স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াকালীন শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন থাকে নিজস¦ স্থাপত্যে দপ্তর খোলার। কিন্তু পাস করে বেরিয়ে এলে বোঝা যায় ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। নিজেদের সময় ও অর্থ বিনিয়োগ শুধু নয়, ভীষণভাবে ধৈর্য বিনিয়োগের বিষয়ও এখানে আছে। যেহেতু পড়াশোনাটা ব্যয়বহুল, তাই অর্থের বিষয়টাও অবজ্ঞা করা চলে না। এমন অবস্থায় একজন স্থপতির কাক্সিক্ষত নিজের ফার্মটি শুরুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়ে ওঠে না। যদি কাজ যথাযথভাবে জানা থাকে, তবে কিছু চিন্তা-দর্শন ধারণ করে তাঁরা নিজেদের পরিচয় স্থির করতে সক্ষম হয়। এমনই একটি সদ্য জেগে ওঠা নবীন স্থপতিদ্বয়ের ফার্ম ‘টু ফোল্ড স্টুডিও’। তাসনোভা আফরোজ লুনা ও স্নেহাশীষ সাহা-এর কর্ণধার। তাঁদের চিন্তা ও কর্মপ্রক্রিয়ার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নবীন স্থপতিরা কীভাবে নিজেদের একটা ফার্ম করতে উদ্যোগী হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করব আমরা।
সামগ্রিকতার বোধ
প্রথমত, স্থপতিকে স্থাপত্যের বাইরে বহুমুখী গুণের অধিকারী হতে হয়, থাকতে হয় দূরদর্শী যোগ্যতার ধারক হওয়ার মতো দার্শনিক ভাবধারা। যদিও স্থপতি গুরু মাজহারুল ইসলামের মতে, স্থপতির সংজ্ঞাটাই এমন, যিনি সামগ্রিকতা নিয়ে ভাবেন; চিন্তা করেন। একজন স্থপতি নিজের কাছে একটি জাতির নকশা তৈরি করার মতো একজন মহামানবও বটে। এটিও একটি চর্চার বিষয়। ফলে শুরু থেকেই এমন চিন্তাধারা কেউ প্রকাশ করবে এ দাবি করছি না। কিন্তু সবকিছুর পেছনে ও সামনে যত দূর যিনি আঁকতে পারবেন, তাঁর কাজ ততটাই জনমঙ্গলে প্রকাশ পাবে। ক্লায়েন্ট ও প্রজেক্টের চাহিদার সঙ্গে পরিবেশকে, জাতিকে সংযুক্ত করতে পারা এবং তা প্রকাশ করতে পারার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য নিয়মিত কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জানার দরকার নেই। সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন, হৃদয়ের গহিনে প্রেমভাব থাকা প্রয়োজন, বন্ধু, আত্মীয়-পরিজন এবং নিজ দেশের প্রতি প্রয়োজন গভীর প্রেম থাকা। এটা এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়, এটাই সৌন্দর্য। টু ফোল্ড স্টুডিও এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে প্রকৃতি, পরিবেশ ও আবহাওয়াকে। তাঁদের সব কাজের মধ্যেই এর প্রমাণ রাখতে ইচ্ছুক তাঁরা। এটি তাঁদের একটা সিগনেচার স্টাইল হয়ে উঠতে পারে মননে-দর্শনে।
পার্টনারশিপের রসায়ন ও অভিজ্ঞতা
স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফার্ম দেওয়ার চিন্তা না করে সব থেকে ভালো হয় প্রায় তিন-চার বছর একটি প্রতিষ্ঠিত স্থাপত্যে ফার্মে কাজ করা। কাজ করাকালীন প্রকল্পের ধরন দেখা, প্রপোজাল লেখা ও ক্লায়েন্ট সামলানো থেকে শুরু করে নির্মাণকালীন সব বিষয় দেখার যে সুযোগ স্থাপত্যবিদ্যার একাডেমিক পড়াশোনার সময় হয় না, সেটাকে গ্রহণ করে তবে স্থাপত্যবিদ্যার ‘বিদ্যা’ অংশটি সম্পন্ন করা। যেহেতু এটি ডাক্তারি বা আইন পেশার মতোই চর্চার একটি ব্যাপার, তাই একাডেমির বাইরে কাজে বিশেষ সময় দিয়ে দক্ষতা অর্জন না করা পর্যন্ত