বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশটি বৃষ্টিপাতেরও। সময়ভেদে কমবেশি প্রায় নয় মাস এখানে বৃষ্টি হয়। যার মধ্যে চার মাস অতিবৃষ্টির কাল। আর এই অতিবৃষ্টিতেই আশপাশে জমে পানি। এ কারণে বাইরের মতো ঘরের ভেতরের নানা অংশে সহজেই ড্যাম্প ধরে। আর এ সমস্যার প্রকটতা বেশি দেশের সিলেট-চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। আবহাওয়ার কিংবা জলবায়ুজনিত কারণেই হোক এসব এলাকার ঘরের দেয়ালজুড়ে দেখা মেলে অতিরিক্ত ড্যাম্পের।
ড্যাম্প কী?
ড্যাম্প মূলত একটি ঘরের দেয়ালের নাজুক অবস্থা, যা ধীরে ধীরে দেয়ালের পুরুত্বে ক্ষত তৈরি করে ধীরে ধীরে পুরো দেয়ালটি নষ্ট করে ফেলে। ছত্রাক জন্মে দেয়ালের স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারায়। বিভিন্ন স্থানে কালচে দাগ পড়ে একসময় পুরো দেয়াল থেকে রং ও প্লাস্টারের অংশ খসে পড়তে শুরু করে।
ড্যাম্প চিনবেন যেভাবে
একটি দেয়ালে ড্যাম্প আছে কি না কিংবা হবে কি না বুঝতে দেয়ালটি দিনের আলোয় ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করুন। দেয়ালে ভেজা ছোপ থাকলে বুঝতে হবে এটা পেনিট্রেটিং ড্যাম্প। এর মানে হলো এখানে ড্যাম্পের আশঙ্কা রয়েছে। আপনি দেয়ালে হাত দিলেই ঠান্ডা পানির অবস্থা টের পাবেন। দেয়ালের যেকোনো রঙের অংশ ফুলে উঠলেই তাকে বলে পেনিট্রেটিং ড্যাম্প। এটি ড্যাম্প পড়ার আগের অবস্থা। এতে দেয়ালের রং ফুলে ওঠে। ছত্রাক পড়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়। রংগুলো হাতে চাপ দিলে সহজেই বসে যায়। দেয়ালের কোনো অংশ যখন অন্য রং, বিশেষ করে খয়েরি বা কালো রং ধারণ করে, একে বলে রাইজিং ড্যাম্প। ইতিমধ্যে ড্যাম্প পড়ায় ধীরে ধীরে এটি আরও বাড়বে।
ড্যাম্প কীভাবে হয়?
- দেয়ালের ভিত বা দেয়ালে ড্যাম্পপ্রুফ বা সিক্ততা নিরোধক স্তর না থাকলে ড্যাম্প হয়।
- সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার অভাবে দেয়ালের ইটে নোনা ধরে ড্যাম্প তৈরি করে।
- পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে না পারলে দেয়ালে নোনা ধরে এটি ড্যাম্প তৈরি করে।
- স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের ভুলের কারণে ছাদে নোনা ধরে ড্যাম্প তৈরি হয়।
- বাড়ি তৈরির সময় স্বল্প পোড়ানো ইট ব্যবহারের ফলে এতে সহজেই নোনা ধরে সেই ইটের কালচে ছত্রাক পুরো দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ে।
- বাড়ি তৈরির উপকরণ যেমন ইট, বালু, সিমেন্টের মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি লবণের উপস্থিতির জন্য নোনা ধরে, যা ড্যাম্প তৈরিতে বেশ সহায়ক।
- প্লাস্টারের নিচে পানির লাইন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে নোনা ধরে দ্রুত ড্যাম্প তৈরি হতে পারে।
