সুন্দর একটি উদ্যোগের সঙ্গে স্থাপত্য কীভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেতে পারে, ঠিক সে গল্পটিই বলে ‘স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন’। সচরাচর কোনো একটি প্রকল্পের শুরুর মুহূর্তেই আবির্ভাব হয় স্থপতির। চিরাচরিত এই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন। একটি উদ্যোগ শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেখানে স্থাপত্য কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব আমরা।
প্রারম্ভিকা
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার একটি গ্রাম ঢেরাপাড়া। কয়েক দশক আগে এখানে ছিল একটি চা-বাগান। এখানে যাঁরা কাজ ও বাস করতেন, তাঁদের বলা হতো ‘ঢের’। ইতিহাসে এই ঢের সম্প্রদায়ের জায়গা হয়েছে নিম্ন্নবর্ণের অচ্ছুত এক জাত হিসেবে। আশাহীন টিমটিমে এক জীবন, অপর্যাপ্ত সুবিধাদি, অপুষ্টি, শিক্ষার অভাব, রোগব্যাধি, আঞ্চলিক ক্ষমতাধরদের চাপ, সাংস্কৃতিক-মানসিক হীনকরণ আর অসীম দারিদ্র্যে এই সম্প্রদায় বছরের পর বছর ধরে ভুগছিল। এই ভোগান্তির গল্প কিন্তু শত বছরের। বীরভূম আর বাঁকুড়া থেকে লোকজন এসে সে সময় চা-বাগানে কাজ করে বদলাতে চেয়েছিল নিজেদের ভাগ্য। এখন চা-বাগান আর নেই। কিন্তু দিনমজুর হিসেবে কাজ করেও নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের সেই ভাগ্য আজও তাঁরা পরিবর্তন করতে পারেননি। বরং শিক্ষার অভাব আর দারিদ্র্য তাঁদের সমাজ থেকে দিনকে দিন দূরে ঠেলে দিচ্ছিল।
২০০৪ সালে পাশর্^বর্তী এলাকার রফিক, ওয়াসিম ও ধ্রুব এই তিনজন নিজ উদ্যোগে এই সম্প্রদায়ের জন্য অত্র এলাকায় চালু করেন একটি স্কুল, যেন অদূরভবিষ্যতে সুন্দর এক ছাপ ফেলা যায়। ঢের সম্প্রদায়ের দুর্ভাগা দিনগুলোর যেন অবসান ঘটে। গ্রামবাসীরও এই পরিকল্পনায় একীভূত করলে তাঁরাই স্কুলের জন্য একটি পুরোনো চা-বাগানের ফ্যাক্টরির এক টুকরো জমি জোগাড় করে দেন। তাঁদের দীনতার পরও নিজেরাই স্কুলের জন্য বাঁশ, কাঠ, ছন এবং অন্যান্য উপকরণ পাশের জঙ্গল থেকে আনেন। এই অধিবাসীরা যে তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কতটা মরিয়া, তা এই স্কুলের কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই টের পাওয়া যায়। স্কুলের এই সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এলাকাবাসীর অংশগ্রহণ এখানে খুবই সরব। স্কুলটি তাঁদের ওপর কিংবা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ব্যাপারটি এমন কখনোই ছিল না। স্কুলটি তাঁদের নিজেদেরই অস্তিত্বের একটি অংশে পরিণত হয়েছে, সেই শুরু থেকেই। এরপর ২০০৬ সাল থেকে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের সহায়তায় এই কমিউনিটি স্কুলটি চালু হয়। দুই বছরের মধ্যে প্রথাগতহীন স্কুলটি অর্থাভাবে ও অন্যান্য জটিলটায় বন্ধ হয়ে যায়, যদিও স্কুলের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একে পুনরায় চালু করার বারুদটা থেকেই গিয়েছিল। অপেক্ষা ছিল শুধু সঠিক সময়ের।