একজন স্থপতি আসলে সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন না। টু ফোল্ড স্টুডিওর দুজন নবীন স্থপতি ঠিক একইভাবে চার বছরের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত ফার্মে কাজ করেই নিজেদের সম্পূর্ণ করে তুলেছেন। পেশাগত ক্ষেত্রে কনস্ট্রাকশন ডিটেইলে তাঁরা বরাবর আগ্রহী ছিলেন বলেই নিজেদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে পেরেছেন চমৎকারভাবে। নিজেদের ডিজাইন করা প্রকল্পগুলোতে তাই অপরিপক্ব ও অভিজ্ঞতাহীন মিস্ত্রিদের সঙ্গে নিয়েও তাঁরা তাঁদের নির্মাণপ্রণালির অধ্যায়টুকু যথাযথ সমাধা করতে পেরেছেন। নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে প্রকৌশলী, অঞ্চলভিত্তিক একাডেমিক শিক্ষাহীন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা মিস্ত্রিÑ সবাই তাঁদের কাছে সম্মানের এবং সমান গুরুত্ব রেখেছে বলে শিক্ষায় কোনো ফাঁক থাকার সুযোগ ঘটেনি। স্থপতিদ্বয় কাজের বেলায় নিজ নিজ ক্ষেত্র ভাগ করে নিয়ে সেই দিকগুলোতে এতই বলিষ্ঠতা অর্জন করেছেন যে কেবল দুজনের কর্মদক্ষতা দিয়েই তাঁরা কাজ উঠিয়ে নিতে পারেন। একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠলে পরেই যৌথ উদ্যোগে কোনো ফার্ম এগিয়ে যেতে পারে চমৎকারভাবে।
সিকিউরিটি নিশ্চিত করা
সত্যজিৎ রায় যখন ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করছিলেন তখনো তাঁর নিয়মিত চাকরিটি অব্যাহত রেখেছিলেন। অর্থাৎ তিনি নিরাপদ আয়ের দিকটি নিশ্চিত রেখেই তাঁর প্যাশনের খোঁজ করতে নেমেছিলেন। এবং সেটা বুঝে নিয়ে তবে চাকরি ছেড়েছিলেন। অর্থাৎ প্রথমেই নিজের সর্বস্ব দিয়ে যদি আমরা একটা ফার্ম শুরু করতে চাই, তাহলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই উদ্যোগটি যদি কাজ না করে বা ফল পেতে দেরি হয়, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা হতাশাগ্রস্ত হব। আমাদের কাজে ও জীবনে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। ফলে আমাদের পায়ের নিচে মাটির উপস্থিতি নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে। স্থাপত্যচর্চায় শুরুর দিকে মূল বিনিয়োগ হলো ধৈর্য। ফলে নিজেকে মানসিকভাবে স্থির রাখা অত্যন্ত জরুরি। টু ফোল্ড স্টুডিওর দুজন স্থপতির একজন এখনো একটি চাকরিতে যুক্ত এবং আরেকজন সার্বক্ষণিক হাল ধরে আছেন তাঁদের ফার্মের। ফলে এই যে ভারসাম্যটা তৈরি হয় পার্টনারশিপে, এটা তাঁদের মনোবল দৃঢ় করে, যা তাঁদের কর্মপ্রক্রিয়ায় স্পষ্ট।
যোগাযোগের দক্ষতা
নবীন স্থপতিদের ক্ষেত্রে ধৈর্যের সঙ্গে প্রায় সমান সমান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হলো যোগাযোগের দক্ষতা। এই দক্ষতা অনেক স্তরে কাজ করে। প্রথমত, ক্লায়েন্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে এই যোগাযোগের দক্ষতা অপরিহার্য। যেহেতু স্থাপত্য ও স্থপতির সঙ্গে আমাদের সমাজ এখনো নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি, তাই ক্লায়েন্ট পাওয়াটা এখনো খুবই চ্যালেঞ্জিং। এ জন্য প্রথমে নিজের এলাকা বা নিজের আয়ত্তের মধ্যে থাকা অঞ্চলে যোগাযোগ করে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করতে হয়। এটা স্থপতি ও তাঁদের চিন্তাদর্শনের গুণের ধরন অনুযায়ী ভিন্নতর ও কার্যকর হতে পারে।