ড্যাম্পের শুরুটা দেয়ালের কোনো একটা অংশের প্রতিনিয়ত পানির সংস্পর্শে আসায়। প্রথমে এর বাইরের অংশে পানি লেগে আস্তরণ নষ্ট হয়। এরপর সেই পানি ধীরে ধীরে ইটে গিয়ে পৌঁছে এর গায়ে নোনা ধরে। এই নোনা ধরা অংশটি দিয়ে পানি ইটের অন্য প্রান্তে এসে সেখানকার প্লাস্টার নষ্ট করে। এরপর দেয়ালের রঙের আস্তরণ নষ্ট হয়। এতে সেখানে দাগ পড়ে। ফাঙ্গাস ও ছত্রাক ওখানে আক্রমণ করে সহজেই। ফলে সেখানে আর কোনো রংই কাজ করে না। কদিন পরপর সেখান থেকে রং উঠে যায়। আর নষ্ট হতে থাকে সেখানকার আসবাবগুলো। এভাবে একটি ঘরের ড্যাম্প দেয়াল ধীরে ধীরে অন্য দেয়ালে সংক্রমিত হয়, যা পরে পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
ড্যাম্প কয়েক ধরনের দেয়ালে দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি যে দেয়ালে ড্যাম্প হয়, সেটা হলো টয়লেটের দেয়াল। যে দেয়ালটির পেছনে টয়লেট থাকে, সেই দেয়ালে থাকা শাওয়ার অথবা অন্য কোনো পানির লাইন যেমন গিজার বা বেসিনের ইন লাইনের ব্রাস জয়েন্ট থেকে পানি লিক হওয়া শুরু হয়। আর এর মূল কারণ হলো পানির দুটো লাইন একই হলেও মাঝের ব্রাস জয়েন্ট (টি জয়েন্ট অথবা ক্রস জয়েন্ট) থেকে পানি লিক হওয়া। এর ফলে পানি বের হতে থাকে। সাধারণত টয়লেটের ভেতর দিকে পানি লিক করে না। টাইলস বসানো থাকে বলে পানিটা বাইরের দেয়ালকে নষ্ট করে।
এরপর থাকে বেসিন, সিংক ও এসির পানি থেকে সৃষ্ট ড্যাম্প। আমাদের দেশের বেশির ভাগ বাড়ির ডিজাইন করার সময় আর্কিটেক্টরা এয়ারকন্ডিশনিং নিয়ে তেমন চিন্তা করেন না। ফলে এয়ারকন্ডিশন যেখানে সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয়। আর এর ওয়াটার পাইপ লাইন যেকোনো জায়গা দিয়ে বের করা হয় বাড়ির বাইরে। বাড়ির বাইরে যেকোনো জায়গায় বের হওয়া এই পানির লাইন থেকে প্রতি তিন ঘণ্টায় এক লিটার পানি নির্গত হয় এসি চলাকালীন। এটা যে দেয়াল দিয়ে পড়ে সেই দেয়ালে দ্রুত ড্যাম্প ধরে।
আর এসব ছাড়াও বৃষ্টির পানি ছাদে জমে গিয়ে ড্যাম্প হতে পারে সেখানে। ছাদে ড্যাম্প হওয়ায় ছাদ থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে পড়া পানি ঘরের ভেতরে আসায় একসময় সেই ছাদ ভেঙেও পড়তে পারে। ছাদে যদিও রড ব্যবহার করা হয়; আরসিসি ঢালাই বলে এটা ভেঙে পড়ার হার কম কিন্তু ছাদ থেকে চুন-সুরকি খসে পড়ার হার বেশি। অনেক পুরোনো বাড়িতেই হরহামেশাই এই ঘটনাটা ঘটে। এ ছাড়া বিল্ডিংয়ের স্পাংশন জয়েন্ট থাকলে সেই জয়েন্ট দিয়ে পানি চুইয়ে পড়তে পারে। আর সেই পানিতে পুরো বাড়িটাই একসময় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বাড়ির কার্নিশ ও সানশেড থেকে চুইয়ে পড়া পানি থেকে তৈরি হতে পারে ড্যাম্প। ঘরের ফ্লোরে স্কার্টিং হিসেবে কাঠ ব্যবহার করলে প্রতিনিয়ত কাঠের স্কার্টিং ফ্লোর মোছার সময় পানিতে ভিজলে সেখান থেকেও দেয়ালে ড্যাম্প তৈরি হতে পারে সহজেই।
