কার্বন নির্গমন কমবে বিকল্প নির্মাণ উপকরণে

আধুনিক ও নিরাপদ বসবাসে নিয়ামক ভূমিকা স্থপতি ও প্রকৌশলীদের। নিরাপদ বাসস্থানের ভৌত কাঠামো গঠন এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনায় এই দুই পক্ষের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাদের যৌথ প্রয়াসেই গড়ে ওঠে বিলাসবহুল আধুনিক জীবনমান। তবে বিলাসিতা আর আধুনিক জীবনমানের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা পরিবেশ বিপর্যয়। বিশেষজ্ঞদের দাবি, নির্মিত আধুনিক ভবন পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণ উৎপাদন ও ব্যবহারে বিপুল পরিমাণে কার্বন নির্গত হয়, যা পরিবেশদূষণকে করে ত্বরান্বিত। অথচ কতিপয় বিকল্প নির্মাণ উপকরণের ব্যবহারে সহজেই কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব উল্লেখযোগ্য হারে। 

বস্তুত, আধুনিক স্থাপনায় ব্যবহৃত ইট, রড, সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম, গ্লাস থেকে মূলত কার্বন নিঃসৃত হয়। গ্লোবাল অ্যালাইন্স ফর বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের এক গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ৩৯ শতাংশ নির্গত হয় ভবন থেকে। ভবনের বিশেষ বিশেষ সুবিধা যেমন এয়ারকন্ডিশনের ব্যবহার ও আলোকসজ্জাকে কার্বন নিঃসরণে ২৮ শতাংশ দায়ী মনে করছে সংস্থাটি। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কঠোর বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি করলে হয়তো ধসে পড়া বা ফাটল দেখা দেওয়ার মতো ক্ষতির আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় কিন্তু কার্বন নিঃসরণের ফলে ধীরে ধীরে যে ক্ষতি হয়, তা অপূরণীয়। একটি মজবুত বিল্ডিং যেমন টিকে থাকে উপকরণের স্থিতিস্থাপকতার ওপর নির্ভর করে, একইভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে কার্বন বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ। 

শিল্পকারখানায় শক্তিশালী স্থাপনা নির্মাণে অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। নির্মাণ এই উপকরণের প্রতি শিল্পমালিক, স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও আগ্রহের কমতি নেই। ২০৫০ সালের মধ্যে এই উপকরণগুলোর চাহিদা দ্বিগুণ বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অপরদিকে পরিবেশকে বাসযোগ্য করে তুলতে একই সময়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ। বর্তমানে নির্মাণশিল্পে এই উপকরণগুলো ব্যবহারে একশ্রেণির অসাধু চক্রের মদদ রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়, তা কমাতে হবে। বাস্তবে এই দুটো কাজই ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ, একই সঙ্গে প্রচুর কারিগরি জটিলতাপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সংস্থা থর্নটন টমাসেটির দুটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভবন থেকে কার্বন নিঃসরণের বিষয়টি প্রথম স্থপতি ও প্রকৌশলীদের নজরে আসে। শুরু হয় তুমুল আলোচনা, বিতর্ক। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বিল্ডিং থেকে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড অনেকাংশে দায়ী। সংস্থাটির দীর্ঘদিনের কনস্ট্রাকশন প্রকল্পভিত্তিক বিভিন্ন ভবনের ওপর চালিত গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় জানা গেছে, কোন ধরনের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন আর উপকরণের কারণে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসৃত হয়। এ বিষয়ে তারা ২০১৯ সালে একটি টুলও আবিষ্কার করেছে। এই টুলটি ব্যবহার করে স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়াররা কেমন স্ট্রাকচারে কেমন কার্বন নিঃসরণ হতে পারে তা নির্ণয় করতে পারবেন। প্রকল্প চলাকালীনও কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে এই টুলটি ব্যবহার করে। 

ভবন নির্মাণে যেভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব

নির্মিত ভবন থেকে কার্বন নিঃসরণ হলে আমরা তা খুব সহজেই বুঝতে পারি না। মূলত এ ক্ষেত্রে যেসব নির্মাণ উপকরণ থেকে কার্বন নিঃসরণ হয় সেসব উপকরণ নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কারণেই তা হয়ে থাকে। ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম ২০১৮-এর গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর বিল্ডিংস অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন রিপোর্ট অনুযায়ী, ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত স্টিল, কংক্রিট, অ্যালুমিনিয়াম আর গ্লাসের মতো উপকরণ থেকে মোট ১১ শতাংশ কার্বন নির্গত হয়। তাই ভবন নির্মাণে গবেষকদের বিকল্প উপায় খোঁজা ছাড়া বিকল্প আর কিছুই নেই। বিকল্প নির্মাণ উপকরণের মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য- 

