করোনা প্রতিরোধী ওভারকোটিং

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় নাকাল বিশ্ব। করোনা প্রতিরোধে প্রতিদিনই আসছে নতুন নতুন তথ্য, হচ্ছে গবেষণা। তবে সব মহলের সাধারণ বিবেচ্য জনসচেতনতা। প্রকৃত অর্থে সচেতনতার অভ্যাস গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ। তত দিনে যে ক্ষতি হবে তা অপূরণীয়। তাই নির্মাণ প্রকৌশলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু গবেষক করোনা প্রতিরোধে নির্মাণের ক্ষেত্রে করণীয় কিছু বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছেন। কোনো স্থাপনার সঙ্গে এ বিষয়গুলো যুক্ত হলে তা শুধু করোনাই নয়, যেকোনো ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া থেকে আমাদের দেবে বাড়তি সুরক্ষা। 

ঘরে কিংবা বাইরে যেকোনো স্থানেই যেকোনো বস্তুর পৃষ্ঠতলের বিদ্যমান অদৃশ্য ভাইরাস আমাদের আতঙ্কিত করছে প্রতি মুহূর্তেই। এটি নতুন ভাইরাস হওয়ায় বিশেষজ্ঞরাও এর প্রতিরোধের কোনো সঠিক ও নিশ্চিত উপায় খুঁজে পাননি। দেশে দেশে ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলেও করোনা সংক্রমণের সঠিক কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত নন। ধারণার ভিত্তিতেই চলছে একের পর এক প্রতিরোধযুদ্ধ। করোনাভাইরাসও বারবার বদলাচ্ছে নিজের ধরন। তবে একটি বিষয়ে সব দেশের বিশেষজ্ঞরাই একমত। করোনাভাইরাস একধরনের আণুবীক্ষণিক পার্টিকেল (আরএনএ) জাতীয় ভাইরাস। সে কারণে এর উপস্থিতি মেলে অনেক কিছুর ওপরই। সহজেই বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারে এই ভাইরাস। থাকতে পারে জামাকাপড় কিংবা যেকোনো কঠিন পৃষ্ঠতলে। বাসাবাড়ি, অফিস, আসবাব, দেয়াল এমনকি যেকোনো পৃষ্ঠতলে থাকতে পারে এর সরব উপস্থিতি। সঠিক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পাশাপাশি পৃথিবীর সব মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তত দিনে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর জীবনের ঝুঁকি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে। এ অবস্থায় করোনা প্রতিরোধে উদ্ভাবনী নতুন উপায়, উপকরণ মানুষকে স্বল্প সময়ে অনেক বেশি নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। সে লক্ষ্যেই নির্মাণ উপকরণের উৎপাদক শ্রেণি করোনা মোকাবিলায় নতুন উপকরণ, উপায় ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি উদ্ভাবনের পরিকল্পনা করছে। করোনা প্রতিরোধে গবেষক ও উদ্ভাবকেরা কী ভাবছেন চলুন জেনে নিই।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বস্তুর পৃষ্ঠতলের ভিন্নতার কারণে করোনাভাইরাস বারবার ধরন (মিউটেশন) বদলাচ্ছে। সে কারণে নতুন অ্যান্টিভাইরাল পৃষ্ঠতলের কথা ভাবছেন আর্কিটেক্ট, ইঞ্জিনিয়ারসহ বড় বড় নির্মাতা। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কোটিং পৃষ্ঠতলে বিদ্যমান করোনাভাইরাস প্রতিরোধের বিশেষ এক উপায়। এর ফলে বস্তুর পৃষ্ঠতলে একধরনের রাসায়নিক আবরণ দেওয়া হয়। এই আবরণ থেকে নতুন নতুন মাইক্রো স্টেইন তৈরি হয়, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গতানুগতিক পদ্ধতিতে সাধারণ জীবাণুনাশক দিয়ে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের চেষ্টা করায় করোনা সংক্রমণ রোধ করা যাচ্ছে না কিছুতেই।

