টার্নিং ইয়ার্ডে যানজট নিরসন

বর্তমান বিশ্বে যানজট প্রকট এক সমস্যা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশই যানজটে আক্রান্ত। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন দেশ ব্যয় করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। নির্মিত হচ্ছে বহুতলবিশিষ্ট উড়ালপথ, পাতালপথ, চক্রাকার পথ, মেট্রোরেল, ট্রামওয়ে। নিয়ন্ত্রণে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বসানো হয়েছে মনুষ্য সিগন্যাল, যান্ত্রিক সিগন্যাল, আরও কত-কি! কিন্তু যানজট থেকে মুক্তি মিলছে না কিছুতেই। তবে ভয়াবহ এ যানজটে মুক্তির দূত হয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে টার্নিং ইয়ার্ড। সড়কে এই টার্নিং ইয়ার্ড পদ্ধতি যানজট নিরসনে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী ভ‚মিকা। 

যানজটের ঐতিহাসিক পটভূমি 

একসময় মানুষ যাতায়াত করত পালকিতে চড়ে। ঘোড়া, গাধা কিংবা উটের পিঠেও সওয়ার হতো। চাকা আবিষ্কারের পর সেই চাক্রিক বাহনকে টেনে নিয়ে যাওয়া হতো মানুষ কিংবা পশু দিয়ে। সভ্যতার ক্রমোন্নয়নে আবিষ্কৃত হয় ইঞ্জিন। শুরু হয় যান্ত্রিক বাহনের পথচলা। এতে মানুষের জীবন ও যোগাযোগব্যবস্থা হয় সহজতর। তৈরি হয় নতুন নতুন সড়ক-মহাসড়ক। নানা ধরনের যানবাহনের উদ্ভব ঘটে বিশ্বের নানা প্রান্তে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যানজটও। ফলে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষজনও এখন এটা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীগণ বিষয়টি টের পেয়েছিলেন প্রায় শতাব্দীকাল আগেই। ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে যখন বাষ্পচালিত রেলগাড়ির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় তখন থেকেই একটা বিষয় বিজ্ঞানীদের নজর কাড়ে। তাঁরা লক্ষ করেন, যন্ত্রচালিত একটি বাহনকে চলার সুযোগ দিতে গিয়ে অন্য একটি বাহনকে থামিয়ে রাখতে হয়। তখন থেকেই তাঁরা সচেষ্ট হন এই সমস্যাটির সমাধানে। তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘ এই সময়ে এসেছে অনেক পদ্ধতিও। কিন্তু কোন পদ্ধতি কতটা কার্যকর কিংবা আদৌ কার্যকর কি না একবিংশ শতাব্দীতে এসে সে প্রশ্ন রয়ে গেছে আজও।

যানজট সমস্যা সমাধানের জন্য সারা বিশ্বে বেশ কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পদ্ধতি হলো-  

একমুখী রাস্তা

একমুখী সড়কব্যবস্থায় সব গাড়ি একদিকে চলাচল করে। এতে শহরের কিছু কিছু সড়কে কিছুটা উপকৃত হওয়া যায়। তবে শহরের সব জায়গায় এরকম উপযুক্ত সড়ক পাওয়া যায় না, যেখানে একমুখীতে রূপান্তর করা সম্ভব। যার ফলে এই পদ্ধতিতে যানজট থেকে পুরোপুরি মুক্তি সম্ভব হয় না। 

রিং রোড বা চক্রাকার পথ

রিং রোড বা চক্রাকার পথের ওপর একসময় ভরসা রাখা হতো। এক রিং রোড থেকে অন্য রিং রোডে যাওয়ার জন্য সংযোগ সড়কের প্রয়োজন। এদের সংযোগস্থলে যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে এ ব্যবস্থাও আর আশা জাগাতে পারেনি।  

গোলচত্বর

একাধিক রাস্তার সংযোগস্থলে গোলচত্বর নির্মাণ করা যায়। এই পদ্ধতির ব্যবহার বেশ পুরোনো। গোলচত্বরকে কেন্দ্র করে সব গাড়ি চলমান থাকবে, এটি বেশ কার্যকর। তবে বিভিন্ন সড়ক থেকে আগত গাড়িগুলোকে চলমান রাখার জন্য গোলচত্বরের আকার হতে হয় অনেক বড়। বাস্তবিক পক্ষে এত বড় জায়গা জোগাড় করা অনেক ক্ষেত্রেই দুরূহ। খুব অল্প জায়গা নিয়ে তৈরি করা হয় ছোটখাটো পরিসরের গোলচত্বর। ফলে এখান থেকেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। 