ড্যাম্প সারানোর উপায়
ড্যাম্প যেহেতু পানি থেকে হয়, সেহেতু পানির দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি বন্ধ হলেই ড্যাম্প সারানো যায়।
হলো ব্রিক বা ক্যাভিটি ওয়াল ট্রিটমেন্ট
দেয়ালের মূল উপাদান হলো ইট। আর ক্যাভিটি ওয়াল তৈরির মাধ্যমে আমরা ড্যাম্প ধরা থেকে দেয়ালকে রক্ষা করতে পারি। ক্যাভিটি ওয়াল বা হলো কংক্রিট ব্লকের ভেতর ফাঁকা অংশ থাকে। পানি বাইরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারলেও এটি ভেতরের অংশে প্রবেশ করতে না পারায় দেয়াল স্বাভাবিক থাকে।
ড্যাম্প নিরসনে টাইলসের ব্যবহার
দেয়ালে যে ড্যাম্প হচ্ছে, সেই দেয়ালে টাইলস ব্যবহার করা হয়। যেসব দেয়াল অনেক বেশি পানি শোষণের ফলে নষ্ট হয়ে গেছে, তাতে কোনোভাবেই রং ব্যবহার সম্ভব না, সেই দেয়ালে টাইলস ব্যবহার করা যায় সহজেই। টাইলস ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের বেছে নিতে হবে এমন টাইলস, যেগুলোর শ্রিংকেজ কম। বাজারে দুই ধরনের টাইলস পাওয়া যায়। এক. সিরামিক টাইলস; অন্যটি পোর্সেলিন টাইলস। পোর্সেলিন টাইলস ও সিরামিক টাইলসের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো এর বেকিং টাইম। পোর্সেলিন টাইলস অনেক বেশি তাপে পুড়িয়ে তৈরি করা হয় বলে এটি সিরামিক টাইলসের চেয়ে বেশি ভালো ওয়াটারপ্রুফিং করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সিরামিক টাইলসের নিচের অংশটি পানি শোষণ করে বিধায় অনেকেই পোর্সেলিং টাইলস ব্যবহার করেন। সিরামিক টাইলসের দামের কারণে বহুল ব্যবহৃত হলেও এটি পরিষ্কার করতে বেশ কষ্টকর, পোর্সেলিন টাইলসের চেয়ে কম টেকে বলে বাজারে যেসব পোর্সেলিন টাইলস পাওয়া যায়, সেগুলোর বদলে রাস্টিক টাইলস বা পোর্সেলিন টাইলস এ ধরনের দেয়ালগুলোতে বেশি ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে টাইলস লাগানোর জন্য দুই ধরনের উপায় অনুসরণ করা যেতে পারি। এক. টাইলস যে দেয়ালে লাগাব, সেই দেয়ালের প্লাস্টার তুলে ইটের সারফেস বের করে আনা এবং সেই দেয়ালে ভালোমতো তেঁতুল গোলানো পানি ছিটিয়ে এর ক্ষারের মাধ্যমে দেয়ালের শুদ্ধিকরণ করা। এরপর টাইলস লাগানো। অন্যটি হলো চিপিং করে দেয়াল থেকে রং ও সামান্য কিছু প্লাস্টার তুলে টাইলস এডহেসিভ দিয়ে টাইলস ইনস্টলেশন করা।
তেঁতুল পানি দিলে দেয়ালের যেসব ইট নষ্ট হয়ে গেছে বা নষ্ট হওয়ার পথে কিংবা নোনা ধরে যাওয়া ইটগুলো আবারও পূর্বের শক্তি ফিরে পায়। ফলে নতুন করে আর দেয়াল নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না।
কেমিক্যালের ব্যবহার
ড. ফিক্সিট: ভালো মানের ড্যাম্পের জন্য-
