিশোরের আবাস অথচ তাদের জন্য আমরা পর্যাপ্ত সবুজ মাঠ করতে পারছি না। ফলে এটি নিঃসন্দেহে দায়িত্বশীল একটি সিদ্ধান্ত। তবে মাঠের মাঝে একটি ভবনের প্রয়োজনীয়তা ফেলে দেওয়ার নয়।
খেলাধুলা সংক্রান্ত কিছু আভ্যন্তরীণ সুবিধা নিশ্চিত করা, এবং মাঠের সুরক্ষার জন্য একজন অভিভাবক হিসেবে ভবনের দরকার রয়েছে। তাসফিয়ার ডিজাইনে তাই এই ভবনের মাঝে রয়েছে মাল্টি-পারপাস হল। এই হলে নানারকমের অনুষ্ঠান আয়োজন করা সম্ভব। ইন্ডোর বাস্কেটবল কোর্ট হিসেবেও জায়গাটিকে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া শৌচালয় এবং লকার-শাওয়ারের মতো মৌলিক কিছু সুবিধাও এখানে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তাসফিয়া তার ডিজাইন স্কিমে সাইটে প্রবেশের রাস্তার সাথে সংলগ্ন স্থানে নির্মিত ভবনকে চিন্তা করেছেন। কিন্তু এতে করে যেন দৃশ্যগত কোনো বাধা তৈরি না হয় তাই তিনি ভবনে প্রবেশের স্থানটিকে ফাঁকা রেখেছেন। বেশ বড় একটা ফাঁকা প্যাভিলিয়নের মতো এই স্পেসটি কোনো গেট দিয়েও আটকানো নেই। নেইবারহুড বা পাড়ার স্পোর্টস সেন্টারে স্থাপত্যের এই উদারতা কিশোরমনকে বিশালত্বে মিশে যাওয়ার শক্তি জোগায়। অথবা বলা ভালো, তার সাবলীলতায় কোনো প্রশ্নের জন্ম দেয় না। ঢাকা শহরে এখন অনেকগুলো পার্ককে নতুন করে ডিজাইন করা হচ্ছে।
এইসব পার্ককে নানাভবে নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, সবসময়ের জন্য পার্কটি সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না। কিন্তু এনিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কিছু নগর পরিকল্পনাবিদ। তারা এরূপ সিদ্ধান্তের বিপরীতে কতগুলো প্রশ্ন রেখেছেন। তারা বলছেন, আমরা আসলে কাদের জন্য পার্ক বানাচ্ছি, কাদেরকে নিরাপত্তা দিতে চাইছি এবং কাদেরকে হুমকি বলে মনে করছি? আমরা পার্কটি বানাচ্ছি এই পাড়ার সকলের জন্য। আবার তাদেরই একটা গোষ্ঠীকে প্রশ্নবিদ্ধ করছি। ঢাকা শহরকে ভীষণভাবে গরীব বিরোধী এবং নারী বিরোধী একটি শহর বলা হয়। এই শহরের জৌলুস টিকিয়ে রাখতে গরীবদেরকে প্রয়োজন অথচ তাদের অস্তিত্ব আমরা যেন অস্বীকার করতে চাই।
যে অর্থনৈতিক শ্রেণির মানুষেরা নিরাপত্তাহীনতার কারণ হতে পারে পার্কে তাদের আগমন সীমিত করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আসলে বিভেদের পচা রাজনীতিটা বহাল রাখা হয়। আমরা যদি পার্কটি উন্মুক্ত রেখে বরং তাদের হাতেই এই নিরাপত্তার ভারটা তুলে দেই এবং তাদেরকেও এই পার্কের ন্যায্য অংশীদার হিসেবে গণ্য করি তাহলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। অন্যথায় ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দল তাদেরকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পার্কগুলো বেদখল করে ফেলতে পারে।
এমন ঘটনা পূর্বেও ঘটেছে। দুই শ্রেণির এই বৈপরীত্য এজমালি সম্পদ অধিকার প্রশ্নে তাই রুখে দিতে হবে। পাব্লিক স্পেসকে নিরাপত্তার নামে পাব্লিকের জন্য সীমিত করে ফেলার মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক টিকে থাকে। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সামাজিক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নিরাপত্তা কর্মীদেরকেও সুরক্ষা প্রদান করতে হবে যেটি তাদের দায়িত্ব।
কিন্তু সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে তাকে নিরাপত্তা প্রদানের গল্পটা হাস্যকর। রাষ্ট্রীয় এই ব্যর্থতা ঢেকে ফেলা এখনকার প্রজন্মের কাছে আর সহজ নয়। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাতের বেলায় মাঠে যাওয়া যাবে না এমন কোনো ধারণা আসলে প্রচলিত রূপ নিয়ে ফেলতে পারে না। যদিও তাসফিয়ার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জ্যুরিতে প্রশ্ন উঠেছিলো বাস্তবতার নিরিখে।
