সময় আর সভ্যতা পাল্লা দিয়ে প্রতিনিয়তই বদলাচ্ছে। মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে প্রয়োজনীয় জীবনব্যবস্থা। আদিম যুগ থেকে মধ্য যুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগ। সময়ের ধারাবাহিকতায় অপেক্ষমাণ উত্তর আধুনিক যুগ। এক কথায় বলতে গেলে জীবন এখন স্মার্ট। এরই অংশ হিসেবে প্রতিদিনই উদ্ভাবন ঘটছে স্মার্ট প্রযুক্তির। প্রতিযোগিতা চলছে স্মার্ট আবাসনব্যবস্থায়। সংক্ষেপে বললে বলতে হয় স্মার্ট সিটি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন সময়ের সঙ্গে মানানসই যে নগরব্যবস্থা কার্যকর, তারই নাম স্মার্ট সিটি। প্রযুক্তিতে অগ্রগামী চীনের শেনজেন, এমনই এক স্মার্ট সিটির দৃষ্টান্ত।
আজকের চীনের শেনজেন শহর আর অতীতের শহর এক নয়। ঝলমলে আলোর ঝলকানির আজকের শেনজেন একদিন ছিল জেলেপল্লি। সেদিন বেশি দূরের নয়। ৩০ বছর আগেই জেলেদের বসত ছিল এখানে। চারপাশে ছিল আবাদি ধানি জমি। আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির এক পর্যায়ে চীনে যখন প্রথম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন থেকেই গ্রামীণ মেঠোপথ থেকে ব্যস্ত ব্যবসায়িক শহরে রূপান্তরিত ঘটে শেনজেনের। ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই শহরটি এখন পার্ল নদীর অববাহিকায় বিরাট এক নগরমাত্র। চীনের স্মার্ট শহর হওয়ার পরিকল্পনা বিশ্বের বৃহৎ পরিকল্পনাগুলোর অন্যতম।
২০৫০ সালের মধ্যে চীনের শহরগুলোতে বাড়বে আরও ২৯ কোটি ২০ লাখ বাসিন্দা। ইতিমধ্যে দেশটির ৫৮ শতাংশের বেশি নাগরিক শহুরে এলাকায় বাস করে, যেখানে ১৯৮০ সালে মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ শহরে থাকত। কর্তৃপক্ষের হিসাবমতে, দেশটিতে ৬৬২টি শহর আছে, এর মধ্যে ১৬০টির বেশি শহরেই অন্তত ১০ লাখ বা তার বেশি মানুষের বসবাস। সেখানকার সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে প্রযুক্তি। মানুষের হস্তক্ষেপ এতে খুবই সামান্য।
নাগরিকদের নিয়ম মেনে চলতে হয় স্মার্ট সিটিতে। রাস্তা দিয়ে ইচ্ছেমতো হেঁটে যাওয়া, সড়কে ময়লা ফেলা, অবৈধভাবে রাস্তা পার হওয়া, সুযোগ পেলেই কিছু চুরি করা সম্ভব নয় স্মার্ট সিটিতে। পরিবহন আইন ভাঙলে যেমন চালকদের ক্রেডিট সিস্টেম থাকে, তেমনি প্রতিটি আইনভঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্রেডিট কাটা যায়। ক্রেডিট শূন্যে নেমে এলে চালক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স হারায় এবং হাজার চেষ্টা করেও আর লাইসেন্স ফেরত পায় না। একইভাবে নাগরিকদেরও আছে সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম। প্রতিটি আইন অমান্যের জন্য ক্রেডিট কাটা যাবে। আইন লঙ্ঘনের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ক্রেডিটও কমতে থাকবে। ক্রেডিট বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে এলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কমবে প্রায় শূন্যের কোটায়।
স্মার্ট সিটির গাড়িগুলো সব বিদ্যুৎ-চালিত। সে কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা কম। চীনের স্মার্ট সিটিতে আছে অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ। তবে চীনে বর্তমানে একধরনের সোশ্যাল স্কোর প্রথা চালু রয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। সেগুলো অতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে। তবুও ট্রেনে সিগারেট খাওয়া, বিনা টিকিটে ভ্রমণের চেষ্টা ইত্যাদি অপরাধ একাধিকবার ধরা পড়ায় অন্তত ১০ লাখ মানুষকে ট্রেন এবং বিমানের টিকিট কিনতে দেওয়া হয়নি। অসংখ্য অদৃশ্য চোখে ঘেরা স্মার্ট সিটি অপরাধ ও অপরাধ প্রবণতা কমাতে দারুণ সহায়ক।