- দেয়ালের নষ্ট রং ভালোমতো তুলে ফেলতে হয়।
- শক্ত তারের ব্রাশ দিয়ে পুরো নষ্ট প্লাস্টারও তুলে ফেলতে হয়। নিচের ভালো প্লাস্টারের অংশ থাকলে সেটা রেখে দেওয়া যায়।
- এরপর পানি দিয়ে দেয়াল ভিজিয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে।
- ড. ফিক্সিট ড্যাম্প গার্ডকে ১:১:১ অনুপাতে মেশাতে হবে। একভাগ পানি, একভাগ বেইজ ও একভাগ হার্ডনার মিশিয়ে পেস্ট বানাতে হবে।
- ব্রাশের সাহায্যে ড. ফিক্সিট পরিষ্কার করা দেয়ালে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর এই কোটকে ছয় থেকে আট ঘণ্টা শুকোতে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, যেন এটা কোনোভাবেই না ভেজে। বৃষ্টির সময় এটা কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না।
- এরপর আগের সেই মিশ্রণ আবারও সেই দেয়ালের ওপর ৯০ ডিগ্রি কোণে প্রয়োগ করতে হবে। এটা দেওয়া শেষ হলে আবারও ২৪ ঘণ্টা শুকোতে হবে।
- এই দেয়ালের ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে কাজ শেষ করতে হবে। পুটি দেওয়া ছাড়া এই দেয়াল মোটেও ঘষা যাবে না। যতটা না ঘষে কাজ করা যায়, সেভাবেই কাজ করতে হবে।
মাঝারি মানের ড্যাম্পের জন্য
- দেয়ালের নষ্ট রং তুলতে হবে ভালোমতো।
- শক্ত তারের ব্রাশ দিয়ে পুরো নষ্ট প্লাস্টারও তুলে ফেলতে হবে। নিচের ভালো প্লাস্টারের অংশ থাকলে সেটা রাখতে হবে।
- এরপর পানি দিয়ে দেয়াল ভিজিয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে।
- ড. ফিক্সিট ড্যাম্প গার্ডকে ১:১:১ অনুপাতে মেশাতে হবে। একভাগ পানি, একভাগ বেইজ ও একভাগ হার্ডনার মিশিয়ে পেস্ট বানাতে হবে।
- ব্রাশের সাহায্যে ড. ফিক্সিট পরিষ্কার করা দেয়ালে প্রয়োগ করতে হবে। এরপর এই কোটকে ছয় থেকে আট ঘণ্টা শুকোতে দিতে হবে।
- ড্যাম্প গার্ড পুটি বানাতে হবে। এ জন্য ১:১:২ অনুপাতে বেইজ, হার্ডনার ও হোয়াইট সিমেন্ট দিতে হবে। এরপর পুটি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পানি দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। এরপর সেটা দেয়ালে প্রয়োগ করতে হবে যেন সব ছিদ্র ভরাট হয়ে সমান সারফেস তৈরি হয়।
- ১:১:১ অনুপাতে একভাগ পানি, একভাগ বেইজ ও একভাগ হার্ডনার মিশিয়ে পেস্ট বানাতে হবে। আবারও সেই পুটির ওপর এই মিশ্রণ ব্রাশ দিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা পর এই দেয়াল পুরোপুরি ড্যাম্পপ্রুফ হয়ে যাবে।
ক্রাকের থার্মোকল থেরাপি
