পরমের প্রতি গভীর প্রেমে মগ্ন সুফি, সাধু, আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় নেতা আর তাঁদের অনুসারীদের প্রার্থনাসহ স্ব-স্ব প্রথা পালনের জন্য নির্মিত হয় বিশেষ ধরনের স্থাপনা। এমনই এক ধর্মীয় স্থাপনা ‘খানকা’। খানকা স্থাপনার মূল তত্ত¡, সুফি-সাধুদের মিলনস্থল, যেখানে আয়োজন করা হয় জিকির, ধ্যান, ভাবসংগীত। আবার যা হয়ে ওঠে ভাব বিনিময়ের স্থানও। কখনো কখনো সুফিগুরুরা পরিবারসহ বাসও করেন এখানে। সুফিগুরুর অনুসারীরাও চায় নিভৃতে গুরুর সান্নিধ্যে সময় কাটাতে। তাঁদের থাকার জায়গার পাশাপাশি নাওয়া-খাওয়ার সেবাটুকুও থাকতে হয় খানকায়। খানকা মাজার না হলেও যে মহান ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে খানকা গড়ে ওঠে, তিনি দেহ রাখলে তাঁর পার্থিব অবশিষ্ট শরীরটি স্থান পেয়ে যায় খানকাতেই। গতানুগতিক স্থাপত্য ধারার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আর্কিগ্রাউন্ড লিমিটেডের স্থপতি ও পার্টনার লুৎফুল্লাহিল মজিদ ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী আধুনিক এক খানকা স্থাপনা ফকিরের খানকা। দৃষ্টিনন্দন এ প্রকল্পটির আদ্যান্ত এ রচনায়।
খানকা ফার্সি শব্দ। কোনো কোনো অঞ্চলে খানকাকে ‘রিবাট’ও বলা হয়। খানকা বলতে এমন একটি ভবন বোঝায়, যেটি একদল সুফি তরিকার মানুষের জমায়েতের কথা ভেবেই কেবল নির্মিত। মূলত আধ্যাত্মিক দীক্ষা আর চারিত্রিক গুণাবলিসমৃদ্ধ বৈশিষ্ট্য অর্জনের জন্যই নির্মিত হয় খানকা। কখনো কখনো এসব খানকা হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক নেতাসহ তাদের পরিবারের আবাসস্থল। ভ্রমণে থাকা সুফি, মুরিদ কিংবা অনুসারী, তালিব তথা ইসলামের সাধক- সবার জন্যই ছায়া হলো খানকা। কোনো একজন সুফি সাধকের দরগা, মসজিদ বা মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে খানকা। আরব দেশ, তুরস্ক, ইরান, বসনিয়া কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় এমনই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এমন সব ভবনকে নানা নামে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আমাদের এ অঞ্চলে ফকিরদের এই বিশ্রামাগার ‘দরগা’ বা ‘খানকা’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম খানকা নির্মিত হয়েছিল প্রায় ৮০০ বছর আগে।
ফকিরের খানকা প্রকল্পটির ক্লায়েন্ট শামীম ওসমান সিলেটের একটি মাজারে এই ফকিরের দেখা পান; হয়ে ওঠেন তাঁর ভক্ত। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন যে ফকিরের থাকার কোনো জায়গা নেই। তাই তাঁর জন্য একটি থাকার জায়গা আর খানকা নির্মাণের কথা ভাবেন তিনি। খানকা নির্মাণের দায়িত্ব দেন আর্কিগ্রাউন্ড লিমিটেডের স্থপতি ও পার্টনার লুৎফুল্লাহিল মজিদের ওপর। জায়গা ঠিক করা হয় ময়মনসিংহের গফরগাঁও। নদীর ধারে, পুকুর ঘেঁষে মনোরম ছোট্ট এক জমিতে। প্রকল্পের স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্থপতি হাসিব মাহমুদ। প্রকল্পটির সাইট ইঞ্জিনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার নুরুল ইসলাম।
সাইটের ধরন আর ছবি দেখলে মনে হতে পারে যে জলাশয় ভরাট করে বানানো হয়েছে স্থাপনাটি। আসলে কিন্তু তা নয়! এখানে এমনই অনেক ছোট-বড় পুকুর ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। এ জন্য নদীর ধারে হলেও এই জমিতে কখনো কোনো পানি ওঠে না। কেননা ভরাট করে জমিটি তৈরি নয়। নদী সাইট থেকে বেশ দূরে। রয়েছে সাইটসংলগ্ন একটি পুকুর। সাইটের দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে পানি আর পূর্ব দিকে রাস্তা। এই জমিতে বর্ষাতেও পানি ওঠে না। অর্থাৎ ভূমি ও পানির স্তর নিয়ে নেই কোনো সমস্যা। সাইটের পূর্ব দিকে রাস্তার সঙ্গে সংযোগের অংশে অনেক জায়গা ছেড়ে রেখে পেছনের সম্পূর্ণ জায়গা ব্যবহারের চিন্তা করা হয়েছে, যেন সামনের অংশেই বাইরের সব মানুষের সঙ্গে আয়োজন ও কর্ম সম্পাদিত হয়। ফকির পরিবারের সদস্যদের সহজাত চলাফেরা যেন বজায় থাকে, সেজন্যই সচেতন এই চিন্তা।