আর্ডাল একধরনের স্প্রে জাতীয় তরল পদার্থ। এই উপাদানটি প্রথমে বিমানযাত্রীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছিল। পরে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত আসবাবেও এর ব্যবহার শুরু হয়। এটি কোনো বস্তুর পৃষ্ঠতলে স্প্রে করা হলে তা যেকোনো ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লড়াইয়ে সক্ষম। ফলে ওই পৃষ্ঠতল মানুষের শরীরের সংস্পর্শে এলে ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আর কোনো আশঙ্কা থাকে না। জার্মানভিত্তিক আহেন্সবার্গ নামে একটি কোম্পানি প্রথম আর্ডাল প্রস্তুত করেছিল। আর্ডালের মূল উপাদান হলো ননটক্সিক সিলিকন ডাই-অক্সাইড, যা অ্যান্টিভাইরাল উপাদান হিসেবে কাজ করে। আরেকটি বিশেষ উপকরণ হলো ন্যানোস্কেল সিলিকা ফ্র্যাগমেন্ট। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাচের টুকরো। বিশেষ উপায়ে প্রস্তুতকৃত এই কাচের টুকরোগুলো ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকনাশক হিসেবে কাজ করে, যা চর্মরোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

গবেষক ও বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাস শুধু দুজন মানুষ একসঙ্গে চলাফেরা করলেই নয়, বরং যেকোনো পৃষ্ঠতল কিংবা কোনো একক মানুষ থেকেও ছড়াতে পারে। এই গবেষণার ফলেই মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে অনেক কঠিন পৃষ্ঠতলে হাত দিই। দরজার হাতল, সিঁড়ি কিংবা ছাদের রেলিং, কম্পিউটারের কিবোর্ড এসব বস্তুতে হাত লাগালেও করোনা সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে; এমন ভীতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সব ধরনের কঠিন পৃষ্ঠতলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার স্থায়িত্ব সমান নয়। কোনো স্থাপনা ডিজাইন ও নির্মাণের সময় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ডিজাইনার ও স্থপতিদের। ডিজাইনার ও স্থপতিদের একটু বাড়তি সচেতনতা করোনা তথা যেকোনো ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে বলে গবেষকেরা জানান। সব ধরনের পৃষ্ঠতলে করোনাভাইরাস সমান স্থায়ী হয় না। এ বিষয়টির ভিত্তিতে বিভিন্ন সেকশনে বিভিন্ন ধরনের মেটাল পৃষ্ঠতলের কথা ভাবা যেতে পারে বলে গবেষকদের পরামর্শ।

দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে কঠিন পৃষ্ঠতলে সার্স কোভিড-২ (SARS-CoV-2)ভাইরাসের স্থায়িত্ব নিয়ে একদল মার্কিন গবেষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এ গবেষণায় মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট অব হেলথ-এর একজন বিশেষজ্ঞ ভাইরোলজিস্ট ও তাঁর সহকারীরা দেখিয়েছেন, প্লাস্টিক ও স্টেইনলেস স্টিলের পৃষ্ঠে এ ভাইরাস দুই থেকে তিন দিন টিকতে পারে। এ গবেষণায় গবেষকেরা ভাইরাসটি ধ্বংস হওয়ার হার (Decay Rates) নির্ণয় করেন। দেখা যায় একটি কাঠের বোর্ডে এ ভাইরাসটি ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকতে পারে কিন্তু একটি তামার পৃষ্ঠে মাত্রা ৪ ঘণ্টায় অস্তিত্ব হারায় সার্স কোভ-২ ভাইরাসটি।