যখন কোনো দেয়ালে বড় বড় ক্র্যাক তৈরি হয়, যা দিয়ে বাইরে থেকে বৃষ্টির পানি অবিরত প্রবেশ করতে থাকে, তখন সেখানে থার্মোকল থেরাপি দিতে হয়। থার্মোকল মূলত আমাদের বাসাবাড়িতে থাকা ককশিট। এটার বৈজ্ঞানিক নাম থার্মোকল। এটি খুব সহজেই পেট্রলে গলে যায়। একটা মগ বা এমন কোনো পাত্রে পেট্রল নিয়ে ওতে থার্মোকলের টুকরো দিতে হয়। এটা দ্রুত গলে গেলে আরও কিছু দিতে হয়। এভাবে সব গলে গিয়ে একটা পেস্ট তৈরি হয়, যা দিয়ে সেই দেয়াল অথবা ছাদের ফাটল পরিষ্কার করে এর ফুটো ভরাট করতে হয়। একবার ভরাট হয়ে গেলে এটি আট থেকে দশ ঘণ্টা শুকোতে হয়। একবার শুকিয়ে গেলে এটি পুরোপুরি ওয়াটারপ্রুফ হয়ে ড্যাম্প দূর করে। এই পদ্ধতিতে বর্তমানে খুব কম খরচে বাড়ির ওয়াটারপ্রুফিং করা হয়।
ক্র্যাক ফিল পেস্ট
দেয়ালের যেসব স্থান দিয়ে কোনো ছিদ্র থাকে বা ক্র্যাক থাকে, সেই ক্র্যাক থেকে পানি চুইয়ে ড্যাম্প তৈরি হয়। আর এই ক্র্যাক ফিল করে দেওয়ার জন্য আছে ক্র্যাক ফিল পেস্ট। তবে কখনোই ৫ মিলিমিটারের বেশি মোটা ফাটল ভরাট করার জন্য এটাকে ব্যবহার করা উচিত নয়। এটি ৫ মিলিমিটারের বেশি ফাটল বন্ধ করতে অক্ষম। ছোট্ট ফাটল বা হেয়ারলাইন ক্র্যাক যদি থাকে, তবেই এটি ব্যবহার করা হয়। কোণ স্ট্রাকচারাল ক্র্যাক, স্পাংশান জয়েন্ট, সেপারেশন গ্যাপ-এ এটা ব্যবহার না করাই উত্তম।
এটি পেইন্ট করার জন্য যে পুটি বাজারে পাওয়া যায়, সেটা ব্যবহার না করাই উত্তম। ঘরের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির কম হলে এটি শুকোতে অনেক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া বৃষ্টি বা পানির প্রবেশ না থামিয়ে এটা ব্যবহার করা ঠিক নয়। বাজারে এটি পাউডার অথবা মিশ্রণ হিসেবে পাওয়া যায়। ইউভি প্রটেকশন দেয় বলে এটি বাইরের দেয়ালেও সমভাবে কার্যকর।
ব্যবহারবিধি
- প্রথমেই যে ফাটল আছে সেটাকে গ্রান্ডিং মেশিন দিয়ে দুই পাশ থেকে একটু কেটে দিতে হবে যেন বেশি মাত্রায় ক্র্যাকফিল সেখানে প্রবেশ করতে পারে।
- ভালোমতো রং পরিষ্কার করে ধুলো-ময়লা সব ফেলে দিতে হবে ক্র্যাক থেকে।
- হোম শিল্ড ক্র্যাক ফিল সেখানে প্রয়োগ করতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে যেন অপ্রয়োজনীয় ক্র্যাকফিল ফাটলের আশপাশে না থাকে। স্ক্র্যাব দিয়ে ভালোমতো সেগুলো তুলে ফেলতে হবে। অনেকটা রঙের পুটি কাটার মতো একই প্রয়োগবিধি।
- স্যান্ডিং করতে হবে ভালোমতো। এতে দেয়ালের আশপাশের সারফেসের সঙ্গে ক্র্যাকের জায়গাটিও একই লেভেলে চলে আসবে।
- এরপর রং করে দিতে হবে। রং করে দিলে আবারও জায়গাটি নতুন দেয়ালের মতো হবে।
ড্যাম্প স্টপ
অতিরিক্ত পানি লিকেজ থাকলে সেই দেয়ালে ড্যাম্প স্টপ ব্যবহার করতে হয়। ড্যাম্প স্টপ মূলত যে দেয়াল থেকে বেশি পানি প্রবেশ করে, সেই দেয়ালে প্রয়োগযোগ্য।
- প্রথমে দেয়াল থেকে নষ্ট রং তুলে ফেলতে হবে। ব্রাশ দিয়ে ভালোমতো ঘষে নিতে হবে জায়গাটা। যেন কোনো ফাঙ্গাল বা ছত্রাক না থাকে।
- ড্যাম্প স্টপ গুঁড়োর সঙ্গে পানি ১:১ অনুপাতে মেশাতে হবে। এরপর সেটাকে ব্রাশ দিয়ে দেয়ালে প্রয়োগ করতে হবে। এটি প্রয়োগ শেষ করে ছয় ঘণ্টা শুকোতে হবে।