ফকির তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে এখানে থাকবে। মারা গেলে তাঁর কবরের জন্যও একটি জায়গা রাখার প্রয়োজন এখানে। ৬১৪ বর্গমিটার জমির ওপরে ৩৬০ বর্গমিটার হচ্ছে মোট নির্মিত এলাকা। তিনটি মূল আয়োজনকে ঘিরে ভাবা হয়েছে সাইটের স্থানবিন্যাস। সেগুলো হচ্ছে-
- ফকিরের জন্য আগাম কবরের জায়গা
- পরিবারের জন্য একটি বাড়ি
- ফকির ও তাঁর অনুসারীদের মিলনস্থল।
এখানে স্পষ্টভাবেই পাওয়া যাচ্ছে একটি পাবলিক ও প্রাইভেট স্পেসের ধারণা। ফকিরকে ঘিরে সব আয়োজনই জনমানুষের বা তাঁর অনুসারীদের। কেবল ফকির পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয়তা রয়েছে একটি প্রাইভেট স্পেসের।
খানকার স্থাপনার প্ল্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে তিনটি চিন্তাপ্রসূত এলাকা সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো হলো-
- যাপন
- প্রার্থনা ও
- প্রস্থান।
একজন সাধকের জীবনের সত্য ফুটে ওঠে এই তিনটি শব্দের ভাবগাম্ভীর্যে। ‘যাপন’- এখানে জাগতিক নশ্বর জীবনের ভাব-নতুন এই গৃহ প্রবেশ এবং এখানে বেঁচে থাকাটায় এর অর্থ। ‘প্রার্থনা’ হলো একজন সাধকের জাগতিক জীবনের অন্যতম সাধনা বা খানকার মূল উদ্দেশ্যকে নাড়া দেয় এই ভাব অর্থে। আর ‘প্রস্থান’ হলো জাগতিক জীবনের ইতি। আগাম কবর এই ভাবের ইঙ্গিত। খানকা কোনো মাজার নয়। ইসলামের ডেকোরেটিভ কাঠামো না ভেবে তাই ফকিরের অনুসারীদের সঙ্গে একত্রে দেখা করার জায়গা হিসেবে স্থপতি জায়গাটিকে সামাজিক ক্রিয়াকর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছেন। যেখানে একজনের নেতৃত্বের নিচে এসে এলাকার জনমানুষ নানা ধরনের ধর্মীয় আলাপের পাশাপাশি যুক্ত হবে সামাজিক আলাপেও। ফলে আদিম গতানুগতিক ইসলামিক কাঠামোতে না গিয়ে স্থপতি এই খানকাকে সমাজেরই একটি অংশ বিবেচনা খুব দূরে ঠেলে না দিয়ে বরং সবার কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। ভবনের সাজসজ্জায় ইসলামের গৎবাঁধা স্থাপত্যের দিকে না গিয়ে বাংলায় মাটি, পানি, বাতাসকে চিনে সে অনুযায়ী একটি খানকা নির্মাণের কথাই ভেবেছেন স্থপতি। যেখানে ধর্মীয় আলাপের পাশাপাশি এলাকার নানা সমস্যায় সাংগঠনিকভাবে উদ্যোগী হয়ে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগক্ষেত্র এই খানকা।
কম খরচায় একটি প্রথাগত ‘বাংলাঘরের’ পরিকাঠামোকে চিন্তা করেই ভাবা হয়েছে খানকার ডিজাইন। আমাদের গ্রামবাংলায় উঠানভিত্তিক বাড়িগুলোকে স্মরণ করলে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। উঠান হলো ঘরের বাইরে ছাদহীন অংশটুকু, যেখানে পরিবার ও এলাকার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলনমেলার সব থেকে আনন্দদায়ক ক্ষেত্র। দোচালা ছাদও বাংলাঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই খানকায় দুই ধরনের ছাদহীন উঠান দেখা যায়। একটি ঘরের মধ্যে, ভেতরের দিকে এবং আরেকটি প্রবেশপথের দিকে, বাইরের অংশে। বাইরের অংশে এমন উঠানটি আমাদের গ্রামবাংলায় ‘বৈঠকঘর’ নামেও পরিচিত। বাড়ির বাইরেই বড় বারান্দার মতো জায়গা, যেখানে বাইরে থেকে মানুষজনের সঙ্গে