প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রতিক বছরগুলো সারস ও মারস ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা প্রতিরোধে তামার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকেরা। এর পেছনের কারণগুলো হলো, কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া তামার সংস্পর্শে এলে ওই ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াগুলোর মূল কোষের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাহত হয়। ফলে ক্ষতিকারক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার স্থায়িত্ব হয় খুব কম। গবেষণায় দেখা গেছে, ই. কোলাই (E. Coly) নামের একটি ব্যাকটেরিয়া একটি তামাপৃষ্ঠের ওপর ৯০ মিনিট পর্যন্ত টিকতে পারে। একইভাবে স্টেইনলেস স্টিলের ওপর এই ব্যাকটেরিয়াটি ২৭০ মিনিট পর্যন্ত টিকতে সক্ষম। দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনের গবেষণাও এ বিষয়টিরই ইঙ্গিত দেয়।

গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী কঠিন পৃষ্ঠতলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল আবরণ থাকলে তা সহজেই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে পারে। মার্কিন জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত করোনাভাইরাস-বিষয়ক এক গবেষণায়  সারস ও মারস ভাইরাসের ওপর গবেষণা পরিচালিত হয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাসপাতালগুলোয় করোনায় মৃত্যুহার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং করোনাভাইরাসের সঙ্গে সারস ও মারস ভাইরাসের সামঞ্জস্য থাকায় এই ভাইরাসের ওপর গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় করোনাভাইরাসের আধার বিভিন্ন কঠিন পৃষ্ঠতলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, বিভিন্ন পৃষ্ঠতলে (যেমন: দরজার হাতল, সিঁড়ির রেলিং, কাউন্টার, বাড়ির দেয়াল) আমরা হাত লাগিয়ে থাকি। ধুলিকণা জাতীয় করোনাভাইরাস এসব জায়গা থেকে আমাদের হাতে লেগে বিভিন্ন মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। গবেষণার এ ফলাফলের ভিত্তিতে স্থপতিরা বিভিন্ন স্থাপনা, আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ডিজাইন ও নির্মাণের ক্ষেত্রে করোনা প্রতিরোধী অভিনব কৌশল পরিকল্পনা করেন। এক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয় গৃহসজ্জার বিষয়টিও।

ভবনের যে স্থানে মানুষের হাত বেশি লাগে, সেখানে তামার ব্যবহার বেশি করতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ থাকলেও সব ক্ষেত্রে তামার ব্যবহার সম্ভব নয় এতে ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। তবে ছোট ছোট যে স্থানে ব্যবহার সম্ভব, সেখানে ব্যবহার করা যেতেই পারে। বিকল্প পরামর্শ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। অনেক পেইন্টিং কোম্পানি তাদের রঙে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক কোম্পানি তাদের রঙে কিছু বাড়তি রাসায়নিক এজেন্ট যুক্ত করছে। ফলে ভবনের দেয়াল, দরজা, জানালা, সিঁড়ির রেলিং এবং নিত্যব্যবহার্য আসবাবে এ ধরনের রঙের প্রলেপ ব্যবহার করলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া এসব কঠিন পৃষ্ঠতলে বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না। অর্গানোসাইলেন (Organosilanes) এমন একধরনের সিলিকনভিত্তিক ন্যানোকোটিংস, এর প্রলেপে কোনো ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া থাকলে তা রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। এ ধরনের কোটিংস মানুষের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর নয়। এ ছাড়া ফটোক্যাটালিক এবং সুপারহাইড্রোফোবিক প্রলেপ ব্যবহার করারও পরামর্শ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ করোনা টিকার দীর্ঘ অপেক্ষা আর মরণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে নিজেদের কিছু অভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য পৃষ্ঠতলে বাড়তি কিছু সংযোজন অনেক নিরাপদ। সাময়িক সামান্য আর্থিক ব্যয় বাড়লেও পরিবারের সুরক্ষা বিবেচনা প্রত্যেক নাগরিকের কাছে প্রাধান্য। তাই স্থপতি, ডিজাইনার ও বিশেষজ্ঞদের এ ভাবনা ও গবেষণা মহামারির এ সময়ে হতে পারে আশীর্বাদ।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।

সারোয়ার আলম
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top