ড. জুবায়ের-আল-মাহমুদ
সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড চেয়ারম্যান
ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রোফরেস্ট্র্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স
ফ্যাকাল্টি অব অ্যাগ্রিকালচার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা
তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় প্রধান নিয়ামক এ দেশের কৃষি। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ। দ্রুত নগরায়ণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই কৃষিজমি নেমেছে ১০ শতাংশে। তারপরও বাংলাদেশ ফসল উৎপাদন, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনে শীর্ষে। করোনা সংক্রমণে সারা দেশ যখন স্থবির, তখনো সচল আছে কৃষির চাকা। দুঃসময়ে কৃষিই সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। শুধু করোনার সংকটে নয়, বিগত ৫০ বছরে ঝড়, জলোচ্ছ্ব্াস, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলে কৃষি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অপ্রচলিত নানা কৃষিপণ্যে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। প্রযুক্তির ছোঁয়া পেয়েছে কৃষি। বদলে যাওয়া এই সময়ের কৃষিতে যুক্ত হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণেরাও।
বর্তমান সময়ের কৃষির হালচাল ‘বন্ধন’কে জানিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. জুবায়ের-আল-মাহমুদ।
তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে, ২০১১ সালে কৃষি বনায়ন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৪ সালে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করতে জাপান যান। এ সময় কাগওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন তিনি। ২০১৭ সালে জাপানের এহেমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর ৫০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
বন্ধন: বাংলাদেশ কৃষিপণ্য (ফল, ফুল, সবজি ইত্যাদি) উৎপাদনে কতটা অগ্রসর হলো?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য অভাবনীয়; ঈর্ষা করার মতো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। তা সত্ত্বেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দৃষ্টান্ত। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বিভিন্ন দুর্যোগসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে শীর্ষে বাংলাদেশ। কিছু উদাহরণ দিলে বাংলাদেশের কৃষির সার্বিক চিত্র উঠে আসবে। যেমন: চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম।
১৯৮৩ সালে যশোরে শুরু হয় ফুলের চাষ। এখন প্রায় ২৪ জেলার ৫ হাজার ৬৬৫ একর জমিতে ফুল চাষ হয়। প্রায় দেড় লাখ মানুষ ফুল চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের ব্যবহারও বেড়েছে অনেক। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য অভাবনীয়। যুদ্ধের পর একটা সময় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। কিন্তু আমরা এখন ফুড সিকিউরিটি (খাদ্যনিরাপত্তা) অর্জন করেছি। এখন আমাদের নিউট্রিউশনাল ফুড সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করতে হবে।
বন্ধন: গ্রামের পাশাপাশি নগরেও গড়ে উঠছে ছাদকৃষির মতো বাগানব্যবস্থা। নগর কৃষির আরও কী কী সুযোগ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: ছাদকৃষির বাইরেও নগরে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। কমিউনিটি প্ল্যানটেশন করা যেতে পারে। পার্কে ও খোলা জায়গায় গাছ লাগানো যেতে পারে। সড়কের দুই পাশ ও ডিভাইডারের পাশাপাশি বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনে আমরা গাছ লাগাতে পারি।
বন্ধন: নগরের অনেকেই ছাদবাগান করছেন কিন্তু পাচ্ছেন না কাক্সিক্ষত সাফল্য, কেন?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: এর অনেক কারণ আছে। আমরা যারা ছাদবাগান করছি, তাদের কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। শখের বসে অনেকেই টবে এসে গাছ লাগাচ্ছেন। কোথায় কী ধরনের গাছ লাগানো দরকার, কীভাবে গাছের পরিচর্যা করা যায়, সেই জ্ঞানটাও সবার নেই। যার ফলে ছাদবাগান থেকে সফলতা আসছে না। মাঠকৃষি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হলেও ছাদবাগান নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা অপ্রতুল। যেহেতু গবেষণা হয় না সেহেতু ছাদ কৃষিতে কী কী সমস্যা হয়, সেটা সমাধানের উপায় কী, সেটা আসলে জানা যাচ্ছে না।
বন্ধন: আদর্শ ছাদবাগান আসলে কেমন হওয়া উচিত? এ ধরনের কোনো মডেল আছে কি? কী ধরনের চাষপদ্ধতি ছাদবাগানের উপযোগী?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল বোটানি ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহ্বুব ইসলাম ছাদকৃষি নিয়ে একটি মডেল ডেভেলপ করেছে। সেটার প্রসপেক্টাস ও ম্যানুয়াল করা হয়েছে। আমরা বর্তমানে একটা প্রজেক্ট পরিচালনা করছি। সেখানে আমরা ছাদের ক্ষতি না করে কীভাবে ছাদকৃষি করা যায় ও গাছে দেওয়া পানিকে রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছি। ফলে পানি দ্বারা ছাদ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সমস্যাটির সমাধান বেরিয়ে আসবে।