  • গ্রিন সিমেন্ট
  • গ্রিন ব্রিকস
  • বাঁশের বিম।

গ্রিন সিমেন্ট

গ্রিন সিমেন্ট ফ্রান্সভিত্তিক একটি কোম্পানির উদ্ভাবিত নতুন পণ্য। এই সিমেন্ট ব্যবহারের ফলে বিশ্বে মোট কার্বন নিঃসরণের ৮ শতাংশ কমবে বলে কোম্পানিটির দাবি। ফ্রান্সের কেমিস্ট রিভিস ডি ইয়ন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই সিমেন্ট উদ্ভাবন করেছেন। অ্যালকালিনের উচ্চ কার্যকারিতা ব্যবহার করে এইচ-পি২-এ প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা এই সিমেন্ট উদ্ভাবন করে। সিমেন্ট উৎপাদনের একটি উপজাত ফার্নেস স্লাগ ব্যবহার করে গ্রিন সিমেন্ট উৎপাদন করা হয়।

গ্রিন ব্রিকস

কার্বন নিঃসরণ বন্ধ করতে ভবন নির্মাণের আরেকটি কার্যকরী উপকরণ হলো গ্রিন ব্রিকস। পরিবেশবান্ধব এই উপকরণটি উৎপাদনপ্রক্রিয়া সহজ, ব্যয় ও জ্বালানিসাশ্রয়ী। এই ইট বা ব্লক তৈরিতে একটি মোল্ডিং মেশিনের সাহায্যে যেখানে জমির টপ সয়েল বা ওপরের মাটির পরিবর্তে নদী খনন থেকে প্রাপ্ত মাটি এবং সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি ইটে ব্যবহৃত হয় ৯০ শতাংশ নদীর মাটি এবং ১০ শতাংশ সিমেন্ট। জমির টপ সয়েল ব্যবহার এবং আগুনে পোড়ানো হয় না বিধায় এই ইট পরিবেশ ও কৃষিবান্ধব। প্রচলিত ইটের থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যয়সাশ্রয়ীও বটে। হাউসিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) দীর্ঘদিন যাবৎ ব্লক ইট তৈরি করে আসছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে এই ব্লক ব্যবহৃতও হচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোগেও শুরু হয়েছে ইট ও ব্লক তৈরির কার্যক্রম।

বাঁশের বিম

বাঁশের তৈরি বিম ভবন নির্মাণে কংক্রিট আর সিমেন্টের বিকল্প হিসেবে খুবই পরিবেশবান্ধব। অনুচ্চ ভবনে বাঁশের তৈরি বিম নির্মাণ করলে কোনো ঝুঁকি থাকে না। তবে সনাতন বাঁশ সাধারণভাবে ব্যবহার করে বিম নির্মাণ করা যাবে না। প্রতি হেক্টর জমিতে উৎপাদিত পরিপক্ব বাঁশ প্রায় ৮০ মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমাতে পারে। একইভাবে দ্রুতবর্ধনশীল অন্য প্রজাতির কোনো চিরসবুজ জাত ৫৫ মেট্রিক টন কার্বন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। দ্রুতবর্ধনশীল বাঁশকে প্রক্রিয়াজাত করে বিম নির্মাণ করলে প্রচুর রড, সিমেন্ট ও কংক্রিটের ব্যবহার কমানো সম্ভব। 

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পাল্লা দিয়ে সুউচ্চ ভবন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নানা মাত্রিক ঝুঁকি। সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। বিশ্বব্যাপী গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণে কার্বন নিঃসরণ করে এমন উপকরণের ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। আগামী প্রজন্মের সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য স্থপতি, ডিজাইনার, উপকরণ সরবরাহকারীসহ সবাইকেই পরিবেশের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। পরিবেশ বাঁচাতে ভবন নির্মাণেও কার্বন নির্গমনের ব্যাপারে হতে হবে আরও সজাগ। পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমেই শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে কার্বন ফুট প্রিন্ট। তবেই সম্ভব পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে বৈশি^ক জলবায়ু ও উষ্ণতা স্বাভাবিক রাখা। 

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৮তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০২১

সারোয়ার আলম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top