একবিংশ শতাব্দীতে নগরায়ণের গতি বন্য হয়ে উঠছে। প্রতিবছর বড় শহরগুলোতে সরে যাওয়ার চেষ্টা করা মানুষের সংখ্যা কেবলই বাড়ছে। মেগাসিটিগুলো ভালো কাজের পরিস্থিতি, উচ্চ উপার্জন, উন্নত অবকাঠামোসহ গ্রাম এবং গ্রামের বাসিন্দাদের আকর্ষণ করে। তবে এ ক্ষেত্রে অনেক যৌক্তিক প্রশ্নও থাকে।
একটি আদর্শ শহরের সমস্যা
ভিসেনজো স্কামোজজি, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, ফ্রান্সেস্কো ডিমার্ক, জিওভানি বেলুচি, লে কর্বুসিয়ার- এই মেধাবী ব্যক্তিত্বরা বিভিন্ন সময়ে তথাকথিত আদর্শ শহরের ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন। কীভাবে এ জাতীয় লোকেশন তৈরি করা যায়, সে ব্যাপারে ইউরোপ মধ্য যুগে সক্রিয় চিন্তাভাবনা শুরু করে। বর্তমানে বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে একটি আদর্শ শহরের ধারণা কিছুটা বদলেছে। বিশ এবং একবিংশ শতাব্দীর শেষে, একটি ‘স্মার্ট সিটি’ ধারণার জন্ম হয়েছিল, যা নগরজীবনের একেবারে সমস্ত প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়তার ভিত্তিতে।
স্মার্ট সিটির ৭টি লক্ষণ
সংক্ষেপে স্মার্ট সিটির মূল উদ্দেশ্য হলো সমস্ত পরিষেবার উন্নয়ন ঘটানো। কোনো সাধারণ বন্দোবস্ত থেকে স্মার্ট সিটি আলাদা করার কিছু উপায় আছে। স্মার্ট সিটির অনেক লক্ষণের উল্লেখযোগ্য হলো-
- আধুনিক ব্যবস্থা, যা সাধারণ নগরবাসীকে আকর্ষণ করে
- বুদ্ধিমান ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম
- অত্যাধুনিক আলোকসজ্জার বিন্যাস
- শহরব্যাপী ফ্রি ও শক্তিশালী ওয়াই-ফাই ব্যবস্থাপনা
- শক্তিশালী সৌর প্যানেল স্থাপন
- এসএমএসের মাধ্যমে শহরের নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতিতে সতর্ককরণ
- পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা চালু করা।
স্মার্ট বলতেই বোঝায় প্রযুক্তি আর শিল্পের ব্যবহার। একটি স্মার্ট সিটি পুরোপুরিই প্রযুক্তিনির্ভর। চীনের স্মার্ট সিটিতেও ব্যবহার করা হয়েছে এসব প্রযুক্তি। এখানে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ওয়্যারলেস সেন্সর নেটওয়ার্ক
- বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সেন্সর
- বৈদ্যুতিক মানচিত্র ও অ্যাপ্লিকেশন।
প্রযুক্তি একটি সামগ্রিক অদৃশ্য বিষয়, একটি ব্যবস্থাপনার নাম। প্রযুক্তি খালি চোখে দেখা যায় না। প্রযুক্তির বাস্তবায়ন করতে ব্যবহার করতে হয় নানা ধরনের মাধ্যমের। এই মাধ্যমগুলোকে খুব সহজে বললে বলতে হয় ডিভাইস। প্রযুক্তি-নির্ভর স্মার্ট সিটি নির্মাণে ব্যবহার করতে হয় অসংখ্য ডিভাইস। এই ডিভাইসগুলোর মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হয় প্রযুক্তি। প্রযুক্তি এবং ডিভাইসগুলোকে ভাগ করা হয় কয়েকটি বিশেষ কাঠামোগত উপাদানে। সাতটি কাঠামোগত উপাদান (অংশ) নিয়ে গঠিত হয় একটি স্মার্ট সিটি। এর মধ্যে তিনটি প্রধান এবং চারটি সহায়ক।
স্মার্ট অর্থনীতি
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ, উদ্ভাবনের অনুকূল পরিবেশ, একটি অনলাইন রিজার্ভেশন সিস্টেমের মাধ্যমে স্মার্ট অর্থনীতির বাস্তবায়ন করা হয় এ ক্ষেত্রে।
স্মার্ট আর্থিক ব্যবস্থা
স্মার্ট অর্থনীতি অনুযায়ী নগদহীন অর্থব্যবস্থাও চালু করতে হয় স্মার্ট সিটিতে। গতানুগতিক ধরার মতো ক্যাশ ব্যবহার করার কোনো গুরুত্ব থাকে না এখানে। তাই ডিজিটাল পেমেন্ট, এটিএম এবং টার্মিনালের উপলব্ধ স্মার্ট আর্থিক ব্যবস্থার মূল বিষয়।
স্মার্ট সিটিব্যবস্থাপনা