এরপর প্রকৌশলী ও নির্মাণশিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁদের সঙ্গে একটা চমৎকার অলিখিত পার্টনারশিপ তৈরি করতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্থপতিদের সঙ্গে এমন রসায়ন নির্মাণশিল্পীদের তৈরি হয় সহজেই। যেহেতু এখন শুধু সাংস্কৃতিক স্থাপত্যের চর্চা হয় না। ফলে অনেক নতুন ডিজাইন নির্মাণশিল্পীদের নির্মিত করতে হয় বলে এই শেখা ও নির্মাণের যাত্রায় দুই চর্চাকারীর মধ্যে বোঝাপড়ায় ভালো সখ্য থাকতে হয়। যখন স্বল্পপরিসরে শুরুটা হয় এবং যৎসামান্য লোকবলে কাজ সমাধা করতে হয়, তখন স্থপতিকেই সাইট ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্ব নিতে হয়। এ জন্য স্থাপত্যচর্চার অফিসে থাকাকালীন নির্মাণ অংশে স্থপতিরা বিশেষ জোর দিতে পারেন। কেবল নিজের ফার্ম খোলার জন্যই নয়, বরং যে ডিজাইনটি করেছেন, তার বাস্তব রূপ দেওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটা আমাদের জানা থাকা জরুরি। টু ফোল্ড স্টুডিওর স্থপতিদ্বয়ের মধ্যেও এই গুণটি পাওয়া যায়। তাঁরা তাঁদের ডিজাইনের নতুনত্বগুলো নির্মাণশিল্পীদের কাছ থেকে বের করে আনতে শিখেছেন। ভবনের ম্যাটেরিয়াল এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি নিজেরাই ডিজাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বের করেছেন। চমক লাগানোর মতো কোনো পারিশ্রমিকের আশায় নয় বরং কাজের প্রতি ভালোবাসা ও নিজেদের পরিচিতি তৈরি করতেই দৈনিক অফিসের কাজের ফাঁকে এই শ্রম দেওয়া।
ইতিমধ্যেই তাঁরা প্রশংসা পাচ্ছেন এবং এই পর্যায়ে চলে আসে আরও একটি যোগাযোগের অংশ, তা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের কাজ সম্পর্কে সবাইকে জানানোর উদ্যোগ। নিজেদের ফার্ম খোলার পরপরই তাঁরা তাঁদের কাজ সম্পর্কে নিয়মিত জানিয়ে এসেছেন সবাইকে এবং কীভাবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে সেটিও নিশ্চিত করেছেন। সেসব কাজ আগের ও পরের ছবি পাশাপাশি সাজিয়ে দেখানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের চিন্তার স্পষ্ট ঝলক দেখানো যায় সবাইকে। যেকোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রেই আগের ছবি ও পরের ছবি স্থাপত্য চর্চায় জনমানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। যদিও প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী এতে ভিন্নতা আসতে পারে। ছবি ও ড্রয়িংয়ের নান্দনিক গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে তাঁদের কাজের সঙ্গে পরিচিতি বাড়তে থাকলে ক্রমান্বয়ে আরও কাজ পাওয়ার পথটি সুগম হয়, সেই সঙ্গে স্থাপত্য সংসারে নিজেদের উপস্থিতি থাকে সরব।
টু ফোল্ড স্টোরির শুরুর প্রকল্প