উড়ালপথ ও পাতালপথ

মাটিতে থেকে যখন সমস্যার কোনো সমাধানই হচ্ছে না তখন চিন্তা করা হয় মাটির নিচ দিয়ে এবং মাটি থেকে ওপরের দিকে বিকল্প রাস্তা তৈরি করা যায় কি না। এমন চিন্তা থেকেই চলে এসেছে উড়ালপথ, পাতালপথ কিংবা সুড়ঙ্গপথ। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ইংল্যান্ডের লিভারপুলের নিকটবর্তী রেইনহিলে অবস্থিত বার্নস টানেলটি হলো পৃথিবীর প্রথম সুড়ঙ্গপথ বা পাতালপথ। এটা নির্মিত হয়েছিল ১৮২৮-২৯ খ্রিষ্টাব্দে, রেলপথের নিচ দিয়ে। এই সুড়ঙ্গপথটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল একে ট্রামলাইন হিসেবে ব্যবহার করা। যদিও পরবর্তী সময়ে ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে এই ট্রামলাইনটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়; পরে এটিকে ভেঙে ফেলা হয়। আর ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল প্রথম রেলওয়ে ফ্লাইওভার বা উড়ালপথ। এটা ছিল ইংল্যান্ডের নরউড জংশন রেলস্টেশনের কাছে। 

যানজট নিরসনে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও সফলতা

অসহনীয় যানজট থেকে রাজধানীবাসী তথা ঢাকাবাসীকে মুক্ত করার জন্য অনেক দিন ধরেই চেষ্টা চলছে। অনেক যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার পর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটা হলো আলোচ্য পদ্ধতিতে (টানিং ইয়ার্ড) পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার উত্তরা-বিমানবন্দর সড়ককে যানজট মুক্তকরণ। এর ধারাবাহিকতায় উত্তরার সবচেয়ে যানজটে নাকাল স্থান জসীমউদ্দীন মোড়কে বাছাই করা হয়। এই মোড়ের উত্তর দিকে রাজলক্ষী মার্কেটের কাছাকাছি একটি টার্নিং ইয়ার্ড তৈরি করা হয়। জসীমউদ্দীন  মোড়ের দক্ষিণ দিকে র‌্যাব-১ অফিসের পাশে আরেকটি টার্নিং ইয়ার্ড তৈরি করা হয়। এতে দেখা যায়, জসীমউদ্দীন  মোড় পুরোপুরিভাবেই যানজট থেকে মুক্ত হয়েছে। এখানে আগের মতো যানজটে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। অথচ একসময় এই জসীমউদ্দীন  মোড়ের যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে চালকেরা উত্তরার বিভিন্ন আবাসিক অঞ্চলের অলিগলি দিয়ে ঢুকে পড়ত গাড়ি নিয়ে। উদ্দেশ্য জসীমউদ্দীন  মোড়ের যানজটের ভয়াবহতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। কিন্তু লাভ হতো কমই। ব্যাপকসংখ্যক গাড়ির চাপে অলিগলিও অনেকটা প্যাকেটের মতো হয়ে যেত। গাড়ি আর নড়তে পারত না। সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা ছিল অসহনীয় রকমের ভয়াবহ। টার্নিং ইয়ার্ড নির্মাণের পর থেকে সেই দৃশ্য এখন শুধুই অতীত। এখন মানুষ গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় টেরও পায় না যে কখন সে জসীমউদ্দীন  মোড় পেরিয়েছে। কাজেই বলা যায় যে পরীক্ষামূলক চলাচল পুরোপুরি সফল হয়েছে। এখানে টার্নিং ইয়ার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছিল পরীক্ষামূলকভাবে। পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিকে কাওলা নামক স্থানে তৈরি করা হয় আরও একটি টার্নিং ইয়ার্ড। এখানেও আসে সফলতা। গাড়িগুলোর কোনোটি না থেমে যে যার মতো যেদিকে প্রয়োজন চলে যাচ্ছে। কাউকে থামতে হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না কোনো যানজটের। এই পদ্ধতি শহরের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সে জায়গাগুলোও যানজট থেকে হবে মুক্ত। সম্ভব নতুন টার্নিং ইয়ার্ডগুলোকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও গতিশীল করা।

