আর পাঁচটা ফ্লাইওভারের মতোই ছিল মুম্বাই শহরের সেনাপতি বাপাট মার্গ ফ্লাইওভার। কিছু ফ্লাইওভারের স্ট্রাকচারের মূল ভিত্তি থাকে মাঝ বরাবর। এর ফলে নিচের স্পেসটা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফ্লাইওভারের কর্নার বরাবর যদি স্ট্রাকচার নির্মাণ নিশ্চিত হওয়া যায়, তখন এর নিচের স্পেস ব্যবহারে আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মুম্বাই শহরের এই ফ্লাইওভার ব্রিজটির নিচের জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে খালিই পড়ে ছিল। তখন কংক্রিটের এই বিশাল নির্মাণটিকে সেই অঞ্চলের মানুষের জন্য একটা পাবলিক স্পেসে রূপান্তরের কথা ভাবা হচ্ছিল। এমন চেতনা থেকে নির্মাণ করা হয়েছে ওয়ান মাইল গ্রিন (এক মাইল সবুজ) নামক একটি প্রকল্প।
সেনাপতি বাপাট মার্গ ফ্লাইওভার মুম্বাই শহরের প্রাণকেন্দ্রের মূল কিছু সড়ক ধরে প্রায় ১১ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফ্লাইওভারের নিচে প্রায় ১৮০০ মিটারের যে অব্যবহৃত রাস্তাস্বরূপ অংশটি বের হয়ে এসেছে, সেটির কার্যকর মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে নিউক্লিয়াস অফিস পার্ককে নিযুক্ত করা হয়। কর্তৃপক্ষ মুম্বাইয়ের স্থাপত্যের দপ্তর স্টুডিও পিওডিকে নিয়োগ দেয়, যারা এই এক মাইল সবুজ প্রকল্পের আরবান ডিজাইন এবং মাস্টারপ্ল্যানিংয়ে বাস্তবায়ন করেছে।
এই স্কিমের সব থেকে বেশি রূপান্তর ঘটানো পরিসরটি ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ফ্লাইওভারের নিচের এলাকা, যেটি পারেল বাগ নামে পরিচিত। স্টুডিও পিওডি এই প্রকল্পটির ডিজাইন করার জন্য নেদারল্যান্ডের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এমভিআরডিভিকে দায়িত্ব দেয়। তাদের চিন্তার মূলভাবটি ছিল এই এলাকায় সবুজের যে অভাব আছে তা পূরণের চেষ্টার পাশাপাশি বস্তুগত কিছু সুবিধা প্রদান করা। অন্য কথায় বলতে গেলে এই নির্মাণের কারণে জায়গাটি যে রস হারিয়েছে, সেটিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা।
এই প্রকল্পটির ডিজাইন করে নেদ্যারল্যান্ডের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এমভিআরডিভি। ২০২২ সালে এর নির্মাণ শেষ হয়। প্রকল্পের লাইট ডিজাইন করেছে লাইটিং কনসেপ্ট নামক একটি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনে পরামর্শক হিসেবে ছিল এনভায়রোস্কেপ, এএমএস কনসালট্যান্টস। এমইপি ইঞ্জিনিয়ারিং পরামর্শ দিয়েছে এআরকে কনসালটিং। প্রকল্পের স্ট্র্যাটেজি এবং ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন শ্রুতি ঠাকরার। সহযোগী স্থপতি হিসেবে স্টুডিও পিওডি কাজ করেছে। প্রকল্পের ক্লায়েন্ট ছিলেন নিউক্লিয়াস অফিস পার্ক।
স্টুডিও পিওডি স্পেসের প্রোগ্রামগুলো কী হবে, সেটা গবেষণা করে বের করে। এরপর তারা এমভিআরডিভির সঙ্গে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে তা নির্ধারণ করে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক গবেষণার ধারণা থেকে এমভিআরডিভি তাদের ডিজাইন শুরু করে এবং নীল রঙের সর্পিলাকার স্ট্রাইপগুলো যুক্ত করাটা তাদের চিন্তা থেকেই আসা। এক মাইল সবুজ যেন একটা আনন্দঘন এবং সামগ্রিক আরবান স্প্যাটিয়াল বা স্থানগত অনুভবের জন্ম দিতে পারে তা প্রকল্পে যুক্ত করেছেন। সেই সঙ্গে নানা স্তরের মানুষকে একীভূত করার সূক্ষ্ম চিন্তাও এখানে কাজ করেছে।
এই প্রকল্পের কিছু অংশে কিছুটা পাহাড়ি ঢালের মতো ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন করা হয়েছে, যা দ্বিমাত্রিক দৃশ্যের আবেদন বদলে দিয়ে একটা ত্রিমাত্রিক স্পেসের অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এ রকম একটা বহুমাত্রিক স্পেস আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে বলে এখানে নানা ধরনের প্রোগ্রাম সরবরাহ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। এই প্রকল্পের দৃশ্যগত যে ভাষার প্রকাশ এবং গ্রাফিকস তা এই জায়গায় হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে অখণ্ড একটি রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রকল্পের গোটা স্পেসকে অনেক পাবলিক রুমের একটি সমন্বিত রূপ বললেই ভালো হয়। প্রতিটা রুমে ঘটছে নানা ধরনের আয়োজন- লাউঞ্জ, জিম, ছায়ায় বসার জায়গা, পারফরম্যান্স স্পেস এবং পড়ার জায়গা।