স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন
২০০৯ সালের শুরুর দিকে আরেকটু বড় দল নিয়ে সমমনারা আগের চেয়েও গাঠনিক প্রক্রিয়ায় স্কুলের কার্যক্রম শুরু করে। সুজা, ইশতিয়াক, নীলয়, নাসিমা ও মাশকুরা এই স্কুলের সংস্পর্শে আসেন। নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আগের চেয়েও কয়েক গুণ জোরালোভাবে তাঁরা মেতে ওঠেন স্কুলের কাজে। একেবারেই নিজেদের কাঁধে এই মহান দায়িত্ব তাঁরা তুলে নেন আর এই সময়টাতেই স্কুলের নামকরণ করা হয় ‘স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন’। এ নেহাতই এক স্বপ্ন বটে, প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন! এই কয়েকজন মানুষ নিজেদের সামাজিক জীবনের তথাকথিত উন্নতি সাধন বা ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে না লেগে এ কোন স্বপ্ন পূরণে ছুটে চলছিল তা সত্যিই ভাবার বিষয়! সমষ্টিগত আর্থিক সহায়তার মধ্য দিয়ে চলতে থাকল স্বপ্ননগর। শিক্ষার্থীদের বাবা-মা এবং পাস করে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অর্থ সাহায্যে স্কুলটি চলতে থাকল। তা ছাড়া ব্যক্তিবিশেষে এমন একটি উদ্যোগকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও নিয়মিত সাহায্য অনেকেই করে থাকেন। এখন শুধু এই এক গ্রামের নয়, আশপাশের গ্রাম থেকেও ছেলেমেয়েরা এই স্কুলে পড়তে আসে। অচ্ছুত এ গল্পের অবসান একটা স্কুল করিয়ে দিতে পারে, সেটা আমরা বুঝতে পারছি। এখন সব ধর্মের ছেলেমেয়েরাই এখানে একসঙ্গে পড়ালেখা করছে। একটা স্কুলবিহীন সম্প্রদায় থেকে শুরু করে শিক্ষার কেন্দ্রে থাকা একটা গ্রাম হয়ে উঠল ঢেরপাড়া।
নিজেদের পরিচয় তৈরি
নিরাপদ পানির সুবিধা নেই, নেই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, ভূমিহীন জাতি-গোষ্ঠী, উচ্ছেদের আতংক, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একই বর্ণের বাঙালি হিন্দুরাও যাঁদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে যেতে নারাজ, যেহেতু তাঁদের আদিবাস এ দেশ নয়। অর্থাৎ সবকিছুই যখন তাঁদের বিরুদ্ধে, তখন তাঁরা প্রকৃতিকেই তাঁদের একমাত্র সহযাত্রী করে নিয়েছিলেন। বন্য হাতির অত্যাচার যেমন সহ্য করতে হয়, তেমনি বন্য প্রাণীদের পোষ মানিয়ে, কাঠ কেটেই তাঁরা আজ অবধি টিকে আছেন সরবে। শতবর্ষের এই সাংস্কৃতিক বলয় ভেঙে এখানে শিক্ষার আলো আনা কি এতই সোজা ছিল, প্রশ্ন জাগে মনে! স্কুলের সঙ্গে যাঁরা আছেন, তাঁদের আনন্দ দেখে যে কেউই উৎসাহ পাবেন। এই শিশুরা, তাদের বাবা-মায়েরা সবার যে আনন্দ, সে পরশ আপনি পাবেনই। স্কুলের আধিপত্য, শিক্ষকদের আধিপত্য, জ্ঞানের আধিপত্য এসব কোনো কিছুর বালাই নেই স্বপ্ননগরে। স্কুলের শিক্ষার্থীরাই এখানকার মূল হর্তাকর্তা। প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তাদের যে পড়াশোনা, খেলা, বাগান চর্চা, খাদ্যাভ্যাস আর সৃজনশীল দিকগুলোকে উন্মোচন করা হয়েছে, তাতে ঠিক সম্মানার্থে ডাকা নয় যে নাম ‘ঢের’ তা এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে।