যানজট নিরসনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ 

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রয়েছে যানজট। সেসব দেশের গবেষক ও প্রকৌশলীগণ নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যানজট সমস্যা থেকে উত্তরনে। খরচ করা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। ভূপৃষ্ঠে নির্মিত রাস্তায় চলতে গেলে যানজটের সৃষ্টি হয়। এখানে গাড়ির চাপ বেশি। তাই পৃথিবীর সামর্থ্যবান রাষ্ট্রগুলো মাটির নিচ দিয়ে বিকল্প রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নেয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকেও রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নির্মাণ করা হয় বহুতলবিশিষ্ট উড়ালপথ, পাতালপথ কিংবা সুড়ঙ্গপথ। 

এসব দেশের নির্মাণপন্থা অনুসরণ করে অন্যান্য দেশেও উড়ালপথ ও পাতালপথ তৈরির হিড়িক পড়ে। এত বিশাল স্থাপনা তৈরির যেসব দেশের সামর্থ্য নেই, তারা অন্যদের কাছ থেকে ধারদেনা এবং সুদে ঋণ নিয়েও তৈরি করে এসব অবকাঠামো। এবার বুঝি মুক্তি মিলবে যানজট থেকে! কিন্তু না; মুক্তি মেলে না। মাটির নিচে কিংবা ভূপৃষ্ঠের ওপরের দিকে তৈরি এসব রাস্তা থেকে মানুষকে একসময় ভূপৃষ্ঠে চলে আসতে হয়। আর ভূপৃষ্ঠে এলেই তৈরি হয় যানজট। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের সড়ককে যানজটমুক্ত করতে পারলেই মিলবে প্রকৃত যানজট থেকে মুক্তি। এই ধারণা থেকেই বাংলাদেশের সড়কে যানজট নিরসনে সম্প্রতি গ্রহণ করা হয় ভিন্ন পন্থা, যার প্রকৌশলগত নাম ‘টার্নিং ইয়ার্ড’। বিশ্বে^র উন্নত দেশগুলো যখন যানজট থেকে পরিত্রাণ পেতে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেস ওয়ে, পাতালপথ নির্মাণ করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চালাল সফল এক পরীক্ষা। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় এবং বড় কোনো অবকাঠামো নির্মাণ না করে শুধু সড়কের কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন করেই সম্ভব হলো যানজট নিয়ন্ত্রণ। সৃষ্টি হলো নতুন এক ইতিহাস।  

টার্নিং ইয়ার্ড কী?

টার্নিং ইয়ার্ড হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে চলমান গাড়ি গতিপথ পরিবর্তন করে বিপরীত পথে যেতে পারে নির্বিঘেœ। সড়কে নির্মিত এই টার্নিং ইয়ার্ডের মধ্য দিয়ে যখন কোনো গাড়ি ঘোরে, তখন অন্য কোনো গাড়ির চলাচল বিঘিœত হয় না। যানজট নিরসনের জন্য মূলত এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। টার্নিং ইয়ার্ডের রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রকরণ। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • এল ইয়ার্ড
  • মডারেট টার্নিং ইয়ার্ড
  • টারশিয়ারি টার্নিং ইয়ার্ড
  • ফোরথ জেনারেশন টার্নিং ইয়ার্ড
  • ফিফথ জেনারেশন টার্নিং ইয়ার্ড প্রভৃতি।

প্রতিটি প্রকরণ আবার কতগুলো উপ-বিভাগে বিভক্ত। সড়ক, গাড়ি, পারিপার্শ্বিকতা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যেখানে যে প্রকরণ উপযুক্ত, সেখানে সেটা তৈরি করা হয়। স্বাভাবিক গতিতে কাজ করলে কয়েক সপ্তাহের ভেতরই একটি টার্নিং ইয়ার্ড তৈরি করা সম্ভব।