তবে স্থপতি এহসান খান তাসফিয়ার সাথে সহমত ছিলেন। আমরা চাই, শিক্ষাজীবনে ডিজাইনে নিজের দর্শন নিয়ে কাজ করতে পারার মতো স্বাধীনতা পেশাগত জীবনেও সকল স্থপতি’র জন্য যেন সহজে বাস্তবায়িত হতে পারে। তাহলে স্থপতি সমাজের প্রতি তার দায়পূরণ করতে পারেন। পুরো মাঠে কোনো সীমানা দেয়াল না থাকা এবং ভবনে তালা দেওয়া দরজা না থাকাটায় এই প্রকল্পের সবথেকে বড় বিষয়। বাড়তি ও প্রচলিত কিছু না করার সচেতন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এই স্পোর্টস সেন্টারে দীর্ঘমেয়াদি একটি সামাজিক আন্দোলন জারি রাখা হলো।
প্রকল্পে প্রবেশের জন্য হাঁটা, গাড়ি এবং সাইকেল সকলের জন্যই পথ ও পার্কিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটানা নির্বিঘ্নে সাইকেল চালানোর জন্য সাইটের চারপাশ দিয়ে পথ করা হয়েছে। সাইকেলের এই পথ যেন পথচারীদের সাবলীল চলাফেরায় বিঘ্ন না ঘটায় এবং সাইকেল আরোহীরাও যেন মাঠের কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন না ঘটাতে পারেন তাই রাস্তা থেকে ১৫ ফিট উঁচুতে তুলে ফেলা হয়েছে।
এই সাইকেল পথের নিচেই দর্শকদের জন্য গ্যালারি করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি সাইকেল খুব সহজেই এখানে চলতে পারে। একমুখী সাইকেল চালানোর এই পথে তাই গোলমালের সম্ভাবনা কমে গিয়েছে এবং একটি ডিজাইন সিদ্ধান্তে দুটি সমস্যার সুন্দর সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।
ক্রীড়া কেন্দ্রের যত সুবিধা
শেডেড ড্রপ অফ দিয়ে স্পোর্টস সেন্টারে প্রবেশের পর মাঠের সাথে দৃশ্যত উন্মুক্ত প্যাভিলিয়নে একটি টেবিল টেনিস রাখা আছে। এর বাম পাশে আছে মাল্টিপারপাস হল যা অন্যসময় বাস্কেটবলের কোর্ট হিসেবে কাজে লাগছে। এরসাথে আছে লকার শাওয়ারের ব্যবস্থাও। এখান থেকে সরাসরি মাঠে যাওয়া যায় আবার এখানে দাঁড়িয়ে মাঠের খেলাও উপভোগ করা যায়।
এখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় যেয়েও একইভাবে মাঠের খেলা উপভোগ করার জন্য দুইপাশ খোলা জায়গা রয়েছে। আরও আছে জিমনেশিয়াম। মাল্টিপারপাস হল যেহেতু ডাবল হাইটের তাই দোতালায় কেবল জিম ও নানা সার্ভিস নিশ্চিত করা হয়েছে।
তাসফিয়া স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউটের যে নির্মাণশৈলী সেটি বেছে নিয়েছেন। এর জন্য তিনি কিছুদিন গবেষণাও করেন। সাধারণত স্পোর্টস সেন্টারে অনেক বড় স্প্যানের স্পেসকে ধারণ করতে হয়। এক্ষেত্রে তাই ট্রাসের হাল্কা স্ট্রাকচারই বেশি জনপ্রিয়।
স্থপতি তাসফিয়ার ডিজাইন করা স্পোর্টস সেন্টার তার দক্ষতা ও সৃজনশীলতার একটি অনন্য উদাহরণ। তার ডিজাইনে ক্রীড়া পরিবেশের সঙ্গে স্থাপত্যশৈলীর সুনিবিড় সমন্বয় রয়েছে। এইকারণে এটি ব্যবহারকারীদের জন্য একদিকে যেমন পেশাদার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, তেমনি অন্যদিকে একটি বিশ্রাম ও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার স্থান হিসেবে কাজ করে। তার ডিজাইন শুধু কার্যকারিতা নির্ভর নয়, এর মধ্যে মানবিক আঙ্গিক, ব্যবহারিক সুবিধা এবং সৌন্দর্যও তুলে ধরা হয়েছে।
স্পোর্টস সেন্টারের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়া ও শারীরিক সংস্কৃতির প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এটি কেবল একটি প্রকল্প নয় যা স্থানের সাথে সম্পর্কিত। বরং, এটি একটি নতুন ধরনের কমিউনিটি সেন্টার যেখানে সুস্থ, শক্তিশালী ও মানসিকভাবে সমৃদ্ধ জাতি গঠিত হবে।