বন্ধন: আদর্শ ছাদবাগান সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ আপনারা প্রদান করেন কি? কীভাবে নগরবাসী এ ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: ছাদকৃষি চাষাবাদের ম্যানুয়াল তো রয়েছেই। এটা যে কেউ চাইলে সংগ্রহ করতে পারে। এ ছাড়া ছাদবাগান নিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগ ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আরবান ফরেস্টির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের একটা সোসাইটি আছে। সেখানে যারা মেম্বার, তাদের এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সরকার থেকে ছাদকৃষি সম্পর্কিত কোনো প্রজেক্ট পেলে সেখানে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে পত্রিকায় সার্কুলেশন দিয়ে ৩০-৪০ জনের একটা গ্রুপ করে এ ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া বেসরকারিভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিছু ফেসবুক গ্রুপও রয়েছে, যারা বেশ সক্রিয়।
বন্ধন: দেশে প্রচুর বিদেশি ফল, ফুল, সবজির চাষ হচ্ছে। এগুলো দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের জন্য কতটা উপযোগী। ক্ষতিকর কোনো দিক আছে কি?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: আমাদের দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে যেগুলো খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, সেগুলোই টিকে থাকতে পারছে। ফলের মধ্যে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, সবজির মধ্যে ব্রকলি, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি চাষ হচ্ছে প্রচুর। এগুলো চাষ হলে আমাদের পরিবেশের বা ফসলের কোনো ধরনের সমস্যা নেই। তবে দেশি ফসলের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। আমাদের ফল, সবজি যেন হারিয়ে না যায়, সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আরেকটা বিষয় আছে সেটা হলো: যেসব ফল, সবজির বীজ, চারা বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে নতুন করে কোনো পোকামাকড় বাংলাদেশে যেন না আসে। কিংবা অপ্রয়োজনে যেন কেনো কিছু না আনা হয়। জার্মানি থেকে একসময় কচুরিপানা আনা হয়েছিল অ্যাসথেটিক উদ্দেশ্যে। সেই কচুরিপানায় এখন কিন্তু আমাদের নদী, পুকুর সয়লাব। এটা এখন পানির আগাছা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বন্ধন: দেশের পার্বত্য অঞ্চলে হলুদ, কলা, আনারস, পেঁপে চাষের পাশাপাশি বাদামজাতীয় ফলের চাষ শুরু হয়েছে, আরও কী কী ফল–ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে সেখানে?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: পাহাড়ে আম্রপালি আমের চাষ হচ্ছে প্রচুর। তার মানে পাহাড়ে আম চাষের সম্ভাবনা আছে। অন্য জাতের আম যেমন, ফজলি, গোপালভোগ, হিমসাগর প্রভৃতি জাত সেখানে আমরা নিয়ে যেতে পারি। এ ছাড়া লটকন চাষও করা যেতে পারে। কমলা, মালটার নতুন নতুন জাত; কাঁঠাল, বেল, কতবেল, জলপাই, জামরুল, সফেদা, শরিফা এই ফলগুলোকেও আমরা পাহাড়ে চাষ করতে পারি। এ ছাড়া একটা মিরাকল ট্রি আছে, সেটা হলো শজনে। ১২ মাসি শজনের চাষও আমরা পাহাড়ে করতে পারি। তবে পাহাড়কে কম ক্ষতিগ্রস্ত করে আমাদের এই চাষাবাদ করতে হবে। এমন কিছু সেখানে চাষাবাদ করা যাবে না, যার জন্য মাটিকে বেশি কর্ষণ করতে হয়। তাহলে সেখানে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকবে।
বন্ধন: কৃষিসংক্রান্ত কী কী বিষয় নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তথা ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স–এ গবেষণা হচ্ছে?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: নতুন জাত উদ্ভাবন মূলত ফলন বাড়ানো ও দুর্যোগসহিষ্ণু করার জন্য করে থাকি। এই ধরনের জাত উদ্ভাবনে এখন কাজ চলছে। আমাদের বর্তমান ভিসি ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া সরিষার নতুন কয়েটি জাত উদ্ভাবন করেছেন। আমাদের অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট ক্লাইমেন্ট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচারাল নিয়ে কাজ করছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্ব এখন নাজুক অবস্থায় আছে। এই সময়ে ক্লাইমেন্ট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচারাল বা কৃষি বনায়নে উন্নত বিশ্ব নজর দিচ্ছে। এটা নিয়েও আমাদের গবেষণা চলছে। পাশাপাশি দেশের কৃষির উন্নয়নে আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগও বিভিন্ন গবেষণা চলমান রেখেছে।