টার্নিং ইয়ার্ড একটি বিশেষ গবেষণাতত্তে¡র ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ’-এর সেপ্টেম্বর-২০১৬ সংখ্যায় টার্নিং ইয়ার্ডের প্রথম প্রকরণ-সংক্রান্ত (এল ইয়ার্ড) একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে যানজট উদ্ভবের কারণ, প্রক্রিয়া, সমাধান, কারিগরি ব্যাখ্যার বিশদ বর্ণনা রয়েছে। 

যানজট নিরসনে যা করণীয়

কোনো মোড়ের যানজট নিরসনের জন্য প্রধানত যে কাজগুলো করা প্রয়োজন:

  • রাস্তার সংযোগস্থলে এক দিকের বিভাজককে নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে।
  • দুইটি রাস্তা যখন একটি অন্যটির সঙ্গে মিলিত হয়, তখন সেগুলো পরস্পর ন্যূনতম কোণে (প্রায় সমান্তরালভাবে) মিলিত হবে।
  • রাস্তার সংযোগস্থল থেকে কিছু দূরে (১ কিলোমিটার, আধা কিলোমিটার বা অন্য কোনো সুবিধাজনক দূরত্বে) টার্নিং ইয়ার্ড নির্মাণ করতে হবে।
  • কোনো দীর্ঘ রাস্তার মাঝে মাঝেও এই টার্নিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চিত্রে প্রদর্শিত ফিগার-১-এ প্রদর্শিত রাস্তার মোড়কে ফিগার-২-এর মতো মোড়ে রূপান্তরিত করতে হবে। 

ব্যাখ্যা

ফিগার-২-এর কথা ধরা যাক। এখানে ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর সড়ক এসে একটি মোড়ে মিলিত হয়েছে। প্রতিটি সড়ক আবার ‘অ’ ও ‘ই’ চিহ্নিত লেনে বিভক্ত। ধরা যাক একটি গাড়ি ঢ। এটা লেন ৩অ থেকে লেন ৪ই-তে যেতে চায়। এ জন্য গাড়িটি প্রথমে ৩অ থেকে ২ই লেনে প্রবেশ করবে। লেন ১অ থেকেও অন্য গাড়ি লেন ২ই-তে প্রবেশ করবে। এখানে লেন ৩অ এবং লেন ১অ থেকে আগত গাড়িগুলো পরস্পর সমান্তরালভাবে মিলিত হবে। কাজেই একটি গাড়ির গতি অন্যটির দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না। এখন ঢ গাড়িটি অন্য গাড়ির সঙ্গে ভিন্ন গতিবেগে চলতে থাকবে। এই গতিবেগ অন্য গাড়ির গতিবেগের চেয়ে কম বা বেশি হবে। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর ঢ গাড়ি ও অন্য গাড়ির মধ্যে একটা আপেক্ষিক দূরত্ব সৃষ্টি হবে। এখন ঢ গাড়িটি এই আপেক্ষিক দূরত্বের মধ্য দিয়ে চলমান অবস্থায় ক্রমেই ডান দিকে চাপতে থাকবে। ঢ গাড়িটি লেন পরিবর্তন করার সময় প্রয়োজনীয় সংকেত প্রদর্শন করবে। অতঃপর এটা টার্নিং ইয়ার্ডের মধ্য দিয়ে সড়ক ২অ-এর ডান দিকে প্রবেশ করবে। এরপর গাড়িটি আগের মতো করে ক্রমেই বাম দিকে চাপতে থাকবে। শেষে এটা ৪ই লেনে প্রবেশ করবে।

যানজট নিরসনে দ্রুততম ও টেকসই সমাধান

টার্নিং ইয়ার্ড হলো যানজট নিরসনের সবচেয়ে দ্রুততম ও টেকসই সমাধান। যানজট নিরসনে প্রচলিতভাবে যে পন্থাগুলো অবলম্বন করা হয় কিংবা যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়, সেগুলো নির্মাণ করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়; বাড়ে জনভোগান্তি। টার্নিং ইয়ার্ড তৈরিতে এসবের কোনো বালাই নেই। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একেকটি টার্নিং ইয়ার্ড তৈরি করা সম্ভব। আন্তরিকভাবে কাজ করলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ঢাকা শহরের উল্লেখযোগ্য অংশকে টার্নিং ইয়ার্ডের মাধ্যমে যানজটমুক্ত করা সম্ভব।