স্কুল ভবন নির্মাণ
ইতিমধ্যেই নিদারুণ এক অর্গানিক স্থাপনা পদ্ধতি চলছে এই স্কুলের জন্মলগ্ন থেকে। এর আগে একটা টিনশেডের ছোট ঘরে ক্লাস হতো, যে ভবনটি এখনো ব্যবহৃত হয়। নতুন ভবনে আসার আগেও এই টিনশেডের ভবনটি কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠতে থাকে। প্রথমে খোলা আকাশের নিচে শুরু স্কুলের ক্লাস। এরপর একচালা একটা দেয়ালবিহীন উঁচু পাটাতনে বসে ঘর থেকে শুরু করে একটা পর্যায়ে এসে এর চারপাশে দেয়াল তৈরি করা, খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করা এবং সোলার প্যানেল বসানো ইত্যাদি নানা উদ্যোগ কিন্তু সেই পুরোনো ভবনে নেওয়া হয়। রাস্তা থেকে স্কুলের শক্ত জমিতে আসতে প্রায় ৪০০ গজের মতো রাস্তা পাড়ি দিতে হতো, যেটা বেশির ভাগ সময়েই পূর্ণ থাকত কাদায়। সেটা গ্রামবাসী মিলে বিনা পয়সায় চা-বাগানের ফ্যাক্টরির ধ্বংসস্তূপের ইটসহ অন্যান্য উপকরণসহ গড়ে তুলেছেন। প্রতি পরিবার বাঁশ বা ছন দেবে এমন চুক্তিতে স্কুলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সে প্রায় এক যুগ আগের কথা। আজ অবধি স্কুলের কাজ যতবারই হয়েছে, তা প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুদের বাবা-মায়েরা মিলেই করেছেন। ফলে তাঁরা স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের দিয়ে আসেননি বরং গোটা স্কুলটা বানিয়ে তবে সেখানে বাচ্চাদের দিয়ে এসেছেন। এই এলাকায় মাটির বাড়ি হয় না কারণ ঘরামি নেই। তা ছাড়া ইটের অনেক ভাটা থাকায় মাটির দাম পড়ে বেশি। সব শিক্ষক এসব ইটের ভাটা থেকে ইটের চাঁদা নিতেন। প্রথম প্রথম ইটভাটার লোকেরা এতে খুব অবাক হলেও এখন তাঁরা স্কুলের মর্মার্থ টের পেয়েছেন। এখনো পর্যন্ত ১৫ হাজার ইটের যে চাহিদা, তার একটিও কিন্তু কেনা নয়।
পরিকল্পনা স্থাপনার সংযোগ
এখন যদি এখানে স্কুলের কার্যপদ্ধতিকে আরও সরব করার চেষ্টা করা যায় সেক্ষেত্রে স্থাপনা কেমন হতে পারে? এই স্কুলের পরবর্তী স্থাপনাসংক্রান্ত সব বিষয়ে কাজ করছেন স্থপতি অনিকেত চৌধুরী, যিনি এখন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্যও বটে। পাশাপাশি তিনি ‘সিলভার ব্রিকস’ নামক স্থাপত্য ফার্মের অন্যতম কর্ণধার। প্রাণের টান ছাড়া এই স্কুলে কোনো কাজ করা হয়তো সম্ভব নয়। যেহেতু চা-বাগানের পুরোনো ফ্যাক্টরির ধ্বংসাবশেষে স্কুলটি দাঁড়িয়ে আছে, তাই একটি ভাঙাচোরা মোটা ইটের লম্বাটে দেয়াল আর পুরোনো ফ্যাক্টরির ভাঙাচোরা মেঝেতে স্কুল সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। একপাশে পুরোনো ফ্যাক্টরির দেয়াল আর অন্য পাশে পুরোনো স্কুলঘরের মাঝখানে রয়েছে নতুন ভবন। এই ভবনের সামনে স্কুলের নিজস্ব খোলা প্রান্তর। আশপাশের স্থাপনার কারণে এই নিজস্ব উঠানটুকু তৈরি। এই খোয়াভরা উঠানের ওপর দেড় ফুট পুরু মাটি ভরাট করা হয়েছে যেন সবুজ ঘাস ও গাছপালা জন্মায় আর ছেলেমেয়েদের জন্য ব্যবহারের উপযোগী হয়। এই সবুজ উঠানের দুই পাশে গ্রামীণ গোলাকার টয়লেটের নানা ব্লক বসিয়ে তাতে রোপণ করা হয়েছে সবুজ বৃক্ষ।