বন্ধন: আপনাদের গবেষণা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কোনো কার্যক্রম রয়েছে কি না সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: গবেষণাগুলো বিভিন্ন ম্যানুয়ালের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে। জার্নালে প্রকাশিত সম্ভামনাময় টেকনোলজির যাচাই-বাছাই এবং ট্রায়ালপূর্বক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা বিভিন্ন এনজিও তা কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেয়।
বন্ধন: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হচ্ছে কি? না হলে সীমাবদ্ধতা আসলে কোথায়, বিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: কৃষি নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হচ্ছে না। জাতীয় বাজেটে কৃষি ও শিক্ষার বাজেট কম। বাজেট কম থাকলে স্বাভাবিকভাবেই গবেষণায় বরাদ্দ থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, ৫০ লাখ টাকার একটা গবেষণা হলে সেটার একটা ভালো আউটপুট থাকবে। আর একই টাকায় ৫০টা গবেষণা হলে সেটার আউটপুট নিশ্চয়ই ভালো হবে না। সরকারের বিভিন্ন স্কলারশিপ নিয়ে শিক্ষার্থীরা পিএইচডি ডিগ্রি নিতে বাইরে যাচ্ছে। তারা অনেকেই ফিরে আসছে না। এর ফলে মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমরা ভালো গবেষক হারিয়ে ফেলছি। যারা গবেষণা করে, সেই গবেষকদের কোনো প্রণোদনা বা সম্মাননা এখানে নেই। যথাযথ সম্মান না পেলে গবেষণায় গবেষকদের স্পৃহাটা আর থাকে না। গবেষকদের বয়স যত বাড়ে তত তাদের সৃজনশীলতা তত বাড়ে। কিন্তু আমাদের এখানে চাকরির বয়সসীমা নির্দিষ্ট। গবেষকদের চাকরির বয়সসীমা থাকা উচিত না।
বন্ধন: বাংলাদেশে চাষকৃত ফল, ফুল, সবজি ও কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি ও বাজার ধরে রাখতে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমাদের কৃষিপণ্যের রপ্তানির বাজার নষ্ট করছে। চিংড়িতে শিসা প্রবেশ, জেল মেশানোর খবর আমরা পেয়েছি। আবার মশলা জাতীয় পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা। এদের নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এ জন্য মান নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ কঠোর হতে হবে। উন্নত সংরক্ষণ পদ্ধতি আমাদের অবলম্বন করতে হবে। নতুন জাতের উদ্ভাবন করতে হবে। ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণেও আমাদের নজর দিতে হবে। এই প্রক্রিয়াজাতকরণটাও আমরা ঠিকমতো করতে পারি না। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে আমদানিকারক দেশের চাহিদা মোতাবেক রপ্তানি করতে পারছি না। আবার আমদানি প্রক্রিয়ার সকল শর্ত পূরণ করতে পারে না অনেক ব্যবসায়ী। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোয়ালিটি ও সেইফটি নিশ্চিত করলে রপ্তানির বাজার আরও বাড়বে।
বন্ধন: কীভাবে আমরা কৃষিতে সমৃদ্ধ হতে পারি, আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে বন্ধনের পাঠকদের জানাবেন?
ড. জুবায়ের–আল–মাহমুদ: কৃষিতে আমরা ভালো করছি। তারপরও বেশ কিছু জায়গায় আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। চাষাবাদে এখনো আমরা উন্নত প্রযুক্তি পুরোপুরি ব্যবহার করছি না। উন্নত প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নত জাত বাছাই করতে পারে না আমাদের কৃষকেরা। এ কারণে দেখা যায়, ফলনের পর আমাদের কৃষকেরা হাহাকার করে। উন্নত জাত বাছাই, সময়মতো বীজ রোপণ, সময়মতো সেচ ও নিকাশ, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টেকসই অণুজীব ও বালাই ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দিতে হবে।
ফসল রোপণ, পরিচর্যা, সংগ্রহ, সংরক্ষণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। একটা জমিতে আমরা মাত্র এক থেকে দুবার ফসল ফলাই। বছরের একটা সময় আমাদের জমি পড়ে থাকে। সেক্ষেত্রে জমি থেকে দুইয়ের অধিক ফসল উৎপাদনে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। এ ছাড়া শস্য বহুমুখীকরণে আমাদের এখন বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা আমরা একটা জমিতে এক ধরনের ফসলই চাষাবাদ করি। এতে মাটিতে বিশেষ পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। এ জন্য জমিতে ধানের পাশাপাশি, ডাল ও অন্যান্য সবজির চাষাবাদ করতে পারি। খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। আমরা যদি শুধু ধান চাষ করি, তাহলে তো পুষ্টির নিরাপত্তা পূরণ হবে না।
কৃষকের স্টোরেজের সুবিধা হাতের নাগালে না থাকায় কম মূল্যে তাদের ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে। উন্নত সংরক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করতে হবে এবং সেটা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। কৃষককে প্রণোদনা দিতে হবে। এ ছাড়া শস্যবিমার আওতায় কৃষককে আনতে হবে। দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে এই বিমার বিকল্প নেই। এ ছাড়া স্বল্প সুদে কৃষকদের ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করতে পারলে কৃষিতে আমাদের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।