প্রতিটি অবকাঠামোরই নির্দিষ্ট একটা লাইফ টাইম থাকে। এরপর সেটা ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন বহনের কারণে অনেক সময় কোনো কোনো স্থাপনা আবার অল্প সময়েই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে; হারায় ব্যবহারের উপযোগ্যতা। কিন্তু টার্নিং ইয়ার্ডের ক্ষেত্রে সেরকম কিছুই নেই। এটা মূলত ভূপৃষ্ঠে নির্মিত রাস্তারই একটা অংশ। কাজেই এখানে তেমন কোনো ঝুঁকি নেই। কোনো কারণে রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে টুকটাক মেরামতের মাধ্যমে ঠিক করে নেওয়া যায়। এভাবে এটা বহু বছর পর্যন্ত টেকে। 

সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশরক্ষায় টার্নিং ইয়ার্ড

ঢাকা শহরে খোলামেলা জায়গা খুব একটা নেই। সব জায়গায় দালানকোঠা, বাড়িঘর উঠে গেছে। ফাঁকা ছিল শুধু রাজপথ। এখন সে পথের মধ্যেও কংক্রিটের বড় বড় খুঁটি বসিয়ে তার ওপরে ছাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে চাঁদ, সূর্য কিংবা খোলা আকাশ দেখার সর্বশেষ সুযোগটুকুও মানুষের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কোনো জনপদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় যে পরিমাণ গাছপালা থাকা দরকার, ঢাকা শহরে সেটা মোটেও নেই। চারদিকে শুধু গাড়ি-ঘোড়া আর ইট-পাথরের জঞ্জাল। প্রতিটা টার্নিং ইয়ার্ডে সড়কদ্বীপ হিসেবে অনেক পরিমাণ জায়গা রাখা হয়। এই সড়কদ্বীপে বিভিন্ন জাতের গাছপালা লাগানো সম্ভব। এতে পরিবেশের উন্নতি ঘটবে এবং রাস্তার সৌন্দর্য প্রাকৃতিকভাবে বাড়বে। পরিকল্পনামাফিক ফুলসহ বিভিন্ন জাতের গাছপালা লাগিয়ে সড়ককে আরও দৃষ্টিনন্দন ও প্রাণবন্ত করে তোলা যায়। এতে উন্নতি ঘটবে পরিবেশেরও।

যানজটে ক্ষতি

যানজট এক নীরব ঘাতক হিসেবে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি করে চলেছে। যেমন- 

কর্মঘণ্টা বিনষ্ট

যানজটের কারণে অতি মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিন কী পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় তা নিরূপণের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি জরিপ চালিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, ইউএনডিপি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদি সংস্থার জরিপ পর্যালোচনা করলে যানজটের আর্থিক ক্ষতি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। সব জরিপ, তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে মোটামুটি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে ঢাকা শহরে যানজটের কারণে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, তার আর্থিক মূল্য প্রায় বাংলাদেশের জিডিপির ৭ শতাংশের সমান। 

জ্বালানির অপচয়

জ্বালানি একটি মূল্যবান সম্পদ। গাড়ি চালনার জন্য সাধারণত ডিজেল, পেট্রল, অকটেন,  প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। সারা বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবছে। কারণ, উল্লেখিত জ্বালানিগুলোর মজুত ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। কিছুদিন আগ পর্যন্তও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের মিতব্যয়িতা সম্পর্কে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। অথচ শহর অঞ্চলে গাড়ি চালনায় ব্যবহৃত এসব মূল্যবান জ্বালানির বেশির ভাগই পুড়ছে যানজটের কারণে। অবশিষ্ট অংশটুকু শুধু গাড়ি চলার কাজে ব্যবহৃত হয়। যানজট না থাকলে এসব শহরে ব্যাপক মাত্রায় জ্বালানি সাশ্রয় হতো। এই সাশ্রীয় জ্বালানি দিয়ে অন্যান্য চাহিদা পূরণ করে ঘটানো যেত দেশের উন্নয়ন।

পরিবেশদূষণ 

গাড়িতে জ্বালানি দহনের ফলে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয়। এগুলো বাতাসে মিশে বাতাস তথা পরিবেশকে দূষিত করে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এগুলো আবার মানবদেহে প্রবেশ করে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বায়ুদূষণজনিত রোগে শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে প্রতিবছর লোক মারা যায় ৭ মিলিয়ন। এর প্রধান কারণ হলো যানজট। 