নতুন ভবনের সামনে রয়েছে একটা সেমি আউটডোর শান বাঁধানো ছোট শেডেড বা ছাউনির মতো একটি অংশ। সবুজ উঠান থেকে বেশ খানিকটাই ওপরে একটা পাটাতনের সৃষ্টি হয় বলে এখানে করা হয়েছে স্কুলের নানা আয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দরকারমতো অর্থের জোগানে নির্মাণকাজ এগোতে থাকে। এখনো যেমন ভবনের এক প্রান্তে টয়লেট ব্লকের কাজ চলছে। স্কুলের এক প্রান্তের ফ্যাক্টরির পুরোনো মোটা দেয়ালটি খসে পড়তে পারে বলে ভবন নির্মাণের সময় বাড়তি থাকা কিছু ইট দিয়ে সেই দেয়াল সংরক্ষণের কাজ করা হচ্ছে, যেন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি এই ফ্যাক্টরির সঙ্গে শতবর্ষের তাঁদের সংগ্রামের যে স্মৃতি, তাকেও যেন ধরে রাখা যায়। এই দেয়ালজুড়ে সবুজ লতানো গাছের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সবুজ উঠান থেকে সবুজ দেয়ালের এই চিত্র নিঃসন্দেহে সবুজ মনের পরিচয়ের জানান দেয়। এই দেয়ালটা যেহেতু উঁচু, তাই এর একটা লম্বাটে ছায়া হয় বলে এর সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের বসার জায়গার কথা ভাবা হয়েছে।
স্কুল সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় নতুন ভবনের ডিজাইনেরও ছিল নানা ধাপ। প্রথম পর্যায়ে উঠান মঞ্চের ধারণা ছিল না। তখন প্রাধান্য ছিল মূলত তিনটা বিষয়ে। এক. এই গ্রামে যেহেতু বিদ্যুৎ আসার কোনো সম্ভাবনা নেই, ফলে স্কুলের আলো-বাতাস নিশ্চিত করা ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বৈধভাবে এই গ্রামে বিদ্যুৎ আসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না; এখনো নেই। পল্লীবিদ্যুতের নিয়মানুযায়ী ভাড়া বাসা কিংবা নিজ জমিতে বাড়ি বানিয়ে যাঁরা আছেন, এমন কাউকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় না। কিন্তু এই ভূমিহীন চা-শ্রমিকদের এই দুটির কোনোটিরই সামাজিক মর্যাদা নেই। ঠিকানাহীন মানুষকে বিদ্যুতের মিটার দেওয়ার নিয়ম পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নেই। এই গ্রামে বৈদ্যুতিক খুঁটি অনেক আগে এলেও বিদ্যুতের সংযোগ পাননি গ্রামবাসী। পরে স্কুলের জন্যই স্কুলের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্বেচ্ছাসেবকেরা নিজেদের গরজে বহু চেষ্টা করে এলাকার চেয়ারম্যানের সাহায্যে বিদ্যুতের সংযোগের জন্য লেগে পড়েন। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান নিজে এই এলাকাবাসীর হয়ে পল্লীবিদ্যুতের কাছে গ্যারান্টার হন। তখন এই স্কুল ও গ্রামের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইনটি নেওয়া সম্ভব হয়। একটি স্কুল কীভাবে সমাজের এই স্তরগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে জীবনের মানোন্নয়ন ঘটিয়ে ফেলল, ভাবতেই দারুণ লাগে!