বার্তালাপ সারা যায়; এতে করে ঘরের ভেতরে থাকা মানুষদের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নিতে কোনোই সমস্যা হয় না। একই সঙ্গে পথিকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দেখা-সাক্ষাৎও সমাধা হয়। ঘরের ভেতরের দিকে যে উঠানটি রয়েছে, সেটি ক্রস ভেন্টিলেশনের উৎস হিসেবে কাজ করে, যা আমাদের প্রাকৃতিক শক্তিকে ধারণ করে জীবনযাপন বাস্তবসম্মত উপায়ে সহজ করে তোলে। বাড়ির উত্তর-পশ্চিমাংশে ছোট্ট উঠান ডিজাইন করা হয়েছে রান্নাঘরসংলগ্ন সবজি বাগানের কথা ভেবে। ইটের জালি দেওয়া দেয়াল ঘরের সর্বত্রই প্রায় দৃশ্যমান, যা একাধারে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। রক্ষা করে প্রাইভেসি ও মুক্তি দেয় একঘেয়েমি থেকেও। আবার জ্যামিতিক নকশার জালি ইসলামের আবেশেও মৃদু করে স্পর্শ করে যায়। আঞ্চলিক জীবনাচারের কথা মাথায় রেখেই শৌচাগারগুলোও শোবার ঘর থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
গোটা প্রকল্পে একটি মনোলিথিক বা এক ছন্দের ভাব রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ জন্য একটিমাত্র ম্যাটেরিয়ালে ইটের দেয়াল, মেঝে ও ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ম্যাটেরিয়াল এবং নির্মাণশিল্পী এই দুইটি প্রধান বিষয়ে আঞ্চলিকভাবে উপলব্ধ সামগ্রী এবং নির্মাণকর্মীদের ওপরেই নির্ভর করা হয়েছে। সমস্ত ঘর এবং প্রার্থনার জায়গায় ছাদে মেটাল ফ্রেমের ওপরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিট ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ভেতরের উঠানের চারপাশের করিডরের ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে রেইনফোর্সড ইট। দোচালা ছাদে মেটাল ফ্রেম, নারিকেলের ছোবড়া এবং ফেরো সিমেন্ট ব্যবহার করে একটি পরীক্ষামূলক কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। চলাচলের জায়গায় ইটের মেঝে বানানো হয়েছে এবং ঘরের অন্যান্য অংশে দেওয়া হয়েছে এনসিএফ-এর মেঝে। পরিবেশবান্ধব ও আঞ্চলিকতাকে উৎসাহ দিয়ে করা এই ডিজাইনটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
স্থপতিরা সচরাচর অন্দরসজ্জা করেন না। কিন্তু এই প্রকল্পের অন্দরসজ্জা স্থপতি করেছেন অত্যন্ত যত্ন সহকারে। যখন একজন স্থপতি তাঁর স্থাপনার অন্দরসজ্জা করেন, তখন দেখা যায় তিনি ঘরের বাইরের অংশ ও ভেতরের অংশে সমান গুরুত্ব দেন। এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ঘরের ভেতরেও রয়েছে এক্সপোজড ইটের দেয়াল এবং খুব কম ফার্নিচার। মেটাল ফ্রেম ও মেহগনি কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা ও আসবাবগুলো এখানে হয়ে ওঠে জীবন্ত। স্থপতি অন্দরকে সচেতনভাবেই সামান্যে সাজিয়েছেন যেন সে তার পারিপার্শ্বিক র্শিক আবহের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারে। ইটের জালির দেয়াল এবং এই আসবাব দেখলে সত্যি সত্যি হৃদয়ের কপটতা খুঁজে পেতে চায় মুক্তির স্বাদ। বেশ কয়েক ধরনের বসার জায়গা দেখা যায় ঘরের মধ্যে। স্থাপনার ঢেউ খেলানো জানালার বা আর্চের উপরিভাগ এবং দুই জানালার স্প্যানের মধ্যে আছে কাঠের ইসলামিক প্যাটার্নের কারুকাজ। বাংলোবাড়ির আবেশের মাঝে মাঝে ইটের জালির দেয়াল, কারুকার্যময় কাঠের প্যানেল এই বিষয়গুলো ইসলামিক স্থাপনার ভাবটিকে নাড়া দেয় ভীষণভাবে। এখানে যত গাছ রয়েছে, সবই সংগ্রহ করা হয়েছে অত্র এলাকার রাস্তার ধার থেকে। প্রকল্পের ল্যান্ডস্কেপও ডিজাইন করেছেন স্থপতি নিজেই।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০২১