প্রথম প্রজেক্ট ছিল একটা রেনোভেশন প্রজেক্ট। স্থপতি স্নেহাশীষ সাহার জন্মস্থল নোয়াখালী। সেখানেই তিনি তাঁর পরিচিতদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে এই প্রকল্পটি পেয়েছিলেন। তাঁর ক্লায়েন্ট হলেন কয়েকজন বন্ধু, যাঁরা সবাই মিলে একটি পুরোনো আবাস ভবনের রেনোভেশন করে সেখানে একটা রেস্তোরাঁ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রকল্পের ক্লায়েন্ট মোহাম্মদ শামসুদ্দিন ভুঁইয়ার খালা ১৯৭৫ সালের দিকে এই আবাস ভবনটি নির্মাণ করেন। তাঁরা এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন থাকার জন্য কিন্তু ১৯৮০-৮২ সালের দিকে লন্ডনে চলে যান সেখানকার নাগরিক হিসেবে। এরপর থেকে ভবনটি আর কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়নি এবং এলাকায় লন্ডনি বাড়ি নামেই ছিল এর পরিচিত। ৪৬ দশমিক ৮ একরের বিশাল এই জমিতে নির্মিত হয় এই ভবন এবং ভবনসংলগ্ন পুকুর, যা নিয়ে রেনোভেশন ও ল্যান্ডস্কেপের একটা প্রকল্পের প্রস্তাব ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে পায় টু ফোল্ড স্টুডিও। নোয়াখালীর চৌরাস্তা থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে কেন্দুরবাগ বাজারের কাছেই এই সাইটটি। শহরের বিড়ম্বনাবর্জিত একটি মনোরম পরিবেশ পাওয়ায় স্থপতিদ্বয়ের কাছে সাইটটি নিয়ে সম্ভাবনা অনেক বলে মনে হয়।
রেস্তোরাঁয় যত বসার জায়গা করা যাবে, ততই লোক সমাগম হবে এবং ব্যবসার উন্নতি হবে বলে ভবনের ভেতরে ও ছাদের দুই অংশে কাস্টমার বসার কথা ভাবা হয়। কিন্তু ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি আগের ভবনে না থাকায় এই সিঁড়িটাকে ডিজাইনের মধ্য দিয়েই ভবনের গোটা চেহারায় আমূল পরিবর্তন এনেছেন স্থপতিদ্বয়। ভবনের সামনে চমৎকার এই অভিজ্ঞতা ডিজাইনের দরুন এর সামনে থেকে দেখার ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় আবাসিক ভবনের ফাংশনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। এর ফলে রেস্তোরাঁ হিসেবে দেখার জায়গাটি স্পষ্ট হতে শুরু করে। তা ছাড়া পুরোনো এই ভবন আলাদা করে কোনো লোড বা ভার নিতেও পারত না। দুটো লম্বা দেয়ালের মাঝখান দিয়ে এই সিঁড়িটা রেনোভেশন প্রকল্পের পুরোনো ভবনকে নতুন একটা চামড়া দেয়, পাশাপাশি উদ্্যাপনের মতো সিঁড়ি হওয়ায় রেস্তোরাঁয় আসার অভিজ্ঞতাকে দেয় পূর্ণতা। ছাদটা একদম ফ্ল্যাট না রেখে সেখানে একটা স্কেলিটন ডিজাইন করা হয়। এই ফ্রেমটি একটা সেমি আউটডোর স্পেস ভাবের জন্ম দেয়, যার ফলে রেস্টুরেন্টে যাঁরা আসেন, তাঁদের নিজ সীমানা সম্পর্কে একটা সেন্স বা ধারণা যেমন কাজ করে, তেমনি চারপাশের সুন্দর প্রকৃতি উপভোগের একটা জায়গাও তৈরি হয়। সেই অভিজ্ঞতাকে উসকে দিতে এই ফ্রেম থেকে লতানো গাছ ঝুলবে এবং ছাদের রেলিং ঘেঁষে থাকবে গাছপালা। কী ধরনের গাছ এখানে লাগানো হবে তা নিয়েও স্থপতিরা সচেতন। ছাদের এই ফ্রেমটি হরাইজন্টালি বা অনুভূমিকভাবে করা তাই কিন্তু এর সাপোর্ট ভার্টিক্যালি বা উলম্বভাবে সাপোর্টটা পুরোটাই মাটিতে দেওয়া। ছাদের ফ্লোরের মাঝখান দিয়ে একটা সার্কুলেশন ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে ভোক্তাদের সার্ভিস প্রদান করা সহজতর হয়। এই হলো ছাদ চিত্র।
ভবনের অভ্যন্তরে মিটিং, বন্ধু ও পরিবার নিয়ে বসা যেতে পারে এরকম নানা ধরনের গল্প-আড্ডার জায়গা থেকে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে। মিটিংয়ের কথা ভেবে কোজি কর্নারে কিছু সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে। খরচের বিষয়টি পুরো প্রজেক্টেই মুখ্য ছিল বিধায় ইন্টেরিয়রেও কম খরচে সর্বোচ্চ সৌন্দর্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছে। রং আর আলোর খেলার পাশাপাশি তাই এখানে উঠে এসেছে পুরোনো দেয়ালের প্লাস্টার খুলে এক্সপোজড ব্রিককে সাদা দেয়াল বানিয়ে আয়না বা ছবি দিয়ে আলোর সহায়তায় উদ্্যাপনের চেষ্টা। ফ্লোরে অর্ধেক অংশ এনসিএফ এবং অর্ধেক অংশ টাইলস করা হয়েছে। এখানে ক্লায়েন্টের মন রেখে টাইলস করা হলেও স্থপতির ইচ্ছানুযায়ী এনসিএফ ফ্লোরও তাঁরা নতুন স্থপতি হলেও রাখতে পেরেছেন, এটা উৎসাহিত করার মতো ঘটনা।