- এরপর ড্যাম্প স্টপ ও পানি ৩:১ অনুপাতে মিশিয়ে পুটি বানিয়ে পুটি কাটার দিয়ে সেই দেয়ালে প্রয়োগ করে ছয় ঘণ্টা শুকোতে হবে।
- এটি শুকিয়ে গেলে আবারও একই অনুপাতে মিশ্রণ তৈরি করে একইভাবে প্রয়োগ করে ছয় ঘণ্টা শুকিয়ে নিলে দেয়ালটি রঙের জন্য তৈরি হয়ে যাবে।
ওয়াটারপ্রুফ পুটি
দেয়ালে রং করার আগে দেয়ালের সারফেস সমান করার জন্য যে পুটি ব্যবহার করা হয়, সেটা ওয়াটারপ্রুফ পুটি দিয়ে করলেই দেয়াল বস্তুত ড্যাম্পপ্রুফ হয়ে যায়। দেয়াল রং করার জন্য বর্তমানে ওয়াটারপ্রুফ পুটির ব্যবহার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যহারে।
সিল-ও-প্রাইম
সিল ও প্রাইম মূলত একটি টপ কোট। রং করার পর এটি দেওয়া হয় প্রাইমার হিসেবে। এতে আছে পেইন্টেটিভ অ্যাক্রেলিক পলিমার, সিলিকন ও টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড। এই তিনটি বুস্টারের কারণে এটি এই মুহূর্তে বাজারের সেরা প্রাইমার। পেইন্টেটিভ অ্যাক্রেলিক পলিমার দেয়ালের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র বন্ধ করে দেয়। দেয়ালের গায়ে যেন কোনো পানি প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করে। সিলিকনে পানি পড়ে সেটা ছিটকে বেরিয়ে যায়। টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড চিলার ও আন্ডারকোট হিসেবে কাজ করে। এটি অ্যান্টি অ্যালক্যালি, গ্রিন প্রো সার্টিফাইড। এতে কোনো ফাঙ্গাস আসে না। কোনো ব্যাকটেরিয়া অ্যাফেক্ট করতে পারে না। এটি ড্যাম্পপ্রুফ করার জন্য ১:১ অনুপাতে পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ালে প্রয়োগ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পানির পরিমাণ কমিয়ে দিলে এটির পানি থেকে রক্ষা করার সক্ষমতা বাড়ে। সেক্ষেত্রে এটি ১:.৭৫ অনুপাতে পানির সঙ্গে মেশানো হয়।
পানির লাইন মেরামত
পানির লাইন ঠিক না করে যতই আমরা কেমিক্যাল ব্যবহার করি কিংবা টাইলস লাগাই কোনোভাবেই এটা ঠিক করা সম্ভব নয়। কেননা সমস্যার আসল কারণ যে পানি সেটা ঠিক করা না হলে কয়েক বছর পর আবারও টাইলসের ফাঁক দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়া বা ড্যাম্পপ্রুফ নষ্ট হয়ে আবারও ফাঙ্গাস পড়ে যাওয়ার সমস্যায় পড়তে পারে। এক্ষেত্রে পানির লাইন নতুন করে ঠিক করে দিলে এটা ভবিষ্যতে আর ড্যাম্প সৃষ্টি করবে না। ছাদের স্লোপ ও বৃষ্টির পানি সঠিক নিয়মে পাইপের মাধ্যমে নিষ্কাষণের মাধ্যমে সহজেই ড্যাম্প দূর করা যায়।
ওয়াটারপ্রুফ সিমেন্ট
বাজারে এই মুহূর্তে কিছু ওয়াটারপ্রুফ সিমেন্ট আছে, যেগুলো পানি নিরোধক। ইটের দেয়ালের ওপরের প্লাস্টার যদি এসব সিমেন্ট দিয়ে করা যায় তবে সেগুলো সত্যিকারের ওয়াটারপ্রুফ হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশেও পাওয়া যাচ্ছে এ ধরনের সিমেন্ট।