পৌর প্রশাসনের উন্মুক্ততা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে সিটি ব্যবস্থাপনা সহজ, আধুনিকীকরণ এবং সহজতর হতে হয়। এ ছাড়া স্মার্ট পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, স্মার্ট অবকাঠামো, স্মার্ট আলোক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি নাগরিকদেরও হতে হয় স্মার্ট।
স্মার্ট সিটি পরিবহন
যেকোনো স্মার্ট সিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভূ-পৃষ্ঠ। এটি কোনো নির্দিষ্ট বাস, ট্রলি বা ট্যাক্সির অবস্থান নির্ধারণ করে অনলাইনে নগর পরিবহনের গতিপথ ট্র্যাক করতে সহায়তা করে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ইতিমধ্যে পৌর পরিবহনের চলাচল অনুকূলকরণের জন্য একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা যাত্রীকে (বিশেষ তথ্য প্যানেল ব্যবহারকারীর স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে) চলাচলের সর্বোত্তম পথ বাতলে দেয়।
স্মার্ট সিটির আলোকসজ্জা
রাতের রাস্তায় হাটার সময় আলোগুলো পথচারীর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলোকিত হলে কার না ভালো লাগে? এই প্রযুক্তি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের অনেক শহরে চালু ছিল। তথাকথিত সেই গতি সেন্সর আজ বহুল জনপ্রিয়। এই সেন্সরগুলো কোনো ব্যক্তি বা যানবাহনের উপস্থিতি রেকর্ড করে এবং কেবল তখনই জ্বলে ওঠে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে ‘স্মার্ট সিটি’ ধারণার কাঠামোর মধ্যে স্মার্ট লুমিনায়ারগুলো প্রচলিত ভাস্বর আলোর তুলনায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের সঞ্চয় করতে সক্ষম।
অদূর ভবিষ্যতে আলো কেবল মানুষই নয়, উদ্ভিদের জন্যও আরামদায়ক হয়ে উঠবে। নগর উদ্যান এবং উদ্যানগুলোর স্মার্ট আলোকপাত সম্পর্কে ইতিমধ্যে গবেষণা চলছে। নির্গত আলোর উজ্জ্বলতা, তীব্রতা এবং ছায়ার স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়কে বিবেচনায় নিয়ে। শেনজেনের নগর ভবন এবং সর্বজনীন ভবনের মুখের মূল নকশার আলোয় নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
উদীয়মান শহর হিসেবে, শেনজেন তার ৩০ বছরের সমৃদ্ধ বিকাশের সঙ্গে নিজেকে শক্তিশালী হিসেবে প্রমাণ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, শেনজেনের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং স্মার্ট শিল্প চীন এবং এমনকি বিশ্বের সর্বদা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ডিজেআই, হুয়াওয়ে, টেনসেন্টসহ প্রচুর বিশ্বমানের উচ্চপ্রযুক্তি উদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই শহরে। শেনজেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বড় ডেটা প্রযুক্তি গ্রহণ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা, পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই উচ্চপ্রযুক্তি উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।
শেনজেনের বৈদ্যুতিক তথ্য শিল্পটি খুব উন্নত, যা একটি স্মার্ট সিটি তৈরির জন্য ভালো ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এটিতে বিশ্বের বৃহত্তম ইলেকট্রনিকস বাজার রয়েছে, সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্ক্রু থেকে শুরু করে ইলেকট্র্রনিকস ডিভাইসের একটি সম্পূর্ণ সেট পর্যন্ত সব কিছু উৎপাদন ও বিক্রি করে চীন। তবে বিপুলসংখ্যক উদ্ভাবনী পেশাদারদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে শেনজেন ব্যতিক্রমী এক স্মার্ট সিটি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০২১।