পড়ে থাকা ভবন ছিল বলে এর সামনের জায়গাটা কাদা হয়ে থাকত এবং ব্যবহারের একেবারেই অকেজো হয়ে পড়েছিল। তাই সামনের উঠানে যতটা পারা যায় সবুজ রেখে কিছু সফট পেভ ডিজাইন করা হয়েছে। এখানে কিছু বড় গাছ থাকায় নিচে শুকনো পাতা পড়ে থাকত। সেসব স্মৃতি স্মরণ করতে সফট পেভে কিছু পাতার ছোঁয়া রাখা হয়েছে। সাইটের দক্ষিণ পাশে আরেকটি পড়ে থাকা জমি আছে, যেখানে ছয় মাস ফসল হয় আর বাকি ছয় মাস থাকে পানির নিচে। ধান থাকাকালীন, ধান কাটার পর এবং পানিতে প্লাবিত হয়ে বিলের মতো অনেক প্রাকৃতিক রদবদলের মধ্য দিয়ে এই জায়গাটাকে যেতে হয়। তাই এখানে কেবল একটা শেড বা চালের পরিকল্পনা করা হয় যেন সেটি কোনোভাবেই এই প্রকৃতিকে ছাপিয়ে না যায়। পাশাপাশি মানুষজন যেন এই চমৎকার পরিবর্তনগুলো উপলব্ধিও করতে পারেন। এখানে খাবার ব্যবস্থাও হবে ফ্লোরে কোনো বাড়তি ফার্নিচার থাকবে না। এখানে ডেকের ওপর নির্মিত হচ্ছে খুব হালকা ম্যাটেরিয়ালের ছাদ।
আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং পড়ে কাজ করতে পারবেন এমন কোনো নির্মাণশিল্পী অত্র অঞ্চলে নেই। বরং মিস্ত্রি যাঁরা ছিলেন, তাঁরা বাস বানিয়ে থাকেন, এমনকি জীবনে সিঁড়িও তাঁরা নির্মাণ করেননি। যেহেতু এই প্রকল্পের ক্লায়েন্টরা বাস তথা পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাই মেটাল ব্যবহারেই তারা অধিক আগ্রহী। স্থপতিদ্বয় চিন্তায় ছিলেন যে তাঁদের রুচিশীলতা ও মননের সঙ্গে ক্লায়েন্টদের চিন্তা মিলবে কি না। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখা গেল ক্লায়েন্টরা প্রকল্পের কনসেপ্ট নিয়ে ভাবিত ছিলেন যে কেন স্থপতিদ্বয় এমন ডিজাইন করছেন এবং তাঁদের প্রকল্পের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়। তাঁদের এমন চিন্তায় স্থপতিরা ছিলেন খুব আনন্দিত। ফলে ডিজাইনের সঙ্গে ক্লায়েন্ট নিজেদের সম্পৃক্ততা দেখতে পান এবং পরামর্শ দেন এমন ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করতে, যা রি-ইউজ করা যাবে। ছাদের ওপরে গোলটেবিলগুলো তাদের সূত্র ধরেই পাওয়া রি-ইউজ করা ম্যাটেরিয়াল।
প্রকল্পটি এখন নির্মাণাধীন। এরই মধ্যে টু ফোল্ড স্টুডিও আরও কতগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেখানে আছে আবাসিক ভবনসহ রেনোভেশন প্রকল্প। এভাবেই নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন বাংলাদেশের স্থাপত্য মহলে দেশীয় নবীন স্থপতিরা। আশার বিষয় হলো, যাঁরাই এখন নিজেদের ফার্ম নিয়ে ভাবছেন এবং কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের চিন্তার জায়গায় পরিষ্কার বিধায় বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশে এবং জাতিগত পরিচয়ে তাঁরা ভালো ভূমিকা রাখতে পারছে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২১।