স্বাস্থ্যগত সমস্যা 

যানজটের কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি হয়। গাড়ি জ্যামে আটকে থাকলে ক্ষোভ, হতাশা, ব্যর্থতাসহ নানাবিধ মানসিক চাপ তৈরি হয়। এই মানসিক চাপ থেকে উচ্চ রক্তচাপ, খিটখিটে মেজাজ, হৃদ্্যন্ত্রের বিরূপ প্রতিক্রিয়াসহ নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। 

সড়ক দুর্ঘটনা 

দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকার পর গাড়ি যখন চলার সুযোগ পায় তখন যানজটে ব্যয়িত সময়কে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক সময় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো হয়। এতে বাড়ে সড়ক দুর্ঘটনা।

যানবাহনে অস্বস্তি

যানবাহনে অস্বস্তির বড় একটা কারণ হলো যানজট। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একটি গাড়ি কোনো শহরে দৈনিক ১০টি ট্রিপ দিতে পারে। যানজটের কারণে তার টিপসংখ্যা কমে হয়ে গেল ৩, ৪ বা ৫। এখন ১০ ট্রিপের যাত্রীকে ৩, ৪ বা ৫ ট্রিপে আনা-নেওয়া করতে হবে। তাহলে প্রতিটি ট্রিপেই ওই গাড়িকে স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী বহন করতে হবে। এর ফলে যানবাহনে অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করবে। 

ঘনবসতি

বর্তমানে শহরাঞ্চলে লোকজন তাদের কর্মক্ষেত্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। কারণ দূরে থেকে এলে যানজটের কারণে সে যথাসময়ে তার কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবে না। ফলে কর্মস্থলের কাছাকাছি খুব ঘিঞ্জি পরিবেশ তৈরি হয়। এখানে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, নৈতিক অবক্ষয় ঘটে, সহজেই স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি হয় এবং অন্যান্য নানা অসুবিধা সৃষ্টি হয়। যানজট দূর হয়ে গেলে মানুষ তার কর্মস্থলের একদম কাছাকাছি না থেকে বেশকিছু দূরে অবস্থান করতে পারবে এবং সে যথাসময়ে তার কর্মস্থলে উপস্থিত হতে পারবে। ফলে দূরবর্তী অঞ্চলেও নগরায়ণ গড়ে উঠবে; হ্রাস পাবে ঘনবসতিজনিত জটিলতা। 

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন 

যানজটের কারণে প্রতিটি গাড়িকে দীর্ঘসময় রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতিটি গাড়ি থেকেই তাপ নির্গত হয়। এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে বাড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে।

সম্পত্তি রক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় বিলম্ব

যেকোনো দুর্ঘটনার সময় কিংবা জরুরি মুহূর্তে যানজটের কারণে যথাসময়ে অ্যাম্বুলেন্স, মেডিকেল টিম, উদ্ধারকারী দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। ফলে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়। যানজট থেকে মুক্তিলাভ করতে পারলে এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমে আসবে। 

অমানবিকতা

যানজট যেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। অনির্ধারিত দীর্ঘসময়ের যানজটে আটকে পড়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা একান্ত প্রাকৃতিক প্রয়োজনও সম্পন্ন করতে পারে না। এ যেন মানবতার এক চরম বিপর্যয়। যানজট দূর হলে এ সমস্যার সমাধান হবে সহজেই। 

পরিশেষে

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর রয়েছে বিপুল অর্থ-বিত্ত। তারা চাইলেই গড়ে তুলতে পারে নানা ধরনের মেগা প্রজেক্ট। কিন্তু আমাদের অর্থনীতিতে রয়েছে অনেক ঘাটতি। কম ফলদায়ক কিংবা পরিত্যক্ত প্রায় কোনো প্রযুক্তির পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করা আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে অপচয় কিংবা বিলাসিতার শামিল। অল্প খরচে দ্রুততম সময়ে যেখান থেকে অধিক ফল পাওয়া যায়, সেটাকেই আমাদের বেছে নেওয়া উচিত; এক্ষেত্রে টার্নিং ইয়ার্ড হতে পারে এমন কার্যকর এক ক্ষেত্র।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৯তম সংখ্যা, মে ২০২১

প্রকৌশলী কামরুল হাসান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top