পুরোটা প্রকল্পের স্পেসজুড়ে লাগানো হয়েছে গাছ। সবুজের সমারোহটাই হলো এখানে মূল ডিজাইন-সবুজের বেশ কিছু পর্দা ডিজাইন করা হয়েছে প্রকল্পটির কর্নারজুড়ে। প্রবেশপথেও তৈরি হয়েছে একটা সবুজের আর্চ। ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলোতে এবং প্ল্যান্টার বক্সগুলো ভরে উঠেছে সবুজে। এটা একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্যকে উদ্্যাপন করছে, তেমনি পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে শীতল রাখছে এবং শব্দদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনছে।
এমভিআরডিভির প্যাটার্ন স্টিফেন দে কনিং। এ প্রকল্প প্রসঙ্গে বলেন, ‘এক মাইল সবুজ এই প্রশ্নটা আমাদের করে: হাইওয়েতে প্রকৃতির যে অংশ উচ্ছেদ করে নির্মিত হলো, কী হবে যদি সেই জায়গাটা যদি আমরা ফেরত চাই? একটা ফ্লাইওভার এই গরম শহরে কিছু ছায়া দিতে পারে এবং ছোট ছোট কিছু জায়গা সৃষ্টি করতে পারে, তা উঁচু ইমারত নির্মাণের জন্য সহায়ক। তাই এই জায়গাটাকে একটা পাবলিক স্পেস হিসেবে ব্যবহার করতে চাওয়াটা কোনো অসম্ভব চিন্তা নয়।’
এই ডিজাইনটি পথচারী এবং সাইকেল আরোহীদের সংযোগকে আরও বর্ধিত করেছে। কারণ প্রকল্পটির কারণে এলাকাটি আরও স্বস্তিদায়ক এবং সুগম হয়েছে। হেঁটে চলার পথ, সাইকেল আরোহীদের জন্য পথ এবং উজ্জ্বল বিশাল স্কেলের জেব্রা ক্রসিং আদতে সুগম পথ ও নিরাপদ অবস্থাকে আরও জোরদার করেছে। প্রকল্পটির আলোর কনসেপ্টের যে প্রোগ্রাম এবং সেগুলোর যে উপাদান ও আরবান ফার্নিচারের যে রূপ, সেটিকে মাথায় রেখে করা হয়েছে যেন এর দ্বারা জায়গাটিকে চেনা যায় এবং নিত্যদিনের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা যায়, সেটিও ছিল মুখ্য বিষয়।
ফ্লাইওভারের নিচের অকেজো অংশকে ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর মূল্য বাড়িয়ে তোলে। যানবাহনের পাশাপাশি এটি একটি আশ্রয়, যা পাবলিক স্পেস হিসেবে একটা নতুন মাত্রা অর্জন করে। এর প্রকৌশল দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্ষা মৌসুমে এখানে বৃষ্টির পানি ধারণ করা ও তা শোধন করে প্রকল্পটির গাছগুলোতে পানি সেচ করার ব্যবস্থা করা। এই যে ছায়ায় থাকা সবুজে ঘেরা একটা পাবলিক স্পেস এটি এতটাই সহজভাবে ঘটানো হয়েছে যে ঠিক এই কনসেপ্টকে শহরের অন্যান্য প্রান্তে প্রয়োগ করা খুবই সম্ভব।
স্টুডিও পিওডি-এর বৃহত্তর মাস্টারপ্ল্যান এবং পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ ফ্লাইওভারের নিচে পাবলিক স্পেস এবং রাস্তার বাকি অংশে আসা এই পদ্ধতিকে অব্যাহত রাখবে। অবশেষে হাইওয়ের পুরো ১১.২২ কিলোমিটার প্রসারণের পুনঃকল্পনা করবে, যা মুম্বাইয়ের মহালক্ষ্মী রেসকোর্স থেকে ধারাভি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত।
একটা অনাড়ম্বর আউটডোর পাবলিক স্পেস এতটা সুন্দর হয়ে একটা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে পরিণত হতে পারে এবং সামাজিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে, তার জ¦লন্ত উদাহরণ সেনাপতি বাপাট মার্গ ফ্লাইওভার। যেহেতু এই মডিউল আরও নানা জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব তাই সরেজমিনে জায়গাটা দেখে এসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তেই এই গবেষণালব্ধ কাজগুলো করা উচিত। স্থপতি এখানে একটা মোক্ষম প্রশ্ন করেছেন যে সত্যিই তো, যে প্রকৃতির বুকে জায়গাটা নিয়ে ফ্লাইওভারটা নির্মিত হলো সেই জায়গাটিকে যদি প্রকৃতি ফেরত পাওয়ার দাবি করে, কী হবে তখন! অন্তত কিছু তো সেখানে আমাদের ফেরত দেওয়ায় উচিত। নাহলে ডেভেলপমেন্টের নামে একদিন সর্বগ্রাসী আধুনিক সভ্যতা মানুষের চিহ্ন সরিয়ে কেবল কংক্রিটের পূজা করবে, ইতিমধ্যে সেটা করছে বললেও ভুল বলা হবে না। যেহেতু এমন কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে, ফলে সেটার যে সুফল তা সাধ্যে থাকলে আবশ্যিকভাবে নগর পরিকল্পনা ও ডিজাইনে গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৬০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০২৩।