জিপসাম প্লাস্টার
- ড্যাম্প ধরা দেয়াল থেকে সব ময়লা আস্তরণ তুলে ফেলে সেখানে যদি জিপসাম প্লাস্টার দিয়ে ভালোমতো প্লাস্টার করে দেওয়া যায় তবে সেই জায়গাটি অনেক দিন ধরে ড্যাম্পমুক্ত থাকে। জিপসাম প্লাস্টার করার বেশ কিছু সুবিধা আছে।
- জিপসাম প্লাস্টার বেশি দিন ধরে ড্যাম্প থেকে দেয়ালকে সুরক্ষা দেয়।
- এতে কোনো কেমিক্যাল নেই। ফলে এটি স্বাস্থ্যসম্মত।
- এটি শুকিয়ে যাওয়ার পর সংকুচিত হয় না। ফলে ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।
- এটি খুব সহজেই পানি প্রতিরোধ করতে পারে। বাইরে থেকে পানি এলে বা দেয়ালের ভেতর থেকে পানি এলে সেটা এটিকে আটকে দেয়।
- ছত্রাক প্রতিরোধ করে।
- মাইক্রোক্লাইমেট তৈরির মাধ্যমে দেয়ালের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করে।
- সাধারণ প্লাস্টারের তুলনায় দাম একটু বেশি হলেও এটি অনেক বছর ধরে ঘরকে ড্যাম্পমুক্ত রাখে।
- তিন কেজি জিপসাম পাউডারের সঙ্গে ১ দশমিক ৮ লিটার পানি মিশিয়ে জিপসাম পাউডারের পেস্ট বানানো হয়, যা জিপসাম প্লাস্টার হিসেবে দেয়ালে প্লাস্টারের কাজ করে।
ইপোক্সি ইঞ্জেকশন
বাড়িতে যদি বড় কোনো ফাটল থাকে, সেটা দিয়ে অনবরত পানি ঘরে প্রবেশ করলে ইপোক্সি ইঞ্জেকশনের ব্যবহার করে সেই ফাটল বন্ধ করা যায়। ফলে পানির অবাঞ্ছিত প্রবেশ ঠেকানো যায়। এতে ড্যাম্প থেকে সহজেই মুক্তি মেলে। কিছু প্লাস্টিকের নল প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয় দেয়ালের ফাটলের ভেতর। এরপর ইপোক্সি সেই নল দিয়ে (পোর্ট) দেয়ালের ফাটলে প্রবেশ করানো হয়। ২৪ ঘণ্টা পর শুকিয়ে গেলে প্লাস্টিকের নলগুলোর বাড়তি অংশ গ্রান্ডিং মেশিন দিয়ে কেটে দেওয়া হয়। এরপর রং করে ফেললে আগের ফাটল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
দেয়ালের ড্যাম্প ঢাকার জন্য অনেকেই নানা আসবাব, ছবি, আয়নাসহ বিভিন্ন জিনিস ড্যাম্পের জায়গায় রেখে দেন। এতে সাময়িকভাবে হয়তো ড্যাম্প ঢেকে থাকে। কিন্তু দিনশেষে সেই আসবাব বিশেষ করে কাঠের বস্তুগুলো নষ্ট হতে শুরু করে। পরিবারের সবার সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে ঘরের ভেতরকার পরিবেশের ওপর। আর ড্যাম্প মানেই ছত্রাক ও ফাঙ্গাসের ঘরবাড়ি। এগুলো মানব শরীরের ওপর নানা রকম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া দেয়াল থেকে দ্রুত বিভিন্ন আসবাব ড্যাম্পের কারণে ড্যামেজ হয়। সেগুলোর কারণে কাঠের আসবাবে উই ধরা-ফাঙ্গাসের আক্রমণ, ঘুণের ধরার মতো ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। তাই ড্যাম্প হওয়া দেয়াল থেকে নিজ বাসস্থানকে সুরক্ষিত রাখা উচিত আমাদের নিজ স্বার্থেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।