স্থপতি দিনের বেলার আলো-বাতাস মেকানিক্যালি যেহেতু নিশ্চিত করা যাবে না, তাই ডিজাইনে এই ব্যাপারটি মূল প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়। ভবনের সেকশনে দেখা যায় ছাদের আকার ও অবস্থানের কারণে ঘরের ভেতর অবধি আলো আসার সুযোগ থাকে। ছাদে হুয়ার্লি বার্ড সংযুক্ত করার কারণে ঘরের ভেতরের গরম বাতাস ওপরে ছাদ দিয়ে চলে যেতে পারে বলে ভেতরে নেগেটিভ প্রেসারে ঠান্ডা বাতাস আসতে পারে। তখন ভেতরের আবহাওয়া থাকে কর্মোপযোগী ও পাঠোপযোগী। ইংরেজি হরফ ঠ আকৃতির স্লোপের এই চালটা যেমন ইনভাইটিং বা আমন্ত্রণ জানায়, তেমনি সোলার প্যানেল ধরে রাখার জন্যও খুব কার্যকর।
এই সুবিধার কারণে স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে। ফলে এই সময়ে বাচ্চারা বাড়িতে বসে পড়াশোনা করলে যে কেরোসিন পুড়ত, সে খরচটা সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি সহজ হয়েছে এই ঠ আকারের ছাদের ভাঁজে বৃষ্টির পানি ধারণের জায়গাটি নিশ্চিত করাও। এই ধারণপাত্রকে স্কুলঘরের বাইরের দিকটাতে রাখা হয়েছে যেন কখনো কোনো দুর্ঘটনায় পানি ঘরের ভেতরের আয়োজনে বাধা দিতে না পারে। গেত বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় এই ধারণকৃত পানি দিয়ে স্কুলের কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়েছে। দোতলার শেষাংশে আরেকটা বৃষ্টির পানি ধারণের জায়গা আছে। সামনের অংশের পানি দিয়ে সামনের সবুজ বাগানে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয় আর শেষের অংশের পানি টয়লেটে ব্যবহারের চিন্তা করা হয়। বিয়েবাড়িতে ব্যবহার করে এমন জেনারেটর দিয়ে এই নির্মাণকাজ সমাধা করা হয়েছে। দিনপ্রতি ৫ হাজার টাকা ভাড়ার কারণে কম খরচে নির্মাণ করতে নির্মাণসামগ্রী আগেই শহর থেকে বানিয়ে এনে স্কুল প্রাঙ্গণে দুই দিনে ভবনের একাংশ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিছুদিন পরে একই পদ্ধতিতে আরও দুই দিনেই কিন্তু ভবন নির্মাণপ্রক্রিয়া শেষ হয়। স্কুলের পুরোনো ভবনের সঙ্গে নতুন ভবনের সংযোগের জন্য সফট পেভ করা হয়েছে, কেননা সহজেই কাদা হয়ে যেত আগে তখন ছেলেমেয়েদের খুব কষ্ট হতো।
স্কুলের ভেতরে ওপেন ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, শিক্ষকদের কাজের জায়গা এমন আয়োজনগুলো রাখা হয়েছে। স্কুলের ডিজাইন অনুযায়ী একটা বাজেট ঠিক করার পর স্থপতি নিজেই ফান্ডিংয়ের জন্য এগিয়ে এসেছেন। স্থপতি তাঁর নিজের ক্লায়েন্টদের কাছে বা যাঁদের কাজ বিনা পারিশ্রমিকে করে দিতে হয়, তাঁদের অনুরোধ করতেন, যেন তাঁরা স্বপ্ননগরের নির্মাণ তহবিলে অর্থ সহযোগিতা করেন। স্থপতি তাঁর নিজের প্রকল্পের জন্যই এই উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন এমন উদাহরণ বিরল। কিন্তু স্বপ্ননগর বস্তুত এক প্রেমকাহিনি। এখানে এমন চমৎকার সব ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। স্বপ্ননগরের এই নতুন ভবনের অভ্যন্তরীণ আয়োজনগুলো কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে; বদলে নিচ্ছে নিজেদেরও। তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে স্থপতি একাই ডিজাইনের সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। স্থপতির শুরু থেকেই এটা একটা সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল যে স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এই ডিজাইন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, যেহেতু তারাই এর মূল ব্যবহারকারী।
শেষের কথা, সুখের কথা
স্কুলের যে আনন্দজনক পরিস্থিতি, তাকে স্বল্প কথায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে শিক্ষক যখন বন্ধু হন, স্কুলে যখন অবাধ স্বাধীনতা, যেখানে হালকা-পাতলা স্কুল ফার্নিচার মাথায় তুলে স্কুল চত্বরের যেখানে ইচ্ছে ক্লাস করা যায়, যেখানে স্কুল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাগানে ফুলগাছের যত্ন নেওয়া হয়, সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের জন্য যেখানে সৃষ্টিশীলতায় শিশুরা মুখর, গোটা স্কুল প্রাঙ্গণ যখন তাদের নখদর্পণে, তখন নিশ্চয় বলতে হবে স্থাপত্যের যে মমত্ব, যা বেশির ভাগ ভবনেই আমরা পাই না, তাকে যেন সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। স্থাপত্য তখন এক বৃক্ষের মতো, বিশাল ছায়াঢাকা গাছতলায় শিশুদের পাঠশালার মতো।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।